বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ শাসনের ইতিহাস [১৯৭৫-২০২০] ! পর্ব : ১১ (শেষ পর্ব)

[১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধু মারা না গিয়ে বেঁচে উঠলে কিভাবে চালাতেন তিনি আজকের বাংলাদেশ! বহুদলীয় শাসনে বাংলাদেশ কি ভাল আছে এখন! একদলীয় শাসনের চীনের থেকে? তার রূপক গল্প হচ্ছে এটি! বড় বিধায় প্রত্যহ রাত ৮-টায় ধারাবাহিকভাবে পোস্ট করা হবে জীবন চিন্তনের এ গল্প!]

:

অবশেষে এ জাতির চলমান আপাত বিপরীত স্রোতে ধাবমান নৌকা বাইতে বাইতে, উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো মহাকাশের অনন্ত পথ পাড়ি দিতে দিতে বার্ধক্যের ক্লান্তিকর দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছেন বঙ্গবন্ধু। পচাত্তরে কেবল দু’টো মেয়ে ছাড়া সবই হারিয়েছেন তিনি। এতোদিন বেচেঁ আছেন হয়তো কোটি বাঙালির হৃদ-নিংড়ানো ভালবাসায়, যা বাঙালিরা তাঁকে দেখিয়েছিল উনিশশ’ সত্তরে, একাত্তরে এবং পচাত্তরে তার গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে অবস্থানকালে। সে কারণেই হয়তো এতো নিঃসঙ্গতার মাঝেও কিভাবে বেঁচে আছেন এতোদিন বুঝতে পারেননি তিনি। নিজেকে জিজ্ঞেসও করে দেখেনি কোনদিন, কেন এখনো তিনি বাঙালির নৌকোর মাঝি হয়ে বেয়ে চলছেন অনন্তের সুকঠিন বৈঠা। হয়তো এ জীবনকে আর টেনে নেয়া কষ্টকর তার জন্যে। কবিগুরু বরীন্দ্রনাথও এতোদিন বয়স পাননি বাংলাদেশে, ভাবেন তিনি একান্তে নিজ মনে বিষণ্ণ নিঃশ্বাসের ঘ্রাণে।

:

নিঃসর্গ সন্ধ্যায় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে হাসিনা হাসিমুখে বললো বঙ্গবন্ধুকে, ‘‘চমৎকার স্বপ্ন দেখেছে সে গতরাতে, অন্তহীন আনন্দঘন অনুভবের স্বপ্ন। দেখেছে – পরিবারের সকল সদস্যরা বেড়াতে যাচ্ছে মহাকাশে বাংলাদেশের প্রথম নভোখেয়ায়। বঙ্গবন্ধু নিজেই নাম দিয়েছে নভোযানটির ‘‘শহীদ সাটল-৭১’’। উদ্বোধনী নভোখেয়ার যাত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর সাথে হাসিমুখে বসা মা ফজিলাতুন্নেছা, জামাল, কামাল আর রাসেল। পেছনের সিটে সহযাত্রী হিসেবে সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দিন, মনসুর আলী আর কামরুজ্জামান। অনেকদিন পর সবাইকে দেখেছেন চমকপ্রদ মগ্ন চিত্তে হাসিখুশী। হাসিনাও পিতার সাথে উঠতে চেয়েছিলেন নভোযানে কিন্তু খেয়াটি ছোট হওয়ার কারণে কেউই উঠতে দিচ্ছে না তাঁকে। রাসেল মায়ের কোলে বসে ক্যাপ্টেনকে তাড়া দিচ্ছে নভোযানটি দ্রুত ছাড়ার। অকষ্মাৎ কোটি মানুষের করতালি আর আনন্দধ্বনির মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মহাকাশ উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে চোখের পলকে নভোখেয়া লীন হয় অনন্ত আকাশে’’। স্বপ্ন বৃত্তান্ত শুনে ক্ষীয়মান চোখে তাকান বঙ্গবন্ধু হাসিনার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে। বঙ্গবন্ধুর চাহনি দেখে হাসিনার বুক ধক্‌ করে ওঠে! কোমল কণ্ঠে বলেন বঙ্গবন্ধু, ‘‘তোর দাদা কি বলেছিল তোকে মনে আছে? তোর স্বপ্ন নাকি সত্যি হয় ৯৯%। স্বপ্নের সাটলে চড়ে তোর মা’র কাছে যাওয়ার বোধ হয় সময় হয়েছে আমার’’! পিতার হৃদ-দলনের কথায় ভাঙনের কাতর অশ্রম্ন প্রবাহিত হয় কন্যার চোখে। মৃত  মীনাক্ষীর মত নীলাভ নিষ্প্রভ বঙ্গবন্ধুর চোখের দিকে তাকিয়ে হাসিনা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, ‘‘বাবা তুমি চলে গেলে কি নিয়ে থাকবো আমরা’’? আসন্ন পিতৃবিয়োগের অশিনি সঙ্কেতে, বাবা-মেয়ের সান্ধ্য নোনা-জলের কান্নায় ক্লেদাক্ত হয় গণভবনের বাতাস কালীদহের বিধ্বংসী বুনো ঝড়ের মতো!

হাসিনার মুখে স্বপ্নকথা শোনার পর থেকেই মৃত্যু চিন্তায় ভর করেছে বঙ্গবন্ধুকে। বার বার মনে পড়ছে হাজারো সুখ-অসুখের সাথী ফজিলাতুন্নেছা আর ছোট ছেলে রাসেলকে। খুব সকালেই একান্ত সচিব তোফায়েলকে ডেকে ‘‘১০০-সদস্যের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি’’ ’র সভা ডাকতে বলেন দ্রুত। সভায় তিনি দিক নির্দেশনামূলক ছোট একটি বক্তৃতা দেন এই বলে, ‘‘প্রাকৃতিক দুর্যোগের এ দেশে জন্মগ্রহণকারী বাঙালিকে পদদলিত করেছে সবাই। আর্যপূর্ব খড়গ, মৌর্য, গুপ্ত, গৌড়, পাল, সেন, মোগল-পাঠান, ইংরেজ, পাকিস্তানি সবাই এদেরকে শাসন করে দাসত্ব করিয়েছে। একাত্তরের আগে স্বাধীনতা কখনো দেখেনি বাঙালি জাতি। পাকিস্তানীদের মর্মমূলে আঘাত করেছিলাম বলে ৫৮-৬৯ পর্যন্ত আমি কারারূদ্ধ ছিলাম, এরপর একাত্তরে। বাস্তববাদী রাজনীতিক হিসেবে দৃঢ়সংকল্পে শপথ করেছিলাম, দেশ স্বাধীন করবোই একদিন। একাত্তরেই মূলত বাঙালি তার হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন হয়েছিল। আমি সপ্তপদী বৈশ্বিক প্রতিকূলতা আর বিধ্বস্ত অর্থনীতি, লক্ষ-কোটি জনঅধ্যুষিত যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশৃঙ্খল সামাজিকতার মধ্যে শূন্যহাতে দেশ পরিচালনা শুরু করেছিলাম। পচাত্তরে পরিবার হারানোর ওঁৎ পাতা সুপ্ত বেদনার মাঝেও সব ভুলে আমি আমার জনপ্রেম ও সম্মোহনী শক্তিকে জাতীয় সংহতির লক্ষ্যে কাজে লাগিয়েছি। দৃঢ়সংকল্প করেছিলাম একক শপথে, জাতীয় ঐক্য ও শক্তির উৎস হিসেবে বাঙালিকে একত্রে রাখবোই। পচাত্তরে আমার পরিবারবর্গ ও আমাকে হত্যার মাধ্যমে এ জাতিটাকে ওরা আবার পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করতে চেয়েছিল। এটি করতে পারলে দেশটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পদদলিত করে সাম্প্রদায়িকতা, হানাহানি, ঘুষ আর দুর্নীতিপূর্ণ একটি রাষ্ট্রে পরিণত হতো। দুর্নীতি আর নীতিহীনতাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হতো এ সমাজে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলোকে শিক্ষার পরিবর্তে সন্ত্রাসী দিয়ে ধ্বংস করা হতো। দেশে ভাইয়ে ভাইয়ে রক্তারক্তি ও খুনোখুনি শুরু হতো। যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে মূল্যবোধ বলতে কিছুই থাকতো না। সমাজের নিম্ন থেকে উচ্চবিত্ত পর্যন্ত প্রত্যেকটি মানুষই বৈধ-অবৈধ পন্থায় অর্থ কামানোর ধান্ধায় মশগুল থাকতো। সৎ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিরা পদে পদে নিগৃহীত হতো। যোগ্যরা অযোগ্যদের দাপটে কোনঠাসা থাকতো। বাংলাদেশকে পৃথিবীর সভ্য মানুষেরা সাম্প্রদায়িক-দুর্নীতিবাজ বলে উপহাস করতো। কিন্তু মৃত্যুর দরজা থেকে আমি ফিরে এসে দৃঢ়তা, ন্যায় আর সমতার ভিত্তিতে কঠোরভাবে দেশ পরিচালনার কারণে, এর কোনটিই সম্ভব হয়নি এদেশে।

:

বরং পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল চমৎকার দেশ হিসেবে বিশ্বসমাজে স্বীকৃতি পেয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য উৎপাদনসহ মানুষের জীবনযাত্রার মান ও মাথাপিছু জাতীয় আয় পচাত্তরের তুলনায় অন্তত ৩০০-গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন আমাদের নাগরিকদের মাথাপিছু জাতীয় আয় চীনের চেয়েও অন্তত দুশ ডলার বেশি। এটি সম্ভব হয়েছে আপনাদের সবার দেশপ্রেম, সততা, ন্যায়নিষ্ঠতা, মানবিকতা ও আমার নির্দেশাবলীকে যথাযথ অনুসরণের কারণে। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করি, আমিসহ উপস্থিত ‘‘১০০-সদস্যের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপারে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি’’র সকল সদস্যরা অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের জন্যে কাজ করেছেন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদকে রক্ষাকল্পে অনারম্ভর জীবন-যাপন করেছেন। আপনারা সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবীদের ভেতর থেকে এসেছেন, সেখানে হয়তো আপনাদের কারো কারো আর্থিক সুবিধা বর্তমানের তুলনায় বেশি ছিল। কিন্তু তারপরও আপনারা দেশের কল্যাণে নিজেদের সুখ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। আমার বয়স হয়েছে, হয়তো বেশিদিন আপনাদের মাঝে থাকবো না কিন্তু আপনারা যদি আমাদের এতোদিনের অনুসরণীয় নীতিকে মেনে চলেন, তবে বাংলাদেশের যে অর্জন হয়েছে আমাদের সমবেত চেষ্টায়, তা অব্যাহত থাকবে এবং আগামী ১০-বছরে অবশ্যই বিশ্বের মানচিত্রে আমাদের অবস্থান আরো দৃঢ় হবে। আমার অবর্তমানেও আপনারা এখনকার মতো স্বজনপ্রীতি, ঘুষ, দুর্নীতি, সরকারি সম্পত্তির তসরূপ, ভেজাল, আইন অমান্যের মতো নেতিবাচক কর্মকান্ডের ব্যাপারে কঠোর থাকবেন, অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবেন, দেখবেন কেউ-ই আপনাদের পদানত করতে পারবে না। আজ থেকে আমি আপনাদের আর কোন কাজে নির্দেশনা দেবনা! আমার আগের নির্দেশনাগুলো ও আজকের কথা স্মরণ রেখে দেশ চালাবেন। আমার মৃত্যুর পরও আমার নিরহঙ্কারী ও অনারম্ভর জীবনধারা আপনারা মনে রাখবেন, তাহলে দেশ চালাতে আপনাদের কষ্ট হবেনা। এটিই হয়তো আপনাদের সঙ্গে আমার শেষ সভা’’।

:

বঙ্গবন্ধুর আবেগঘন এ বিদায়ী ভাষণে অনেকের চোখেই জল এলো বেহালা মাতমের সুরে। তারপরও তারা একযোগে দৃঢ়কণ্ঠে দু’হাত উঁচু করে বললো – ‘‘নেতা আমরা শপথ করছি, আপনার অবর্তমানেও এ জাতির সঙ্গে আমরা প্রতারণা করবো না, আপনার প্রদর্শিত পথেই আমরা দেশ পরিচালনা করবো। জন্ম জন্মান্তরের ভালবাসার বৃষ্টি আমরা বাঙালি জাতি ও আপনার জন্যেই বর্ষাবো’’! অনুগামীদের দেশগড়ার প্রসন্ন প্রতিশ্রুতিতে আনন্দে চোখে জল নামে বঙ্গবন্ধুর। আজন্ম লালিত সততার শ্রভ্রতা আর সৌষ্ঠবের শক্তিতে প্রাণতা জাগে তাঁর। রাতে আকাশভর্তি নক্ষত্রমালার মাঝে অসীম শূন্যতায় নিজেকে খুঁজতে থাকেন সোনারতরীর স্বপ্নকৃষক মুজিব!

:

আজ ১৭ মার্চ ২০২০। ১৯২০ সালের এই দিনেই বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়েছিল টুঙ্গীপাড়ায়। কোনদিনই আরম্ভর করে জন্মদিন পালন করেননি বঙ্গবন্ধু। তাচ্ছিল্য করে বলতেন, ‘‘গরিব দেশের গরিব নেতার আবার জন্মদিন’’! অনেকেই ফুল নিয়ে এসেছে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে। ডাক্তারদের নিষেধাজ্ঞার কারণে বাইরে ফুল রেখে চলে গেছে প্রায় সবাই। গণভবনে আজ যেন ফুলের পাহাড়। বয়সের ভারে ন্যুজ-ভঙ্গুর বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে রয়েছে মেয়ে হাসিনা-রেহানা, দেশ পরিচালনায় দলীয় নেতৃবৃন্দসহ অন্যান্য  নিকট স্বজনরা। মাঝে মাঝে প্রিয় সহচরদের কেউ কেউ এসে বসছেন মাথার কাছে। পাশের চেয়ারে বসে আছেন ৩-বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তারা সার্বক্ষণিক তদারক করছেন বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যের সর্বশেষ অবস্থা। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল চেতনাহীন বঙ্গবন্ধুর। ডাক্তাররা জানালেন পচাত্তরে ঘাতকদের দু’টো বুলেট বিদ্ধ হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ফুসফুসে। তা বের করা হলেও, ফুসফুসের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ঐ সময়, যে কারণে শ্বাসকষ্ট নিয়েই এতোদিন বেঁচে আছেন তিনি। অনেকক্ষণ পর চোখ খুলে তাকিয়ে রইলেন দু’মেয়ের দিকে। মনে হলো কিছু বলার জন্য ঠোঁট নাড়ছেন তিনি। দু’বোন কাছে গেলে অত্যন্ত ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, ‘‘মা তোর স্বপ্নের মতোই স্বপ্ন দেখলাম আমি, রাসেল হাসিমুখে ডাকছে আমায়। তোর মার কাছে যাচ্ছি, তোদের দু’বোনকে রেখে গেলাম, আমার বাঙালি আর বাংলাদেশের জন্যে। বেলি ফুলের ঘ্রাণ পাচ্ছি এখানে, কে এনেছে বেলি ফুল’’? বাবার কথায় কন্যা রেহানা দৌঁড়ে গিয়ে জন্মদিনের জন্যে আনা হাজারো ফুলের পাহাড়ে খুঁজতে থাকে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বেলি ফুল কিন্তু আজ ফুলের অরণ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বেলি থাকে অধরাই যেন! হাসিনার কান্না আর চিৎকারে যখন দু’হাত ভরে পিতার কাঙ্খিত বেলি নিয়ে রুমে ঢুকে রেহানা, বঙ্গবন্ধু তখন তাঁর জ্যোতিষ্মান তীক্ষণ চোখ বন্ধ করেছেন আকাশ সীমানা তীরের অনন্ত নক্ষত্রের যাত্রী হিসেবে!

:

ঘাস ফুল মধুমতির নবান্নের মাঝেও শিশিরের জলে ভেজা শব্দগুলো টুঙ্গীপাড়ার আঙিনায় দাঁড়ানো হাসিনা-রেহানার হৃদয়-তন্ত্রী ছিঁড়ে শোণিতে প্রবাহিত হয়। নিশুতি জ্যোৎস্নায় ঘাসের বুক চিড়ে উড়ে চলা এক ঝাঁক জোনাকি বঙ্গবন্ধুর কবরে আলো জ্বালাতে থাকে অক্লান্ত শ্রম-নিষ্ঠায়। মধুমতির শ্রাবণ বিলের ক্লান্ত জলমালা সোনালী ধানক্ষেতের বিজন ঘাসে ঢেউ খেলে উড়ে যায় অনন্তের সবুঝ মাঠে। অগণিত পাখির কিচির-মিচির আর ডানার শব্দে পিতার কবরের পাশে এসে দাঁড়ায় কষ্টের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো কন্যাদ্বয়। কবরের কাছে এলেই পিতার শরীরের ওমের স্মৃতি-শব্দ তাদের বিমোহিত করে, বাবার শায়িত শরীরের অদ্ভুদ ছান্দনিক দ্যূতির ভেতর থেকে বেলি ফুলের তীব্র ঘ্রাণ তাদের নাক বেয়ে মগজে গিয়ে অনুরণন তোলে। কবরের গায়ে গুণগ্রাহীদের সদ্য লাগানো বিশালাকার জীবনান্দের কবিতায় লেখা এপিটাফের দিকে চোখ পড়ে দু’বোনের। শীতার্দ্র নোনা জলের ক্লেদাক্ত ভেজা চোখে এপিটাফ পড়ে যায় তারা দু’জনে মননের করুণ অর্কেস্ট্রায় -‘‘জীবন যে কাটিয়াছে বাংলায়-চারিদিকে বাঙালির ভিড়/ধান কাটা হয়ে গেলে মাঠে-মাঠে কত বার কুড়ালাম খড়;/বাঁধিলাম ঘর এই শ্যামা আর খঞ্জনার দেশ ভালবেসে/যেদিন সরিয়া যাব তোমাদের কাছ থেকে-দূর কুয়াশায়/চ’লে যাব, সেদিন মরণ এসে অন্ধকারে আমার শরীর/সেদিন র’বে না কোন ক্ষোভ মনে-এই সোঁদা ঘাসের ধূলায়/যখন মৃত্যুর ঘুমে শুয়ে র’ব-অন্ধকারে নক্ষত্রের নিচে/খয়েরী অশথপাতা-বঁইচি, শেয়ালকাঁটা আমার এ দেহ ভালবেসে/গভীর ঘাসের গুচ্ছে র’য়েছি ঘুমায়ে আমি, -নক্ষত্র নড়িছে/আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে-এই বাংলায়’’।

:

যে সকল গুণগ্রাহী পাঠক পুরো লেখাটি পড়েছেন, তাদের কাছে অনুরোধ থাকবে – রূপক এ লেখাটির মানোন্নয়নের কোন পরামর্শ থাকলে তা প্রদানের জন্য। যাতে বই আকারে প্রকাশের সময় তা যথাযথ যুক্ত করতে পারি।

:

[১১-পর্বে শেষ হলো ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ শাসনের ইতিহাস [১৯৭৫-২০২০’]

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

31 − 26 =