দুর্গাপূজা ও বাংলার দুর্গাপূজার ইতিবৃত্ত

বাল্মীকি রামায়ণে দুর্গাপুজার কোনো অস্থিত্ব একদমই নেই। বনবাসের আগে বা পরে কখনও রাম অযোদ্ধায় দুর্গাপুজো করেছেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়না। এমনকি ” অকালবোধন ” শব্দটির সমগ্র বাল্মিকী রামায়ণ জুড়ে কোনো উপস্থিতি নেই। তাহলে এই ” অকাল বোধন ” কিংবা রাম কর্তৃক দেবী দূর্গা পুজার প্রচলন কোন গ্রন্থে বিদ্যমান এই প্রশ্নটি স্বভাবতই সামনে আসা সমীচীন। কিন্তু তার আগে জেনে রাখা ভালো অকালবোধন কিংবা বাঙালির দূর্গা পূজার এই বহুল চর্চিত কনসেপ্ট আসলে ঘোরতর শাক্ত ও বৈষ্ণব কেন্দ্রীক। মূল সংস্কৃত রামায়ণে না হলেও কৃত্তিবাসী রামায়ণ বা শ্রীরাম পাঁচালীতে দূর্গাপূজার অস্থিত্ব পাওয়া যায়। তবে তারও আগে পুরাণে দুর্গাপুজা ও অকালবোধন সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুসারে, রাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গাকে পূজা করা হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময়টি তাদের পূজা যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে তাই এই পূজার নাম হয় “অকালবোধন”। এই দুই পুরাণ অনুসারে, রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। কবি কৃত্তিবাস ওঝা সংস্কৃত রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করাকালীন সময়ে মূল রামায়ণের বাইরে তৎকালীন বাঙালির প্রচলিত সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইত্যাদি উপাদানসমূহ এই রামায়ণকে অতিরঞ্জিত করতেই সংযোজন করেন। আরো পরিস্কারভাবে বললে ; সংস্কৃত রামায়ণকে তিনি এমনভাবে বাংলাকরণ করেন, স্বাভাবিকভাবেই যেকেউ নিশ্চিত হবে ইহাই রামায়ণের প্রকৃত গল্প এবং অর্থ। প্রকারান্তরে বরং ইহাই বড় রকমের ভুল। বাঙালি হিন্দু আবহে কৃত্তিবাসী রামায়ন তুখোড় জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও, মূল বাল্মীকি রামায়ণের সাথে এই রামায়ণের বহু দূরবর্তী পার্থক্য বিদ্যমান। কৃত্তিবাসী রামায়নে রামচন্দ্র অবতার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যিনি ভক্তদের নিকট একইসাথে পুজিত ও উপাসনার প্রতীক। কিন্তু বাল্মিকী রামায়নে রামের উপস্থিতি মনুষ্যরূপ ও শক্তিতে পাওয়া যায়। যিনি পুরুষোত্তম হলেও, নিদেনপক্ষে দেবতা নন।

 

হিন্দু পৌরাণিক উপাখ্যানে দুর্গাপুজা ও শাক্ত ধর্মে দেবী অর্চনার অস্তিত্ব :

  • ১. আগেই বলেছি, দূর্গা পূজা কিংবা হিন্দুদের দেবী অর্চনার এই যে বহুল চর্চিত কনসেপ্ট তা ঘোরতর বৈষ্ণব ও শাক্ত সম্প্রদায় কেন্দ্রীক। শাক্ত বিশ্বাসে, সর্বোচ্চ পরম দৈবসত্ত্বা হলেন দেবী। দেবীই সমগ্র সৃষ্টির উৎস ও স্বরূপ এবং জীবের শক্তির চালিকা। শাক্ত বিশ্বাস ব্যতীত সমগ্র বিশ্বের ধর্মীয় ইতিহাসের অন্যকোথাও এমন নারীতান্ত্রিক সিস্টেম পরিলক্ষিত হয়না। এও উল্লেখ্য শাক্ত মতবাদে নারীসত্ত্বায় দৈবশক্তি কেন্দ্রীভূত হলেও, তা পুরুষ বা জড় দৈবসত্ত্বাকে অস্বীকার করে না। ভক্তদের কাছে প্রাণহীন শিবের দেহের উপর দণ্ডায়মান দেবী কালীর বহুল জনপ্রিয় মূর্তিটি এই তত্ত্বেরই মূর্তরূপ। এই শাক্তদেরই অন্যতম পুরাণ “দেবীভাগবতে” ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু পৃথিবীর শাসক হয়ে ক্ষীরোদসাগরের তীরে দুর্গার মাটির মূর্তি তৈরি করে পূজা করেন। এই সময় তিনি “বাগ্‌ভব” বীজ জপ করতেন এবং আহার ও শ্বাস গ্রহণ ত্যাগ করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে একশো বছর ধরে ঘোর তপস্যা করেন। এর ফলে তিনি শীর্ণ হয়ে পড়লেও, কাম ও ক্রোধ জয় করতে সক্ষম হন এবং দুর্গানাম চিন্তা করতে করতে সমাধির প্রভাবে স্থাবরে পরিণত হন। তখন দুর্গা প্রীত হয়ে তাকে বর দিতে আসেন। মনু তখন দেবতাদেরও দুর্লভ একটি বর চাইলেন। দুর্গা সেই প্রার্থনা রক্ষা করেন। সেই সঙ্গে দুর্গা তার রাজ্যশাসনের পথ নিষ্কণ্টক করেন এবং মনুকে পুত্রলাভের বরও দেন। একই পুরাণে দেবী ঘোষণা করেন: “আমিই প্রত্যক্ষ দৈবসত্ত্বা, অপ্রত্যক্ষ দৈবসত্ত্বা, এবং তুরীয় দৈবসত্ত্বা। আমি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব; আবার আমিই সরস্বতী, লক্ষ্মী ও পার্বতী। আমি সূর্য, আমি নক্ষত্ররাজি, আবার আমিই চন্দ্র। আমিই সকল পশু ও পাখি। আবার আমি জাতিহীন, এমনকি তস্করও। আমি ভয়াল কর্মকারী হীন ব্যক্তি; আবার আমিই মহৎ কার্যকারী মহামানব। আমি নারী, আমি পুরুষ, আমিই জড়।”
শায়িত শিবের ওপরে দণ্ডায়মান মা কালি
  • ২. বাল্মিকী রামায়ণের সাথে কৃত্তিবাসী রামায়ণ কিংবা শ্রীরাম পাঁচালীর বৈসাদৃশ্য থাকলেও হিন্দু পৌরাণিক উপাখ্যানসমূহে দূর্গা পূজার প্রচলন ও অস্তিত্ব নিয়ে কোনো মতভেদ নেই। যেমন “ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে” সৃষ্টির প্রথমদিকে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ বৈকুণ্ঠের আদি বৃন্দাবনের মহারাসমণ্ডলে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। এরপর মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরের ভয়ে ব্রহ্মা দ্বিতীয় দুর্গাপূজা করেছিলেন। ত্রিপুর নামে এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধে শিব বিপদে পতিত হন ফলে তিনি তৃতীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্র যে পূজার আয়োজন করেছিলেন, সেটি ছিল চতুর্থ দুর্গাপূজা।

 

বাংলায় দূর্গাপূজা প্রচলনের ইতিহাস :

বাংলায় দুর্গাপূজার প্রথম সূচনা ও প্রচলনের ইতিহাস সম্পর্কে বিতর্ক আছে। তবে বাংলার বিভিন্ন রাজা ও জমিদারদের হাত ধরেই বাংলায় দূর্গা পুজার প্রচলন হয়েছিল সেইসাথে বাংলায় দুর্গাপূজার প্রচলন যে কৃত্তিবাসী রামায়ণ থেকে উদ্দীপণা নেয়া এই বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। যেহেতু কৃত্তিবাসী রামায়ণেই দুর্গা পুজার অস্তিত্ব ও বাঙালী হিন্দু সমাজে এর প্রভাবই অনুমেয়। দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এগুতে গেলে আলোচনা করতে হয় তাহেরপুরের দুর্গাপুজোর কথা (বর্তমান বাংলাদেশ) কথিত আছে ১৪৮০ সালে বাংলার অন্যতম রাজা রাজশাহীর কংস নারায়ণ তাহেরপুরের তাহের খানকে যুদ্ধে পরাজিত করার পর, যুদ্ধজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে রাজ পুরোহিত রমেশ শাস্ত্রীর পরামর্শে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। তাঁর আহ্বানে মা দুর্গা স্বর্গ থেকে সাধারণ্যে আবির্ভূত হন। সেই সময় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে কংস নারায়ণ প্রথম যে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন, সেই প্রতিমা ছিল সোনার তৈরি। তার আয়োজনে ১৪৮০ খ্রিস্টাব্দের বাংলা আশ্বিন মাসে মহাষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বোধন হয় রাজপ্রাসাদের আঙিনায় (বর্তমানে তাহেরপুর কলেজ মাঠ)। পূজামণ্ডপ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় সেই সময় থেকেই। প্রথমবারের পূজার আনুষ্ঠানিকতা ছিল বিপুল। সোয়া ৫০০ বছর আগের ওই উৎসবে খরচ হয়েছিল প্রায় ৯ লক্ষ টাকা। পরে তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাদুরিয়ার (রাজশাহী) রাজা জয় জগৎ নারায়ণ প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয় করে বাসন্তী দুর্গোৎসব করেন। দুর্গাদেবীর প্রতিমা গড়েছিলেন ওই পূজার পুরোহিত রাজপণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রী। কংস নারায়নের প্রথম দুর্গা পূজাটি হয়েছিল রাজবাড়ি সংলগ্ন প্রধান ফটকের পাশেই একটি বেদীতে। দেবী দুর্গার সমস্ত গহনা করা হয়েছিল স্বর্ণ ও মনিমুক্তা দিয়ে। এর পাশেই তিনি নির্মাণ করেন প্রথম দুর্গা মন্দির। রাজপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ওই মন্দিরে দুর্গাপুজা হত। দেশ বিদেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসতেন পূজায় অংশ নিতে। রাজপ্রথা বিলুপ্ত হলে রাজার বংশধররা ভারতে চলে যান। ১৯৬৭ সালে রাজা কংস নারায়নের রাজবাড়িসহ সব জমি লিজ নিয়ে সেখানে গড়ে তোলা হয় তাহেরপুর ডিগ্রি কলেজ। এরপর থেকে মন্দিরটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১৩ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মন্দিরটি খুলে দিতে বাধ্য হন কলেজ কর্তৃপক্ষ।

একটি বিষয় এখানে বলা প্রয়োজন কংস নারায়ণের সময় কৃত্তিবাস পণ্ডিতের আবির্ভাব হয়। তিনি ১৪৩৩ শকে নদীয়া জেলার ফুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রাজপণ্ডিত হবার জন্য কংস নারায়ণের রাজসভায় গিয়েছিলেন। শোনা যায় যে কংস নারায়ণের অনুরোধে কৃত্তিবাস বাংলায় রামায়ণ লিখেছিলেন । কৃত্তিবাস ১৪৬০ শকে রামায়ণ লেখেন। কৃত্তিবাস ওঝার জন্মকাল নিয়ে অনেক মত আছে| তবে সাধারণভাবে তাঁকে পঞ্চদশ শতকের কবি বলে মেনে নেওয়া হয়েছে| তিনি ছিলেন পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া জেলার নবদ্বীপের অন্তর্গত ফুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা| তিনিই প্রথম বাংলায় লেখেন ‘শ্রীরাম-পাঁচালী’, যা আজ বাংলা ভাষায় ‘রামায়ন’ নামে পরিচিত| বইটি শত শত বছর ধরে বাংলার মানুষের কাছে সমাদর পেয়ে আসছে।

তাহেরপুর রাজবাড়ীর ধ্বংসস্তুপের ছবি

পরিশেষে, এটা বলা যায় দূর্গাপুজার কনসেপ্ট মূলত পুরাণ কেন্দ্রীক হলেও বাংলায় দুর্গাপুজার কনসেপ্ট ততোটা পুরাণ কেন্দ্রীক নয়। বাংলার দুর্গাপুজার কনসেপ্ট গড়ে উঠেছিল মূলত কৃত্তিবাসী রামায়ণকে ঘিরে, যেখানে মূল সংস্কৃত বাল্মিকী রামায়ণে এই কনসেপ্ট পুরোপুরিভাবে অনুপস্থিত। একইসাথে বাংলার দুর্গাপূজার প্রচলন হয় এখানকার হিন্দু রাজা ও জমিদারদের কল্যাণে, যাঁরা কৃত্তিবাসী রামায়ণ বা শ্রীরাম পাঁচালীকেই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন।

.

.

সহায়ক গ্রন্থ :
১। বাল্মিকী রামায়ণ, হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য।
২। কৃত্তিবাসী রামায়ণ।
৩। রামায়ণ: কৃত্তিবাস বিরচিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা।
৪। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

41 − 32 =