ইহুদি (ইসরাইলি) জাতির পৃথিবীতে টিকে থাকার ইতিহাস পর্ব-৯

ইহুদি (ইসরাইলি) জাতির পৃথিবীতে টিকে থাকার ইতিহাস পর্ব-৯
:
ইহুদি তথা ইসরাইল জাতি সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারণা এই যে, ইসরাইল একটি আগ্রাসী তথা সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। আমারও ধারণা এমনই ছিল। এই কিউরিসিটি থেকে ইহুদি জাতি তথা ইসরাইল সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছি, যাতে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে সহযোদ্ধা অনিমেষ রহমান। নানাবিধ বই-পুস্তক এবং বিশাল ইন্টারনেট জগতে প্রবেশ করে ইহুদি জাতির ইতিহাস জেনে বিষ্মিত হয়েছি। আজকের বিশ্বে তারা সন্ত্রাসী বা আগ্রাসী কিনা তা সচেতন পাঠক বিবেচনা করবে। নিজে বিভিন্ন উৎস থেকে ঐ জাতিটার যে ইতিহাস জানতে পেরেছি, তাই ধারাবাহিকভাবে দিলাম ১-১৭ পর্বে। ভিন্ন ভিন্ন সূত্র থেকে নানাবিধ তথ্য সংগ্রহের কারণে কোথাওবা ভিন্নতর তথ্য-কথামালা চলে আসতে পারে। এ ব্যাপারে সচেতন পাঠকের যৌক্তিক সংশোধনী ধন্যবাদের সঙ্গে গৃহীত হবে। ঈদের ছুটিতে ১০-দিনের অবকাশে যাচ্ছি বিধায় একসাথে ৬-১৭ পর্ব আগাম পোস্ট দিয়ে গেলাম, যাতে এ জটিল বিষয়গুলো আগ্রহী পাঠকরা ছুটির মধ্যে শেষ করতে পারেন। ধন্যবাদ পাঠকদের।
যাযাবর হিব্রুগণ উর থেকে স্থানান্তরিত হয়ে কেনান বা বর্তমান ইসরাইলে বসতি স্থাপন করা শুরু করে। মোটামুটিভাবে ১৪০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত হিব্রুদের এই স্থানান্তরণ প্রক্রিয়া চালু থাকে। কেনানে দুর্ভিক্ষজনিত কারণে ইহুদি জাতির একাংশ মিশরে গমন করে। মিশরে প্রাথমিক পর্যায়ে সমাদৃত হলেও, পরবর্তীকালে মিশরীয় শাসক ফারাহ-এর নির্যাতনের শিকার হয় তারা। এ বিষয়ে ওল্ড স্টেটমেন্টে বলা হয়েছে, এক নতুন ব্যক্তি মিশরের রাজা হন, যার যোসেফ (হযরত ইউসুফ) সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না, ফলে হিব্রুগণ বাধ্য হন বাধ্যতামূলকভাবে দাস-শ্রমিকদের কাজে নিয়োজিত হতে। এই পর্যায়ে ইহুদিদের মাঝে ত্রাণকর্তা হিসাবে আবির্ভূত হন মোজেজ। তার নেতৃত্বে ইহুদিগণ মিশর থেকে পুনরায় কেনানে প্রত্যাবর্তন করে। খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০-এর দিকে এই প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। হিব্রুদের এই মিশর থেকে প্রত্যাবর্তনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে ওল্ড স্টেটমেন্টের Exodus বা যাত্রা পুস্তকে। হিব্রুধর্ম বিবর্তনের প্রথম ধাপ অর্জন করে কেনানে প্রত্যাবর্তনের নেতৃত্ব প্রদানকারী মোজেজ-এর হাতে।
:
মোজেজ হিব্রুদের মাঝে এই ধারণার প্রচলন করেন যে, ইহুদি জাতির গোত্রীয় দেবতা হলো YHWH ইংরেজিতে যার উচ্চারণ হবে JEHOVAH এবং বাংলায় একে ‘যিহোভা’ লিখা যায়। তার আগের যুগে এই নাম ইহুদিদের কাছে অজানা ছিল। একটি জ্বলন্ত ঝোপের উপর মোজেজকে দেখা দিয়ে নিজের নাম প্রথমবারের মতো জানান দেন এই যিহোভা নামক গড। সমসাময়িককালে এক এক জাতি এক এক দেবতাদের তাদের নিজস্ব দেবতা বলে মনে করতো, কাজেই মোজেজ কর্তৃক যিহোভাকে ইহুদি জাতির নিজস্ব দেবতা হিসাবে স্বীকৃতি দান খুবই স্বাভাবিক বিষয় ছিল। মোজেজ অন্যান্য দেবতাকে অস্বীকার না করে যিহোভাকে প্রধান দেবতা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে তার উপাসন করার জন্য ইহুদিদের অনুপ্রাণিত করেন। দেবতা যিহোভা যে অন্য কোনো দেবতার চাইতে কোনো অংশে কম ক্ষমতাসম্পন্ন নন তা প্রমাণ করতে উদ্যোগী হন।
:
মোজেজ এর যিহোভা নিরাকার ছিল না, সে মানুষের মতেই দৈহিক আকৃতিবিশিষ্ট ছিল। মিশর থেকে পলায়ন করার সময় লোহিত সাগর অতিক্রম করার পরে যে বিজয়-গাঁথা রচিত হয়, সেখানে যিহোভাকে চিত্রিত করা হয়েছে মানব সাদৃশ্য এক সত্তা হিসেবে।
:
অবশেষে হিব্রুগণ মিশর থেকে প্যালেস্টাইনে প্রত্যাবর্তনে সমর্থ হয়। প্যালেস্টাইন তখন অধিকার করে নিয়েছে ফিলিস্তিন জাতি। তাদের সাথে সহ-অবস্থান ও ক্রমান্বয়ে নিজেদের প্রভাব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এক পর্যায়ে এখানে হিব্রু রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। স্যামুয়েল, ডেভিড ও সলোমনের গৌরবময় রাজত্বকাল শেষে ইহুদি জাতি ইসরাইল ও জুডা রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভক্তি আসে খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৯৩০ পরবর্তী কোন এক সময়ে। উত্তরে প্রতিষ্ঠিত ইসরাইল রাজ্য ছিল সম্পদশালী। তার ছিল উর্বর ভূমি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের দ্বারা অর্জিত সম্পদরাশি। অপর পক্ষে দক্ষিণের জুডা রাজ্য ছিল দরিদ্র। অধিবাসীরা পূর্বের সেই যাযাবর জীবনই যাপন করতো, বাস করতো তাঁবুতে। পক্ষান্তরে ইসরাইল রাজ্যের ইহুদিদের যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে। ফলে একই ইহুদি জাতির মধ্যে বৈষম্য দেখা দেয়। একদিকে থাকে সম্পদের প্রাচুর্য অন্যদিকে সীমাহীন দারিদ্র্য।
:
এই পর্যায়ে ইহুদি জাতির মাঝে আবির্ভাব ঘটে একদল সমাজ ও ধর্মসংস্কারকদের, যাদের হিব্রুগণ ‘নবী’ (Nabi) বলে অভিহিত করতো। এই নবীগণ হিব্রুধর্মে গুণগত পরিবর্তন ঘটান। হিব্রু ধর্মের বিকাশের পরবর্তী ধাপ সূচিত হয় এই নবীদের হাতে। ’নবী’ আক্কাদীয় উৎস থেকে উদ্ভুত শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ ডাকা, চিৎকার করা। সেই অনুসারে এর অর্থ কথক বা বাণী প্রদানকারী। সমসাময়িক প্যালেস্টাইনি ও সিরীয় ধর্মে ঐশী বাণী প্রচারের রীতি থেকে ইহুদিদের মাঝে এর প্রচলন হয়। নবী ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।
:
তার কাজ হলো ঈশ্বরের কী ইচ্ছা তা জনসাধারণের কাছে ব্যক্ত করা, পাগ্যান ধর্মের মতো মানুষের অনুসন্ধিৎসার জবাব দেওয়া নয়। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী থেকে ইহুদী জাতির জীবনে একের পর এক যে দুর্বিপাক ও বিপর্যয় নেমে আসে তা থেকে তাদের রক্ষা করতে এগিয়ে আসে এই নবীগণ। বিভিন্ন সময়ে জাতিকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে গিয়ে তারা বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা প্রদান করেন। কোনো পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে নয়, সংকটময় মুহূর্তে জাতিকে রক্ষা ও ধর্মকে টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে এই সব ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়েছিল। ইহুদিদের কাছে তিনিই হলেন সত্যিকার নবী, যার মন উন্মুক্ত থাকে নতুন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে ঈশ্বরের কী ইচ্ছা তা যেন অনুধাবন করতে পারে। নবীদের নতুন নতুন ব্যাখ্যার ফলে হিব্রুধর্ম এক নতুন রূপ পরিগ্রহ করে।
:
এরপর পর্ব – ১০
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 16 = 19