ধর্মে নারী, রাষ্ট্রে নারী

পৃথিবীতে মোট ধর্মের সংখ্যা ৪৩০০ এবং প্রায় প্রতিটি ধর্মগ্রন্থের কেন্দ্রীয় বিন্দু হচ্ছে নারী। প্রতিটি ধর্মের বিশ্বাসীরা দাবী করে তাদের ধর্মই সেরা এবং তাদের ধর্মই দিয়েছে নারীকে সম্মান ও সুমহান মর্যাদা। কিন্তু ধর্মগ্রস্থগুলো যদি নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় তাহলে দেখা যায় যে, অধিকাংশই ক্ষেত্রেই নারী সম্বন্ধে বিশ্রী, বিদঘুটে, অমানবিক, হাস্যকর, অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক ও নারীবিদ্বেষী কথাবার্তা। তবে, যেহেতু প্রায় প্রতিটি ধর্মগ্রন্থই বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন মানুষের দ্বারা লিপিবদ্ধ হয়েছে; তাই, একেক সময়ে একেক ধরণের নিয়মনীতি, দিক নির্দেশনা, ভাবধারণা ও ইঙ্গিত।

একদিকে, ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে- নারীকে মায়ের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। আবার অন্যদিকে, নারীকে পুরুষের অধীনস্থ থাকারও নির্দেশনাও দেওয়া আছে। বাড়িঘর থেকে প্রস্থানের সময় নারীকে অবশ্যই একজন পুরুষের সাথে বের হওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অন্যথায়, আল্লাহ্‌ হুকুম অমান্য করা বোঝাবে। যার পরিমাণ ভয়ংকর। সম্মান অর্থ কী? সম্মান অর্থ কি কারো অধীনস্থ হয়ে থাকাকে বোঝায়? ধর্মগ্রস্থ ও সেই সকল ধর্মের বিশ্বাসী অনুসারীরা এক উদ্ভট চিন্তার মধ্য দিয়ে নিজেদের স্থির করেছে যে- অধীনস্থ শব্দটি সম্মানজনক। তবে, এই শব্দটি শুধুমাত্র নারীর ক্ষেত্রেই বটে। পুরুষ কারো অধীনে বিশ্বাসী নয়। পুরুষদের যদি বলা হয়, নারীর অধীনে কি আপনি সম্মানবোধ করেন? তবে উত্তর কী হবে?

‘পুরুষগণ নারীদিগের উপর কর্তৃত্বশীল, এই কারণে যে, আল্লাহ উহাদের কাহাকেও কাহারও উপর মর্যাদা প্রদান করিয়াছেন, এবং পুরুষেরা স্বীয় মাল হইতে তাহাদের অর্থ ব্যয় করিয়াছে, ফলে পূন্যবান রমনীগণ অনুগত থাকে, অজ্ঞাতেও তত্ত্বাবধান করে, আল্লাহর তত্ত্বাবধানের মধ্যে এবং যাহাদের অবাধ্যতার সম্ভাবনা দেখিতে পাও, তাহাদিগকে উপদেশ দাও, এবং তাহাদের সহিত শয্যা বন্ধ কর এবং তাহাদিগকে সংযতভাবে প্রহার কর, তারপর যদি তোমাদের নির্দেশ অনুযায়ী চলিতে থাকে, তাহা হইলে তাহাদের উপর নির্যাতনের পন্থা অবলম্বন করিও না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সুউচ্চ মর্যাদাশীল মহান।‘ (সূরা-৪:নিসা, আয়াত:৩৪)

যেহেতু নারী ও পুরুষের সমতায় ইসলাম ধর্ম বিশ্বাস করে না সেহেতু সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রে আসল রূপ দেখা যায়। সমতার প্রশ্ন উঠলেই একদল ধর্মান্ধ চিৎকার করে বলে- মেয়েরা কি ছেলেদের সাথে দৌড়ে পারবে? মেয়েরা কি ছেলেদের মত সবার সামনে উপরের পোশাক খুলতে পারবে? মেয়েদের শারীরিক গড়ন কি ছেলেদের মতোন? ধর্মীয় পুরুষ ও নারীরা এসবে নারী ও পুরুষের পার্থক্যের মাধ্যমে কুযুক্তি উপস্থাপন করে থাকে। তাদের এই কুযুক্তিকে যদি সাময়িকভাবে যুক্তি হিসেবে দেখা হয়- তাহলে, নারী বাচ্চা প্রসবের সময় যে পীড়ন সহ্য করে থাকে তা কি পুরুষেরা সহ্য করতে পারবে? শরীরের সবগুলো হাড্ডি একসাথে ভেঙে গেলে যতোটা ব্যথা, পীড়ন, যন্ত্রণা, কষ্ট মানুষের হবে, ততোটাই যন্ত্রণা বাচ্চা প্রসবের সময় নারীরা সহ্য করে যায়। তাহলে কি আমরা বলতে পারি না যে, পুরুষের থেকে নারীর শারীরিক সহ্য ক্ষমতা বেশি? এমনকি, পুরুষের থেকে নারীর শারীরিক মিল বা  সেক্সের ক্ষমতা বেশি, এক্ষেত্রেও তো পুরুষেরা শারীরিকভাবে নারীর থেকে দুর্বল। তারপরও ইসলামের ধর্মের বিশ্বাসীরা উচ্চস্বরে দাবী করে যে, নারীকে যথেষ্ট সম্মান ও অধিকার দেওয়া হয়েছে।

ইসলাম ধর্মের পবিত্র কোরআনে লিপিবদ্ধ আছেঃ

‘তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র, সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যে প্রকারে ইচ্ছা অবতীর্ন হও।‘ সূরা-২: বাক্কারাহ, আয়াত:২২৩

আধুনিক সময়ে ও বিশ্বে এই-ধরণের কথাবার্তা গ্রহণযোগ্য নয়। এইভাবে নারীকে ভোগ্যপণ্যরূপে উপস্থাপন, ও গ্রহণ এবং তার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করা নারীবিদ্বেষী হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের ভূমিতে এই কথা অস্বীকার ও অবজ্ঞা করার অর্থ ধর্মত্যাগী, অর্থাৎ মৃত্যু অনিবার্য।

এখন এই আয়াতটি যদি স্ত্রীর পরিবর্তে স্বামীতে পালটে দেওয়া হয় তাহলে পুরুষদের কেমন বোধ হবে?

‘তোমাদের স্বামীগণ তোমাদের শস্যক্ষেত্র, সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যে প্রকারে ইচ্ছা অবতীর্ন হও।‘

প্রতিটি ধর্মগ্রন্থে পুরুষ রাজা হলেও নারী কিন্তু রানী নয়। বরং নারী হচ্ছে দাসীরূপে। সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটে পুরুষ নারীকে দুই চার অংশে সম্মান দিয়েছে তা সত্য। যার পিছনে যথেষ্ট কারণও আছে বটে। এমন নয় যে, শুধুমাত্র ইসলাম ধর্মেই নারীকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়েছে, বরং প্রায় প্রতিটি ধর্মেই নারীকে অমঙ্গল ও অকল্যাণকর এবং ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

 ‘স্ত্রীদের মধ্যে যাদের অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তারপর তাদের শয্যা বর্জন কর এবং (তাতেও যদি কাজ না হয়) তাদের প্রহার কর। বিবাহিতা পত্নীকে প্রহার করাটা যে পতি দেবতাদের জন্মগত অধিকার তাতে সন্দেহ থাকতে পারে না।‘ (সূরা নিসা, আয়াতঃ ৩৪)

স্ত্রীদের প্রতি স্বামী অর্থাৎ প্রভুর কীরূপ আচরণ হতে পারে তাও ধর্মগ্রস্থে লিপিবদ্ধ আছে। এবং প্রায় সময়ই খবরের কাগজে দেখতে পাওয়া যায় যে- মিশর, সৌদি ও পাকিস্থানের পুরুষদের নারী নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হলেও কোরআনে আল্লাহ্‌ এই নির্দেশের কথা উল্লেখ করে অভিযুক্ত নিজেকে নির্দোষ দাবী করে। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিশর, পাকিস্তান ও সৌদির আইনব্যবস্থা ও শরিয়া আদালত অভিযুক্ত পুরুষকে ক্ষমা করে দেয় এবং নারীকে জেল, বেত্রাঘাত ও অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের শিকার হতে হয়। এইরকম ভয়ংকর ও অমানবিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ধর্মগ্রস্থগুলো মুখ্য ভূমিকা রাখে। এবং নারী নির্যাতন ও নিপীড়ন চলতেই থাকে।

আয়শা হতে বর্নিত- ‘যে সব বস্তু নামাজকে নষ্ট করে তারা হলো- কুকুর, গাধা ও নারী। আমি বললাম- আপনি আমাদেরকে (নারী) কুকুর ও গাধাদের সাথে তুলনা করলেন, হায় আল্লাহ!’ (সহি বুখারি, ভলুম-১, বই- ৯, হাদিস-৪৯৩)  

 

সিমন দ্য বোভোয়ার এর ‘দি সেকেন্ড সেক্স’ গ্রন্থে ‘শিশু’ সেন্ট’দের কিছু উক্তি বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরী।

‘For the man is not of the woman but the woman of the man. Neither was the man created for the woman but the woman for the man.’

‘For  the husband is the head of the wife even as Christ is the head of the church therefore as the Church is subject into Christ so let the wives be to the wives be to their own husband’s in everything.’

অর্থাৎ নারী সম্বন্ধে ইসলাম ও খ্রিষ্টান ধর্মের কথিত সৃষ্টিকর্তা বা পয়গম্বরদের ভাবনার খুব একটা পার্থক্য নেই। বর্তমান বিশ্বে খ্রিষ্টানেরা ধর্মের নিকৃষ্ট ভাবনা ও দিক নির্দেশনা ত্যাগ করেছে। যার ফলে খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে ধর্মের নামে নারীদের আক্রমণ, নির্যাতন খুব একটা সম্ভব নয়। তবে একদমই যে কোন ধরণের অপকর্ম ঘটে না তা কিন্তু নয়। যেমনঃ- মার্কিন যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ইউরোপের অনেক চার্চের ফাদারদের নামে অনেক অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। যেখানে শিশুদের শারীরিকভাবে শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠে। তেমনই, মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার শিক্ষক, পাদ্রী, নানা ধরণের বাবা নামে খ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ধর্ষণের প্রমাণ অহরহ খুঁজে পাওয়া যায়।

‘But I would have you know, that the head of every man is Christ; and the head of the woman is the man; and the head of Christ is God.’ (1 Corinthians 11:3)   

সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদ (বাঙলা)ঃ পুরুষের কর্তা হচ্ছে যীশু, আর নারীর কর্তা হচ্ছে পুরুষ।

‘Wives, submit yourselves unto your own husbands, as unto the Lord.’ (Ephesians 5:22)

সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদ (বাঙলা)ঃ  স্ত্রীরা তাদের স্বামীদের প্রতি আত্মসমর্পণ করবে, যেমন গডের প্রতি তারা আত্মসমর্পণ করে।

‘For the man is not of the woman: but the woman of the man. Neither was the man created for the woman; but the woman for the man.’ (1 Corinthians 11:8-9)

সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদ (বাঙলা)ঃ পুরুষকে নারীর জন্য সৃষ্টি করা হয়নি, কিন্তু নারীকে পুরুষের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

নারীর অবস্থান যে পুরুষের নিচে, পুরুষের ক্ষমতা যে নারীর চেয়ে বেশি, পুরুষের অধিকার যে নারীর থেকে মাত্রাধিক, নারীর উপর পুরুষের কর্তৃত্ব- এসকল শক্তি প্রদর্শন সকল ধর্মগ্রন্থে  ঘুরেফিরে আসে। এই একই কথাগুলি ইসলাম ও ইহুদী ধর্মেও লিপিবদ্ধ আছে। যেহেতু ইহুদী, খ্রিষ্টান, ইসলাম ধর্মের আয়াত, সূরা, নিয়মাবলী, নির্দেশ, আইনকানুন একে অপরের থেকে কমবেশি কাঁটা হেঁচড়া করে নেওয়া, সেহেতু এই ধর্মগুলোর মধ্যে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। খ্রিষ্টান প্রধান অঞ্চলে ধর্মকে অস্বীকার বা ধর্মের এই বিধি-বিধানকে অস্বীকার করার পরিমাণ মৃত্যু বা জেল নয় বলে এসকল অমানবিক ও হাস্যকর বিষয়াদি নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা ও সমালোচনা করা সম্ভব হলেও মুসলমান প্রধান দেশে মৃত্যু আবশ্যক। পৃথিবীর কোন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক নয়; গণতন্ত্রের নামে কোথাও স্বৈরতন্ত্র আর কোথাও গণতন্ত্রের নামে শরিয়াতন্ত্র চলার কারণে নির্যাতন, জেলবন্দি, দেশত্যাগ ও মৃত্যু চূড়ান্ত।

ইউরোপ ও আমেরিকার নারীরা পুরুষের অধীনে এখন আর থাকতে চায় না। যার একটি কারণ হচ্ছে ধর্মের প্রভাব থেকে রাষ্ট্রগুলো মুক্ত। নারীর নিজস্ব স্বত্বা, ইচ্ছে, চাহিদা, স্বপ্ন, অধিকারকে রাষ্ট্র সম্মানের চোখে দেখতে বাধ্য হয়েছে। ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের পেছনে রেনেসাঁস, ফরাসি বিপ্লব, ইউরোপিয়ান এনলাইটেন্টমেন্টের ভূমিকা আছে। মানুষের অধিকার ও শান্তির জন্যে নানা ধরণের মানবিক আইনকানুন ও সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। অন্যদিকে, মুসলমান ও হিন্দুদের চিন্তার সীমাবদ্ধতার কারণে এখনও নারীদের পুরুষের অধীনে থাকতে হচ্ছে। সেইসাথে আছে- নানা ধরণের ও রকমের ভীতি, লোকলজ্জা, অনিরাপত্তা, বেকারত্ব, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, অসৎ জীবনাচরণ, ধর্ম ব্যবসা ও অর্থনৈতিক সমস্যা।

জাহেলি যুগ থেকে শুরু করে ইসলামের আবির্ভাব, প্রতিষ্ঠা এবং গত ১৪৫০ বছরে পৃথিবীতে অবিশ্বাসনীয় পরিবর্তন এলেও মুসলমান নারীদের জীবনের খুব একটা পরিবর্তন আসে নি। তেমনই, ভারত ও নেপালের হিন্দুদের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়েও আহামরি পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় নি। ধর্ম নিরপেক্ষতার পাশাপাশি উগ্রতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এটা সত্য যে, ভারতের কয়েকটি শহর, প্রদেশ, রাজ্যের (যেমনঃ- দিল্লি, বোম্বাই, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই) ধনী বংশের নারীদের জীবন আংশিক পরিবর্তন হলেও গোটা ভারতের নারীদের চিত্র এক নয়। এখনও ভারতের অনেক রাজ্যে, প্রদেশে, অঞ্চলের নারীদের মাসিকের সময় ঘরের বাইরের কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানে থাকতে হয়। যেমনঃ- গুজরাত, রাজস্থান, বিহার, হায়দ্রাবাদ, তামিলনাডু ইত্যাদি। এখনও মুসলমান ও হিন্দুদের ঘরে কন্যা সন্তান জন্মের কারণে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে দেওয়ার ঘটনা শোনা যায়। ক্রাইম পেট্রোলে এই ধরণের অজস্র ঘটনার প্রমাণ আছে।

 ‘নারীরা কোনো নিয়মানুবর্তিতা মেনে চলে না। তাদের বুদ্ধিমত্তা নাই বললেই চলে।‘ [ঋগ্বেদ ৮:৩৩:১৭]

‘একজন স্বামী যতই খারাপ হোক না কেন, তথাপি একজন কর্তব্যনিষ্ঠ স্ত্রী সেই স্বামীকে দেবতা হিসেবে ক্রমাগত পূজা করবে।‘ [মনুসংহিতা ৫:১৫৪]

নারীদের মৃত্যুর পর তাদের মৃতদেহ সৎকারের সময় পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে কিছু পাঠ করা যাবে না।‘ [মনুসংহিতা ২:৬৬]

‘নারীদের সাথে কোনো স্থায়ী বন্ধুত্ব হতে পারে না। নারীদের হৃদয় হচ্ছে হায়েনাদের হৃদয়।‘ (ঋগবেদ ১০:৯৫:১৫)

‘নারীদেরকে অবশ্যই দিন-রাত নিজ পরিবারের পুরুষদের অধীনে থাকতে হবে। তারা যদি কোনো রকম ইন্দ্রিয়াসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে তাহলে তাদেরকে অবশ্যই কারো নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।‘ (মনুসংহিতা ৯:২)

সনাতন ধর্মাবলম্বী, হিন্দুধর্মে নারীকে মৃত্যু, নরক, সর্প, বিষ ও আগুন থেকেও মারাত্মক বলা হয়েছে। ইসলাম ও খ্রিষ্টান ধর্মের মতোই হিন্দু নারীদের সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি একই। তবে এটা সত্য যে, হিন্দু নারীদের আরও তীব্র ও অমানবিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

‘বিধবা নারীরা পুনরায় বিয়ে করতে পারবে না। তাদেরকে বরং নিরামিষভোজী ও অত্যন্ত দ্বীনহীনভাবে বাকি জীবন কাটাতে হবে।‘ (মনুসংহিতা ৫) 

স্বামী ছাড়া নারীর কোনো অস্তিত্বকে স্বীকার করা হয় নি। যার কারণে স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকেও তার স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে বাধ্য করার কথা বলা হয়েছিল। সতীদাহ প্রথার মতো জঘন্য এক সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে যেদিন রাজা রামমোহন রায় রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, সেদিন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ ওনাকে হাস্যাস্পদ করেছিল।

বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই নিকৃষ্ট ধারা ও নিয়মের ইতি টানা হয়েছে। তবে এই একই নিয়ম যদি মুসলমানদের থাকতো, তাহলে কি তারা পরিবর্তন করতো? খ্রিষ্টান ও হিন্দুরা পরিবর্তন এনে কিঞ্চিত মানবিকতা দেখিয়েছে বটে, কিন্তু এখন পর্যন্ত মুসলমানেরা তাদের গ্রন্থের নিকৃষ্ট আয়াতগুলোর কোন ধরণের পরিবর্তন আনে নি। বরং তারা নিকৃষ্ট নিয়ম, ধারা, প্রথাকে উৎকৃষ্টের দাবী করে।

‘নারীরা শক্তিহীন বা কর্তৃত্বহীন। তারা পৈত্রিক সম্পত্তির কোনো অংশ পাবে না।‘ (যজুর্বেদ ৬:৫:৮:২)

সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর কোন ভাগ নেই। তবে, সম্প্রতি, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নারীদের সম্পত্তি পাওয়ার অধিকারের পক্ষে যুগান্তকারী একটি রায় দিয়েছে। হিন্দু-সাকসেশন অ্যাক্ট সংশোধন হওয়ার পরে মেয়েদের এই আইনি অধিকার নিশ্চিত রয়েছে। তবে সংশোধনের সময় বাবা বেঁচে থাকলে বা না থাকলেও সকল মেয়েদেরই এই সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। “সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়ে দেয়, ২০০৫ সালে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী পৈতৃক সম্পত্তিতে মেয়েদের সমানাধিকার আছে। এদিন রায় দিয়ে বিচারপতি অরুণ মিশ্র বলেন, ‘একটা মেয়েই সারাজীবন বাবা-মায়ের আদরের মেয়ে হয়ে থাকেন। কিন্তু সম্পত্তির মালিক বেঁচে থাকুক আর না থাকুক, সেই সম্পত্তির উপর মেয়ের সারাজীবন অধিকার থাকবেই।’” (সুমন বিশ্বাস, এইসময়, ১১ আগস্ট ২০২০) 

প্রতিটি ধর্মই নারীকে শৈশবে পিতার, যৌবনে স্বামীর এবং বার্ধক্যে পুত্রের অধীনে থাকতে হবে- এই নির্দেশনা দিয়েছে। এবং এই  নির্দেশনা বা মন্তব্য সনাতন ধর্ম থেকে শুরু করে ইসলাম ধর্মের বিশ্বাসীরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। একবিংশ শতাব্দীতেও নারীর যে বন্দি দশা তা মানুষের সামগ্রিক মনুষ্যত্বের প্রশ্নবিদ্ধ করে। কোন ধর্মই নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা ও অধিকার দেয় নি, তবে সম্মানের নামে সান্ত্বনা পুরষ্কার অবশ্যই দিয়েছে। 

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 5 =