ধর্ষক ছাত্রলীগ হলে সে নিষ্পাপ-নিষ্কলঙ্ক!

সিলেটের এমসি কলেজে ছাত্রলীগ কর্তৃক সংঘটিত গণধর্ষণই এই ছাত্র সংগঠনটির দ্বারা ঘটিত প্রথম ধর্ষণ নয়। বরং অতীত ঘাটলে ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময় আওয়ামী’র মদদপুষ্ট এই দলটির কর্মীদের ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনসহ বহুবিধ অপরাধে যুক্ত থাকার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। যে অপরাধসমূহ গণতন্ত্র এবং মানবতার সাথে প্রচণ্ড রকমের সাংঘার্ষিক। তবু এই সংগঠনটির ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে একদমই নড়েচড়ে বসেননি বর্তমান প্রধাণমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর বৃহৎ নেতৃত্ব পরিষদ! উপরন্তু এমসি কলেজের গণধর্ষণের ঘটনার পর, আওয়ামী’র শেখানো সেই পুরোনো বুলি রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে দলবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছাত্রলীগকে আওড়াতে দেখা গেছে।

আওয়ামীগ দেখানো পথে ছাত্রলীগের মুখস্থ বুলি আওড়ানোর এই ট্রেন্ড আসলে কেমন সেই আঙ্গিকে খানিক উদাহরণ আগে দেয়া যাক। বহুসময় ও বহুক্ষেত্রে মাদ্রাসায় মোল্লা কর্তৃক ছাত্র বলাৎকারের সমালোচনা বা প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমরা ইসলাম ও উক্ত মোল্লার ইসলামিক প্যাটার্নকে যৌক্তিকভাবেই সামনে টেনে আনি। আমাদের প্রশ্ন থাকে এই ইসলামিক প্যাটার্ন কিংবা মূল্যবোধের এতই যদি ব্রতচিত্তে সৎ সংকল্প থাকবেই, তাহলে এই প্যাটার্ন গায়েই এত বিকৃত রুচিবোধের প্রয়োগ কেনো? তখন এই প্রশ্নগুলোর বিপরীতে অন্ধ মুমিনদের রিপ্লাইগুলো থাকে এমন ; ” ইসলামে ধর্ষক নাই “, ” ঐ ধর্ষক মুসলিম না ” ” ধর্ষক কখনও মুসলিম হয়না”। ফলে ছাত্রলীগের বয়ান এবং এই অন্ধ মুমিনদের বয়ানের মাঝে আপনি ইচ্ছে করে হলেও কখনোই কোনো তফাৎ কখনোই খুঁজে পাবেননা।

ছাত্রলীগের ধর্ষণবিরোধী সমাবেশে কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের বয়ান ছিল ; ” নারীর প্রতি খারাপ চোখে তাকানোর মতো একটি কর্মীও ছাত্রলীগে নেই৷” ছাত্রলীগ ধর্ষণ করে হাইলাইট হওয়ার পর প্রতিবারই কিন্তু একই রকমের বয়ান আমরা শুনতে পাই ; ” ছাত্রলীগ ধর্ষক নয়, ধর্ষক ছাত্রলীগ সাজে।” ” ধর্ষক মুজিবের আদর্শের নয়।” বা ” এই ধর্ষনের ঘটনা ছাত্রলীগের ওপর বিএনপি – জামাতের ষড়যন্ত্র।” অন্ধ মুমিন এবং ছাত্রলীগের এরূপ বয়ানের পরিস্কার সাদৃশ্য সম্পর্কে আশাকরি ইতোমধ্যেই আপনারা অবগত।

সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রলীগের ছয় ধর্ষক

এই ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের সাথে জড়িত থাকার ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ভিত্তিতে দলটি যদি জড়িত না-ই হয়, তবে এই অপরাধসমূহ ঘটায় কারা? অভিযোগগুলো কি তবে মিথ্যা বা সবটাই বিরোধী পক্ষের ষড়যন্ত্র? পরিসংখ্যান অনুযায়ী এমন উদ্ভান্ত প্রশ্ন উদ্ভবেরও কোনো সুযোগ নেই। এ বছরের শুরুতে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে ধর্ষণ মামলায় সরকারি ইব্রাহিম খাঁ কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আসিফুজ্জামান হৃদয় মণ্ডলকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ভূঞাপুর থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ রাশিদুল ইসলামের ভাষ্যমতে ; স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার ছত্রচ্ছায়ায় হৃদয় মণ্ডল কলেজের ছাত্রীদের উত্ত্যক্তসহ নিয়মিত বিভিন্ন অপকর্ম করে আসছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া বিবাহিত এক ছাত্রীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্মমভাবে ধর্ষণ করে। একই মাসে চট্টগ্রামে নাম ও পরিচয় গোপন রেখে ভুয়া কাবিনে বিয়ে করে এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আকিবুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশি তদন্ত অনুযায়ী ছাত্রলীগের এই নেতা মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধেও যুক্ত ছিলেন।

এরপর ফেব্রুয়ারীর দিকে বরিশালে এক ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে কলেজ ছাত্রীকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার সময় অভিযুক্ত ধর্ষক বনি আমিন বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।  একই বছরের মার্চে পাবনা জেলার সুজানগর পৌরসভার ভবানিপুর এলাকায় এক গৃহবধূ ছাত্রলীগ কর্তৃক গণধর্ষণের শিকার হন। এই দলবদ্ধ ধর্ষণের নেতৃত্বে ছিলেন সুজানগর পৌর ছাত্রলীগের যুগ্ন আহ্বায়ক সুমন খান। ভুয়া বিয়ের নাটক সাজিয়ে রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান সিদ্দিকী রনির বিরুদ্ধে এক শিক্ষিকাকে ধর্ষণের খবর পাওয়া গেছে সেপ্টেম্বরের শুরুতে।

শুধু তাই নয়, একইসাথে বিভিন্ন অযুহাতে উক্ত শিক্ষিকার কাছ থেকে আঠারো লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে রনির বিরুদ্ধে। পরিসংখ্যান অনুসারে প্রতিবছর বিভিন্নসময় বহুভাবেই ধর্ষণ ও গণধর্ষণ করে এসেছে আওয়ামীর ছত্রছায়ায় হৃষ্টেপুষ্টে লালিত এই ছাত্র সংগঠনটি, যা এমসি কলেজের ঘটনার মত হয়তো এত মিডিয়া কাভারেজ বা প্রচার প্রসার পায়নি। ছাত্রলীগ কর্তৃক সংঘটিত এমন অহরহ ধর্ষণ ও গণধর্ষণের তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করতেও হয়তো কারোই ইচ্ছে করবেনা, কিন্তু এই ছাত্র সংগঠনটি কত নির্মম ও বিকৃত সেটা জানানোর জন্য ইচ্ছে না থাকলেও, আজ তুলে ধরা ভীষণ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটু ফ্ল্যাশব্যাকে গেলে দেখা যাবে এতকিছুর পরো “ছাত্রলীগ পূতপবিত্র, ছাত্রলীগ দুধেল শিশু বা ছাত্রলীগ মাছুম বাচ্চা” আওয়ামীতন্ত্র থেকে শুরু করে বহু প্রগতিশীলতার আড়ালে অনগ্রসর শ্রেণীর ও বুদ্ধিজীবির লেবাসে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মানুষদের ঠিক এইভাবে স্লোগান দিতে প্রায়ই দেখা যায়! আর তখন যেকারও মনে হবে ; লজ্জাবোধ, অনুশোচনা, মূল্যবোধ ও আত্ন উপলব্ধি বিষয়গুলো আসলে এদের সাথে কোনদিক থেকে কখনোই যায়নি। অনেকেই জানেন ২০১৫ সালে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ( শাপ্রবি) শিক্ষকদের ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কিভাবে হামলে পড়েছিল, তারপরো আওয়ামী সরকার এই ঘটনা ঠিকঠাক চেপে গিয়ে পুরোদমে নীরব ছিলেন! তখনো লেখক ভট্টাচার্যের মত উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতির দাবি ছিল ; ” ছাত্রলীগ এই ঘটনায় জড়িত নয়, তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে জড়িত থাকতে পারে।”

এদিকে এই ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের শাস্তি দেয়ায় অত্যাধিক কষ্ট পেয়েছিলেন খ্যাতনামা লেখক ও অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এই বিষয়ে তাঁর মন্তব্য ছিল ; ছাত্রলীগ বাচ্চা ছেলে, তাদের শাস্তি দেয়া অন্যায়। আরো বলেছিলেন; “শিক্ষকদের ওপর কে হামলা করেছে? ছাত্রলীগের ছেলেরা? না। এরাতো ছাত্র, আমাদের ছাত্র। এত কমবয়সী ছেলে, এরা কি বুঝে? ওদেরকে আপনি যাই বোঝাবেন ওরা তাই বুঝবে।”

সিলেটের এমসি কলেজে ছাত্রলীগ কর্তৃক গণধর্ষণের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুস্পষ্ট কোনো প্রতিত্তোর ও আওয়ামী নিয়ন্ত্রিত এই বর্বর ছাত্র সংগঠনটির বিপরীতে তাঁর অবস্থান কেমন হবে এই বিষয়ে কোনো পরিকল্পনা আমরা এই অব্দি পাইনি, যা সত্যিই অবাক করার মত এবং দুঃখজনক! আরো মজার ব্যাপার ছিল, এই নির্মম ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যে শেখ হাসিনা তাঁর জন্মদিন উদযাপন করতেও এতটুকু ভু্লে যাননি! আমরা প্রধানমন্ত্রীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা অবশ্যই জানাব বা তিনি উদযাপন করবেন। কিন্তু সেটা কেনো তাঁর হৃষ্টপুষ্টে বেড়ে ওঠা ছাত্রলীগের নগ্ন উল্লাস ও ধর্ষিতার অবিরাম ক্রন্দনের ওপর হবে এখানেই যত প্রশ্ন৷ মাদার অব গুমেনিটি, মাদার অব কওমি’র পর আমাদেরও বিবেকে বাঁধা দেয় তাঁকে মাদার অব রেপিস্ট সম্বোধন করতে! তাঁর পালিত ছাত্রলীগের এই সঙ্কোচবোধ আছে তো?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

63 + = 67