বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বেহাল অবস্থা ও ভবিতব্য

করোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর, ১৬ই অক্টোবর থেকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাগৃহসমূহ খুলতে শুরু করেছে৷ এটা একদিক থেকে হল মালিক ও চলচিত্রের সাথে সংশ্লিষ্টদের জন্য বেশ সুসংবাদ। একইদিনে মুক্তি পেয়েছে হিরো আলম অভিনীত “সাহসী হিরো আলম” নামের একটি সিনেমা। এই সিনেমা প্রসঙ্গে প্রথম আলো পত্রিকার একটি শিরোনাম দেখে, বহুদিনের লুকায়িত লজ্জা আর চেপে রাখতে পারলাম না। প্রথম আলোর শিরোনামটি ছিল “হিরো আলমকে দেখতে সিনেমা হলের বাইরে ভিড়, ভেতরে খালি”। বিস্তারিত পড়ে জানতে পারলাম, হিরো আলমকে দেখতে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে উৎসুক জনতার ভিড় থাকলেও হলের ভেতরের চিত্র ছিল একদমই আলাদা। ছিলনা কোনো দর্শক এবং প্রেক্ষাগৃহের সংশ্লিষ্টরা হতাশ ও বিমর্ষ! প্রেক্ষাগৃহের দূর্বিষহ অবস্থা ও চলচিত্রের এই নির্মম হাস্যকর পরিণতি আবারও এই সাক্ষ্যই দেয় ; এই মাঠে টিকে থাকতে হলে ট্যালেন্ট ও ব্রিলিয়ান্ট কাজের বিকল্প কোনোভাবেই নেই। যদিও বাংলাদেশের চলচিত্রের এই পরিণতির জন্য আরো বহুবিধ কারণকে স্বাভাবিকভাবেই যৌক্তিক মনে হতে পারে।

তবে এই মূহুর্তে কেনো যেনো অতীত হাতড়াতে ভীষণ ইচ্ছে করছে। সেই অতীতে এদেশের চলচ্চিত্র কেবল একজন মেধা ও প্রতিভার ওপরই নির্ভার হয়ে চলেনি। আমাদের যেমন বহু ভালো গল্পকার ছিল, ছিল চিত্রনাট্যকার, পরিচালক, সুরকার ও আর্টিস্ট। যাঁদের সৃষ্ট স্রোতের অনুকূলেই শেষ কুশীলব পর্যন্ত নিবেদিত প্রাণে চিত্রায়িত হত প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে দেখার মত কিছুর। মূল ধারার চলচ্চিত্র বেদের মেয়ে জোসনা কিংবা হিন্দি রিমেক কেয়ামত থেকে কেয়ামত এদেশের সর্বাধিক ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র হলেও, আমাদের ছিল আগুনের পরশমণি উপন্যাসকে পর্দায় স্বমহিমায় তুলে ধরার মত স্পেশালিষ্ট ও বোদ্ধা৷ চলচ্চিত্র কার কথা বলে, কাদের কথা বলে বা কেনো বলে? এই প্রশ্নে বিতর্ক থাকলেও, একটি বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই চলচ্চিত্রের সাথে জড়িয়ে থাকে সাংস্কৃতিক সমস্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ। অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে ব্যাপারটা হল এই চলচিত্র যে সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠে, সেই সংস্কৃতিরই প্রতিনিধিত্ব করে। রাবেয়া আপা, মায়ের মৃত্যুর পর পরম মমতায় মায়ের মতো করে তার পাঁচ ভাই বোনকে আগলে রাখেন। রান্না, খাওয়া থেকে শুরু করে বাসার ছোট থেকে ছোট ব্যাপারগুলোতে তার তীক্ষ্ণ খেয়াল। বড় বোন যে মায়েরই ছায়া তা রাবেয়া আপাকে দেখলেই বোঝা যায়। বাড়ির বড় ছেলে খোকা। কলেজে ছাত্র পড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে বাড়ি ফিরলে সবাই সবার যতরকম সমস্যা আছে তা নিয়ে বসে পরে খোকা ভাইকে শোনাবে বলে। খুব চুপচাপ আর লাজুক বলে কখনো নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারেনি। মা মারা যাবার সময়ও বলতে পারেনি মাকে কেমন ভালোবাসতো। খালাতো বোন কিটকিকেও সাহস করে বলতে পারেনি ভালোবাসি। ওরই বোন রুনুকে দেখতে এসে পাত্রপক্ষ তার আরেক বোন ঝুনুকে পছন্দ করে ফেলে। একসময় বিয়েও হয়ে যায় ঝুনুর। কাউকে কিছুই বলেনা রুনু্। কষ্ট মনে পুষতে থাকা রুনু একসময় পাগলের মতো হয়ে যায়, সারাক্ষণ হাসে, হঠাৎ কাঁদে। পরিণতিটা হয় করুণ। তারপর ছোট দুটা ভাই-বোন মন্টু আর নিনু। মন্টুও একসময় বড় হয়ে পত্রিকা অফিসের সহ-সম্পাদক হয়। বেশ ভালো বেতন, নামী ব্যাক্তি সে। অনেকেই তার কাছে আসে। নিনুকে জন্ম দিতে গিয়েই তাঁদের মা শিরিন সুলতানা মারা গিয়েছিলেন। খুব বড় ঘরের মেয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু কিভাবে যেন আজহার হোসেন নামের গরীব সিধেসাধা মানুষটির সাথে বিয়ে হয়ে যায় তার, তারপর তেইশ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন স্বামীর সাথে। একটিবারের জন্যও নিজেদের প্রকান্ড বাড়িটায় আর যাননি। তেইশ বছর পর আবার নিজের বাড়ি গেলেন মৃত্যুর পর। শঙ্খনীল কারাগারের কথা বলছিলাম। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালির এই যে ছড়ানো ছেটানো মূহুর্ত, আবেগ, হাসি কান্নার সাদমাটা জীবন ও অনুভূতিগুলো চিত্রায়ণ করার মত সুদক্ষ ও সুনিপুণ কারিগর বাংলাদেশে যে ছিল, এই অতীতই আজ রূপকথার মত মনে হয়। তবে এখান থেকে এই বার্তাও পাওয়া যায়, ভালো গল্প থেকে ভালো সিনেমা তৈরির সৃষ্টিতত্ত্ব অসম্ভব কিছু নয়।

কে ভেবেছিল আমাদের চলচ্চিত্রকে হাস্যকর হিরো আলম বা ইত্যাদি ইত্যাদির কালো মেঘ এইভাবে আবৃত করে রাখবে, যেখানে একবিন্দু অক্সিজেন যেনো অলৌকিক আর অতিরঞ্জিত স্বপ্ন? বাস্তবতা এও বলে হিরো আলমরাই শুধু নয়, আরো বিভিন্ন কারণ চলচিত্রের এই বেহাল পরিণতির জন্য দায়ি। আগেই বলেছি মেধা, শিল্প, চলচিত্র সম্বন্ধীয় জ্ঞান – ট্যালেন্টের অভাব, সরকারী সহযোগিতা না থাকা, পরিবেশহীন প্রেক্ষাগৃহ, ও শিল্পী রাজনীতির ফলে সৃষ্ট কাঁদা ছোঁড়াছুড়ির কারণগুলো এই পরিণতির জন্য কমন হলেও, বাঙালির সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আবহে বাংলাদেশ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এই কারণকেও এড়িয়ে যাওয়া যায়না। চলচিত্রের এই দূর্দশা সম্পর্কে চ্যানেল আই অনলাইনে চলচিত্র নির্মাতা কাজী হায়াৎ তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ; ” একটা কথা বলি, মনে কিছু করিয়েন না। এ দেশের শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান। এখানে সিনেমা শিল্প ছিলো এটাইতো অবাক বিস্ময়ের ব্যাপার। এদেশে হিজাব পরা লোক অনেক বেশি। এখন ধর্মীয় আনুগত্যটাও অনেক বেশি। সিনেমা দেখাকে অনেকে পাপ মনে করে। তো যে দেশে সিনেমা দেখাকে মানুষ পাপ মনে করে সেখানে হল ভর্তি দর্শক কীভাবে আশা করি! এটা হলো প্রথম ও প্রধান কারণ।” আপনি বললেন সিনেমা দেখাকে মানুষ পাপ মনে করে বলেই এখন মানুষ সিনেমা দেখে না। আসলেই কি তাই? সিনেমার স্বর্ণযুগ বলা হয় আপনাদের সময়টাকে। সেসময়তো নাকি মানুষে হলভর্তি থাকতো। তখন কি ধর্ম ছিলো না মানুষের?  প্রশ্নকর্তার এমন প্রশ্নের উত্তরে মি. হায়াৎ বলেন ,
“ধর্ম ছিলো, কিন্তু ধর্মীয় আনুগত্যটা এতো বেশি ছিলো না। এবং সোশাল সিকিউরিটি ছিলো মানুষের। এখন মানুষের সোশাল সিকিউরিটিও নাই। আর মানুষ যখন ইনসিকিউরিটিতে ভুগে তখন মানুষের ধর্মীয় আনুগত্যটা বেড়ে যায়। আমার কথাগুলো অন্যভাবে নিবেন না, আমি খুব স্পষ্টবাদী একজন মানুষ।”
কাজী হায়াৎ এর এই কথাগুলো অবান্তর মনে হতে পারে, তবে বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটাও বাস্তব ও চলচিত্রের অনগ্রসরতার জন্য অনন্য একটি কারণ।
.
এতগুলো সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প কিভাবে অগ্রসর হয়ে একটি আদর্শ ও সমৃদ্ধ চলচিত্র প্লাটফর্মে উপনীত হবে, অপ্রিয় সত্য হল এই ; কোনো ভবিষ্যৎ অন্তত বর্তমান নেই। কিছুদিন সিনেমার মাঝেই অশ্লীল দৃশ্য সংযোজন করে এই শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা ভেবেছিল অসৎ উপায়ে সহজে হয়তো কিছু উপার্জন এবার করা যাবে। তাও ধোপে টিকলনা আর সিনেমা ডুবে গেলো আরো তলানীতে। সাফটা চুক্তির প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে সালমান খান অভিনীত হিন্দি চলচ্চিত্র ওয়ান্টেড বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে মুক্তির পর আমাদের চলচিত্রের সাথে সংশ্লিষ্টরা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও, নিজেদের ব্যর্থতার বিপক্ষে গিয়ে উন্নত সংকল্পে এদেশের চলচ্চিত্রকে তাঁর হারানো অবস্থান আজো ফিরিয়ে দিতে পারেনি। সত্যি আফসোস হয়। তুলনা চলেনা তবু তর্কের খাতিরে বলি আমাদের হয়তো বলিউডের মত একটি সমৃদ্ধ ও সুবৃহৎ চলচ্চিত্র প্লাটফর্ম নেই, স্পন্সর নেই এবং অগণিত প্রেক্ষাগৃহ নেই। কিন্তু আমাদের তো মেধার অভাব ছিলনা, মানসম্মত কাহিনী ও সংলাপ তৈরি, অভিনয়ে স্কিলসম্পন্ন প্রতিভারও অভাব ছিলনা। একটা সময় পশ্চিমবঙ্গের মানুষও আমাদের সিনেমায় মুগ্ধ ছিলেন, আমাদের এখনও ট্যালেন্ট সুরকার এবং এই শিল্পে বিনিয়োগ করার মত মানুষও আছেন, সর্বপরি এদেশের বহু মানুষ এই শিল্পের কাছে এখনও আশাকরে এও বা কম কিসের! চলচ্চিত্রের এই বেহাল অবস্থাকে এখনই রিপেয়ার করতে না পারলে, বলাইবাহুল্য এই শিল্পের কোনো অস্তিত্ব এতটুকু অবশিষ্ট থাকবেনা। সুকুমারী, মুখ ও মুখোশ, ছুটির ঘন্টা, পদ্মা নদীর মাঝি বা চাঁপা ডাঙার বৌ – এর মত বাংলা কিংবা ঢাকাই চলচিত্র অতীতে যাঁরা গড়ে গিয়েছিলেন তাঁদের জন্যও কি চলচিত্রের সাথে সংশ্লিষ্টদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই! আমরা কেনো তাঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হই না?
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 8 =