২১৩: তায়েফ যুদ্ধ -২: আঙ্গুর ক্ষেত ও সম্পদ ধ্বংসের আদেশ!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ কুরআন (সুরা হাশর: ৫৯:৫) ও আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই রচিত মুহাম্মদের পূর্ণাঙ্গ জীবনী-গ্রন্থ (সিরাত) ও হাদিস গ্রন্থের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, আগ্রাসী আক্রমণে অবিশ্বাসী জনপদের মানুষদের অবরুদ্ধ করে তাঁদের ভূমির ফসল ও সম্পদ বিনষ্ট করা ছিল মুহাম্মদের চরিত্রের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বানু নাদির গোত্র উচ্ছেদ (পর্ব: ৫২) ও খায়বার হামলার (পর্ব: ১৩১) প্রাক্কালে তিনি তাঁর এই কর্মটি কী প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করেছিলেন তার বিস্তারিত আলোচনা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে। মুহাম্মদের তায়েফ আক্রমণ ও তাঁর এই চরিত্রের ব্যতিক্রম ছিল না। মুহাম্মদের ও তাঁর অনুসারীদের ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত তায়েফ-বাসী যখন তাঁদের জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনে তাঁদের দুর্গের দরজা দু’টি বন্ধ করে দুর্গ-মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা তাঁদের-কে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন দিনের পর দিন! তাঁদের এই অবরোধ ঠিক কতদিন যাবত স্থায়ী ছিল, সে বিষয়ে আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। এই সময়-টি তে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নির্দেশে তাঁর অনুসারীরা কী প্রক্রিয়ায় তায়েফ-বাসীর “আঙ্গুর ক্ষেত ও ফসল” ধ্বংস করেছিলেন, তা ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসের প্রায় সকল মুসলিম ঐতিহাসিকই তাঁদের নিজ নিজ “পূর্ণাঙ্গ সিরাত” গ্রন্থে বিভিন্ন ভাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনার পুনরারম্ভ (কবিতা পঙক্তি পরিহার): [1]
(আল-ওয়াকিদি ও আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ) [2] [3]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২১২) পর:

‘প্রায় বিশ দিন যাবত তিনি তাদের অবরোধ করে রাখেন। [ইবনে হিশাম: ‘কিছু লোক বলে ১৭ দিন’ [4]; আল-ওয়াকিদি: ‘কিছু লোক বলে আঠারো দিন, অন্যরা বলে উনিশ দিন, এ ছাড়াও অন্যরা বলে পনেরো দিন; ইমাম মুসলিম: ‘চল্লিশ দিন’ (পর্ব: ২০৬)।‘]

তাঁর সঙ্গে ছিল তাঁর দু’জন স্ত্রী: উম্মে সালামা বিনতে আবু উমাইয়া [তাবারী: ‘ও তার সঙ্গে ছিল আর একজন’; আল ওয়াকিদি: ‘ও যয়নাব’]। তিনি তাদের জন্য দুটি তাঁবু নির্মাণ করেন ও তাঁবুগুলির মধ্যবর্তী স্থানে নামাজ আদায় করেন। অতঃপর তিনি সেখানে অবস্থান করেন। থাকিফের লোকদের ত্মসমর্পণের পর আমর বিন উমাইয়া বিন ওহাব বিন মুয়াত্তাব বিন মালিক তাঁর নামাজ পড়ার স্থান-টি তে এক মসজিদ নির্মাণ করে। সেই মসজিদে ছিল একটি স্তম্ভ। কিছু লোকের দাবী এই যে, সেখান থেকে আসা এক ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ শুনতে পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সূর্য কোন দিনই তার ওপরে উঠে আসতো না। আল্লাহর নবী তাদের অবরোধ করে রাখেন ও তাদের সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধ করেন। দুপক্ষই একে অপরকে তীর নিক্ষেপ শুরু করে ও আল-তায়েফের প্রাচীরে ঝটিকা আক্রমণের দিন-টি তে তাঁর কিছু অনুসারী testudo-এর নীচ দিয়ে গিয়ে তাদের প্রাচীর অতিক্রমের চেষ্টা করে। থাকিফরা তাদের উপর টুকরো টুকরো গরম লোহা নিক্ষেপ করে ও তারা যখন তার [testudo-এর] নীচ থেকে বের হয়ে আসে তখন থাকিফরা তাদের ওপর তীর নিক্ষেপ শুরু করে ও তাদের কিছু লোক-কে হত্যা করে।

আল্লাহর নবী তাদের আঙ্গুরের ক্ষেত-গুলো কেটে ফেলার আদেশ জারী করেন ও লোকেরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ও তা কেটে ফেলা শুরু করে।

আবু সুফিয়ান বিন হারব ও আল-মুঘিরা বিন শুবা আল-তায়েফে গমন করে ও থাকিফদের-কে ডেকে নিজেদের নিরাপত্তার আশ্বাস চান, যেন তারা তাদের সাথে কথা বলতে পারে। তারা যখন রাজী হয়, তখন তারা কুরাইশ ও বানু কিনানা গোত্রের মহিলাদের-কে তাদের কাছে আসার জন্য ডাকতে থাকে; কারণ তারা শঙ্কিত ছিল এই ভেবে যে তারা [সেই মহিলারা] বন্দী হতে পারে। কিন্তু তারা বাহিরে আসতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে। তারা ছিল: [5]

[১] আমিনা বিনতে আবু সুফিয়ান (আল ওয়াকিদি: ‘আবু সুফিয়ানের কন্যা’; [তিনি কন্যাটির নাম উল্লেখ করেন নাই]’), যার বিয়ে হয়েছিল উরওয়া বিন মাসুদের সাথে ও যার ঔরসে সে জন্ম দিয়েছিল দাউদ বিন উরওয়া-কে (ইবনে হিশাম: ‘অন্যরা বলে ইবনে হুবাব-কে’) [6] [7]

[২] আল-ফিরাসিয়া বিনতে সুয়ায়েদ বিন আমর বিন থালাবা, যার পুত্র হলো আবদুল রহমান বিন কারিব; ও

[৩] আল-ফুকায়েমিয়া উমায়েমা বিনতে উমাইয়া বিন কা’ল [আল ওয়াকিদি: ‘অন্য একটি মহিলা’; তিনি মহিলা-টির নাম উল্লেখ করেন নাই]।

তারা যখন বাহিরে আসতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করে, তখন ইবনে আল-আসওয়াদ বিন মাসুদ এই লোক দু’টি কে [আবু সুফিয়ান ও আল-মুঘিরা-কে] বলে:

“যে কারণে তোমাদের আগমন তার চেয়ে ও উত্তম কিছু একটা তোমাদের বলি। তোমরা তো জানো যে বানু আসওয়াদের সম্পত্তি-টি কোথায় অবস্থিত। (আল্লাহর নবী সেই স্থান- ও আল-তায়েফের মধ্যবর্তী উপত্যকা-টি তে অবস্থান করছিলেন, যার নাম ছিল আল-আকিক।) আল-তায়েফে এমন কোন সম্পত্তি নাই যা বানু আসওয়াদের এই সম্পত্তি-তে পানি সেচন, চাষাবাদ করণ ও রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে ও বেশী শ্রম ও কষ্টসাধ্য। যদি মুহাম্মদ এর গাছগুলো কেটে দেয় তবে এতে আর কখনোই চাষাবাদ করা যাবে না।

সুতরাং তার সাথে কথা বলো ও এটি তাকে তার নিজের জন্য নিতে বলো, কিংবা তার আত্মীয়-স্বজন ও তার আল্লাহর জন্য রাখতে বলো; এই কারণে যে তার ও আমাদের মধ্যে সম্পর্ক-টি সুপরিচিত।”

তারা জানিয়েছে যে আল্লাহর নবী এটি তাদের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।’

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) বিস্তারিত ও অতিরিক্ত বর্ণনা: [3]

‘আল্লাহর নবী যখন আল-আকামা নামক স্থানে আসেন, তখন তাঁর সঙ্গে ছিল তাঁর দুই জন স্ত্রী; উম্মে সালামা ও যয়নাব। মুসলমানরা দুর্গ আক্রমণ করে। জননেতা, ইয়াযিদ বিন যা’মা বিন আল-আসওয়াদ তার ঘোড়ায় চড়ে বেড় হয়ে আসে ও থাকিফিদের কাছে তার নিরাপত্তার আশ্বাস চায়, এই প্রত্যাশায় যে সে যেন তাদের সাথে কথা বলতে পারে। তারা তাকে নিরাপত্তার অঙ্গীকার করে; কিন্তু সে যখন তাদের নিকটে আসে, তখন তারা তাকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করে ও তাকে হত্যা করে। [আল-ওয়াকিদির এই বর্ণনা ইবনে ইশাকের বর্ণনার সাথে সাংঘর্ষিক। ইবনে ইশাকের বর্ণনা মতে: ইয়াযিদ বিন যা’মা আল-আসওয়াদ মৃত্যু বরণ করেছিল “হুনায়েন যুদ্ধের সময়টি-তে”; ‘আল-জানাহ’ নামের ঘোড়া-টি তাকে ফেলে দেওয়ার কারণে (পর্ব: ২০৯)]।

উমাইয়া বিন আবি আল-সালতের ভাই হুদায়েল বিন আবি আল-সালত দুর্গের দরজাটির কাছে বের হয়ে আসে; সে চিন্তাও করে নাই যে তার আশেপাশে কেউ আছে। যা বলা হয়েছে, তা হলো: ইয়াকুব বিন যা’মা তাকে বন্দী করার জন্য লুকিয়ে ছিল, যাতে সে তাকে আল্লাহর নবীর কাছে ধরে নিয়ে যেতে পারে। সে বলেছিল, “হে আল্লাহর রসুল, [এই হলো] আমার ভাইয়ের হত্যাকারী!” আল্লাহর নবী খুশী হয়েছিলেন, এই কারণ যে, সে তাকে তাঁর কাছে ধরে নিয়ে এসেছিল। নবী তাকে অনুমতি প্রদান করেছিলেন ও অতঃপর সে তার কল্লা-টি কেটে ফেলেছিল।

আল্লাহর নবী তাঁর স্ত্রীদের জন্য দু’টি তাঁবু নির্মাণ করেন। তাঁর আল-তায়েফ অবরোধের সময়-টি তে তিনি সর্বদায় এই দু’টি তাঁবুর মধ্যবর্তী স্থানে নামাজ আদায় করতেন। এই অবরোধের বিষয়ে আমাদের মধ্যে মতভেদ আছে। কিছু লোক বলে: আঠারো দিন; অন্যরা বলে উনিশ দিন, আরত্ত অন্যরা বলে পনেরো দিন। সর্বদায় তিনি এই তাঁবু দু’টির মাঝখানে দুই রাকাত করে নামাজ আদায় করতেন। —-

আল্লাহর নবী একটি ম্যাঙ্গোনেল [দুর্গের দেওয়ালে ভারী কিছু ছুঁড়ে মারার জন্য মধ্যযুগে যুদ্ধে ব্যবহৃত এক ধরণের যন্ত্র] স্থাপন করেন। সে বলেছে: আল্লাহর নবী তাঁর অনুসারীদের সাথে পরামর্শ করেন। অত:পর, সালমান আল-ফারসী [পর্ব: ৭৯] তাঁকে বলে:

“হে আল্লাহর নবী, আমার মনে হয় তাদের দুর্গের বিপরীতে আপনার ম্যাঙ্গোনেল স্থাপন করা উচিত। বস্তুতই, পারস্য দেশে আমরা আমাদের শত্রুদের দুর্গগুলোর মোকাবেলায় দু’টি ম্যাঙ্গোনেল স্থাপন করেছিলাম। আমরা আমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে ম্যাঙ্গোনেল ব্যবহার করেছিলাম এবং তারাও আমাদের বিরুদ্ধে ম্যাঙ্গোনেল ব্যবহার করেছিল। যদি আমাদের ম্যাঙ্গোনেল না থাকতো, তবে তা হতো এক দীর্ঘস্থায়ী বিলম্ব।”

আল্লাহর নবী তাকে নির্দেশ প্রদান করেন ও সে তার সম্মুখে একটি ম্যাঙ্গোনেল স্থাপন করে। সে এটি আল-তায়েফের দুর্গের বিরুদ্ধে স্থাপন করে। যা বলা হয়েছে, তা হলো: ইয়াযিদ বিন যা’মা একটি ম্যাঙ্গোনেল ও দু’টি যুদ্ধ-যন্ত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। কিছু লোক বলে: ‘[সে ছিল] আল-তোফায়েল বিন আমর। আরও কিছু লোক বলে: আল-জুরাশ থেকে আসার প্রাক্কালে খালিদ বিন সায়িদ একটি ম্যাঙ্গোনেল ও দু’টি যুদ্ধ-যন্ত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। আল্লাহর নবী তাদের দুর্গের চারপাশে দ্বিমুখী কাঁটা ছড়িয়ে দেন, ‛আইডনের’ কাঁটা। মুসলমানরা যুদ্ধ-যন্ত্রের নীচে প্রবেশ করে, যা ছিল গরুর চামড়া দিয়ে নির্মিত। সেই দিনটির পর সেটি-কে ‘আল-শাদখা’ নামে নামকরণ করা হয়।

কেউ একজন জিজ্ঞাসা করে: আল-শাদখা কী?
সে বলেছে: মুসলমানদের মধ্যে যারা নিহত হয়েছিল —। তারা যুদ্ধ-যন্ত্রটির নীচে প্রবেশ করেছিল, অতঃপর তারা দুর্গের প্রাচীর-টি ভেঙে ফেলার উদ্দেশ্যে সেটি নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে দুর্গের প্রাচীর-টির কাছে গিয়েছিল। কিন্তু থাকিফরা আগুনে উত্তপ্ত করা ছোট ছোট লোহার গরম টুকরা তাদের ওপর নিক্ষেপ করেছিল ও যুদ্ধের যন্ত্রটি পুড়িয়ে ফেলেছিল; সে কারণে মুসলমানরা এটির নীচে থেকে বেরিয়ে এসেছিল, যাদের মধ্যে ছিল আহতরাও। থাকিফরা তাদের লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ শুরু করেছিল ও তাদের কিছু লোক-কে হত্যা করেছিল।

সে বলেছে: আল্লাহর নবী তাদের-কে আঙ্গুরের ক্ষেতগুলো কেটে ফেলা ও পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ জারী করেন। তিনি বলেন, “যে কেহ এক বাণ্ডিল আঙ্গুর কাটবে, তার জন্য বেহেশতে এক রজ্জু স্থাপিত হবে।”

ইয়ালা বিন মুররা আল-থাকাফি-কে ইউয়ানা বিন বদর জিজ্ঞাসা করে, “সেগুলো কেটে ফেলার জন্য কি আমাকে পুরস্কৃত করা হবে?” ইয়ালা বিন মুররা তাই করছিল। অতঃপর ইয়ালা তার কাছে আসে ও বলে, “হ্যাঁ।” ইউয়ানা বলে, “তোর জন্যই হলো জাহান্নামের আগুন।” সেটি [খবর-টি] আল্লাহর নবীর কাছে এসে পৌঁছে ও তিনি বলেন: “ইয়ালার চেয়ে ইউয়ানাই হলো আগুনের জন্য বেশী উপযুক্ত।”

মুসলমানরা দ্রুতগতিতে কাটা-কাটি শুরু করে।

সে বলেছে: সুফিয়ান বিন আবদুল্লাহ আল-থাকাফি কে উমর ইবনে আল-খাত্তাব ডেকে বলে, “আল্লাহর কসম, আমরা অবশ্যই তোমাদের পরিবারগুলোর ভরণপোষণ-সামগ্রী কেটে ফেলছি!” সুফিয়ান জবাবে বলে, “তাহলে কী তোমারা আমাদের জল ও মাটি ধ্বংস করবে না!” সে যখন এই কাটা-কাটিগুলো দেখতে পায়, সুফিয়ান চিৎকার করে বলে:

“হে মুহাম্মদ, কেন তুমি আমাদের সম্পদগুলো কেটে ফেলছো? তুমি যদি আমাদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হও, তবে তো তুমি তা অবশ্যই আত্মসাৎ করবে। অতঃপর, তোমার দাবী মোতাবেক নিশ্চয়ই তা তুমি আল্লাহ ও তোমার আত্মীয়-স্বজনদের জন্য গচ্ছিত রাখবে!”

আল্লাহর নবী বলেন, “অবশ্যই, আমি এটি আল্লাহ ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য গচ্ছিত রাখতে পারি!” তাই, আল্লাহর নবী তা রেখে আসেন।

আবু ওয়ায়েযা আল-সা’দি হইতে বর্ণিত: আল্লাহর নবী প্রত্যেক ব্যক্তি-কে পাঁচ বাণ্ডিল আঙ্গুর কেটে ফেলার নির্দেশ জারী করেন। উমর ইবনে আল-খাত্তাব আল্লাহর নবীর কাছে আসে ও বলে, “হে আল্লাহর নবী, নিশ্চয়ই এটি সম্পূর্ণ পরিপক্ক ও ফলগুলো এখনও ঘরে তোলা হয় নাই।”

তাই আল্লাহর নবী এই নির্দেশ জারী করেন যে, ইতিমধ্যেই যে ফসলগুলো ঘরে তোলা হয়েছে, তারা যেন সেগুলো কেটে ফেলে। সে বলেছে: তাই তারা তা কাটা শুরু করে। —–

একজন লোক দুর্গে দাঁড়িয়ে বলছিল, “হে ভেড়ার রাখাল, দুর হও! মুহাম্মদের চেলারা, দুর হও! মুহাম্মদের দাসরা, দুর হও! তোরা কী মনে করিস যে আমাদের আঙ্গুরের ক্ষেত থেকে তোদের আত্মসাৎ করা আঙ্গুরের কারণে আমরা দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়বো?”

আল্লাহর নবী বলেন, “হে আল্লাহ, তাকে তুমি জাহান্নামে প্রেরণ করো!”

সা’দ বিন আবি ওয়াকাস [পর্ব: ৬২] বলে: আমি তাকে নিশানা করে তীর নিক্ষেপ করি, যা তার শিরা (Vein) বিদ্ধ করে ও সে মৃত অবস্থায় দুর্গ থেকে ভূপতিত হয়। আমি দেখতে পাই, আল্লাহর নবী সেই কারণে খুশী হোন।’——-

– অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ – লেখক।

আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-ওয়াকিদি ও আল-তাবারীর ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের ভয়ে ভীত হয়ে যখন তায়েফ-বাসী তাঁদের দুর্গ মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তখন মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের এই আদেশ করেছিলেন যে তারা যেন তাঁদের আঙ্গুর-ক্ষেতের আঙ্গুরগুলো কেটে ফেলে! আর আল-ওয়াকিদির বিস্তারিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, এই কর্মে মুহাম্মদ তাঁর অনুসারীদের বেহেশতের প্রলোভন দেখিয়েছিলেন, এই বলে:

“যে কেহ এক বাণ্ডিল আঙ্গুর কাটবে, তার জন্য বেহেশতে একটি রজ্জু স্থাপিত হবে।”

এই অনৈতিক আদেশের বিরুদ্ধে যখন ‘ইউয়ানা বিন বদর’ নামের তাঁর এক অনুসারী সন্দেহ প্রকাশ করেন ও এই কর্মে লিপ্ত ইয়ালা বিন মুররা আল-থাকাফি নামের তাঁর অন্য এক অনুসারী-কে জানান যে, এই অনৈতিক কর্মের প্রতিফল হলো, “জাহান্নামের আগুন!” এই খবর-টি শোনার পর মুহাম্মদ তাঁর এই সন্দেহকারী অনুসারীর উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “ইয়ালার চেয়ে ইউয়ানাই হলো আগুনের জন্য বেশী উপযুক্ত।” অতঃপর, উমর ইবনে আল-খাত্তাব যখন মুহাম্মদ-কে অবহিত করান যে, এই আঙ্গুরের ফসলগুলো পাকা আঙ্গুর সমৃদ্ধ ও তায়েফ-বাসী তা এখনও ঘরে তোলে নাই, তখন মুহাম্মদ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তায়েফ-বাসী যে ফসল-গুলো ঘরে তুলেছে, সেগুলো যেন ধ্বংস করা হয়!

প্রতিপক্ষের ভূমির ফসল ও সম্পদ ধ্বংস করা ছাড়াও মুহাম্মদের চরিত্রের আর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, যুদ্ধ, হামালা ও অবরোধ কালে তিনি তাঁর প্রতিপক্ষের “পানির উৎস” বন্ধ করে দিতেন। তিনি এই কাজটি করেছিলেন ইসলামের ইতিহাসের সর্বপ্রথম রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ “বদর যুদ্ধ (পর্ব: ৩২)” ও তাঁর খায়বার হামলার প্রাক্কালে (পর্ব: ১৩৮)।

আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা আরও জানতে পারি মুহাম্মদ এক থাকিফ-বাসী-কে অভিশাপ বর্ষণ করেছিলেন ও অতঃপর সা’দ বিন আবি ওয়াকাস নামের তার এক অনুসারী এই লোক-টি কে হত্যা করেছিলেন। মুহাম্মদের চরিত্রের আর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এই যে, তিনি তাঁর প্রতিপক্ষ-কে যথেচ্ছ “অভিশাপ বর্ষণ” করতেন, যার আলোচনা “অভিশাপ ও আবু-লাহাব তত্ত্ব” পর্বে (পর্ব: ১১-১২) করা হয়েছে।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল ওয়াকিদির প্রাসঙ্গিক বর্ণনার মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি (ইবনে ইশাক ও আল তাবারীর রেফারেন্স: বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক তথ্যসূত্র এক ও দুই):]

The narratives of Al-Waqidi: [3]

‘When the Messenger of God came down to al-Akama he had two of his wives with him, Umm Salama and Zaynab. The Muslims stormed the fortress. The leader of the people, Yazīd b. Zama‛a b. al-Aswad came out on his horse and he asked a Thaqīfite for protection desiring to speak to them. They promised him protection but when he came close to them they aimed at him with arrows and killed him. Hudhayl b. Abī l-Ṣalt the brother of Umayya b. Abī l-Ṣalt came out to the gate of the fortress, not thinking that there was anyone with him. It was said that Ya‛qūb b. Zama‛a had stayed in hiding for him and taken him captive in order to bring him before the Messenger of God. He said, “The killer of my brother, O Messenger of God!” The Messenger of God was happy that he brought him to him. The Prophet [Page 927] gave him the authority, and he cut off his head.

The Messenger of God had struck up two tents for his wives. He used to pray between the two tents, all the time he laid siege to al-Ṭā’if. There was disagreement among us about its siege. Someone said: eighteen days; another, nineteen days; another fifteen days; and all that while he prayed between the two tents two bowings. —–

The Prophet established a mangonel. He said: The Messenger of God consulted his companions, and Salmān b. al-Fārisī said to him, “O Messenger of God, I think that you should establish a mangonel against their fortress. Indeed, we in the land of Persia established two mangonels against the fortresses that were established against us. We established mangonels against our enemy and they established mangonels against us. If there were no mangonel, it would be a long stay.” The Messenger of God commanded him and he set up a mangonel in front of him. He set it up against the fortress of al-Ṭā’if. It was said: Yazīd b. Zama‛a brought a mangonel and two war machines. And some said: al-Ṭufayl b. ‛Amr. And some said: Khālid b. Sa‛īd arrived from al-Jurash with a mangonel and two war machines. The Prophet spread double-pronged thorns, thorns of the ‛Aydān around their fortress. The Muslims entered under the war machine, which was made of cowhide. That day was named al-Shadkha, after it.

[Page 928] Someone asked: What is al-Shadkha? He said: those who were killed among the Muslims—They entered under the war machine, then they crawled with it to the wall of the fortress to breach it, but the Thaqīf sent scraps of iron heated with fire against them and burned the war machine; so the Muslims came out from under it, and among them were those who were wounded. The Thaqīf aimed at them with arrows and some of them were killed.

He said: the Messenger of God ordered them to cut the grape vines and burn them. He said: Who cuts a rope of grapes, for him is a rope in Paradise. ‛Uyayna b. Badr said to Ya‛la b. Murra al-Thaqafī, “The cutting of that rewards me?” Ya‛la b. Murra did so. Then Ya‛la came to him and said, “Yes.” ‛Uyayna said, “For you is the hell-fire.” That reached the Messenger of God and he said, “‛Uyayna is more deserving of the fire than Ya‛la.” The Muslims began cutting cuttings rapidly.

He said: ‛Umar b. al-Khaṭṭāb called out to Sufyān b. ‛Abdullah al-Thaqafī, “By God, we are surely cutting the provider of your families.” Sufyān replied, “Then, you will not destroy the water and soil!” When he saw the cutting, Sufyān called out, “O Muḥammad, why are you cutting our wealth? Indeed you will take it if you are victorious against us. And indeed you will put it down to God and the relatives as you claim!” The Messenger of God said, “Indeed, I can put it down to God and the relatives.” So the Messenger of God left it.

Abū Wajza al-Sa‛dī narrated: The Messenger of God commanded that every man cut the grapes of five ropes. ‛Umar b. al-Khaṭṭāb came to the Messenger of God and said, “O Messenger of God, [Page 929] surely, it is fully grown and its fruit is not yet harvested.” So the Messenger of God commanded that they cut down what was already harvested. He said: So they began to cut the first of the first. ——–

A man was standing on the fortress and saying, “Depart, O shepherd of the sheep! Depart, flowing garment of Muḥammad! Depart, slaves of Muḥammad! Do you think we will be miserable over the vine-ropes you take from our vineyards?” The Messenger of God said, “O God, send him to the hell-fire!” Sa‛d b. Abī Waqqāṣ said: I aimed at him, and my arrow took his vein, and he fell dead, from the fortress. [Page 930] I saw that the Prophet was happy about that.’ ——-

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৫৮৯- ৫৯০
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf
[2] অনুরূপ বর্ণনা- আল-তাবারী, ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ২২-২৪
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp
[3] আল-ওয়াকিদি: ভলুম ৩: পৃষ্ঠা ৯২৬-৯২৮; ইংরেজি অনুবাদ: পৃষ্ঠা ৪৫৪-৪৫৫
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[4] Ibid ইবনে ইশাক: ইবনে হিশামের নোট নম্বর ৮৩৯ – পৃষ্ঠা ৭৭৯:
[5] Ibid আল-তাবারী: নোট নম্বর ১৭৪
‘বানু কিনানা গোত্র: বৃহৎ মুদারি গোত্র (কিনানা বিন খুযায়েমা বিন মুদরিকাহ বিন আল-ইয়াস বিন মুদার বিন নিযার বিন মাআদ বিন আদনান), যারা মক্কার আশেপাশের অঞ্চল-গুলোতে অবস্থান করতো। কুরাইশ-দের আদি উৎস হলো এই গোত্র।’
[6] Ibid আল-তাবারী: নোট নম্বর ১৭৫
‘ইবনে হিশাম ও ইবনে সা’দ: ‘মায়েমুনা বিনতে আবু সুফিয়ান; আমিনার বিয়ে হয়েছিল অন্যত্র।’
[7] Ibid ইবনে ইশাক: ইবনে হিশামের নোট নম্বর ৮৪৪- পৃষ্ঠা ৭৮০

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 4 =