ফ্রান্সে ক্লাসে কার্টুন দেখানো বাক-স্বাধীনতা বিষয়ে পাঠদানের অংশ | তাসনীম খলিল

তাসনীম খলিল : স্যামুয়েল প্যাটি প্যারিসের উপকণ্ঠে একটি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ইতিহাস, ভূগোল আর সমাজবিজ্ঞান পড়াতেন — তার একটি ক্লাসের টপিক ছিলো বাক-স্বাধীনতা। আমরা জানি যে বাক-স্বাধীনতা নিয়ে বর্তমানে ইউরোপে যে আলোচনা, বিতর্ক চলছে তার একটি বড় অংশই মুসলমানদের নবী মুহাম্মদকে নিয়ে আঁকা কার্টুন/ব্যঙ্গচিত্রগুলোকে ঘিরে। এখন একজন ফরাসী শিক্ষক তার ক্লাসে বাক-স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার সময় ক্লাসরুমের ভিতরে কার্টুন/ব্যঙ্গচিত্রগুলো তার স্টুডেন্টদের দেখাতে চাইতেই পারেন, বিশেষ করে যেখানে ঠিক এই কার্টুন/ব্যঙ্গচিত্রগুলো ছাপার কারণে শার্লি এবদো পত্রিকার অফিসে জিহাদী হামলা হয়েছিলো, পত্রিকাটির সম্পাদকদের খুন করা হয়েছিলো। উপরন্তু প্যাটি ক্লাসে কার্টুনগুলো দেখানোর আগে ক্লাসের মুসলমান ছাত্রদের অপশনও দিয়েছিলেন যে তারা চাইলে ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে যেতে পারে, যাতে কার্টুনগুলো দেখে তাদের ধর্মীয় অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। এইখানে বলে রাখা ভাল, ফ্রান্সের বিভিন্ন স্কুলে বাক-স্বাধীনতা বিষয়ে আলোচনার সময় মুহাম্মদ, ম্যাঁক্র বা ট্রাম্পের ব্যঙ্গচিত্র দেখানো খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা।

আরেকটি ব্যাপার হলো যে, শার্লি এবদোর বিরুদ্ধে ২০০৭ সালে যে মামলা হয়েছিলো সেই মামলাটির রায় অনুযায়ী শার্লির ছাপা কার্টুনগুলো ফরাসী হেট স্পিচ ল ভঙ্গ করেনি কারণ কার্টুনগুলো আঁকা হয়েছিলো “মৌলবাদী মুসলমানদের” ব্যাঙ্গ করে, সমগ্র মুসলমান সমাজকে আঘাত করার জন্য নয়। বিপরীতে বিখ্যাত ফরাসী ফিল্মস্টার ব্রিজেত বার্দোর কথা এখানে বলা যায় — সমগ্র মুসলমান সমাজকে আঘাত করে ঘৃণাসূচক বক্তব্য দেওয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে এই ফরাসী হেট স্পিচ ল অনুযায়ীই বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছিলো, এবং দোষী হিসাবে তাকে বেশ মোটা অংকের জরিমানাও করা হয়েছিলো। ফরাসী আইনে মুসলমানরা হেট স্পিচ থেকে বেশ শক্ত সুরক্ষাই পান। অর্থাৎ, মুসলমান-বিরোধী বিদ্বেষ/হেট স্পিচ ছড়ানো ফরাসী আইনেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

স্পষ্টতই মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিংসা-ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো প্যাটির উদেশ্য ছিলোনা। তিনি মুহাম্মদকে নিয়ে আঁকা দুইটি কার্টুন তার ক্লাসে দেখিয়েছিলেন বাক-স্বাধীনতা বিষয়ে পাঠদানের অংশ হিসেবে। সেখানেও তিনি যথেষ্ট সর্তর্কতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তার মুসলমান শিক্ষার্থীরা যেন অপমানিত, আঘাতপ্রাপ্ত না হয় তা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যপার হলো এই ঘটনার পরে মূল ঘোটটি পাকিয়েছেন যেই মুসলমান ভদ্রলোক তার মেয়ে ওই স্কুলের শিক্ষার্থী বটে, কিন্তু প্যাটির ওই ক্লাসে ওই মেয়েটি ছিলোইনা। ওই লোকটিই প্যাটির বিরুদ্ধে উস্কানী দিয়ে প্রচারণা শুরু করে, এমনকি একটি ভিডিও রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়াতেও ছেড়ে দেয়। সেই উস্কানীমূলক ভিডিওটি আবার স্থানীয় মসজিদের ফেসবুক পেজেও শেয়ার করা হয়। তারই জের ধরে এক তরুণ চেচেন রেফিউজি প্যাটিকে প্রকাশ্যে শিরোচ্ছেদ করে হত্যা করে। এই হত্যাকারী “শহীদ” হতে চেয়েছিলো এবং তার সাথে সিরিয়াতে অবস্থানরত জিহাদীদের যোগাযোগ ছিলো এমন খবরও এখন পাওয়া যাচ্ছে।

এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা যে ফ্রান্সে অত্যন্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে সেটাই স্বাভাবিক। রাস্তার উপর কুপিয়ে একটা মানুষকে মেরে ফেলা হলে স্বাভাবিক-সুস্থ-আধুনিক সমাজে এই প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া হবেই। প্যাটির স্মরণে-শ্রদ্ধায় যে ফ্রান্সের সরকারি ভবনের দেওয়ালে ওই কার্টুনগুলো প্রজেক্ট করা হয়েছে সেটা এই প্রতিবাদেরই অংশ। এখানে ওই প্রজেকশনের মাধ্যমে ফরাসী সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ভঙ্গ করেছে এই কথাটি যারা বলছেন তারা বিষয়টি না জেনে, না বুঝেই বলছেন। কোন ধর্মের অনুসারীদের অপমান বা আঘাত করার জন্য ওই কার্টুনগুলো প্রজেক্ট করা হয়নি — একজন শিক্ষক তার পাঠদানের অংশ হিসেবে যে কার্টুনগুলো তার ক্লাসে দেখিয়েছিলেন, এবং যে কার্টুনগুলো দেখানোর জন্য তাকে খুন হতে হয়েছে, সেই কার্টুনগুলোই প্রজেক্ট করা হয়েছে। আমি ফরাসী কর্তৃপক্ষের এই যুক্তিসঙ্গত পদক্ষেপ সমর্থন করি। অবশ্য কেউ যদি মনে করেন যে ওই চেচেন জিহাদীটিই সমগ্র মুসলমান সমাজের প্রতিনিধি, তাহলে এই পদক্ষেপে আপত্তি তোলা যেতেই পারে। আবার জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি আর তোষণমুখী বুদ্ধিজীবীতার চর্চা যারা করেন, তারাও এই বিষয়ে সস্তা ও বিভ্রান্তিকর অবস্থান নিতে পারেন, সেটা তাদের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা।

লেখক : তাসনীম খলিল

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =