সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম প্রসঙ্গে

স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে আওয়ামীলীগ ও শেখ মুজিবুর রহমান যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভারত বিভাজন ও স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবের ইতিহাসে মুসলিম লীগ ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ গুরুত্বপূর্ণ (যদিও জিন্নাহ সংগঠন হিসেবে মুসলিম লীগকে এই কৃতিত্ব দেননি। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে তিনি টাইপরাইটারের মাধ্যমে পাকিস্তান অর্জন করেছেন)। যে লাহোর প্রস্তাবের মধ্যে পাকিস্তানের জন্মের সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিলো, সেই প্রস্তাবে কোথাও পাকিস্তান শব্দটির উল্লেখ নেই। লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের পরে হিন্দুদের দ্বারা পরিচালিত পত্রিকাগুলোই লাহোর প্রস্তাবকে পাকিস্তান প্রস্তাব নাম দিয়ে খবর প্রচার করে। লাহোর প্রস্তাব বিষয়ে জিন্নার দুই ঘন্টাব্যাপী ভাষণ যতটা না স্পষ্ট ধারণা তৈরি করেছিল শ্রোতাদের মনে, সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের পত্রিকাগুলো সেই আবছায়া প্রস্তাবকে পাকিস্তান প্রস্তাব নাম দেওয়ায় মুসলমানদের মনে স্বাধীন স্বতন্ত্র বাসভূমি পাকিস্তানের চিত্রটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জিন্না নাকি এইজন্য ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন পত্রিকাগুলোকে।

এই পাকিস্তান প্রস্তাবের ভাষণে জিন্না মুসলিম শ্রোতাদের আকৃষ্ট করার জন্য বক্তব্যের ফাঁকে ফাঁকে সাম্প্রদায়িক ও গোষ্ঠীগত আবেদনযুক্ত শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। যে কোন বিচারেই হিন্দু ও মুসলমান যে আলাদা জাতি, জীবনের প্রতি এদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা, এবং মুসলিম ভারত ও হিন্দু ভারত কখনোই এক জাতি নয়, তারা একসাথে থাকতে পারেনা এসবই সেদিন বলেছিলেন। তার শ্রোতারা এসব বিশ্বাস করেনি? করেছে বলেই তো মনে হয়। না হলে পাকিস্তান আন্দোলন এতো জোরদার হলো কী করে?

পাকিস্তান দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম লীগের প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি পেল এবং পাকিস্তান আন্দোলনে জোয়ার এলো। তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে। মুসলমান জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই তখন দ্বিজাতিতত্ত্বের চেতনায় বুদ (এর বাইরে কংগ্রেসে যুক্ত ছিলেন কিছু ভারতীয় জাতীয়তাবাদী। তাদের মধ্যে অন্যতম মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। কংগ্রেসের বাইরে ছিলেন কিছু প্যান ইসলামিস্ট। তারাও লাহোর প্রস্তাবের বিরোধী ছিলেন। আর ছিলেন জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ)। মুসলিম জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এমনই জোয়ার এসেছিল তখন যে সেই জোয়ারে সলিল সমাধি ঘটে মুসলমানপ্রধান প্রদেশ পাঞ্জাবের জাতীয়তাবাদী নেতা সিকান্দার হায়াত খানের দল ইউনিয়নিস্ট পার্টির। আসামের মুখ্যমন্ত্রী স্যার মোহাম্মদ সাদুল্লা, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক এবং পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী সিকান্দার হায়াত খান এই তিনজনই ১৯৩৭ এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের বাইরে থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পরপরই মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছেন। ওই নির্বাচনে ভারতের এগারোটা প্রদেশের কোন প্রদেশেই মুসলিম লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো নয়ই, উল্লেখযোগ্য কোন অর্জনই ছিলোনা (একমাত্র বাংলা ব্যতিক্রম। এখানে ৩৭ টি আসন পেয়ে মুসলিম লীগ দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শেরে বাংলার কৃষক প্রজা পার্টি পায় ৩৬ টি আসন)। মুসলিম লীগে ওই তিন নেতার অংশগ্রহণই জিন্নাহর হাতকে শক্তিশালী করে যার ফলে ৪৬ এর নির্বাচনে মুসলিম লীগ বাংলায় ও পাঞ্জাবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৯৪৫ এর ডিসেম্বরে কেন্দ্রীয় পরিষদের নির্বাচনে লীগ মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত সবকটি আসনে বিজয়ী হয়। পরবর্তী বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে প্রায় নব্বই শতাংশ আসনে জয়ী হয় লীগ। ১৯৪০ সালে যখন মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে ভারতে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির দাবী উত্থাপিত হল তখন নানাবিধ কারনে বাঙালি মুসলমানদের অধিকাংশই এই দাবীর সমর্থনে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। প্রাদেশিক এ্যসেম্বলি নির্বাচনে বাংলা প্রদেশে মুসলিম লীগ ১১৯ টি মুসলমান আসনের মধ্যে পায় ১১৩ টি আসন পায়। পাঞ্জাবের ৮৬ এর মধ্যে ৭৩, সিন্ধুর ৩৪ টির মধ্যে ২৭টি। হিন্দু সংখ্যাগুরু নির্বাচন এলাকাতেও মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত আসনে লীগের ব্যাপক বিজয় অর্জিত হয়। সংযুক্ত প্রদেশের ৬৬ টির মধ্যে ৫৪, বিহারে ৪০ এর মধ্যে ৩৪। এভাবে সারা দেশে ৪৯২টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৪২৫টি আসন পায় জিন্নার মুসলিম লীগ।

এসব নির্বাচনী সমাবেশে কী বলেছিলেন মুসলিম লীগের নেতারা?এতো জনসমর্থন কিভাবে পেল তারা? একটা উত্তর হচ্ছে ১৯৪৫-৪৬ এর নির্বাচনে লীগ ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতাকে জয়লাভের হাতিয়ার করে। পাঞ্জাবের ছোটলাট গ্ল্যান্সি বড়লাটকে জানিয়েছিলেন পাঞ্জাবের নির্বাচনের ক্ষেত্রে “ইসলাম বিপন্ন” একটা বড় ধুয়া। ধর্মান্ধ মোল্লা মৌলভীদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে সেখানে। মুসলিম লীগকে ভোট না দিলে তার মুসলমানিত্ব থাকবেনা, মুসলমানদেরকে একদিকে পাকিস্তান অন্যদিকে কাফিরস্থান বা হিন্দুস্থানের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হবে – এসব বলা হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণায়। একইভাবে পাঞ্জাবের বিশিষ্ট নেতা স্যার ফিরোজ খান নুন পাঞ্জাবের জনগনকে এই বলে আহবান জানান “To vote a non-Muslim League member will be against Islam and the Muslims.”

ভারতীয় মুসলমানদের মনে যে হিন্দু প্রভুত্বের ভীতি এবং ইসলামি অহমিকাবোধ সেটাকেই নির্বাচনে কাজে লাগানো হয়েছে। সেই সাথে হিন্দু প্রভাব ও প্রতিযোগিতামুক্ত হয়ে চাকরি ও ব্যবসার সুযোগ লাভের আশা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করেছিল জিন্না ও মুসলিম লীগের প্রতি। কায়েদে আজমের মতে এটা পাকিস্তানের পক্ষে মুসলমানদের ম্যান্ডেট।

পাকিস্তান স্বাধীন হবার প্রাক্কালে জিন্না পাকিস্তানে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সংখ্যালঘুদের সমমর্যাদা, তাদের ধর্ম পালন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার কথা বলেছিলেন। স্বাধীন পাকিস্তানে তিনি সর্বোচ্চ পদ গভর্নর জেনারেলের আসন গ্রহণ করেছিলেন। নিজের হাতে সংহত করেছিলেন একাধিক পদের ক্ষমতা। দ্রুতই তার স্বাস্থ্যভঙ্গ হয়। সেই সাথে আশাভঙ্গ। পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দু এবং ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের দুরবস্থা দেখে অশ্রুপাত করেছিলেন। পাকিস্তানে তিনি সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা দিতে পারেননি। জিন্নার ও করুণ ও অসম্মানজনক পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয়েছিল। “হিন্দু মুসলিম ঐক্যের দূত” জিন্না পাকিস্তান সৃষ্টির প্রয়াসে যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন, পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর সেই পথেই হেঁটেছে। যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও জিঘাংসাকে সম্বল করে পাকিস্তান সৃষ্টি, সেই বিদ্বেষ এখন জারী হয়েছে শিয়া, আহমদিয়া বা কাদিয়ানীদের উপর। পাকিস্তান ও জিন্নার এই পরিণতি নিয়ে লিখতে গিয়ে একজন লেখক লিখেছেন “কেউ যদি তাঁর লক্ষ্য সিদ্ধির পন্থা নির্বাচনে সতর্ক না হন, তাহলে দেখা যাবে যে পন্থাই তাঁর লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে।”

সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে উস্কে দিয়ে, জনগনের রাজনৈতিক চেতনা ও সাংস্কৃতিক মানের উন্নয়নের কোন চেষ্টা না করে স্রেফ জনমনোরঞ্জক বক্তৃতা করে, জনগনের সাংস্কৃতিক মানের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করলে দেশ এরকম নিম্নগামী হয়। আব্রাহাম লিঙ্কন বলেছিলেন “যদি এই (আমেরিকা) স্বাধীন মানুষ ও দেশের সরকার নীতিভ্রষ্ট ও নির্বীর্য হয় তার জন্য দায়ী হবে সেই রাজনীতিবিদেরা যারা পদ লাভের জন্য লড়াই করে,কেননা ওই পদ হল কোন কাজ না করে জীবিকা অর্জনের একমাত্র পথ।”

পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ছিলো চব্বিশ বছর। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাকিস্তানের উত্তরাধিকার একেবারে বিলীন হয়না।তার কিছু কুপ্রভাব বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার এতোদিন পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া যায়না। সেটা এই লেখার উদ্দেশ্যও নয়।

আমি ভাবছি বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে পতিত হয়েছে কিনা, যেখানে সরকার ক্রমাগত জনতুষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে জনগনকে শিক্ষিত ও সচেতন করে না তুলে, জনগনের সাংস্কৃতিক মানের উন্নতির চেষ্টা না করে। এর পরিণতি কী জিন্নার মতোই হবে, যিনি মূলত ছিলেন গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক, যিনি নিজের একটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ বা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সাম্প্রদায়িকতার পথ অবলম্বন করেন এবং উদ্দেশ্য পূরণ হলে অসাম্প্রদায়িকতার পথে চলতে গিয়ে দেখেন সে পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। প্রথমটা অর্জনের জন্য আমাদের পূর্ব প্রজন্মের লোকেরা জীবন দিয়েছেন এবং দ্বিতীয়টা এক সামরিক শাসক না চাইতেই জনগনকে উপহার দিয়েছেন জনতুষ্টির প্রয়াসে। যে সকল চেতনার উদয়ের ফলে মুক্তিযুদ্ধ করে নিজেদের জন্যে স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, গণপরিষদ কতৃক গৃহীত সংবিধানে সেই চেতনাসমূহের প্রতিফলন ঘটেছিল। সেই সংবিধানেই নানান সংশোধনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণাদায়ী কিছু চেতনাকে রাষ্ট্রের রাজকীয় নীতি থেকে ছেটে ফেলা হয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তন তার মধ্যে একটি।

আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় প্রথমে “বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম”, তারপর ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গায় “সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর আস্থা”এবং সর্বশেষ অষ্টম সংশোধনীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ এগুলো জনদাবী ছিলো না। শাসক শ্রেণী এটা করেছে জনগনকে ভোলানো, তাদেরকে খুশি রাখা, জনপ্রতিরোধের কোন সম্ভাবনাকে ধর্মের মাদকতা দিয়ে নস্যাৎ করে দেওয়া এবং নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা দখলকে স্থায়িত্ব দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানও রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে নিজেদের ধর্মের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা পেয়ে তৃপ্তি বোধ করেছে। তার অহমিকায় এখন রাষ্ট্রধর্মের পালক।

রাষ্ট্রধর্মের আবরণে তারা মানসিকভাবে নিরাপদ বোধ করেছে। কারণ বাঙালি মুসলমানের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে হিন্দু জমিদারদের শোষণ নির্যাতন এবং শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায় এককালে হিন্দুদের চাইতে অাপেক্ষিক অনগ্রসরতা থেকে জাত ভীতি, এবং এককালে যে ভারতবর্ষ মুসলমানেরা শাসন করেছে সেই ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশ শাসক বিদায় নিলে অবিভক্ত ভারতবর্ষে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে হিন্দু রাজত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার ভয়। এসবই মুসলমান জনগোষ্ঠীকে হয়তো এখনো সন্ত্রস্ত করে রাখে, (যদিও স্বাধীন বাংলাদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ওসব ভয়ের কোন কারণ নেই, তবুও ওই জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাই তাকে ভীত করে রাখে), সেইজন্য রাষ্ট্রধর্মের আবরণ বা আভরণ থেকে সে বাড়তি নিরাপত্তা খুঁজে পায়।

মুসলিম রাজনীতি যখন প্রথম বিচ্ছিন্নতাবাদের পথ ধরেছিল, তখন হিন্দুর সাম্প্রদায়িকতা মুসলমানের বিচ্ছিন্নবাদী প্রক্রিয়াকে আরো উস্কে দিয়েছিল। সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক যে কারণেই হোক ভারতবর্ষের মুসলমান জনগোষ্ঠী হিন্দু জনগোষ্ঠীর চাইতে প্রথমত শিক্ষায় এবং তার ফলে ব্রিটিশ শাসনে প্রবর্তিত চাকুরি ও রাজনৈতিক কাঠামোর অংশীদারিত্বে বেশ পিছিয়ে ছিল। হিন্দু নেতারা কোনদিন তাদের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকায়নি। তাদের অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করেনি। কোন ছাড় দিতেই তারা প্রস্তুত ছিলোনা মুসলমানদের জন্য। লখনৌ প্যাক্ট এবং বেঙ্গল প্যাক্টে সংখ্যালঘু ও অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর মুসলমান জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নেওয়ার তাগিদে কিছু বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল। হিন্দু নেতা বা জনগোষ্ঠী সেটাকে ভালো চোখে দেখেনি; বিরোধিতা করেছে। এর ফলও হয়েছে। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন ও মানসিক বিভাজন তীব্রতর হয়েছে। উভয়েই উভয়কে বিদ্বেষ ও সন্দেহের চোখে দেখছে আজও। দুই জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন এটা।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের রাজনীতির প্রতিক্রিয়া হয় অবশ্যম্ভাবীরূপে। বাংলাদেশ যখন পূর্ব পাকিস্তানরূপে পাকিস্তানের অংশ ছিলো, তখন বাঙালির যে কোন প্রতিরোধ আন্দোলন তা সে ভাষার জন্যই হোক, আর স্বাধীনতার জন্যই হোক, পাকিস্তানি শাসকবর্গ সেটাকে ভারতের বা হিন্দুদের (কখনো কমিউনিস্টদের) ষড়যন্ত্র বলে প্রচার চালাতো। এভাবে পাকিস্তান বাংলাদেশে ভারতবিরোধীতা আমদানি ও জারী রাখে। (পাকিস্তান মুসলমানের দেশ ও ভারত হিন্দুর দেশ- এই ছিলো তখন জনসাধারণের মনোভাব। তাই পূর্ববঙ্গে ভারতবিরোধীতা ও হিন্দুবিরোধিতা মূলত সমার্থকই ছিলো)। সেই প্রবণতা এখনো আছে। আর সেই সাথে ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ব্যাপক উত্থান, পরপর দুইবার কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় হিন্দুত্ববাদী শক্তির অধিষ্ঠান, ভারতে মুসলিমবিরোধী ব্যাপক প্রচার ও কর্মকান্ড,কাশ্মীর পরিস্থিতি, পাকিস্তানের সাথে ভারতের সীমান্ত সংঘর্ষ, ভারত কর্তৃক বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান, বাংলাদেশের সাথে পানি বন্টনে অসাম্য, বাণিজ্য ঘাটতি এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সাথে ঘনিষ্টতা প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশে ভারতবিরোধীতা তীব্রতর হয়েছে।

এছাড়া বর্তমানে ভারতে হিন্দুত্ববাদী সরকার থাকার কারণে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে বিচার করার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। উপমহাদেশের অধিকাংশ মানুষের মনে হিন্দু – মুসলমান একটা বাইনারি অপোজিট, পরষ্পর পরষ্পরের শত্রু সম্প্রদায়। হিন্দু ভারত তাই অনেক মুসলমানের কাছে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে পরিগণিত। ঠিক যেমন করে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা তার দেশের মুসলমানদেরকে বহিরাগত ও আশ্রিত মনে করছে এবং পাকিস্তানকে ধরে নিচ্ছে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে। আধিপত্যবাদী হিন্দু ভারতকে বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান সম্ভবত একটা চ্যালেঞ্জ বা একটা থ্রেট হিসেবে দেখে। সেই ভারতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে একটা বর্ম হিসেবে দেখছে। এই বর্মের আড়ালে তারা নিরাপদ বোধ করে। রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে তারা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের প্রতীক ও স্বীকৃতি মনে করে তৃপ্তি পায়। ভাবে এটা তাকে হিন্দু ভারতের আগ্রাসন থেকে সুরক্ষা দেবে। তাই সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম তুলে দেওয়ার কথা তারা ভাবতে পারেনা। তেমনি সরকারও তা তুলে দিয়ে জনগনকে রুষ্ট করতে চায়না।

এছাড়া বিশ্বব্যপী ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের সম্পর্কে একটি নেতিবাচক প্রচার রয়েছে। অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ পশ্চিমা শক্তির আক্রমণের মুখে প্রায় বিধ্বস্ত হয়েছে। ফলে পৃথিবীর দেশে দেশে মুসলমান জনগোষ্ঠী আতঙ্কিত রয়েছে। নিজেদের রক্ষার জন্য তারা আরও বেশি করে ধর্মীয় রক্ষণশীলতাকে আশ্রয় করছে। এটা একটা কমন স্ট্রাটেজি। আর তাছাড়া পশ্চিমা শক্তির আক্রমণের মুখে তারা ইসলামকেই বিপন্ন মনে করছে। ফলে আরো বেশি করে ইসলামকে আঁকড়ে ধরতে, রক্ষা করতে চাচ্ছে। এর ফলে ইসলামপন্থী দলের জনসমর্থন বাড়ছে।

আমার ধারণা বর্তমানে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার উত্থান ও বিস্তার তার ভৌগোলিক এলাকার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে হয়তো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। তাতে আরো বোঝা যায় সেকুলার দল ও সরকারগুলো কেন সাম্প্রদায়িকতার দিকে ঝুঁকেছে। সমাজ ও রাজনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে এবং ক্ষমতা পরিধিতে যারা বিচরণ করছে অর্থাৎ শাসন ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরে যারা বসে আছে তাদের অধিকাংশ লোকই সাম্প্রদায়িক। এরা সাম্প্রদায়িক ঘৃণার পরিবেশ থেকেই উঠৈ এসেছে। তাদের শিক্ষা সাম্প্রদায়িক, রাজনীতি সাম্প্রদায়িক, সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িক। তাইতো সংবিধানের মৌল কাঠামোর বিরোধী হওয়ায় অষ্টম সংশোধনীর একাংশ বাতিল হলো অথচ রাষ্ট্রধর্ম বাতিল হয়না। এটা বাতিল করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনকে ক্ষেপাতে চায়না সরকার। যে সোনার চাঁদ একবার জনগণ না চাইতেই পেয়ে গেছে সেই সোনার চাঁদকে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগন আর হারাতে চাইবেনা কিছুতেই। কারণ ওই রাষ্ট্রধর্ম জিনিসটা এতোদিনে তাদের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। এটা হারানোর কথা ভাবলে তারা বিপর্যস্ত বোধ করে, পরিচয় নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ততায় ভোগে।

রাজনীতিতে এখন আদর্শ বলে কিছু নেই। অথবা বলা যায় যে কোন ভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকাটাই আদর্শ। সেই আদর্শ অনুযায়ী দলগুলো কাজ করে। তাদের প্রধান কাজ জনমনোরঞ্জন, হাততালি পাওয়া। এবং নিজের পকেট ভরা। জনগনকে শিক্ষিত ও সচেতন করে তোলা, জনগনের সাংস্কৃতিক মানের উন্নতির চেষ্টা করা এসবে তাদের রুচি নেই।বরং জনগনের সাংস্কৃতিক নিম্নরুচির কাছে সরকার ও রাজনৈতিক দল অসহায়ভাবে অাত্মসমর্পণ করে নিজেদের ভোট বাড়াতে ব্যস্ত। জনগনকে আকৃষ্ট করতে, মন ভোলাতে ধর্মের ব্যবহারের জুড়ি নেই। ধর্ম এক্ষেত্রে পরিক্ষীত হাতিয়ার। সাধারণ জনগনকে শুধু নয়, ইসলামী আদর্শের নাম ভাঙিয়ে এবং নানান কৌশলে উগ্রপন্হী ইসলামী দলগুলোকে পর্যন্ত কব্জা করতে সমর্থ হয়েছে বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে ধর্মনিরপেক্ষতা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য পরিত্যাজ্য একটা শব্দ। ধর্মনিরপেক্ষতা যেখানে পরিত্যাজ্য, রাষ্টধর্ম সেখানে মোক্ষম দাওয়াই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + = 5