আমি কেনো ধর্ষকের ফাঁসি চাই না

রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো প্রকার শাস্তি সেটা হোক আইনের মাধ্যমে ফাঁসি কিংবা বিচার বহির্ভূত খুন যাকে আমরা ক্রসফায়ার বলে জানি – এগুলো কোনোভাবেই সমাজকে, রাষ্ট্রকে শৃঙ্খলিত করতে পারে না। উপরন্তু রাষ্ট্রের ফ্যাসিজমকে শক্তপোক্তভাবে বেড়ে উঠতে, ডালপালা ছড়াতে সাহায্য করে।

আসলে আমাদের সমাজে ক্রিমিনাল সাইকোলজি নিয়ে আপনি মোটেও আলাপ করতে পারবেন না। কারণ এ সমাজে সে সুযোগ যেমন নেই তেমন এ দেশে কেউ এ সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞান রাখে না। ফলে এদেশের জনগণের মগজে ধর্ম যেভাবে আবেগীয়ভাবে গেঁথে গিয়েছে তেমনইভাবে অপরাধীর শাস্তি ফাঁসি কিংবা ক্রসফায়ার দিয়ে দাও বলে দিয়েই খালাস হয় কেবলমাত্র সেই আবেগের বশবর্তী হয়েই। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে আবেগের কোনো জায়গা নেই।

আজকে দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকায় ধর্ষণের হার সবচেয়ে বেশি। সে দেশে প্রতি ৮ মিনিটে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। ধর্ষণের প্রতিবাদে তারাও আন্দোলন করছে। সরকারের কাছে দাবী দাওয়া পেশ করছেন। কিন্তু আশ্চর্য হবেন এই ভেবে যে সে দাবীতে কোথাও ধর্ষকের ফাঁসি, ক্রসফায়ার করে মেরে ফেলার কথা নেই। ডয়েচ ভেলের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণ ধর্ষণ রোধে পরামর্শ কেন্দ্র খোলা, ধর্ষিতা নারীদের জন্য সহায়ক দপ্তর খোলা এবং কারাগারে ধর্ষকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবী জানিয়েছেন। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকায় ছেলেরা বাবার ছত্রছায়া ছাড়াই বেড়ে ওঠে। ফলে পুরুষ হিসেবে নিজেদের ভূমিকা কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে তাদের মনে তেমন কোনো ধারণা নেই। কারাগারে তাদের জন্য পুরুষ অভিভাবকের ব্যবস্থা করলে ভালো হয় বলে মনে করেন সে দেশের জনগণ।

একজন নারীকে যখন নির্মমভাবে ধর্ষণ করা হচ্ছে এবং একই সঙ্গে কখনো কখনো খুন করা হচ্ছে। তখন আমরা স্বাভাবিকভাবেই আবেগ তাড়িত হয়ে যাই। তখন রাগে, ক্ষোভে অনেক কথা বলি। ধর্ষকদের ফাঁসি চাই, ক্রসফায়ার চাই, লিঙ্গ কর্তন করা হোক বলেও দাবি করি। অনেকে তো মধ্যযুগীয় বর্বর সৌদী আরবের মত প্রকাশ্যে ধর্ষকের শিরচ্ছেদ করা হোক চায়। কিন্তু এটা কোনো আবেগের বিষয় নয়। এমনকি এর ফলে দাবি করা বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হলেই যে নারীরা ধর্ষিত হবে না এমনটা তো নয়-ই। বরং রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসে থাকা পান্ডাগুলো একের পর এক রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড চালিয়ে যাবে আইনের দোহাই দিয়ে। এখন আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন তাহলে ধর্ষণ রোধ করতে বা ধর্ষকদের শাস্তি দিতে কি করতে হবে? কি করতে হবে তা পরিষ্কারভাবে আপনাদের সামনেই রয়েছে। সমস্যা হলো আপনারা তা দেখছেন না কিংবা দেখলেও গোঁয়ার্তুমি করে সেগুলো মেনে নিতে চাইছেন না। সমাজের অনেক সচেতন মানুষই ধর্ষকদের শাস্তি ফাঁসির বিরোধীতা করে বিবৃতি দিয়েছেন। দেশের অধিকাংশ জনগণ সে বিবৃতির বিরোধীতা করেছেন। এবং এও বলছেন, ধর্ষকদের সঙ্গে মানবতা দেখানোর কোনো প্রয়োজনীয়তা বোধ করছেন না তারা। সে আপনি না-ই করতে পারেন। কিন্তু ধর্ষকের শাস্তি ফাঁসি এর সঙ্গে কেবল মাত্র মানবতা-ই জড়িত নয়। দেশ, সমাজ পুরো বিষয় জড়িয়ে। ফলে আপনি আবেগে, মানবতা দেখাবেন বলে দিয়ে ধর্ষকের ফাঁসি চেয়ে দিলেন তো রাষ্ট্রে আরো দশটি অপরাধকে প্রশ্রয় দিলেন। যে অপরাধগুলো সংগঠিত হবে রাষ্ট্র দ্বারা। কোনো অপরাধীই জন্মগতভাবে অপরাধী নয়। পরিবার, এ সমাজ কাঠামো, রাষ্ট্র কাঠামো ধীরে ধীরে অপরাধী তৈরী করে। প্রতিটা ধর্ষকই পরিবারের, সমাজের, রাষ্ট্রের তৈরী।

ফলে ধর্ষকদের ধরে ফাঁসি দিয়ে দিলে, ক্রসফায়ার করে দিলে, লিঙ্গ কেটে দিলেই সমস্যার সমাধান হলো না। বরং পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র কাঠামো, তার ব্যবস্থা যে জনগণকে মানবিকবোধ সম্পন্ন করে গড়ে তুলতে ব্যর্থ সে বিষয়টাকেই আড়াল করা হলো। ধর্ষকদের ফাঁসি, ক্রসফায়ারের বিরোধীতা আমি এ কারণেই করবো, ধর্ষক পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র তৈরী করেছে। তার অপরাধের দায় কেবল তার নয়। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রেরও। তাই ধর্ষকদের ফাঁসি দিয়ে, ক্রসফায়ার দাবি করে এবং সে দাবী রাষ্ট্র কর্তৃক আইনি স্বীকৃতি দিয়ে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সে দায় এড়াতে পারে না। তাই ফাঁসি, ক্রসফায়ার কোনো সমাধান নয়। ধরুন, আজকে ধর্ষকদের ধরে ফাঁসি দিয়ে দিলেন কিংবা ক্রসফায়ার করলেন অথবা লিঙ্গ কেটে দিলেন। কিন্তু যারা মগজে ধর্ষণের মানসিকতা নিয়ে বসে আছে, তাদের কি করবেন? এই যে দু দিন আগে অনন্ত জলিল এক ভিডিওতে ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাককেই দায়ী করলেন। এমন লক্ষ লক্ষ অনন্ত জলিল রয়েছে যারা প্রকাশ্যে নারীকে ধর্ষণ করে না। কিন্তু ধর্ষণের জন্য নারীই দায়ী কিংবা ধর্ষণের মানসিকতা পোষণ করে তাদের প্রতি আপনার দায়িত্ব কি? লক্ষ লক্ষ ধর্ষণের মানসিকতা পোষণকারীদের রেখে দু/তিনজন ধর্ষককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলেই সব হয়ে গেলো? গোড়ায় গলদ রেখে আপনি যতই ফাঁসি দাও, ক্রসফায়ার করো, লিঙ্গ কাটো বলে চিল্লান আর রাষ্ট্র সে চিল্লানিতে সাড়া দিয়ে, সব মেনে নিয়ে ফাঁসি দিয়ে দিলো, ক্রসফায়ার দিলো তাতে কোনো লাভ নাই। ‘সারা রাত পিটালাম সাপ সকালে উঠে দেখি দড়ি’র মত ঘটনা ছাড়া আর কিছুই ঘটবে না। ফলে পরিবার, সমাজের শিক্ষা ব্যবস্থা, অ্যাকাডেমিক পাঠ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন যেমন সমাজ থেকে ধর্ষণ সহ নানা অপরাধ রোধ করতে পারবে। সেই সঙ্গে ধর্ষকদের মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2