পরকালের অস্তিত্ব সম্পর্কে….

ধর্মব্যবসার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো- “পরকাল”! বেহেস্তের লোভ, দোজখের ডর! সাধারণ মানুষকে এই লোভ আর ভয় দেখিয়ে চলে পরকালের টিকিট ব্যবসা। পরকালবিদ্যায় বলা হয়- মুসলিমদের মৃত্যুর পর কবরে আজাব হবে, পূনরুত্থানে হাশর, মিজান, বেহেস্ত, দোজক, হুর, কচি বালক ইত্যাদি পাবে।

মোল্লা, পুরহিতরা মানুষকে পরকালের ভয় দেখিয়ে এবং ৭২টা হুরী-যৌনকর্মীর ও কচি বালকদের লোভ দেখিয়ে অর্থ ও ক্ষমতা পেতে চায়। – এটা একটা অনৈতিক, নির্লজ্জ, বেহায়াপনা, শঠ- প্রতারণা। যা পরকাল চর্চায় পাওয়া যায়। তারা পুরো জাতিকে পরকাল নামক একটি অবৈজ্ঞানিক, মিথ্যা, বানোয়াট, অলৌকিক লোভ দেখিয়ে নিজেরা দেশের নেতা, মন্ত্রী, এমপি, রাষ্ট্রদূত ও রাষ্ট্রপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং মোটা অংকের অর্থ রোজগার করে। এটা একটা মারাত্মক আয়ের উৎস!

এবার আসুন দেখি এসব কেয়ামত, হাশর, মিজান বেহেস্ত, দোজক নামক পরকালগুলির আদৌ কোন অস্তিত্ব আছে কি-না? প্রথমেই, পরকালে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা হলো নিজের মৃত্যু! মৃত্যু হলেই কেবল আত্মা পরকালে যেতে পারে। পরকালে যাওয়ার প্রথম শর্ত যেহেতু মৃত্যু, তাই মৃত্যুটা আসলে কী- আগে সেটা জানতে হবে।


মৃত্যু:
আমাদের জীবন হলো জাগ্রত সময়ের অনুভূত চেতনার সমষ্টি। আর এই চেতনার স্থায়ী বিনাশই হলো মৃত্যু। অর্থাৎ মস্তিষ্কের মৃত্যু মানেই মৃত্যু। মস্তিষ্কের মৃত্যু হলে চিকিৎসকেরা রোগীকে মৃত জ্ঞান করেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করতে পারেন না যতক্ষণ পর্যন্ত হৃৎস্পন্দন বন্ধ না হয়। হার্টবিট বন্ধ হওয়া মানেই মৃত্যু নয়। ব্রেইনে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পর ১৫ মিনিট পরেই মস্তিস্কের চেতনা নিক্রিয় হয় এবং চিন্তা করার ক্ষমতা নিক্রিয় হয়, যাকে বলে মস্তিষ্কের মৃত্যু।- স্থায়ী মৃত্যু।

দেহের মৃত্যু হলে দেহের উপাদানগুলি খন্ড-বিখন্ডিত হয় এবং প্রাণশক্তির বিলুপ্তি ঘটে। ফলে চেতনার আর কোনো অংশই অবশিষ্ট থাকে না। মৃত্যুর কোনো সুনির্দিষ্ট একক মুহূর্ত নেই। মৃত্যুকালে মানুষ ধারাবাহিকভাবে ছোট ছোট মৃত্যুর ভেতর দিয়ে যায়। আলাদা আলাদা টিস্যু আলাদা আলাদা সময়ে মারা যায়। কোনো ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করা হলেও একেবারে ফুরিয়ে যায় না। তাঁর চেতনা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সজাগ থাকে এবং সে অন্যের কথাও শুনতে পাশ। কিন্তু তাঁর কিছু করার মতো শক্তি বা সামর্থ্য থাকে না।

মৃত্যুর অভিজ্ঞতা:
যারা মৃত্যুর দুয়ার হতে ফিরে এসেছেন তাদের কমন অভিজ্ঞতাগুলো হলো- তারা সবাই দেখেন একটি উজ্জ্বল টানেলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন অথবা তারা খুব দ্রুতগতিতে একটি আলোকোজ্জ্বল টানেলের ভেতর দিয়ে সামনের দিকে ছুটতে থাকেন কারো আহ্বানে, শঙ্কাহীনভাবে। তাদের মধ্যে অনেকে মৃত্যুকালী দেখেন ‘নানামাত্রিক রঙের কারুকাজ। অনেকে দেখেন, দেহ থেকে চেতনা বের হয়ে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে এবং দেহ নিচে পড়ে আছে। অনেকে নিজেদের আত্মাকে দেহের পাশে দণ্ডায়মান দেখতে পান। এই সময় শরীরের কোনো ব্যথা বা যন্ত্রণা স্পর্শ করে না। কিন্তু তার দেহের চারপাশ ঘিরে কী ঘটছে তা সে দেখতে পায় এবং বুঝতে পারে। যেমন ডাক্তার-নার্সদের ছোটাছুটি, লোকজনের কথাবার্তা, দাফন-কাফন, আত্মীয় স্বজনের কান্নাকাটি এসব। মৃত্যু অবস্থায় মানুষের সময় এবং স্থানসংক্রান্ত পার্থিব ধারণা বদলে যায়। তারা অতীত আর বর্তমানে সংঘটিত সব ঘটনা যুগপৎভাবে দেখতে পাচ্ছিল যেটি বেঁচে থাকা অবস্থায় সম্ভব না। তারা খুব স্বল্প সময়ে পৃথিবীতে কাটানো তাদের জীবনের সব মুহূর্তের একটি ‘প্যানারোমিক’ রিভিউ দেখেছেন। অনেকটা মুভি দেখার মতো। যারা ধার্মীক তারা দেখেন তাদের কৃত পাপ, পুণ্য, এবং যারা নাস্তিক তারা দেখেন তাদের ভালো, মন্দ এসব কাজের একটি সালতামামি তাদের সামনে। অনেকেই বলেছেন যে, তারা তাদের ইতোমধ্যে মৃত আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বান্ধবের সাক্ষাৎ পেয়েছেন, কথা বলেছেন। ঐ মৃত ব্যক্তিরা তাদের স্বাগত জানিয়েছেন। তারা পরস্পরকে চিনতে পেরেছেন এমনকি এমন অনেক মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে যারা মারা গেছেন তাদের জন্মেরও আগে। তবে ভবিষ্যতে যদি মৃত্যুর পরে তার মস্তিষ্ককে ফিরিয়ে আনা যায়, তার চেতনা ও ব্যক্তিত্ব ফিরে আসে, তবে মানুষ পুনরায় জীবিত হতে পারে।

মৃত্যু বলতে দেহের সকল কোষের পচনের আন্তঃসংযোগ, বিচ্ছিন্ন হওয়ার মাধ্যমে দেহের প্রাণ শক্তি বিলোপ। যতে দেহের মৃত্যুর সাথে সাথে আত্মারও মৃত্যু ঘটে। একবার ব্রেইন ডেথের পর মস্তিষ্ক তার কার্যক্রম বন্ধ করে ফেললে, চেতনার বা আত্মার অস্তিত্বের সমাপ্তি ঘটে।

মৃত্যুর পর আত্মা যদি চলেই যাবে তবে তার চোখ ৩১ মিনিট জীবিত থাকে কী করে? হৃদপিন্ড ১০ মিনিট, পা ০৪ ঘন্টা, শরীরের চামড়া ০৫ দিন, হাড় ৩০ দিন জীবিত থাকে কী করে? তাদের আত্মা কি ততদিন অপেক্ষা করে? আবশ্যই না। এটা আত্মার কোন কাজ না। মৃত্যুর পরই কেবল মানুষ পরকালের চিন্তা করে।

স্থান, কাল, ভেদে বিভিন্ন ধর্মের পরকাল বিভিন্ন রূপে দেখা যায়। তবে প্রধান কয়েকটি ধর্মে পরকালবিদ্যা ব্যপক ভাবে চর্চা করা হয়। এসব ধর্মে বলা হয়, মৃত্যুর পর মানুষের আত্মা স্রষ্টার কাছে যায়। পূণ্যবান হলে আশ্রয় পায় নতুবা বহিষ্কৃত হয়, প্রেতাত্মা হিসেবে পৃথিবীতে ফিরে আসে। তারপর শেষ বিচারে- কেয়ামত, হাশর, মিজান পাড় হয়ে চলে যায় স্বর্গে কিংবা নরকে। সেখানে মানুষ অনন্তকাল বাস করবে।

এখন প্রশ্ন হলো- “অনন্তকাল” বলতে আমরা কি বুঝি? অনন্তকাল মানে যেই কালের কোন শেষ নাই। অর্থাৎ, যার কোন শেষ নাই- সেই হলো পরকাল। এক্ষেত্রে বিজ্ঞান-দার্শন বলে- যার কোন শেষ নাই, তার কোন অস্তিত্বও নাই।

আসুন এ ব্যপারগুলি নিয়ে একটু বৈজ্ঞানিক আলোচনা করি…

ধর্মীয় ভাবে, কিয়ামত হলো উঠে দাঁড়ানো। এ শব্দটি আরবি ‘কিয়াম’ থেকে আগত যার অর্থ- উঠা(ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহৃত)। ইসলামী আকীদা অনুসারে, ইসরাফীল (আ.) শিঙ্গায় ফুৎকার দিলে কিয়ামত হবে, অর্থাৎ বিশ্বজগৎ ধ্বংস হবে। প্রথম ফুৎকার দেওয়ার সাথে সথেই আকাশ ফে‌টে যা‌বে, তারকাসমূহ খ‌সে পড়‌বে, পাহাড়-পর্বত ছিন্ন-‌বি‌চ্ছিন্ন হ‌য়ে তুলার মত উড়‌তে থাক‌বে। সকল মানুষ ও জীব-জন্তু ম‌রে যা‌বে, আকাশ ও সমগ্র পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যা‌বে।

এখন প্রশ্ন হলো “আকাশ ফেটে যাবে”? মানে -? জ্যোর্তিবিজ্ঞান মতে, আকাশ বলে কিছু নাই।- সে আবার ফাটবে কি করে? “তারকাসমূহ খসে পড়বে”। – তারকাগুলি তাহলে কীসের মধ্যে লাগানে থাকে?

পাহাড়-পর্বত ছিন্ন-‌বি‌চ্ছিন্ন হ‌য়ে তুলার মত উড়‌তে থাক‌বে। সকল মানুষ ও জীব-জন্তু ম‌রে যা‌বে

কথাগুলো ভূমিকম্পের সাথে সম্পর্কিত। আবার, আকাশ এবং পৃথিবী ধ্বংস হবে। পৃথিবী ধ্বংস হতে পারে, আকাশ কী করে ধ্বংস হয়? -প্রাচীন মানুষ ভাবত আকাশেরও অস্তিত্ব আছে এবং সেটি ধ্বংস হতে পারে- তাই হয়ত এরকম বিভ্রম!

যা হোক এবার আসুন কেয়ামত সৃষ্টি তথা সৌরমন্ডল ও বিশ্ব ধ্বংসের ব্যপারে বিজ্ঞান কী বলে?

প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর সূর্য শীতল হয়ে যাবে, তার বহিরাংশ বহুগুণ সম্প্রসারিত হওয়ায় তার ব্যাস বর্তমানের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে এবং সে একটি লোহিত দানবে পরিণত হবে। একসময় বহিরাংশটি সূর্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি গ্রহ নীহারিকা তৈরি করবে এবং কেন্দ্রভাগটি শ্বেত বামন নামক এক ধরনের নাক্ষত্রিক অবশিষ্টাংশে পরিণত হবে। সুদূর ভবিষ্যতে সূর্যের কাছ দিয়ে অতিক্রমকারী তারাগুলো তার সাথে তার ভ্রমণসঙ্গী গ্রহগুলোর বন্ধনকে কমিয়ে দেবে। এর ফলে কিছু গ্রহ ধ্বংস হয়ে যাবে, কিছু আবার আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমে ছিটকে পড়বে। ধারণা করা হয় কয়েক ট্রিলিয়ন বছর পর সূর্যের অবশিষ্টাংশের চারদিকে আর কোন গ্রহই থাকবে না। আর বিশ্বধ্বংসের বিষয়টা প্রসারণের উল্টো প্রক্রিয়ায় সংকুচিত হওয়া শুরু করবে। একটি সিনেমাকে যদি ব্যাকওয়ার্ডের মাধ্যমে উল্টো করে টেনে শেষ থেকে শুরুতে আনা হয়, তাহলে যেরকম হবে, মহাবিশ্বের সংকোচনের ঘটনাও সেরকমই হবে। ৯০ থেকে ১১০ বিলিয়ন বছর পরে মহাবিশ্বের ঘনত্ব অত্যন্ত বেড়ে যাবে। পাশাপাশি প্রচণ্ড উত্তপ্তও হয়ে যাবে। এর পরপরই Big Crunch বা বৃহৎ সংকোচন সংঘটিত হবে। অগ্নিবৎ উত্তাপে মহাবিশ্বের সকল বস্তু একত্রে মিলে যাবে। তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ফাঁকা থাকবে না, সব দিক থেকে পূর্ণ হয়ে যাবে। এ যেন অনেকটা গ্রহ নক্ষত্র গ্যালাক্সির ‘সংঘবদ্ধ সংকোচন’। বিগ ক্রাঞ্চের পরে কী ঘটবে কিংবা সেখানে ‘পরে’ বলতে আদৌ কোনোকিছুর অস্তিত্ব থাকবে কিনা তা কেউ জানে না। এইতো গেল বিজ্ঞানের কথা। যার সাথে ধর্মের কথার কোন মিল নেই। এইবার আসি দ্বিতীয় ফুৎকারের কথায়…

তারপর, দ্বিতীয় ফুৎকার দেওয়ার সাথে সাথেই পৃথিবী সৃষ্টি থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত সৃষ্টজীবের আর্বিভাব হয়েছিল, তারা সকলেই জীবিত হয়ে উঠে দাঁড়াবে? মানে সবাই জীবিত হয়ে উঠে দাড়াবে- এটা কী করে সম্ভব? পরকালবিদ্যা মতে, পরকালে আত্মার উপর দেহ নির্মিত হয়ে সবাই দাড়িয়ে যাবে? পরকালে আত্মার যদি অস্তিত্ব থাকে তবেই তার পূনর্জীবন সম্ভব! এই ঘটনাটা ঘটার জন্য মানুষের আত্মার অবশ্যই অস্তিত্ব থাকতে হবে।

এবার চলুন পরকালে যাওয়ার দ্বিতীয় শর্ত, “আত্মার অস্তিত্ব” নিয়ে কথা বলি…

আত্মার অস্তিত্ব :

প্রাচীন মিশরীয়রা ভাবতো মৃত্যুর পর আত্মা বাঁজপখি হয়ে আকাশে চলে যায়। তারপর নিজ দেহ চিনে আবার ফিরে আসে এবং সে পূর্বজীবন লাভ করে। -এই বিশ্বাসে তারা মানুষ মমি করে রাখত। কালের বিবর্তনে এই ধারণাটাই বৃহৎ প্রধান ধর্মগুলিতে ঢুকে পড়ে- হাশর, কেয়ামত, মিজান, বেহেস্ত, দোজখ নামক গল্পের আকারে।

এখন দেখি যে আত্মা পরকালে যাবে তার কোন অস্তিত্ব আছে কি-না? প্রথমেই আত্মা সম্পর্কে দার্শনিক ডেভিড হিউম বলেন, আত্মা সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা নেই, কারণ আত্মার কোনো ইন্দ্রিয় ছাপ আমাদের মস্তিস্কে তৈরী করেনা। প্রকৃতির ‘গরম বা ঠান্ডা, আলো বা ছায়া, ভালোবাসা বা ঘৃণা, বেদনা বা আনন্দ’ ইত্যাদি আমাদের প্রত্যক্ষ্য অভিজ্ঞতা দেয়। আত্মা কোন অভিজ্ঞতা দেয় না। আমরা যাকে আত্মা বলি তা বিভিন্ন প্রত্যক্ষণের পুঞ্জ বা সমষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়, এসব প্রত্যক্ষণ ধারণাতীত দ্রুততার সঙ্গে পরস্পরকে অনুসরণ করে এবং সব সময়ই পরিবর্তিত হতে থাকে। আমাদের অনুভুতি ও প্রতিক্রিয়াতে ‘বিভিন্ন প্রত্যক্ষণের পুঞ্জ বা সমষ্টি ছাড়া’ কোনো মন বা আত্মা নেই।

আত্মার ওজন ২১ গ্রাম তত্ত্বটিও ভুল। আমেরিকান বিজ্ঞানী “মি. ম্যাকডোগাল” আত্মার (ভর এবং তার পরিমাপের বিশেষজ্ঞ) ওজন ২১গ্রাম মাপেন! অগাস্টাস পি. ক্লার্ক নামে একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী এই পরীক্ষণ ভুল প্রমাণ করেন। তিনি দেখান, মৃত্যুর পরপরই মানুষের ফুসফুস, রক্তকে শীতল করা বন্ধ করে দেয়। ফলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এর পরপরই শরীর থেকে ঘাম নিঃসরণ হয়। মৃতের শরীর থেকে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পানি বের হয়ে যাওয়াই মৃতের ২১ গ্রাম ভর কমে এটা আত্মার ওজন নয়। তিনি আরো বলেন; কুকুরের যেহেতু কোনো ঘর্ম গ্রন্থি নেই, তাই তারা মৃত্যুর পর তাদের ওজন হারায় না। ২০০৮ সালে পদার্থবিজ্ঞানী রবার্ট এল. পার্ক ম্যাকডোগালের পরীক্ষণ নিয়ে লিখতে গিয়ে বলেন; “এ পরীক্ষাটির আজকের দিনে আর কোনো বৈজ্ঞানিক বৈধতা নেই” এবং মনোবিদ ব্রুস হুড এ প্রসঙ্গে লিখেন, “যেহেতু ওজন হারানো মুলক এ গবেষণাটি; না নির্ভরযোগ্য না পুনরাবৃত্ত হয়েছে, তাই ম্যাকডোগালের এ গবেষণাটি অবৈজ্ঞানিক হয়ে গেল। অধ্যাপক রিচার্ড ওয়াইসম্যান এই পরীক্ষার সমালোচনা করেন। ২০১৩ সালে স্নোপস এই পরীক্ষণ সম্পর্কে বলে, এ পরীক্ষণটি ত্রুটিযুক্ত কারণ, এই পরীক্ষায় যে কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে, তা সন্দেহজনক, এখানে স্যাম্পল হিসেবে যাদের ব্যবহার করা হয়েছে, তার সংখ্যা খুবই কম এবং ওজন পরিমাপের জন্য যে যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছে, তা যথার্থ নয়। এরপর, উপসংহার টানা হয় এভাবে যে: “তিনি যে আত্মার ভর ২১ গ্রাম – এটা বের করেছেন এটার জন্য তাকে কৃতিত্ব দান করা তো দূরের কথা, এই পরীক্ষায় যে কিছু প্রমাণ হয়েছে, তার এই ধারণার জন্যও তাকে কোনরকম কৃতিত্ব দেয়া উচিৎ নয়। ম্যাকডোগাল পনেরটি কুকুরের শরীরে যে বিষক্রিয়া করিয়েছেন, এবং তার গবেষণার প্রমাণের জন্য ব্যবহার করেছেন, তাও অন্যতম সমালোচনা হয়ে রয়েছে। অর্থাৎ, আত্মার ওজন ওজন ২১ গ্রাম তত্ত্বটিও ভুল প্রমাণিত।

এবার অন্য প্রসঙ্গে আসি, আসলে মানুষের আত্মা, মন এবং ব্রেইন একই জিনিস। মন বলে আসলে কিছু নেই। অবচেতন মন হলো স্মৃতিভাণ্ডার। প্রকৃতির উদ্দিপনা মস্তিস্কের পূর্বস্মৃতির সাথে সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্যের মাধ্যমে যাচাই বাছাই- প্রসেসিং হয়ে তৈরী হয় জ্ঞান। আমাদের সমস্ত অনুভুতি সৃষ্ট এবং নিয়ন্ত্রিত হয় মস্তিষ্ক দ্বারা। মস্তিষ্কে সৃষ্ট সব অনুভূতির একটা “Virtual” অস্তিত্বকেই আমরা আত্মা বলে মনে করি।

আমাদের সমস্ত অনুভুতির ”Actual” অস্তিত্ব থাকে মস্তিষ্কে। অন্যদিকে মস্তিষ্ককে যদি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়, তবে আত্মার আর কোন অস্তিত্ব থাকে না। এটি এক্সপেরিমেন্টালি ভেরিফায়েড সত্য। আবার কোন পক্রিয়ায় যদি বিচ্ছিন্ন মস্তিষ্ককে পুনরায় মস্তকে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়, তবে আত্মা আবার অস্তিত্বশীল হয় (এটা হাইপোথেটিকাল বৈজ্ঞানিক সত্য)।

পৃথিবীতে বহু লোক আছে যাদের বুকের ভেতর কোন হৃদপিন্ডই নাই। কৃত্রিম হৃদপিন্ড দিয়ে চলে। সে ক্ষেত্রে তার আত্মা তাহলে কোথায় থাকে? কোথাও না। মানে, দেহের চলনে আত্মার কোন ভূমিকা নাই। লতা, গুল্ম, গাছের মতো প্রাণীর দেহের কোষ, কলা, হাড়গোড়, স্নায়ুতে থাকে প্রাণশক্তি। মানুষের চিন্তা, ভাবনা, বুদ্ধি, পরামর্শ আত্মা দিয়ে নয়, বরং মস্তিস্ক দিয়ে করে। আচরণবাদী মনোবিজ্ঞানও ঠিক একই কথা বলে- মন বা আত্মা বলে আলাদা কিছু নাই। মানুষের আচরণই তার আত্মা। আত্মার বৈশিষ্ট্যই প্রাণীর আচরণ।

প্রকৃতির উদ্দীপনা ও দেহের নার্ভাস সিস্টেমের প্রতিক্রিয়া যখন উপলব্ধির উপর এফেক্ট ফেলে তখন আত্মার উপলব্দি হয়- কিন্তু তার কোন অস্তিত্ব নাই। আত্মা কোন মানুষকে বা প্রাণীকে স্বপ্ন দেখাতে পারেনা। স্বপ্ন মূলত মানুষের গোপন আকাঙ্ক্ষা এবং আবেগগুলির বহিঃপ্রকাশ। স্বপ্ন মস্তিস্কের মেমরি গঠন, সমস্যা সমাধান এবং মস্তিষ্ককে সক্রিয়করণ করতে সাহায্য করে।

ঘুমের সময় আমাদের মস্তিষ্কের যুক্তি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র “প্রিফন্টাল কর্টেক্স” অপেক্ষাকৃত অনেক কম সক্রিয় থাকে। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের “লিম্বিক সিস্টেম” যেটি কিনা আমাদের আবেগ কেন্দ্র, সেটি ঘুমন্ত অবস্থাতেও পরুপুরি সক্রিয় থাকে। তাই আমাদের স্বপ্নগুলো হয় অনুভুতি সম্পন্ন। আর যুক্তি নিয়ন্ত্রনের কেন্দ্র “প্রিফন্টাল কর্টেক্স” অপেক্ষাকৃত অনেক কম সক্রিয় থাকার কারনে আমরা স্বপ্নের মধ্যে উড়তে পারি কিম্বা কোন সমস্যার কল্পিত সমাধান খুব সহজেই করে ফেলতে পারে। এখানে, শরীর নিজেই মস্তিস্কের মাধ্যমে স্বপ্ন তৈরী করে। মানুষ ছাড়াও বহু প্রাণীও স্বপ্ন দেখে। তাদের স্বপ্ন নিশ্চয় কোন ফেরেস্তায় দেখায় না। এট একটা শরীরবৃত্তীয় কাজ।

আত্মা যখন ভূত হয়? দেহের মৃত্যুর পর পূণ্যাত্মা সপ্তম আকাশে স্রষ্টার অনুগ্রহ প্রাপ্ত হয় আর পাপী আত্মা বহিষ্কৃত হয়ে প্রেতাত্মা- ভূতে পরিণত হয়। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষায় ভূতের কোন অস্তিত্ব নেই। যদি তা থাকত, তা হলে বিশ্বের সব থেকে বড় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় তা ধরা পড়ত। মানুষের মৃত্যুর পরে তার আত্মা কোথায়ও গেলে তা নিশ্চিতভাবেই বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র সার্ন এর লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার এ ধরা পড়ত। লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার আসলে বিশ্বের বৃহত্তম আণবিক বিশ্লেষক। চৌম্বক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এই যন্ত্র মহাজগতের মৌলিক বস্তুসমূহকে বুঝা যায়। এই বিশ্লেষণ থেকে আমাদের চারপাশে দৃশ্যমাণ জগতের প্রতিটি এলিমেন্টকেই জানা বা বোঝা যায়। লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার যে কোনও এনার্জিকেও বিশ্লেষণ করতে সমর্থ। পদার্থবিদ বিজ্ঞানী কক্সের মতে, ভূত যদি থাকত, তবে তারা এনার্জি দিয়েই গঠিত হত। আত্মারও ঠিক একই অবস্থা- পদার্থ দিয়ে গঠিত হতো। অথচ থার্মোডাইনামিকস-এর দ্বিতীয় সূত্র অনুযায়ী এনার্জি উত্তাপে লোপ পায়। একমাত্র যদি ভূতেরা বা আত্মারা এই সূত্রকে এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল জেনে থাকে, তা হলে কিছু বলার নেই। কিন্তু তা যদি না হয়ে থাকে, তা হলে লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার তাদের খোঁজ পেতই। সার্ন বা ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ-এর তরফে কক্স এক প্রকার ঘোষণাই করে দিয়েছেন ভূতের আসলে কোন অস্তিত্বই নেই। -সেই সাথে আত্মারও।

এখন আসি পরকালের অস্তিত্ব নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ…

বলা হয়ে থাকে হাশরের মাঠে সূর্য আড়াই হাত উপরে থাকবে! সূর্য হতে আড়াই হাত উপরে কোন গ্রহ থাকা সম্ভব নয়, কেননা তিব্র মহাকর্ষস্রোত গিলে খাবে গ্রহটিকে। অনুরূপ ভাবে হাশরের মাঠে আড়াই হাত উপরে কোন সূর্য থাকাও সম্ভব নয়, কেননা তিব্র মহাকর্ষস্রোত গিলে খাবে মাঠটিকে। অবশ্য এই গল্প যখন লেখা হয়েছিল তখন নিউটন, আইনস্টাইনের জন্মই হয়নি। না হলে এরকম ভুল হতোনা।

হাদিসে আছে, বেহেস্তে ছেলেরা ২১ বছর এবং মেয়েরা ১৬ বছরের হবে। এই বয়স কখনও বাড়বেনা এবং কমবেও না। মানে ওখানে সময় প্রবাহিত হবেনা! আইনস্টাইন বলেন, যেখানে সময় প্রবাহিত হয়না সেখানে কোন বস্তুর উপস্থিতিও থাকতে পারেনা। অর্থাৎ বেহেস্তে মানুষের কোন উপস্থিতি বা অস্তিত্ব থাকবেনা। কেননা, সেখানে কোন সময় প্রবাহিত হয়না। অর্থাৎ, বেহেস্ত – দোজকে “সময়” না থাকার কারণে মানুষের কোন অস্তিত্ব থাকবেনা।

হাদিসে আছে, পরকালের একদিন পৃথিবীর পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান! অর্থাৎ, পৃথিবীর তুলনায় পরকালের সূর্য পঞ্চাশ হাজার গুণ বড়? সেই অনুযায়ী- তার সোলার সিস্টেমও পঞ্চাশ হাজারগুণ বড় হবে এবং তার সূর্যটাও পৃথিবীর সূর্যের তুলনায় পঞ্চাশ হাজারগুণ বড় হবে?

এখন কথা হলো, আমাদের এই সূর্যের চেয়ে যদি কোন নক্ষত্র পঞ্চাশ হাজারগুণ বড় হয় তবে, সেই নক্ষত্র খুব তাড়াতাড়ি জ্বালানী শেষ করে ব্লকহোলে পরিণত হবে। তখন আমাদের এই সৌরজগত ধ্বংসেরও পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই সেটি সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়ে যাবে। অর্থাৎ প্রতিটি পরকালই হবে, স্থান শূণ্য, কালশূণ্য- ব্ল্যাকহোল। যেখানে পরকাল নামক কোন স্বর্গ-নরকের অস্তিত্বই নাই! পরকাল হলো ব্লাকহোল!

এখন চলুন যিনি আমাদের স্বর্গে কিংবা নরকে দিতে চান তিনি কেমন? তার অস্তিত্ব কী? তার স্বরূপ কী? বিজ্ঞানের এক্সপেরিমেন্টে সৃষ্টিকর্তাকে কখনও দেখা যায়না- শোনা যায় না- বোঝা যায়না- যারে কল্পনা কইরা নিতে হয়- সেই ঈশ্বর! এ বিষয়ে বিজ্ঞান অচল।

ঈশ্বরকে মাইক্রোস্কোপে দেখা যায় না, দূরবীন দিয়া দেখা যায় না, আগুন দিয়া পোড়ানো যায় না, এসিডে ঝলসানো যায় না- তাই ঈশ্বর। আইনস্টাইনকে একবার ইথারের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, যদি এমন কোনো বস্তু থাকে যা পরম স্থির, সর্বব্যাপী এবং পরিবর্তনহীন তবে তা কোনোভাবেই মানুষের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়বেনা। আমরা আপেক্ষিক জগতের জীব। এবসোলিউট কোনোকিছু থাকা বা না থাকা প্রমাণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ইথার আছে কি নেই তা জানা অসম্ভব। অনুরূপ ভাবে- আল্লাহ, খোদা, গড, ভগবানকে জানাও অসম্ভব। বিজ্ঞানের কাজ বস্তু-জগতের কলা-কৌশল উদঘাটন। সে পথ ধরে পৃথিবী তথা মহাবিশ্ব কিভাবে আবির্ভূত হলো সেটা তারা উদ্ঘাটন করতে পারে, কিন্তু কে সৃষ্টি করল সে বিষয়ে বিজ্ঞান নিরব- মনোযোগী নয়।

অন্যকথায়, সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে কোন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব নেই। এর সজ্ঞা হল নেই, যা নেই তা নিয়ে কোন মতবাদ দাড় করানো যায় না।মহাবিশ্ব সৃষ্টির বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিস অনুযায়ী কোয়ান্টাম ভ্যাকুয়াম থেকে মহাবিশ্ব কোন কিছুর সাহায্য ছাড়াই একা একা তৈরী হতে সক্ষম। এখানে ঈশ্বর নামক কোন প্রপঞ্চ অপ্রয়োজনীয়।

সত্যিকথা বলতে কি আমরাই ব্রহ্মাণ্ড! আমরাই ঈশ্বর, আমরাই সৃষ্টিকর্তা! আমাদের দেহের প্রতিটি অণু পরমাণু একসময় লুকিয়ে ছিল একটি বিস্ফোরিত নক্ষত্রের অভ্যন্তরে। আমাদের বাম হাতের পরমাণুগুলো হয়তো এসেছে এক নক্ষত্র থেকে, আর ডান হাতের গুলো এসেছে ভিন্ন আরেকটি নক্ষত্র থেকে। আমরা আক্ষরিক ভাবেই সবাই নক্ষত্রের সন্তান, আমাদের সবার দেহ তৈরি হয়েছে কেবল নাক্ষত্রিক ধূলিকণা দিয়ে।

এর পেছনে কোন প্রপঞ্চ কাজ করে না। এখন কথা হলো, মানব দেহে কোন আত্মা বাস করেনা। সব কিছু চলে মস্তিস্ক হতে। এখানে আত্মার কোন স্থান নাই। আত্মার অস্তিত্ব নাই বলেই পরকালেরও কোন অস্তিত্ব নাই। এখানে কেউ পরকালে যাবেনা। পরকালের নাম ভাঙ্গিয়ে মোল্লা পুরোহিতের মিথ্যাচারের অর্জিত অর্থ ও ক্ষমতা সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অবৈধ।

লেখক- জাকির হোসেন

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

35 − 27 =