ইহুদি (ইসরাইলি) জাতির কি পৃথিবীতে বসবাসের অধিকার আছে? [ পর্ব – ২ ]

ইহুদি (ইসরাইলি) জাতির কি পৃথিবীতে বসবাসের অধিকার আছে? [ পর্ব – ২ ]
:
প্রাক-কথন :
:
সাংবিধানিকভাবে ইহুদি ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় ধর্ম (বাংলাদেশের মত) হলেও, সকল নাগরিকের যার যার ধর্ম পালনের সম্পূর্ণ অধিকার বিদ্যমান। যে কারণে দেশটির জনসংখ্যার ৭৫.৪% ইহুদি, ১৬.৯% আরব মুসলিম, ২.১% আরব খৃষ্টান, ১.৭% দ্রুজ মুসলমান, ৪% নাস্তিক ও অন্যান্য ধর্ম অনুসরণ করে। ইসরাইলি পার্লামেন্ট ভবনেও মুসলিমদের জন্য মসজিদ বিদ্যমান। দেশটিতে সাংসদ, একজন কেবিনেট মন্ত্রী ও সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি পদেও আরব মুসলমানরা আছে। দেশটির জাতীয় ভাষা হিব্রু কিন্তু দাপ্তরিক ভাষা আরবি ও ইংরেজি। রাস্তায় বিলবোর্ড ও সড়ক নির্দেশিকা হিব্রু, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় লিখিত। স্কুলে সকল শিক্ষার্থীর হিব্রু, আরবি ও ইংরিজ ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক। আরব মুসলিমরা প্রধানত ইসরাইলের গালিল, নাজেভ, হাইফা, জেরুজালেম, আক্রি ও রামাল্লায় বসবাস করে। ১,১৫,০০০ দ্রুজদের সবার বসবাস গোলাম মালভূমিতে।
:
জন্ম থেকে পোড় খাওয়া ও কষ্ট সওয়া এ জাতিটিকে বহু বছর আগেও ব্যাবিলনের রাজা (নবুশ্যাড্ নেযার) আক্রমণ করেছিল। ব্যাবিলনীয় সৈন্যরা তাদের ঘরে ঘরে প্রবেশ করে তাদের হত্যা করে, বাকি সমস্ত লোকজনকে বন্দী করে ইসরাইল জাতিটাকে ক্রীতদাসে পরিণত করে তাদের দেশ ব্যাবিলেনে নিয়ে গেল, ইহুদিদের ডেভিড মন্দির (Temple of David) ধ্বংস করে দিলো তারা। যিহোবা আবার সিরিয়ায় ফিরিয়ে এনে তাদের ওপর দয়া করলেন। ইহুদিরা আবার ধনে-জনে সমৃদ্ধ হয়ে উঠলো, তারা তাদের ডেভিড মন্দির পুন.নির্মাণ করলো। ৭০-খ্রীস্টাব্দে রোমান টিটাস ইহুদিদের আক্রমণ করে তাদের পাইকারীভাবে হত্যা শুরু করলো, তাদের মেয়েদের নিয়ে গেলো, ধন-সম্পত্তি সব লুটে নিলো, ইহুদিদের ডেভিড মন্দির (Temple of David) সহ তাদের রাজধানী যেরুজালেম শহর সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিলো এবং তারপর সিরিয়া থেকে সমস্ত জাতিটাকে সমূলে উচ্ছেদ করে দিলো। হাজার হাজার বছরের বাসস্থান থেকে উৎখাত হয়ে ইহুদিরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করলো। ইসলামের নবীর আগমনকালে ইহুদিদের প্রধান কয়েকটি বসতি ছিল মদিনা ও তার আশেপাশে। ইসলামের নবীর আবির্ভাব এবং মদীনায় হিজরত করে আসার সময় মদীনায় প্রধানত: দু’টি জাতি বসবাস করতো। (১) মদীনার আরব বাসিন্দা এবং (২) ইহুদি সম্প্রদায়। এই দু’টি জাতি আবার অনেকগুলো গোত্রে বিভক্ত ছিলো। যেমন মদীনার আরব বাসিন্দারা দুই গোত্রে বিভক্ত ছিলো যথা (১) আউস এবং (২) খাযরাজ। আউস গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ চারটি শাখা ছিলো যথা (১) বনু আবদিল আশহাল (২) বনু জাফর (৩) বনু মুয়াবিয়া এবং (৪) বনু হারিসা। এমনিভাবে খাযরাজও ছিলো চারটি গোত্রের সমষ্টি। যথা (১) মালিক (২) আদী (৩) মাযিন এবং (৪) দ্বীনার। আর মদিনায় অবস্থানকারী ইহুদিদের মোট গোত্র ছিলো ২০-টিরও বেশি। তবে এই ২০-টি গোত্র গুরুত্বপূর্ণ ও বড় বড় তিনটি গোত্রে সীমাবদ্ধ ছিলো। যথা- (১) বনু নাজীর (২) বনু কুরাইজা (৩) বনু কাইনুকা। মদিনার আরব বাসিন্দা তথা আউস খাযরাজের বংশধারা ইয়ামানের ‘আযদ’ গোত্রের সাথে গিয়ে মিলিত হয়। দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষের দিকে ইয়ামানের উপর আবিসিনিয়ার আক্রমণের কারণে ইয়ামানের অবস্থা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এসময় মা’আরিব নামক একটি বাঁধ ধ্বংস হয়ে যায়, যার দ্বারা ইয়ামানের বিভিন্ন ফসলী জমিতে পানি দেয়া হতো। ফলে কৃষি জমিতে সেচ উপযোগী পানির ভীষণ অভাব ও তীব্র সঙ্কট দেখা দেয়। এ ধরণের আরো বিভিন্ন সমস্যার কারণে আউস ও খাযরাজ গোত্রের পূর্বপুরুষরা বিভিন্ন বিরতিতে একের পর এক মদীনায় হিজরত করে। বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ স্যডিভ এর মতে, “আওস ও খাযরাজ গোত্র তিনশত খ্রিষ্টাব্দের দিকে মদীনাকে তাদের বাসভূমিতে পরিণত করে এবং ৪৯২ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মদীনার উপর তাদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়”। আর মদীনার ইহুদি সম্প্রদায় আউস ও খাযরাজেরও বহু পূর্বে খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে মদীনায় আগমন করে। প্রখ্যাত ইহুদি পন্ডিত ড. ইসরাইল ওয়েলফিন্সন এর মতে, “সত্তর খ্রিষ্টাব্দে ইহুদি ও রোমকদের যুদ্ধের পরিণতিতে যখন ফিলিস্তিন ও বাইতুল মুকাদ্দাস ধ্বংস হয়ে যায় এবং ইহুদিরা পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন ইহুদিদের বহু দল আরব দেশগুলোর দিকে মুখ ফিরায়।” (তারিখুল ইয়াহুদ দি বিলাদিল আরব)। এমনি করে ধীরে ধীরে প্রথম শতাব্দিতেই ইহুদিরা মদিনাকে তাদের আবাসস্থল রূপে গ্রহণ করে। মদিনায় অবস্থানকারী ইহুদিদের বড় বড় গোত্র বনু কুরাইজা ও বনু নাজীর শত্রুতার সূত্র ধরে তাদের স্বজাতীয় অপর গোত্র বনু কাইনুকার বিরুদ্ধে মদিনায় বসবাসকারী আরব গোত্র আওসকে সাথে নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, ফলে তারা অসহায় হয়ে একেকজন একেক আরব সর্দার বা গোত্রের অধীনতা গ্রহণ করে। তাদেরকে নিয়মিত রাজস্ব বা কর দিয়ে তাদের ছত্রছায়ায় ও সহায়তায় জীবন যাপন করতে থাকে। মদীনার আরব বাসিন্দা আউস ও খাযরাজ ১২০ বছর যাবত গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে ছিলো। যার মধ্যে সর্বপ্রথম যুদ্ধ ছিলো ‘সুমাইর’ আর সর্বশেষ যুদ্ধ ছিলো ‘বুআস’। ইসলামের নবীর আগমনের পর থেকে প্রথমে মদিনা ও পরবর্তীতে সিরিয়া ও সমগ্র আরব ভূমি থেকে ইহুদি তথা ইসরাইলিদের হত্যা ও বাস্তুচ্যুত করা হয়, যার প্রমাণ ইসলামের ইতিহাস ও কোরান-হাদিস সর্বত্র সহজ প্রাপ্য।
ইহুদি-বিদ্বেষ বলতে ইহুদি জাতি, গোষ্ঠী বা ধর্মের প্রতি যেকোনো ধরনের বৈরিতা বা কুসংস্কারকে বোঝানো হয়ে থাকে। এধরনের বিদ্বেষের মধ্যে ব্যক্তিগত ঘৃণা থেকে শুরু করে সংঘবদ্ধ জাতি-নিধনও পড়ে। ইংরেজিতে একে বলা হয় এন্টি-সেমিটিজম (Anti-Semitism), যার অর্থ দাঁড়ায় সেমিটিয় সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ। সেমিটিয় একটি বৃহৎ ভাষাভাষী গোষ্ঠী, যার মধ্যে হিব্রুভাষী ছাড়াও আরবি ভাষীরাও অন্তর্ভুক্ত। তথাপি অ্যান্টি-সেমিটিজম ইহুদি-বিদ্বেষ বোঝাতেই ব্যবহৃত হয়। উনিশ শতকের পূর্বে ইহুদি-বিদ্বেষ ছিল মূলত ধর্ম-ভিত্তিক। খ্রিস্টান ও মুসলমানরা ইহুদি ধর্মের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও দৃষ্টিকোণের আলোকে এই বিদ্বেষভাব পোষণ করতো। তৎকালীন খ্রিস্টান-শাসিত ইউরোপে বৃহত্তম সংখ্যালঘু ধর্মীয়-গোষ্ঠী হিসেবে ইহুদিরা বিভিন্নসময় ধর্মীয় বিদ্বেষ, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হত। ধর্মীয় নির্যাতনের মধ্যে ছিল ধর্ম-পালনে বাধা, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ, দেশ থেকে বিতাড়ন ইত্যাদি। শিল্প-বিপ্লবের পর ইহুদিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটতে থাকে দ্রুত। এসময় ইউরোপে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটলে ইহুদিদের প্রতি জাতিগত বিদ্বেষ দেখা দেয়। জাতিতত্ত্ব সংক্রান্ত অপ-বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এই বিদ্বেষে ইন্ধন যোগায়। ইহুদিরা অনার্য ও আর্যদের চেয়ে হীন, এমন মতবাদ দেয়া হয় এবং জাতিগতভাবে তাদের বিরুদ্ধে অর্থলিপ্সা, শ্রমবিমুখতা, ধূর্ততা, গোত্রপ্রীতি ও দেশপ্রেমহীনতার অভিযোগ আনা হয়। তৎকালীন ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবী সমাজ ধর্মভিত্তিক বিদ্বেষকে অসংস্কৃত আচরণ মনে করলেও, এই বংশানুগতিক অপতত্ত্বকে ‘বৈজ্ঞানিক’ তত্ত্ব মনে করে এ ধরণের জাতিগত সংস্কারের যথার্থতা স্বীকার করে নেয়। ১৯৪১, বাবি ইয়ার (Babi Yar) এর গণহত্যা, দুইদিনের ব্যবধানের যেখানে নাৎসী ও স্থানীয় ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রায় ৩৩,০০০ ইহুদিকে গুলি করে হত্যা করে। এই জাতিগত বিদ্বেষ ভয়াবহ চরম আকার ধারণ করে বিংশ শতকের তৃতীয় দশকে, হিটলারের নাৎসি দল-শাসিত জার্মানিতে। ইহুদি-বিরোধী এই জাতিতত্ত্বের উপর ভিত্তি করে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের দায়ও ইহুদিদের উপর চাপিয়ে দিয়ে তারা বিভিন্ন অত্যাচার এবং নিধনমূলক আইন-কানুন প্রণয়ন করে। ১৯৩৯ সালে হিটলার বিভিন্ন দেশ আক্রমণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটালে ইউরোপে ইহুদি নির্যাতন ও নিধন চরমরূপ নেয়। তারা আইন করে ইহুদিদের নিজস্ব নিবাস অধিগ্রহণ করে বন্দী-নিবাসে প্রেরণ করে এবং পর্যায়ক্রমে ইহুদিদের হত্যা করে। প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদিকে হত্যা করা হয়, যা ইতিহাসে ‘হলোকস্ট’ (Holocaust) নামে পরিচিত।
:
ইসরাইল-প্যালেস্টাইনের (প্রাক্তন কেনান) আদিবাসীরা কখনো মুসলিম বা খৃষ্টান ছিল না। ইহুদিদের পূর্বপুরুষ ছিল যা্যাবর হিব্রু জাতি, যাদের উদ্ভব মূলত ইরাকের মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে। মূল ইসরাইল অঞ্চলের আদিবাসীদের হটিয়ে দিয়ে তারা সেখানে বাস করা শুরু করে। ঐ ভূখন্ড তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ অনুসারে ঈশ্বর স্বয়ং তাদের প্রদান করেছে, যার বর্ণনা পাওয়া যাবে তাদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ তৌরাতে এভাবে “মাবুদ ইব্রাহিমকে বললেন, তুমি তোমার নিজের দেশ, আত্মীয় স্বজন ছেড়ে, আমি তোমাকে যে দেশ দেখাবো সে দেশে যাও” (পয়দায়েশ ১১:১২), মূলত বর্তমান ’ইসরাইল’ বা ’কেনান’ সম্পর্কেই তাদের পুস্তকে এ কথা বলা হয়েছে (যেমন বহু মুসলমান বিশ্বাস করে, পুরা পৃথিবীকেই দারুল ইসলাম বানাতে হবে, আল্লাহ তাদের পৃথিবী দিয়ে দিয়েছেন)। আসলে এই ভূখন্ড আরো বিস্তৃত ইরাকের দজলা-ফোরাত থেকে মিশরের নীল নদ পর্যন্ত (জেনেসিস–পুরাতন খন্ড)। বর্তমান ইসরাইলী ইহুদিরা তাদের মৃত হিব্রু ভাষাকে জীবিত করেছে নানা বুদ্ধিমত্তায়। প্যালেস্টাইনীরা আদিবাসীও প্রাচীন ক্যানানাইট, জেবুসাইট, সামারিটান ইত্যাদি জাতির বংশধর। জেনেটিকালি তারা জিওনিস্ট প্রতিবেশী ইহুদিদেরই কাছাকাছি। ষষ্ঠ শতকে ইসলামী শাসন প্রবর্তনের পর হেজাজ অঞ্চলের আরবদের সাথে তাদের রক্তের সংমিশ্রণ ঘটে (যদিও তারা উভয়ই আবার সেমেটিক এবং জেনেটিকালি খুব কাছাকাছি)। ইহুদিরা একসময় আরামাইক (ঈসা বা যিশুর মাতৃভাষা) হিব্রু, এমনকি আরবি ভাষাতেও কথা বলত। ইউরোপীয় ইহুদিদের অনেকেরই ভাষা ছিল ঈদ্দিশ।
 
[এরপর ৩য় পর্ব আগামীকাল রাত ৮:০০ টায়]
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

69 − = 67