আল্লামা শফী যুগের অবসান ও হেফাজতে ইসলামের পরবর্তী দৃশ্যপট

প্রয়াত হলেন হেফাজতে ইসলামের বহুল বিতর্কিত আমির আল্লামা শফী। চট্রগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ঠিক একদিন পরেই, ১৮ই সেপ্টেম্বর শুক্রবারের সন্ধ্যায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হেফাজতে ইসলামের সূত্রমতে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিলো ১০৩ বছর। বিএনপি ও জামাতের পরোক্ষ এবং আওয়ামী সরকারের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে বাংলাদেশকে ইসলামীকরণে উৎসাহিত করা, মুক্তচিন্তক কিংবা নাস্তিক হত্যার হুমকি ও আদেশ, প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধতা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি তথা শাহবাগ আন্দোলনের বিপক্ষতা, নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচারণ এবং কওমি সনদের ফ্যাসিলিটিজ আদায় করা ছিল তাঁর এই দীর্ঘতম জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক। শুধুমাত্র ধর্মীয় পুঁজিতে – সরাসরি রাজনীতি না করেও, দেশের সমগ্র রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব বিস্তারের এক জীবন্ত উদাহরণ ছিলেন তিনি! হেফাজতে ইসলামের প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় বিরতিহীনভাবে ৩৪ বছর যাবৎ মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালনের সুবাদে বাংলাদেশের মুসলিমদের একটি বৃহৎ অংশ ও ইসলামিক মৌলবাদীদের কাছে তাঁর গড়ে উঠেছিল একটি শক্তিশালী আইডল ইমেজ এবং সুবৃহৎ ফলোয়ার উইলস। যেহেতু শাহ আহমদ শফী এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ একই অঙ্গ সেই প্রেক্ষিতে ফিরে দেখা যাক, কেমন ছিলো আল্লামা শফির অবসান করা অধ্যায় এবং তিনি বিহীন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সম্ভাব্য অবস্থান ও দৃশ্যপট।

 

শাহ আহমদ শফীর প্রাথমিক জীবন :

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পাখিয়ারটিলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করা শাহ আহমদ শফীর পিতার নাম বরকম আলী এবং মা মোছাম্মাৎ মেহেরুন্নেছা বেগম। আহমদ শফী দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। তাঁর দুই ছেলের মধ্যে আনাস মাদানি হেফাজতে ইসলামের প্রচার সম্পাদক। অন্যজন মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ পাখিয়ারটিলা কওমি মাদ্রাসার পরিচালক। তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা মাদ্রাসায়। এরপর পটিয়ার আল জামিয়াতুল আরাবিয়া মাদ্রাসায় (জিরি মাদ্রাসা) লেখাপড়া করেন। ১৯৪০ সালে তিনি হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯৫০ সালে তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় যান, সেখানে চার বছর লেখাপড়া করেন। হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক পদে যোগ দেন ১৯৮৬ সালে। এরপর টানা ৩৪ বছর ওই পদে ছিলেন। বাংলায় ১৩টি এবং উদুর্তে নয়টি বইয়ের রচয়িতা ছিলেন তিনি। শাহ আহমদ শফীর বিস্তরিত জীবনী জানতে এখানে ক্লিক করুন।

আল্লামা শফি ও হেফাজতে ইসলামের উত্থান :

মতিঝিলের শাপলা চত্বরে মৌলবাদী ও সুবৃহৎ ফলোয়ারদের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয়ার সময় থেকে আলোচনায় আসেন তিনি। এর আগে আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও ইসলামী ঐক্যজোট এর চেয়ারম্যান ইযহারুল ইসলাম চট্টগ্রামের একশোটি মাদ্রাসার শিক্ষকদের একত্রিত এবং সংঘবদ্ধ করে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি, গঠন করেছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সেইসাথে একই বছর বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরোধিতা করে সংগঠনটি নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়। বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন নীতি – ২০০৯ এর বেশ কয়েকটি ধারাকে ইসলামের সাথে সাঙ্ঘর্ষিক হিসেবে মূল্যায়ণ করে তীব্র বিরোধিতা করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বাংলাদেশে ইসলামী শাসনতন্ত্র স্থাপন লক্ষ্যে সংগঠনটি আন্দোলন ও বিক্ষোভ করে এসেছে। শুরু থেকেই যার মূল নেতৃত্বে ছিলেন শাহ আহমদ আল্লামা শফি। এরপরের সময়টা ছিলো ২০১৩ সাল; যে বছরে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী ও যুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানের পক্ষপাতিত্ব করা রাজাকার, আলবদর ও আল শামসদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে বিচারের দাবিতে ঢাকার শাহবাগ থেকে দেশের সর্বত্র বিক্ষুব্ধ জনস্রোত যখন ফুঁসে উঠছিল ঠিক সেই বছরেই তারা ইসলাম ও রাসুলকে কটূক্তিকারী নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসি দাবী করে আন্দোলন ও সমাবেশের সূচনা করে। এই প্রেক্ষিতে তারা ১৩ দফা দাবী উত্থাপন করে।

শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে ঢাকা অবরোধ :

২০১৩ সালের ৫ই মে, হেফাজতে ইসলাম ঢাকার সমস্ত প্রবেশমুখের দখল নেয় এবং ঢাকাকে অবরুদ্ধ করে। মাদ্রাসার শিক্ষক এবং ছাত্রদের বিপুল পদচারণায় ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালন এবং ঢাকার মতিঝিলে তাদের দ্বিতীয় সমাবেশের আয়োজন ও অংশগ্রহণ করা হয়। একই সময় ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠনটির কর্মীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা গুলিস্তান, দৈনিক বাংলার মোড়, মতিঝিল, পল্টনসহ আশেপাশের এলাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর সেইসাথে অগ্নিসংযোগ করে। যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ কোটি টাকা। শাপলা চত্বর পরিণত হয় ধ্বংসলীলায়! বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী এক প্রেস কনফারেন্সে জানান, সরকারের সংরক্ষিত পরিবহন স্টেশনে থাকা ৪০টি বাসসহ অন্যত্র দুই শতাধিক বাস অগ্নিসংযোগের স্বীকার হয়। ভাঙচুরের ফলে ক্ষতির সম্মুখীন হয় বিভিন্ন ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিসহ আরও বিভিন্ন অভিযোগ এনে ৬ মে গ্রেপ্তার করা হয সংগঠনের তৎকালীন মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরীকে।

২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলাম কর্মীদের ঢাকা অবরোধ।

 

হেফাজতে ইসলামের আলোচিত ১৩ দফা দাবি :

  • ১. সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা।
  • ২. আল্লাহ্, রাসুল ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস।
  • ৩.শাহবাগ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক এবং রাসুল এর নামে কুৎসা রটনাকারী ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা।
  • ৪. ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা।
  • ৫. ইসলামবিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।
  • ৬. সরকারিভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।
  • ৭. মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা।
  • ৮. জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ে বাধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধাদান বন্ধ করা।
  • ৯. রেডিও-টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাড়ি-টুপি ও ইসলামি কৃষ্টি-কালচার নিয়ে হাসিঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায় নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস-পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করা।
  • ১০. পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও এবং খ্রিষ্টান মিশনারিগুলোর ধর্মান্তকরণসহ সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।
  • ১১. রাসুলপ্রেমিক প্রতিবাদী আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র রাসুলপ্রেমিক জনতার ওপর হামলা, দমন-পীড়ন, নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং গণহত্যা বন্ধ করা।
  • ১২. সারা দেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, ওলামা-মাশায়েখ ও মসজিদের ইমাম-খতিবকে হুমকি-ধমকি, ভয়ভীতি দানসহ তাঁদের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করা।
  • ১৩. অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত সব আলেম-ওলামা, মাদ্রাসাছাত্র ও রাসুলপ্রেমিক জনতাকে মুক্তিদান, দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আহত ও নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণসহ দুষ্কৃতকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।

হেফাজত ইসলামের বিডি নিউজে প্রকাশিত ১৩ দফা

হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ ও দাবি উত্থাপন পরবর্তী আওয়ামী সরকারের রূপ বদল :

ক্ষমতা বহাল ও অস্তুিত্বের স্বার্থে হেফাজতে ইসলাম তথা আল্লামা শফীর সমস্ত দাবি দাওয়াই বলতে গেলে আওয়ামী সরকার পূরণ করেছে। ২০১৩ সালের ৫ই মে প্রকাশ্যে আসা আল্লামা শফীর সুবৃহৎ ফলোয়ার এবং এই সংগঠনটির প্রতি বিরোধী দলগুলোর সমর্থন ক্ষমতা নিয়ে আওয়ামীতন্ত্রকে নতুন করে ভাবাতে শুরু করে। ফলে শুধুমাত্র ক্ষমতা টেকাতে লীগ সরকার প্রগতিশীল বাংলাদেশকে বিকিয়ে দিতে একটুও কুন্ঠিত হয়নি। শফী নিয়ন্ত্রিত হেফাজতের কথা রাখার সূচনা হয়েছিলো প্রগতিশীল, লেখক, প্রকাশক, মুক্তমনা ও ব্লগার হত্যার মাধ্যমে। ২০১৩ সালে আল্লামা শফী ও হেফাজতের উত্থানের পর থেকে বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষ মনোভাব এবং প্রগতিশীলতার ওপর নেমে আসে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড় আর বাড়তে থাকে ইসলামিক মৌলবাদ। হেফাজতের ওয়াজ মাহফিলে নন মুসলিম এবং নাস্তিক হত্যার হুমকি দেয়া হতে থাকে সংগঠনটির নেতৃত্ব পর্যায়ের তরফ থেকে। যার সূচনাও করেছিলেন আল্লামা শফী স্বয়ং। কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ সনদকে সাধারণ শিক্ষার স্নাতকোত্তর ডিগ্রির স্বীকৃতি দেয় হাসিনা ও আওয়ামীতন্ত্র। কওমি মাদ্রাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিন) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান আইন, ২০১৮-এর খসড়ায় মন্ত্রিসভার নীতিগত অনুমোদনকে দেশের কওমি শিক্ষিত আলেমসমাজের পক্ষ থেকে ব্যাপকভাবে অভিনন্দন জানানো হয়। আল্লামা শফী, হেফাজত কিংবা দেশের ইসলামীষ্টদের তুষ্ট রাখতে হাসিনা ২০১৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রত্যেক উপজেলা এবং জেলায় আট হাজার ৭২২ কোটি টাকা ব্যয়ে মডেল মসজিদ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সেই অনুসারে কাজও করে। ফলে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উন্নয়ন না হলেও ২০১৩ সালের পর থেকে দেশে ব্যাঙের ছাতার মত গজে ওঠে অহরহ মসজিদ ও মাদ্রাসা। হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক পর্যায়ের বিশিষ্টজনদের সরকারী খরচ অর্থাৎ জনগণের টাকায় পবিত্র ওমরাহ করার সুযোগ করে দেয় শাসকের ভূমিকায় থাকা লীগতন্ত্র।

নারীদের উদ্দেশ্য করে আল্লামা শফীর বিভিন্ন বিতর্কিত মন্তব্য :

তিনি শুরু থেকেই নারী অধিকার ও নারী স্বাধীনতা বিরোধী ছিলেন। ফলে নারীদের উদ্দেশ্য করে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে তিনি কখনো দ্বিধাগ্রস্ত হননি।

  • ( ক) ওয়াজে নারীদের তিনি তুলনা করতেন তেঁতুলের সঙ্গে। তেঁতুল দেখলে মানুষের যেমন জিভে জল আসে তেমনি নারীদের দেখলে ‘দিলের মইধ্যে লালা বাইর হয়’ বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। আল্লামা শফির ওই বক্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুকসহ নানান ব্লগে এখন সমালোচনার ঝড় উঠেছিলো।
  • (খ) শফীর মতে, নারীদের কাজ হলো আসবাবপত্রের যত্ন নেওয়া, সন্তান লালন-পালন করা, ঘরের মধ্যে থাকা।
  • (গ) তিনি বলেছিলেন ; শোনো নারীরা, চার দেয়ালের ভেতরই তোমাদের থাকতে হবে। স্বামীর বাড়িতে বসে তোমরা আসবাবপত্র দেখভাল করবা, শিশু লালন-পালন, পুরুষ শিশুদের যতœ করবা। এই হলো তোমাদের কাজ। তোমাদের কেন বাইরে যেতে হবে?
  • (ঘ) নারীদের ক্লাস করা নিয়ে তাঁর কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ; মহিলাদের ক্লাসের সামনে বসানো হয় কলেজে ভার্সিটিতে, পুরুষরা কি লেখাপড়া কইরতেছে? মহিলা তেঁতুলের মতো-তেঁতুলের মতো-তেঁতুলের মতো। ছোট্ট একটা ছেলে তেঁতুল খাইতেসে, আপনে দেখতেছেন, আপনার মুখ দিয়া লালা বাইর হবে। সত্য না মিথ্যা বলেন তো? তেঁতুল বৃক্ষের নিচ দিকে আপনে হাইটা যান, আপনার মুখ থেকে লালা বাইর হয়। মার্কেটে যেখানে তেঁতুল বিক্রি করে ওদিকে যদি আপনে যান, আপনার মুখ থেকে লালা বাইর হয়। মহিলা তার থেকেও বেশি খারাপ! মহিলাদেরকে দেখলে দিলের মইধ্যে লালা বাইর হয়, বিবাহ করতে ইচ্ছা হয়। লাভ ম্যারেজ/কোর্ট ম্যারেজ করতে ইচ্ছা হয়। হয় কিনা বলেন? এই মহিলারা তেঁতুলের মতো।
  • (ঙ) তিনি আরো বলেছিলেন ; দিনেরাত্রে মহিলাদের সাথে পড়ালেখা করতেছেন, আপনার দিল ঠিক রাখতে পারবেন না। রাস্তাঘাটে হাঁটাহুটা করতেছেন, হ্যান্ডশেক কইরা কইরা, আপনার দিল ঠিক রাখতে পারবেন না। যতোই বুজুর্গ হোক না কেন, এই মহিলাকে দেখলে, মহিলার সাথে হ্যান্ডশেক করলে আপনার দিলের মধ্যে কুখেয়াল আইসা যাবে, খারাপ খেয়াল। এইটা মনের জেনা, দিলের জেনা হইতে হইতে আসল জেনায় পরিণত হবে। এটা সত্য না মিথ্যা?

এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত জানতে এখানে দেখুন

 

হাটহাজারী মাদ্রাসায় সদ্য ঘটিত সংঘাত ও মহাপরিচালকের পদ থেকে আল্লামা শফীর পদত্যাগ :

শাহ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানী কর্তৃক ছাত্র ও শিক্ষক লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের অভিযোগ এনে বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা হাটহাজারী মাদ্রাসা অবরোধ ও বিক্ষোভ পালন করে। এসময় পক্ষে ও বিপক্ষের ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। এমতাবস্থায় বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা কিছু দাবি উত্থাপন করেন। ছাত্রদের দাবিগুলোর মধ্যে কয়েকটি ছিলো :

  • ১. মাওলানা আনাস মাদানীকে অনতিবিলম্বে মাদ্রাসা থেকে বহিষ্কার করতে হবে।
  • ২. ছাত্রদের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান ও সব ধরনের হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
  • ৩. আল্লামা আহমদ শফী অক্ষম হওয়ায় মহাপরিচালকের পদ থেকে সম্মানজনকভাবে অব্যাহতি দিয়ে উপদেষ্টা বানাতে হবে।
  • ৪. উস্তাদদের পূর্ণ অধিকার ও নিয়োগ বিয়োগকে শূরার কাছে পূর্ণ ন্যস্ত করতে হবে।
  • ৫. বিগত শূরার হক্কানি আলেমদের পুনর্বহাল ও বিতর্কিত সদস্যদের পদচ্যুত করতে হবে।

মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফীর সভাপতিত্বে বুধবার রাতে তার কক্ষে মজলিশে শূরার এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় তিনটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তিনি মাইকে ঘোষণা দেন। তিনটি সিদ্ধান্ত হলো, মাদ্রাসার যাবতীয় কার্যক্রম থেকে আনাস মাদানীকে অব্যাহতি। অধ্যয়নরত ছাত্রদের কাউকে কোনও ধরনের হয়রানি করা হবে না। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর মজলিশে শূরার বৈঠক ডেকে বাকি সমস্যাগুলোর সমাধান করবেন। এরপর ছাত্রদের বিক্ষোভের মুখে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদক আনাস মাদানীকে হাটহাজারী দারুল উলুম মাদ্রাসা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং দারুল উলুম মাদ্রাসার মহাপরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন আল্লামা শাহ আহমদ শফী। বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত হয়, আর কোনও ছাত্রকে হয়রানি করা হবে না। সভায় শূরা সদস্যদের মধ্যে মেখল মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা নোমান ফয়েজী, নানুপুর মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা সালাহউদ্দীন নানুপুরী ও মাওলানা ওমর ফারুক, মাওলানা আহমেদ দিদার, মাওলানা ফোরকান আহমেদ, মাওলানা বশির আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।

ছবি : আনাস মাদানি ও আল্লামা শফীর পদত্যাগের দাবিতে হাটহাজারী মাদ্রাসার ছাত্রদের বিক্ষোভ।

 

 

কেমন হতে পারে আল্লামা শাহ আহমদ শফী বিহীন হেফাজতে ইসলামের পরবর্তী দৃশ্যপট ও অবস্থান :

এই সম্পর্কে ডয়েচে ভেল বাংলা বিভাগের প্রধান সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিনের দেয়া একটি সাক্ষাৎকারের ভাষ্যমতে ; কওমী মাদ্রাসা, ধর্ম এবং সমাজ সম্পর্কিত বিষয়ে আল্লামা শফীর একটি বড় প্রভাব ছিলো। তারচেয়ে বড় কথা দেশের রাজনীতিতে ওনার প্রভাব ছিলো অনস্বীকার্য, যা ২০১৩ সালের ৫ ই মে আমরা দেখেছি। তবে ওনার পরবর্তী লিডারশিপ ওয়েভের সাথে বিরোধী দল বা আওয়ামীলীগের সম্পর্ক কেমন হতে সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা। কেনোনা তাঁকে মানতে রাজি হলেও তাঁর ছেলে আনাস মাদানিকে মানতে ছাত্রদের একাংশ রাজি নয়।

এছাড়াও গত ৩ – ৪ বছরে মাওলানা শফির অসুস্থতার কারণে নেতৃত্বে কে যাবেন এ বিষয়ে হাটহাজারী মাদ্রাসা ও খোদ হেফাজতে ইসলামের মধ্যেই মতবিরোধ দেখা দেয়, যেখানে দলের একটি বৃহৎ অংশ বাবুনগরীরও অনুসারী। তবে বহুক্ষেত্রেই বাবুনগরী আল্লামা শফির সমালোচক ছিলেন। হেফাজতের সেকেন্ড ওয়েভের নেতাদের পলেটিক্যাল উইল থাকলেও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা আদায় করার মাধ্যমে আল্লামা শফি তাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন কাউকে ক্ষমতাচ্যুত এবং ক্ষমতায় আসীন করা তাদের গোল নয়।

ছবি : মডেল মসজিদ নির্মাণের জন্য চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দোয়া।

তারপরো ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে হেফাজতের তরফ থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের আশা নিয়ে দলের প্রভাবশালী নেতারা আওয়ামীর দ্বারস্থ হয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলাম ও হেফাজতে ইসলাম উভয়েই ইসলামীক আবেশে রাজনীতি বা অরাজনৈতিক অবস্থানে থাকলেও অস্ত্বিত্বের স্বার্থে হেফাজত ইতিপূর্বে জামাতের সাথে মধ্যস্থতা করেনি। অপরদিকে আওয়ামীর শত্রু যেহেতু বিএনপি ও জামাত সেহেতু হেফাজতের পাল কোনদিকে টার্ন করবে তা এখনই অনুমেয় নয়। কেনোনা এই সংগঠনটি শুরু থেকে সব রাজনৈতিক দলের মাষ্টার পার্ট হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

ছবি : আল্লামা শফি ও হেফাজতের উত্থানের পর আমরা যাঁদের হারিয়েছি।

 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 4 =