প্রগতিশীল, মুক্তমনাদের কি একাত্তর টিভির পক্ষে অবস্থান নেয়া উচিত?

ওয়াজ কিংবা নূরুকে কেন্দ্র করে যখন বাংলাদেশের অর্থাডক্স ধার্মিকরা একাত্তর টিভিকে বর্জনের উন্মাদনায় লিপ্ত। তখন আমি কোনো ভাবেই মানতে পারি না কেবল মাত্র ওয়াজ ও নূরুর নারী বিদ্বেষী মন্তব্যের কারনে এই চ্যানেলটিকে বয়কট করা উচিত। গতকাল থেকে এই একত্তার টিভি বয়কটের পক্ষে বিপক্ষে অনেক পোষ্ট পড়া হয়েছে এবং সবারই যুক্তি ওই নূরুর এবং ওয়াজের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু আমি এই দুটি ঘটনারই মূলে যেতে চাই। কোনো ঘটনাকে কেবল মাত্র খন্ডিত ভাবে বিবেচনা করাটা একটা ভুল সিধান্তের কারণ হতে পারে হয়তো, সেই ভাবনা থেকে দেখলাম একজন নূরু কিভাবে আজকের এই অবস্থানে আছে?

কোটা বিরোধী আন্দোলনের সময়ই গনমানুষের দাবীকে পূজি করে আন্দোলনে নামে এই নূরু ও তার প্যানেল সময়ের সাথে সাথে এন্টি ছাত্রলীগ একটি ইমেজ নিয়ে নিজস্ব ক্যাম্পাস ও বাংলাদেশের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নজরে আসেন তিনি। ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের মতো মধ্যরাতের নির্বাচন হওয়া সত্ত্বেও দেখা যায় নুরু ডাকসুর ভিপি পদে নির্বাচিত হয়ে গিয়েছেন। এখানে এতো অংক-কষার কিছু নেই, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে বিগত ১০ বছরের মধ্যে কোনো নির্বাচন, নিয়োগ, মেয়াদ কোনো কিছুই স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে পারছেনা। ক্ষোদ হাইকোর্টের রায়ও অনেক সময় স্বৈরতান্ত্রীক এই সরকারের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। সেই জায়গায় নূরুকে এই অবস্থানে এনে দাড়করানোর দায়টা আমি কার উপর দিবো? কিংবা যদি ধরেও নেই যে ঢাবি শিক্ষার্থীরা স্বতফূর্ত ভাবে, ফেয়ার ইলেকশনের মাধ্যমে ভোট দিয়েছে ডাকসু নির্বাচনে তাহলে প্রশ্ন কেন নুরুকে ভোট দিলো? নুরুর মতো অন্য একটি শক্তির দিকে কেন তরুণরা ভরসা করলো? এই সমীকরণটি আপতত থাকুক চলেন অন্য ইস্যুটি নিয়ে ভাবি।

৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশের সামরিক শক্তিগুলো ব্যাপক ভাবে এদেশে ইসলামাইজেশনকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে, সংবিধানে বিসমিল্লাহ্‌ শব্দ যুক্ত করা থেকে শুরু করে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল তৈরি করা ও সাম্রাজ্যবাদী সৌদিআরবের সাথে নীবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ করেছে ওই সামরিক শাসকরা। তাদের লক্ষ্য একটিই ছিলো, ধর্মী সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে, দেশের মানুষের কাছে তাদের একটি গ্রহনযোগ্যতা তৈরি করা। সেই থেকে শুরু, লেজেহুমু এরশাদ এই ইসলামাইজেশনের সবচাইতে বেশি সুবিধা ভোগ করেছে, যে ক্ষমতাকে বাংলাদেশিরা রাজনৈতিক ভাবে বিবেচনা করতো, তাকে ধর্ম দিয়ে বিবেচনার রাস্তায় নিয়ে এসেছিলো তারাই। পরবর্তীতে, আওয়ামীলীগ ও বিএনপি সেই রাস্তায় হাটলো বারবার। ধর্মভিত্তিক শক্তিগুলো কে তারা তাদের ক্ষমতা যাবার একটি উপাদান হিসেবে বারবার ব্যবহার করেছে। আমরা যদি দেখি ১৯৯৬ তে বিএনপির ভূয়া ইলেকশনে বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে নামানোর আন্দোলন তবে দেখবো, আওয়ামী লীগের চিরোশত্রু হিসেবে বিবেচিত জামাতকে সাথে নিয়ে একমঞ্চে আওয়ামী লীগ আন্দোলন করেছে। সেই সূত্র ধরে ২০০১ সালের নির্বাচনে সেই জামাতকে সাথে নিয়ে নির্বাচন করেই আওয়ামীলীগ সরকারকে ক্ষমতা হতে হটিয়েছে বিএনপি।

২০০৮ সালের সেনাবাহিনীর দেয়া নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে আওয়ামী লীগকে বেশি কাঠখড় পড়াতে হয়নি, ভারতীয় আর্শীবাদি হস্ত এবং বিএনপির দূর্নীতির প্রতি দেশের মানুষের তীব্র ঘৃণারকারনে আওয়ামী লীগ প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর কাধে ভর করে ক্ষমতায় চলে আসলো। কিন্তু এসে যখন তারা আর ক্ষমতা না ছাড়ার সিধান্ত নিলো, সেই সিধান্তকে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে, আওয়ামী লীগ সরকারও ও সামরিক শাসকদের নীতি অনুসরণ করতে শুরু করলো। ৮০-দশকে লেজেহুমু এরশাদের সমর্থনে গড়ে ওঠা ছাত্র সংগঠনটি যেমন ভাবে অস্ত্রে, সরকারী সুরক্ষা, আর সাধারণ ছাত্রদের উপর নির্যতনে বলীয়ান হয়ে উঠেছিলো, একই আদলে ছাত্রলীগ ও ২০০৮ সাথে বলীয়ান হয়ে উঠে। এমন আরো কর্মকান্ডের মধ্যে অন্যতম হলো ধর্মভিত্তিক শক্তিগুলোর সাথে সমঝোতা করা ও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা।

এটি এখন আর লুকানোর কোনো ব্যাপার নয়, হেফাজতে ইসলাম থেকে শুরু করে, বিএনপি ঘারানার যেসকল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল ছিলো তাদেরও আওয়ামীলীগ নিজেদের মধ্যে নিয়ে নিয়েছে। ওলামা লীগ নামে একটি সহযোগী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছে আওয়ামীলীগ ২০০৮ সালে পরে। দেশে প্রচন্ড ভাবে ওহাবীজম ও সালাফিজমকে প্রচারের সুযোগ তৈরি করেছে জামাত তথা কওমী ধারাকে কোনঠাসা করার জন্য। আজকের এইসকল ওয়াজকে বর্তমান সরকারই পৃষ্ঠপোষকতা করে বর্তমান পরিস্থিতিতে নিয়ে এসেছে।

এবার আবার নূরের সমকরণে ফিরে যাই, একটি প্রশ্ন রেখে এসেছিলাম “নুরুর মতো অন্য একটি শক্তির দিকে কেন তরুণরা ভরসা করলো? ” এই প্রশ্নের উত্তর আমি দেয়ার চাইতে, আপনারা ভাবলেই ভালো, তবে আশংকার কথা হলো সামনের জাতীয় নির্বাচনে যদি দেশের মানুষ বিএনপির মতো নিশ্চিহ্ন একটি সংগঠনকে ভোট দিতে না চায়, যদি আওয়ামী লীগের এই স্বৈরাচারী সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চায়, তবে ভোটটা তারা কাকে দিবে? আচ্ছা এমন কি হতে পারে ভোট তারা নুরুর মতো যারা তাদর দিয়ে দিবে? আর এই একাত্তর টিভি বর্জনের রাজনৈতি পরিষ্কার ভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে এই ধর্মভিত্তি অর্থাডক্স রাজনৈতিক শক্তি আর নুরু একই সুতোয় গাথা, ইলেকশন বা সিলেকশন ভবিষ্যতে যাইহোক, একটি অর্থডক্স রিলেজিয়াম পার্টি ক্ষমতায় আসার একটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে বলে একাত্তরের ঘটনা আমাকে এলার্ম দিচ্ছি। তাহলে এই ক্ষেত্রটি তৈরি করলো কারা? আমি যদি আওয়ামী দুঃশাসনের গল্প বাদও দেই, তাও এইসকল ধর্মীশক্তিকে পেলেপুষে বড় করেছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলগুলোই।

আর এই ক্ষমতাসীন দলগুলোকে অপকৌশলে ক্ষমতায় ধরে রাখতে, একটি গনতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে দিনের পর দিন যেসকল মিডিয়া ইয়োলো জার্নালিজম করে গেছেন, তার মধ্যে একাত্তর টিভির নাম সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকবে। নানা সময়ে নানা খবর অপ্রয়োজনী ভাবে প্রচার করে সরকারকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখার কাজটি সুকৌশলে করেছে এই চ্যানেলটি। দুই নেত্রী ফোনালাপ ফাস করা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের নামমাত্র গনতান্ত্রিক রাজনৈতির ক্ষেত্রকে ঘোলা করে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর ইলেকশনকে সফল ইলেকশন হিসেবে ঘোষনা দেয়া চ্যানেল এই একাত্তর টিভি। একটা জোকস মনে পড়লো ৫ জানুয়ারী সকালে একাত্তর টিভির রিপোর্টার একদল নারীকে ক্যামেরার মধ্যে এনে বলতেছিলো “দর্শক আপনারা দেখতে পাচ্ছে উনারা সবাই ভোট দিয়ে আসছে”, তো ওই নারীদলের এক সদস্যকে সে ইন্টারভিউ করতে সামনে গেলে মহিলা বলে “আমরা তো ভোট দিতে যাই না, আমরা গার্মেন্টেসে যাই”।

আমরা যদি নুরুকে আলাদা করে দেখি, ওয়াজকে আলাদা করে দেখি তবে একাত্তর টিভি বর্জন করাই আমার জন্য সঠিক সিধান্ত, কিন্তু এই লেখাতে উল্লেখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করতে গেলে আমরা দেখতে পাবো এই নুরু, ওয়াজ, কট্টোর মোল্লাদের উত্থান, প্রগতিশীল লেখকদের নিধন এইগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এই সরকার, আর এই সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে নিরলস হলুদ সাংবাদিকতা করে যাচ্ছে এই “একাত্তর টিভি”। আর আমি এই একাত্তর টিভি অনেক আগেই অবিশ্বাস করতে শুরু করেছি, বয়কট শব্দটা ঠিক না, কিন্তু তাদের কাছে পাওয়া তথ্যকে আমি বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হয়। কারন এদের এজেন্ডা আছে স্বৈরতন্ত্রকে দীর্ঘ সময় টিকিয়ে রাখার।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

54 − 46 =