একই দিনে শিবিরের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার সিলেটের তিন তরুণ মুনির-তপন-জুয়েল

১৯৮৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পুণ্যভূমি সিলেটের মানুষ দেখলো ধর্মের নাম করে বজ্জাতি করে বেড়ানো এবং প্রতিপক্ষের হাত পায়ের রগ কাঁটা, জবাই দিয়ে হত্যা করা সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের এক নারকীয় তাণ্ডব। একই দিনে তিনটি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সিলেটের রাজপথ ও ছাত্র রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারে নিজেদের অস্তিত্বের ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। সেদিন মধ্যযুগীয় কায়দায় তারা হত্যা করে তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা ও জাসদ ছাত্রলীগের তিন তুখোড় কর্মী মুনির ই কিবরিয়া, তপন জ্যোতি দেব এবং এনামুল হক জুয়েলকে। বারবার চেষ্টা করেও সিলেটের ছাত্র রাজনীতির মাঠে নিজেদের কোনো অবস্থান সৃষ্টি করতে না পেরে শিবির পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ক্যাম্পাসগুলোর দখল নেয়ার মরীয়া চেষ্টা চালায়। সিলেটের ছাত্র রাজনীতির মাঠে তখন বাম ধারার ছাত্র সংগঠন, বিশেষ করে জাসদ ছাত্রলীগের অবস্থান ছিল অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলোর থেকে বেশি শক্তিশালী। ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেটে প্রকাশ্যে তাদের রাজনীতি শুরু করতে গেলে একাত্তরের চেতনায় সমৃদ্ধ সিলেটের ছাত্রসমাজের বাধার মুখে পড়ে।

বিশেষ করে শিবিরের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া জাসদ ছাত্রলীগ ও বাম ধারার ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের তৎপরতার কারণে তাদের সব উদ্যোগ ভেস্তে গেলে একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা ১৯৮৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর একই দিনে হত্যা করে সিলেটের ছাত্র রাজনীতিতে সেই সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন জাসদ ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মী মুনির, তপন ও জুয়েলকে।

তবে ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিলেট পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরগরম হয়ে ওঠে সিলেটের ছাত্র রাজনীতি। বিপুল অর্থ ব্যয় করে ছাত্রশিবির পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিজেদের প্যানেলের পক্ষে প্রচারণার মাধ্যমে প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করে। সিলেট শহরের গুরুত্বপূর্ণ শহরতলিতে ছাত্রশিবিরের এই আকস্মিক প্রকাশ্য উত্থান চিন্তিত করে সিলেটের সব প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোকে।

এমনই উত্তেজনাকর সময়ে আসে সেই কালো দিন, ঘড়ির কাঁটা অনুযায়ী তখন ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ ইং। সিলেট বাসী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তেমনি একটা সময়ে ফজরের নামাজের পূর্বেই অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছাত্রশিবির কর্মীরা এমসি কলেজ ক্যাম্পাস দখল করে নেয়। ভোরবেলা শিবিরের এই ক্যাম্পাস দখলের সংবাদ দাবানলের মতো ছড়িয়ে যায় সিলেটে। অন্যান্য প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ ছাত্ররা ক্যাম্পাসে ঢুকতে না পেরে কলেজের আশপাশে জড়ো হতে শুরু করে। শিবিরের এই আকস্মিক ক্যাম্পাস দখলের ফলে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাঁরা কলেজের আশপাশে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন।


(সিলেট শহীদ মিনার,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১০ ইং)

এদিকে এমসি কলেজের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পরে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে গাড়ি, মোটরসাইকেল ও টেম্পো নিয়ে সশস্ত্র ছাত্রশিবির কর্মীরা নগরীর বিভিন্ন জায়গায় মহড়া দিতে শুরু করে। এরই এক পর্যায়ে নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকায় জড়ো হওয়া জাসদ ছাত্রলীগ কর্মীদের একাংশের উপর হটাত করেই আলিয়া মাদ্রাসা থেকে টেম্পো নিয়ে একদল সশস্ত্র শিবির কর্মী চারপাশ থেকে সশস্ত্র হামলা চালায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই এমসি কলেজের ছাত্র দুর্দান্ত এ্যাথলেট ও মেধাবী ছাত্রনেতা মুনীরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে কোপাতে তারা রাস্তার পাশে ফেলে রাখে। ধরে ফেলে মদন মোহন কলেজের ছাত্র তপনকে। শুরু হয় তপনের উপরে মধ্যযুগীয় নির্যাতন। পাথর দিয়ে তার শরীর থেঁতলে দেয়া হয়। ফিল্মি স্টাইলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই আক্রমণ শেষ করে শিবির ক্যাডাররা টেম্পো ও মোটরসাইকেল নিয়ে চলে যায় তাদের মূল ঘাঁটি আলিয়া মাদ্রাসার দিকে। শিবির সন্ত্রাসীরা চলে গেলে স্থানীয় এলাকাবাসী মুমূর্ষু অবস্থায় মুনির ও তপনকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। একই সময়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা এমসি কলেজে প্রবেশে করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। অথচ কলেজ ক্যাম্পাসে সশস্ত্র অবস্থায় অবস্থানরত ছাত্রশিবির কর্মীদের পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে নিরাপদে রাখা হয়।

শাহী ঈদগাহ এলাকায় মুনির, তপনের উপরে ছাত্রশিবিরের হামলার খবর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা কর্মীদের কাছে পৌঁছালে টিলাগড় এলাকায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিক্ষুব্ধ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্মীরা এমসি কলেজে প্রবেশের চেষ্টার এক পর্যায়ে তাঁদের চাপের মুখে পুলিশ প্রহরায় শিবির ক্যাডাররা এমসি কলেজ ত্যাগ করে। এই বিষয়ে বলতে গিয়ে সিলেট মহানগর জাসদের সভাপতি অ্যাডভোকেট জাকির আহমদ বলেন, ‘দৃশ্যটা ছিল এ রকম, শিবির মিছিল করে যাচ্ছে, তাদের সামনে ও পেছনে পুলিশের গাড়ি। সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের মিছিল তখন পাহারা দিচ্ছে আইনের লোকজন।’

পরবর্তী সময়ে নগরীর আম্বরখানায় শিবিরের এই মিছিল থেকেই স্কুলছাত্র এনামুল হক জুয়েলকে ধাওয়া করা হয়। জুয়েলের জন্য শিবির স্কুলগুলোতে তাদের কার্যক্রম চালাতে পারছিল না বলে তার ওপর তাদের ক্ষোভ ছিল। অস্ত্রধারী শিবির ক্যাডারদের ধাওয়া খেয়ে স্কুলছাত্র জুয়েল তখন দৌড়ে একটা মার্কেটের ছাদে উঠে যায়। অস্ত্র নিয়ে তার পেছনে পেছনে ধাওয়া করতে থাকে শিবিরের সন্ত্রাসীরা। শিবিরের ধাওয়া খেয়ে নিরুপায় জুয়েল কোনো রাস্তা খুঁজে না পেয়ে মার্কেটের এক ছাদ থেকে পার্শ্ববর্তী ছাদে লাফ দিতে গিয়ে নিচে পড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এদিন ইসলামী ছাত্রশিবির পুলিশের সহায়তা নিয়ে নগরীর নানা স্থানে স্বাধীনতার পক্ষের ছাত্র সংগঠনগুলোর কর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। স্কুলছাত্র এনামুল হক জুয়েলের মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে নগরী উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র, জনতা সিলেট নগরী জুড়ে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে মুনির ই কিবরিয়া ও তপন জ্যোতি দেব মারা গেলে বৃহত্তর সিলেট জুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। নিহতদের স্বজন, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে সিলেটের বাতাস। মুনির, তপন ও জুয়েলকে হত্যা করার মাধ্যমে জামায়াত-শিবির সিলেটে তাদের বর্বরোচিত ও পৈশাচিক রাজনীতির সূচনা করে। এই তিন হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমেই সিলেট শহরে ছাত্র হত্যার রাজনীতি শুরু হয়।


(সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ বিরোধী আলোর মিছিল, সিলেট,২৪ সেপ্টেম্বর ২০১০ ইং)

মুনির, তপন ও জুয়েলের মৃত্যুর খবর সিলেটে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিলেট হয়ে ওঠে মিছিল আর আন্দোলনের নগরী। এ ধরনের ঘটনার জন্য সিলেটের কোনোদিন প্রস্তুত ছিল না। একই দিনে জামায়াত-শিবিরের হাতে তিন মেধাবী ছাত্র খুন হওয়ার পর সাধারণ মানুষ নির্বাক হয়ে পড়ে। সিলেট জুড়ে তখন শুরু হয় জামায়াত-শিবির হঠাও আন্দোলন। শিবির বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও সর্বস্তরের ছাত্রদের পাশে রাজপথে নেমে আসে সিলেটের সাধারণ মানুষ। মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে সিলেটের বাতাস। মুনির, তপন ও জুয়েলের হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবিতে শুরু হয় গণআন্দোলন, সঙ্গে চলতে থাকে জামায়াত-শিবির প্রতিরোধ আন্দোলন। জনরোষ থেকে বাঁচার মুনির, তপন, জুয়েলের খুনি ও শিবিরের নেতাকর্মীরা গা-ঢাকা দেয়। সিলেটের কোর্ট পয়েন্টে ২৫ সেপ্টেম্বর আয়োজিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, ৮ দল ও ৫ দলের জনসভা থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর সিলেটে অর্ধদিবস হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। হরতালের দিন খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে সিলেটের সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। হরতাল শেষে কোর্ট পয়েন্টে আয়োজিত সমাবেশে জাতীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন এবং মুনির, তপন ও জুয়েলের খুনিদের গ্রেফতারের দাবিতে লাগাতার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

এমন অবস্থায় জামাত শিবিরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় স্বৈরাচার এরশাদ সরকার। ফলে প্রশাসন জামায়াত-শিবিরের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেয়। খুনিদের গ্রেফতার না করে তারা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার করতে শুরু করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলন দমিয়ে রাখার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে সিলেটে ১৪৪ ধারা জারি করে। সিলেট জুড়ে তখন এক ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। তখনকার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তৎকালীন ছাত্রনেতা ওয়াসিকুজ্জামান অনি বলেন, ‘সিলেট জুড়েই ভীতিকর একটা অবস্থা ছিল। চারদিকে কেমন যেন যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। খুনিদের গ্রেপ্তার না করে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশ অভিযান চালাতে থাকে। কিন্তু যারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল তাদের কাউকেই গ্রেপ্তার করে না পুলিশ, তাদের আস্তানাগুলোতে তখন তারা কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি, উপরন্তু গ্রেপ্তার শুরু করে সাধারণ ছাত্রদের।’

মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত যারা, মামলা এবং প্রহসনের বিচার :

জাসদ নেতা সদর উদ্দিন আহমদ বাদী হয়ে তখন মুনির, তপন, জুয়েল হত্যায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা জিয়াউদ্দিন নাদের, সায়েফ আহমদ, সোহেল আহমদ চৌধুরী, জিয়াউল ইসলাম, আবদুল করিম জলিল এবং অজ্ঞাত বেশ কয়েকজনের নামে মামলা করেন। কিন্তু ‘হত্যাকাণ্ডের পর জামায়াত নেতারা নানাভাবে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। হত্যা মামলাটিকে দুর্বল করে দিতে স্বৈরাচারী সরকারে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়াও তারা বিভিন্ন পর্যায়ে বিপুল অর্থ খরচ করে। মামলা পরিচালনায় সরকারি আইনজীবীদের বাইরে কোনো আইনজীবীর সহায়তা পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে সিলেটে। মুনির ও তপন হত্যা মামলার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন শামীম সিদ্দিকী, কামকামুর রাজ্জাক রুনু ও বিষ্ণু-পদ চক্রবর্তী। মামলা চলাকালীন তারা কেউই আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে এসে সাক্ষী দেননি। অথচ এই তিনজন তখন সাক্ষী দিলে হত্যাকারীদের শাস্তি হয়ে যেত।

মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় ছিল সিলেটের মানুষ। কিন্তু মামলার সাক্ষীদের আদালতে এসে সাক্ষী না দেওয়ার কারণে অভিযুক্তরা বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। বাদীপক্ষে মামলা পরিচালনা করেছিলেন অ্যাডভোকেট মাহমুদ হোসেন। তিনি বর্তমানে বেঁচে নেই। তার সহকারী হিসেবে মামলা পরিচালনাকারী এ্যাডঃ এমাদউল্লাহ শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ড সিলেটের আলোচিত একটি মামলা হলেও তখনকার সময়ে একজন আইনজীবীকে এই মামলার পক্ষে কোর্টে উঠতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীরা আদালতে এসে সাক্ষী না দেওয়ার কারণেই মূলত আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।’

২৫ বছর আগে মুনির, তপন ও জুয়েলের লাশ ডিঙিয়ে সিলেটের মাটিতে প্রকাশ্য রাজনীতির যাত্রা শুরু করে জামায়াত-শিবির চক্র। সময়ের স্রোতে এবং বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধার সুবিধা নিয়ে এই চক্র এখন সিলেটে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সিলেটের ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশই এখন নিয়ন্ত্রিত হয় জামায়াত নেতাদের তত্ত্বাবধানে। নগরের বড় বড় শপিং মল, আবাসন প্রকল্প, অনেকগুলো হাসপাতাল, ক্লিনিক, মেডিক্যাল কলেজ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কমিউনিটি সেন্টার এখন জামায়াত-শিবিরের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। অথচ মুছে যাচ্ছে মুনির, তপন ও জুয়েলের নাম। কয়েক বছর ধরে সিলেটের কোনো সাংস্কৃতিক জোট, রাজনৈতিক সংগঠন বা অন্য কোনো সংগঠন মুনির, তপন ও জুয়েলের মৃত্যুবার্ষিকীতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এভাবেই নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে এই আত্মোৎসর্গকারী তরুণদের নাম।


(সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ বিরোধী আলোর মিছিল, সিলেট,২৪ সেপ্টেম্বর ১০ )

বাংলাদেশে হত্যা আর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কিভাবে স্বৈরাচারী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় মৌলবাদী ও জঙ্গি রাজনীতির বিস্তার হয়েছিল আগামী দিনের ইতিহাসে তা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে। সেই আলোচনায় মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিও একটি আলাদা অবস্থান রাখবে। একটি প্রগতিশীল জনপদে খুনের রাজনীতি প্রচলন, বিচারকে বাঁধা দেওয়ার কৌশল, অভিযুক্তদের পুনর্বাসন_সব মিলিয়ে কেমন করে মৌলবাদ তার নখর প্রকাশ করে, সেই দৃষ্টান্ত সিলেটের মুনির, তপন ও জুয়েল হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমেই ফুটে উঠেছে। এ কাহিনী তাই সিলেটের নয়, পুরো বাংলাদেশের। জাতির পতাকা খামচে ধরা শকুনদের হাত থেকে স্বদেশকে রক্ষা করতে সিলেটের এই কাহিনী তাই বাংলাদেশের অবশ্য পাঠ্য।

তবে আশার ব্যাপার গত ২০১০ সাল থেকে সিলেটের সাংস্কৃতিক কর্মীদের উদ্যোগে দিনটি পালিত হচ্ছে বেশ ঘটা করেই। এতে করে আগামী প্রজন্মের কাছে অন্তত তুলে ধরা যাচ্ছে কিভাবে তাদের পূর্ব পুরুষদের উপরে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতেই অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে জামাত শিবির চক্র। তবে দিবসটা শুধু সিলেটে নয় জাতীয়ভাবে সকল প্রগতিশীল শক্তির পালন করা উচিৎ বলেই মনে করেন সিলেটের মানুষ।

তথ্য সুত্রঃ
১) দৈনিক কালেরকন্ঠের সাপ্লিমেটারী “রাজকুট” এ প্রকাশিত সাংবাদিক জাকির জাহামজেদের প্রবন্ধ “মুনির-তপন-জুয়েল পরাজিত শক্তির নখরাঘাতে নিহত সেই তরুণরা”
২) যুযুধান : প্রকাশনায় সিলেট মৌলবাদ ও যুদ্ধাপরাধ বিরোধী সাংস্কৃতিক মোর্চা, প্রকাশকাল – ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১০ ইং

কৃতজ্ঞতা : সিলেটের নাট্য সংগঠক হুমায়ূন কবীর জুয়েল।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২১ thoughts on “একই দিনে শিবিরের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার সিলেটের তিন তরুণ মুনির-তপন-জুয়েল

  1. নতুন কিছু জানতে পারলাম।
    ঝামাত

    নতুন কিছু জানতে পারলাম।
    ঝামাত শিভিড় ড়াজাকাড়
    এই মূহুর্তে বাংলা ছাড়!
    বাংলাকে তোড়া ছাড় ডিবি না?
    বাংলা টোডের বাপের কেনা???

    1. ইলেকট্রন ভাই ৪ লাইনে এতগুলো
      ইলেকট্রন ভাই ৪ লাইনে এতগুলো ভুল ……………… :কনফিউজড: আর বাংলা ভাইয়ের লিখার জবাব নাই এক কথায় অসাধারণ পোস্ট সাজিয়ে রাখার মত………।।

    2. কিন্তু আমার নামটা তো বড় সড়
      কিন্তু আমার নামটা তো বড় সড় ঝামেলার সৃষ্টি করে ফেললো!! শেষ মেষ কি না “বাংলা ভাই”!! এই ছিল আমার কপালে :-p

    3. ইলেক্ট্রন ব্রাদার, আমি বুঝতে
      ইলেক্ট্রন ব্রাদার, আমি বুঝতে পারছি আপনি হয়তো ফোন থেকে টাইপ করেছেন, তারপরেও আমাদের মাতৃভাষা, শত শহীদের রক্তস্নাত ভাষাটা আরও কেয়ারফুলি লেখা উচিৎ। ধন্যবাদ।

  2. আপনি ভাই দারুণ কাজের কাজ
    আপনি ভাই দারুণ কাজের কাজ করছেন ।
    আপনার এই ধরণের পোস্ট গুলো ইষ্টিশনের সম্পদ হয়ে থাকবে ।
    আপনাকে অনে অনেক ধন্যবাদ ।
    লেখাটি পড়তে পড়তে শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটছিল ।
    ইচ্ছে করছিল, ইস যদি পারতাম এই হায়েনাদের সবকটাকে নিজ হাতে শেষ করতে !

    1. ধন্যবাদ ব্রাদার। আমি ফেসবুকে
      ধন্যবাদ ব্রাদার। আমি ফেসবুকে প্রথম আসার পরে ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ নিয়ে একটা ছোট্ট পোস্ট দিয়েছিলাম, সেটা আমার সিলেটের বন্ধুদের নজরে আসার পরে তারা ঐ দিবসটা পালনের উদ্যোগ নেন। আর সাংবাদিক জাকির জাহামজেদ, নাট্যকর্মী জুয়েল ভাই, আরিফ জেবতিকরাও এগিয়ে আসে, সেই ২০১০ সাল থেকেই দিনটা সিলেটে বেশ ভালো ভাবেই পালিত হচ্ছে। গতবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটা জেলায় পালিত হয়েছে। সামনে আসছে জুয়েল মুনীর তপনের ২৬ তম মৃত্যু বার্ষিকী, এবার আশা রাখি আরও বিস্তৃত হবে এই দিবস পালনের।

      1. ছড়িয়ে দিতে হবে , জানিয়ে দিতে
        ছড়িয়ে দিতে হবে , জানিয়ে দিতে হবে সবখানে ।
        ওই হায়েনাদের আদর্শিক মৃত্যু ঘটাতে হবে ।
        ভ্রান্ত ও নৃশংস আদর্শ ‘র কবর এই বাংলায় রচনা করতে হবে ।

  3. দারুণ ইনফরমেটিভ পোস্ট ভাই।
    দারুণ ইনফরমেটিভ পোস্ট ভাই। অনেক কিছু জানা গেলো। ধন্যবাদ। শেয়ার দিলাম পোস্টটা।

  4. অসাধারণ কাজ করছেন আপনি উত্তর
    অসাধারণ কাজ করছেন আপনি উত্তর বাংলা। জুন মাসের পুরষ্কারের জন্য ইস্টিশন মাস্টার আপনাকে মনোনীত করে সেটাই বুঝিয়ে দিয়েছেন। এই ইতিহাসগুলো এদেশের সবার, বিশেষ করে তরুণ সমাজের জানা থাকা দরকার। এরকম আরও পোস্ট আপনার কাছ থেকে চাই। সব মিলিয়ে শিবিরের পশুত্ব নিয়ে একটা ই-বুকের সংগ্রহ করা যায় কিনা সেটা আপনি এবং ইস্টিশন কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারেন।

    1. আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য
      আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ আতিক ভাই। এটা আমার দুর্ভাগ্য না সৌভাগ্য জানি না, কিন্তু ছাত্র শিবির নামের সন্ত্রাসী সংগঠনটার রাজনীতি খুব কাছে থেকে দেখেছি। বিশেষ করে বাড়ির পাশের রংপুর কারমাইকেল কলেজ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর ঐ দুই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র এবং প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির একজন প্রাক্তন কর্মী হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে দেখেছি তাদের রগ কাঁটা, হাত কাঁটা, মানুষ খুনের মতো সুপরিকল্পিত নৃশংস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। সংগঠনটা সম্পূর্ণভাবে সন্ত্রাস নির্ভর। আর একটা ব্যাপারও লক্ষ্য করেছি, হীন দলীয় স্বার্থে নিজেদের কর্মীকেও তারা লাশ বানাতে পারে অবলীলায়। তাও আমাদের ছাত্র সমাজের একটা অংশ শুধুমাত্র ধর্মীয় আবেগের কারণে এদের পাতা ফাঁদে পা দেয়।

  5. উত্তর বাংলা ভাইকে অশেষ
    উত্তর বাংলা ভাইকে অশেষ ধন্যবাদ এমন একটি পোস্টের জন্য :থাম্বসআপ: আপনি আপনার পুরষ্কারের সার্থকতা রাখলেন :থাম্বসআপ:

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 3 =