নারীর চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছে-অনিচ্ছের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই

সিনেমার একটি দৃশ্যে কঙ্কনা সেন ও ভূমি পেডনেকড়

এলিয়েনশন হলো ব্যক্তির একটি সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যা তার সামাজিক অস্তিত্বের কয়েকটি দিক থেকে তার বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে জড়িত। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ এত বেশি বিচ্ছিন্ন ও একা হয়ে যাচ্ছে যে তা দূর করতে পুঁজিবাদেরই দ্বারস্থ হচ্ছে। এই যেমন, বিভিন্ন ডেটিং সাইটে ব্যস্ত থাকা, ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রামের মত সাইটগুলোতে নিঃসঙ্গতস কাটাতে অন্যান্য ব্যবহারকারীদের কাছে বন্ধুত্ব, প্রেম আহ্বান করা ইত্যাদি।
তবে এ বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্বের মুখোমুখি হতে হয় সবচেয়ে বেশি নারীকে। তাদের অন্তর্মুখী স্বভাব তাদেরকে এরম করে মানসিকভাবে গড়ে তোলে। ফলে তারা তাদের ইচ্ছে-অনিচ্ছে, চাওয়া-পাওয়া নিয়ে রাখ-ঢাক না রেখে কিছু বলতে পারে না। বিশেষ করে যৌনতা নিয়ে নারী সামাজিক, পারিবারিকভাবে এতটাই অবরুদ্ধ থাকে যে স্বামী সঙ্গে সেক্সুয়াল জীবনে তারা একদমই সুখী হতে পারে না। ফলে স্বামীকে শারীরিক চাহিদা পূরণের জন্যে অন্য নারীর দিকে ধাবিত হতে হয়৷ সেক্ষেত্রে প্রেম বা কেবল সেক্সুয়াল সম্পর্কে জড়ালেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা যৌন নিপীড়ক হয়েই দেখা দেয়। যেমন বাড়ীর কাজ করা নারী কিংবা নিকটাত্মীয় কোনো নারীর দিকে কু-দৃষ্টি দেয়া কিংবা জোর পূর্বক শরীরে স্পর্শ কোনো কোনো সময় ধর্ষণের মত কর্মেও জড়িয়ে যায়। একই ঘটনার উল্টোটাও ঘটে থাকে। স্বামীর দ্বারা শারীরিক চাহিদা পরিপূর্ণ না হওয়া স্ত্রী ভিন্ন পুরুষে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এটা শুধু বিবাহিত জীবনেই প্রভাব ফেলে তা নয়, অবিবাহিত নারীর ক্ষেত্রেও ভীষণ প্রভাব ফেলে। যেমন আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বপর দেশগুলোতে যেখানে যৌন শিক্ষার কোনো সুযোগ নেই সেখানে যৌনতা র্যাপিং পেপারে মোড়ানো আকর্ষণীয় কোনো বাক্সের মত মনে হয়। ফলে তার প্রতি কৌতুহল নারীদের ভয়ানক বিপদের মুখোমুখি করে।

আমাদের সমাজে যৌনতা নিয়ে মানুষের পশ্চাৎপদ চিন্তা, সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে আড়াল করে রাখার প্রবণতা ভয়াবহ। শুধু যে নারী-পুরুষের শারীরিক সম্পর্ককেই এরা মেনে নিতে পারে না তা নয়, প্রকৃতিগতভাবে সৃষ্টি হওয়া হিজড়া বা সমকামীদের প্রতি তাদের ভাবনা সংকুচিত।
ফলে ছোটবেলায় কোনো ছেলে নিজেকে মেয়ে রূপে সাজিয়ে জানতে পারলে পরিবারের মাথা কাটা গেলো ভেবে ব্যাপক মারধর করা হয় সঙ্গে সমাজে মান সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার জন্যে কখনো কখনো সে সন্তানকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।

সিনেমার একটি দৃশ্য

 

যৌনতা, সমকাম, হিজড়াদের নিয়ে এর আগে বহু কথা বলেছি৷ সুতরাং পুরনো কাসুন্দি ঘাটতে মন সায় দিলো বলে একটু ভিন্নভাবে সংক্ষেপে দু/চার কথা বলতেই হলো।
এর বিশেষ কারণ হলো সদ্য নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘ডলি কিট্টি অউর ওয়ো চমকতে সিতারে’।
দুজন বিপরীত নারীর চিত্রায়ন ঘটেছে সিনেমায়। নারীর স্বপ্ন, ইচ্ছে, চাওয়া-পাওয়ার এক দৃশ্যায়ন করেছেন নির্মাতা অলংকৃতা শ্রীবাস্তব।
কিট্টি পরিবার ছেড়ে নয়ডায় এসে ঠাঁই নেন। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছে নিয়ে নিয়ে তার আগমনী পথে জামাইবাবুর নোংরা স্পর্শ, প্রেমিকের কাছে প্রতারিত হওয়া সহ নানা প্রতিবন্ধকতা পথ রুদ্ধ করে দাঁড়ায়।
বিপরীত চরিত্রে ডলি। স্বামী, সংসার সন্তান ও পরিবারকে নিয়ে আদর্শ নারীর মত স্বপ্ন দেখে যাওয়া ডলি শরীরে, মনে সুখী নয় মোটেও। বাহ্যিক চাকচিক্যতাই মনের সুখ নয় – এটাই যেনো বুঝিয়ে দেয় ডলি।
ফলে তাকে সুখের খোঁজে মুখ ডোবাতে হয় এক তরুণ ডেলিভারী বয়’র প্রেমে।
এদিকে নারীবাদ নিয়ে আমাদের সংস্কৃতির ধ্বজাধারী হিন্দুত্ববাদীদের আস্ফালন, পুরুষের শরীরে নারী মন – তা নিয়ে সমাজে ছিঃ ছিঃ! এসবই সিনেমায় সাব-প্লট হিসেবে তুলে ধরেছেন নির্মাতা৷
সিনেমার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করাই ছিলো অলংকৃতা শ্রীবাস্তবের মুন্সিয়ানার প্রথম চমক। বাকিটা দেখিয়েছেন চরিত্র নির্বাচনে এবং বিষয়বস্তু উপস্থাপনে। নারীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের মত জটিল বিষয়কে সহজে উপস্থাপন করায় নির্মাতা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে নির্মাতার সামাজিক বোধ এর আগেই লিপস্টিপ আন্ডার মাই বুরখা সিনেমায় পরিস্কার করে দিয়েছেন৷ ফলে এ সিনেমায় তার মনস্তত্ব নিয়ে আলাদা ভাবনার কিছু নেই।
অভিনেতাদের নিয়ে বলতে গেলে ডলি চরিত্রের কঙ্কনা সেন এবং কিট্টি চরিত্রে ভূমি পেডনেকড় ঠিকঠাক মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে কঙ্কনা ও ভূমির অভিনয় রসায়ন চমৎকারভাবে ঘটেছে। এছাড়াও বিক্রান্ত ম্যাসে, আমির বশির, অমোল পরাসর, করণ কুন্দ্রা সিনেমায় সাপোর্টিভ চরিত্র হিসেবে ঠিকঠাক ছিলেন।

লেখার ইতি টানবো দুটি কথা দিয়ে। যোনী – নারীর জ্বালা এবং নারীর মুক্তি; এখানেই লুকায়িত৷
আর পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার বিস্ফোরন হলো, মায়ের শারীরিক সমস্যা সন্তানের মানসিক এবং শারীরিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলে। অর্থাৎ নারীই যেনো সব সমস্যার মূল!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 47 = 52