বাঙালির অবদমিত যৌন কামলালসা

প্রকাশ্যে চুম্বন ও আলিঙ্গন করা যদি সংস্কৃতিবিরুদ্ধ হয়ে থাকে, তাহলে বুঝে নিতে হবে যে সে সংস্কৃতি মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা, প্রেম ও ভালোবাসাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদিও বাঙালি সংস্কৃতি কখনোই কট্টর প্রথায় লেপটে ছিল না; তবে, সংকীর্ণতা বাঙালির শিরায় শিরায় গেঁথে ছিল ও আছে। যা সময়ের সাথে সাথে বাঙালি সংস্কৃতিপ্রেমীর ছদ্মবেশে মৌলবাদীরা মরুভূমির সংস্কৃতিকে বাঙালি মুসলিম সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিত ও প্রমাণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে
সাহিত্য, ইতিহাস ও বাস্তবতার নিদর্শন প্রমাণ করে যে, বাঙালি সংস্কৃতিতে চুম্বন খুবই স্বাভাবিক এবং প্রেম ও আলিঙ্গনের ইতিহাস ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল জুড়ে আছে। প্রেমের অনুভূতি মানুষকে মানবিক করে তোলে এবং নিষেধ-নিষিদ্ধ ও ভীতি মানুষের মধ্যে অপরাধ ও অন্যায়ের জায়গা তৈরি করে। এই ভীতি, নিষিদ্ধ ও হিংসার ফলে প্রেমঘটিত অপ্রীতিকর ঘটনার সূত্রপাত হয়।
ঢাকাসহ গোটা দেশের চিত্রে- কপোত কপোতী বা প্রেমিকপ্রেমিকা বা নামহীন সম্পর্কের প্রকাশ্যে চুম্বনের ঘটনা অবাস্তব নয়। পথেঘাটে, রিকশায়, রেস্তোরায়, গাড়িতে, মাঠে-উদ্যানে প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসার আদান প্রদান ও প্রকাশ অনৈতিক বা অসভ্যতা নয়; বরং বাঁধা সৃষ্টিকারীরাই অশ্লীল ও শুদ্ধতার পরিবর্তে হিংসাত্মক কর্মকান্ডের পথ বেছে নেয়। মূলত, এ-সকল সংস্কৃতি উদ্ধারের দাবিদারেরা ধর্মের অজুহাতে এবং নিজেদের অবদমিত যৌন চাহিদার ক্ষোভে অন্যের চাহিদা পূরণের ঘটনা ও দৃশ্যকে মেনে নিতে পারে না। অধিকাংশক্ষেত্রে, এ-সকল সংস্কৃতি ও ধর্মউন্মাদেরাই ধর্ষকে পরিণত হয় এবং নারীদের যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন, ধর্ষণ ও অমানবিক নির্যাতন করে থাকে।
যতোদিন না পর্যন্ত নারীদের সম্মন্ধে পুরুষের মন মানসিকতা-ধ্যান ধারণা-চিন্তাধারার পরিবর্তন আসবে, ততোদিন পর্যন্ত ধর্ষণ বর্তমান হারেই চলবে। যতোদিন না পর্যন্ত মানুষ ধর্মের প্রভাব থেকে মুক্ত হবে, ততোদিন পর্যন্ত ধর্ষণের জন্য নারীকেই দায়ী করা হবে। পৃথিবীতে ধর্ষণ হচ্ছে দ্বিতীয় সেই অপরাধ; যেখানে অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করার পরিবর্তে বা অসামীরূপে চিহ্নিত করার পরিবর্তে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা হয়। অনুন্নত বিশ্বে, অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, ধর্মতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বসবাসরত সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষেরা ধর্ষণকে পুরুষের অধিকার মনে করে। এ সকল ব্যবস্থায় নারীকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক; একইসাথে মানসিক ও শারীরিকভাবে দূর্বল করে রাখা হয়, যাতে নারীরা লোকলজ্জায় ও আতংকে নিরবে যন্ত্রণা সহ্য করে যায়।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় যে, ধর্মের পাশাপাশি সংস্কৃতিও মাঝেমধ্যে নারীদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়; এক্ষেত্রে, প্রাচীন কুসংস্কারকে প্রাধান্য দিয়ে সমাজ দোষারোপের হাতিয়ারকে বেছে নিয়ে নারীকে চরিত্রহীন ও কলংকিনী হিসেবে উপস্থাপন করে। যে সকল সমাজে ধর্মের প্রভাব মাত্রাতিরিক্ত; যে সকল সমাজে নারী পুরুষের সমতা আকাশ পাতাল পার্থক্য, যার ফলে সে সকল সমাজে নারী মাংসের মূল্য চরম মাত্রায় এবং ধর্ষণের সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত। এ সকল সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ পুরুষের শারীরিক চাহিদা ও ধর্ষণের পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ। এ কারণেই সেক্স এডুকেশনের কথা শুনলেই অধিকাংশ পুরুষেরা প্রাচীন কুসংস্কার, যৌন বিকৃত, যৌন বিকারগ্রস্থ, অসুস্থ চিন্তাধারার প্রচার করে থাকে। অতএব,পৃথিবীতে যতোদিন পর্যন্ত একজন পুরুষ জীবিত থাকবে, ততোদিন পর্যন্ত নারীরা ধর্ষণের আতংক থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না
গত ৪৮ বছরের বাঙলার ইতিহাস যদি পর্যালোচনা করা হয়- তাহলে দেখা যাবে যে, সকল ধর্ষকেরা বিশ্বাসী মানুষ; কেউ দলীয় ক্ষমতার ভয়ভীতি দেখিয়ে, কেউ ধর্মের আফিমের ভীতি দেখিয়ে, কেউ শত্রুতাবশত, কেউ হিংসাবশত, কেউ উত্তেজনাবশত, কেউ পুরুষ হওয়ার সুফলে নিজের পুরুষত্ব প্রমাণে ধর্ষণ করেছে। যে সকল পুরুষেরা কট্টর চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে তাদের মধ্যে অমন অপরাধ সংগঠিত করার প্রবণতা অধিক।
অর্থাৎ কট্টর সংস্কৃতিপ্রেমী ও ধর্মপ্রেমী মূলত সমাজের জন্য ক্ষতিকর; যে ধর্ম নারীকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর বাইরে গেলেই কলঙ্কিনী, অসভ্য, চরিত্রহীন, বেশ্যা ভাবতে শেখায়, সে ধর্ম নারী পুরুষের স্বাভাবিক সম্পর্ক ও চাহিদাকে অস্বীকার করে। লিঙ্গ বের করে রাস্তায় প্রস্রাব করা, খালি গায়ে সবার সামনে বসে থাকা, অনুমতি ব্যতীত অন্যের শরীরে স্পর্শ করা, অশ্লীল শব্দে পরিবেশ দূষণ করাও যদি অসভ্যতা ও অশ্লীলতা না হয়ে থাকে, তাহলে ভালোবেসে প্রকাশ্যে চুম্বন বাঙালির সংস্কৃতি ও ধর্ম হোক
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 + = 31