বিপ্লব!!!-৩

উৎসর্গঃ

আরিফ আজাদ, ডাঃ শামসুল আরেফিন শক্তি ও আসিফ আদনান। এই দীনি ভাইয়েরা আমাকে লেখার শক্তি দিয়েছেন।

(১)

আমার নাম সালিফ আদনান। আমি নিজেকে আল্লাহর গোলাম মনে ছাড়া আর কিছু মনে করি না। আল্লাহ ওয়াজাল্লাহর মনোনীত একমাত্র দীন ইসলামকে আল্লাহর এই জমিনে প্রতিষ্ঠিত করাকেই আমি আমার জীবনের একমাত্র মাকসাদ বা লক্ষ বানিয়েছি। এই দুনিয়া আজ তাগুতি কুফফার শাসনে বিপর্যস্ত। আল্লাহর জমিনে, আল্লাহর দেয়া পানি বাতাস খাবার খেয়ে এখনও কুফফাররা রাজত্ব করে যাচ্ছে। তারা আল্লাহর একত্ববাদকে অস্বীকার করে আল্লাহর জমিনে শিরক কুফরকে নর্মালাইজ করে ফেলেছে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার যে তারা কেবল আল্লাহর জমিন দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি। এই দুনিয়ায় আল্লাহর একমাত্র গোলাম যে কওম, সেই মুসলিমদের মন ও মগজ দখল করে তারা বসে আছে। আজ উম্মতের নৈতিকতা পশ্চিমা কুফফারগোষ্ঠী ঠিক করে দিয়েছে। কোনটা ভালো কোনটা খারাপ, কোনটা হক কোনটা বাতিল তা কুফফাররা ঠিক করে দিচ্ছে লিবারেলিজমের নামে, উদারতাবাদের নামে। এই উদারতাবাদ নামক গোমরাহী মুসলিমদের শিখিয়েছে যে যা খুশি তাই করা যাবে, অন্যের ক্ষতি না হলেই হলো। সম্মতি থাকলেই ব্যভিচার করা যাবে, সমকামিতা করা যাবে। সমাজের কেউ কিছু বলতে পারবে না। এই উদারতাবাদ মুসলিমদের শেখাচ্ছে হিন্দুদের মূর্তিপূজা, খৃস্টানদের ক্রূশ-পূজাকে ঘৃণা করা যাবেনা। কুফফারদের শত্রু ভাবা যাবে না। তাদেরকে বিশ্বাসের বৈচিত্র্যের নামে মেনে নিতে হবে। ওয়াল্লাহি! আল্লাহর জমিনে এমন বে-ইনসাফি কীভাবে মেনে নেয়া যেতে পারে! এতো সরাসরি মালিকের সাথে গোলামের নেমক-হারামি। তাই আমরা এই বে-ইনসাফি দূর করতে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার জন্য অনন্ত জিহাদে নেমেছি। ইনশাল্লাহ! পুরো দুনিয়ায় তাগুতের পতন ঘটিয়ে কুফফারদের ধ্বংস করে অপমানিত করে দীন-ইসলাম কায়েম না করা পর্যন্ত আমরা থামব না।

আলহামদুলিল্লাহ! তাগুতের পতনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দুনিয়ার বুকে ছোট ছোট ইসলামিক রাষ্ট্র তৈরি হচ্ছে। আপাতত এই রাষ্ট্রগুলো ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হলেও রাজনৈতিকভাবে আমরা একই খিলাফতের অংশ। এই খিলাফতের জেনেরিক নাম দাউলাতুল ইসলামিয়াহ। সংক্ষেপে, দায়েশ বা দাওলাহ নামেও আমাদের চেনে।

এই বাংলার জমিনেও আমরা তেমনই এক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছি। এর নাম দাওলাতুল ইসলামিয়াহ-ই -বাংগালাহ। প্রায় পুরো বাংলায় আমাদের শাসন কায়েম করে ফেলেছি। কেবল খুলনা বিভাগে বাংলাদেশ সরকার এখনো কায়েম আছে। ইন্ডিয়ান মূর্তিপুজারীদের সামরিক সমর্থনেই তাদের টিকে থাকা। তবে ইনশাল্লাহ খুব তাড়াতাড়ি আমরা গাজওয়ায়ে হিন্দ শুরু করে দিবো। ইতোমধ্যে পাকিস্তানেও আমাদের ভাইয়েরা ক্ষমতা প্রায় নিয়ে নিয়েছে। মূর্তির পূজারীরা তৈরি থাকো। ইসলাম আসছে, তোমাদের ধ্বংস অনিবার্য। তোমাদের মূর্তি তোমাদের রক্ষা করতে পারবে না। মাটির পুতুল কি কাউকে রক্ষা করতে পারে!

(২)

আজ বাদ ঈশা যাত্রাবাড়ী মসজিদে হযরত আবু হানজালাহ হাফিজাহুল্লাহ বয়ান করবেন। হযরতের যেমন ঈমানী যশ তেমনই জিহাদি জজবা। খুব ইচ্ছা ছিলো জারিফ আজাদ ভাইকে উনার কাছে নিয়ে যাবো। কিন্তু তার আগেই উনাকে রিএডুকেশন ক্যাম্পে চলে যেতে হলো। আল্লাহ ওয়াজাল্লাহর পরিকল্পনা বোঝা দায়। ইনশাআল্লাহ জারিফ আজাদ ভাইকে ক্যাম্পের উসিলায় আল্লাহ সঠিক আকিদার বুঝ দান করবেন। আমার সাথে আজ ইসলামী লেখক ডাঃ শক্তিশালী ভাই যাবেন। তিনি নতুন গাড়ি খরিদ করেছেন। উনার সাথে মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী যাবো। পথে যেতে যেতেই অনেক কথা হবে।

মিরপুর কালশিতে ডাঃ শক্তিশালী ভাইয়ের সাথে দেখা হলো। আল্লাহ উনার মেহনতকে কবুল করুন। ছাত্রজীবনে উনি ছিলেন ছাত্রলীগের ক্যাডার। রাজনৈতিক কারণে ইসলামপ্রিয়ো ছাত্রদের কতই না নির্যাতন করেছেন। কিন্তু একসময় উনার মন আল্লাহ ঘুড়িয়ে দেন। ঠিক যেন হযরত উমার রাজিআল্লাহআনহুর মতন। ছাত্রলীগের ক্যাডার থেকে হয়ে ওঠেন ইসলামের দাঈ। লেখালেখি শুরু করেন ইসলাম নিয়ে। উনার লেখায় যুব সমাজের অন্তর থেকে ইসলাম নিয়ে সকল সন্দেহ দূর হয়ে যায়।
ঈশার সালাহ আদায়ের পর মসজিদেই শক্তিশালী ভাই এর সাথে দেখা হলো।

“আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহ সালিফ আদনান ভাই। কেমন আছেন?”

“ওয়া আলাইকুম আস সালাম ভাই। আলহামদুলিল্লাহ! ভালো আছি ইনশাল্লাহ! আপনি কেমন আছেন?

“আলহামদুলিল্লাহ! ভালো আছি। ইসলামের বিজয়ের এই সময়ে কীভাবে খারাপ থাকা যায় বলুন?

আমরা একসাথে গাড়ির দিকে হাটা শুরু করলাম।

“আপনি ঠিকই বলেছেন। বিজয়ের এই সময়ে খারাপ থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু ইসলামের দুশমনেরাও কিন্তু বসে নেই। ঈমান বিধ্বংসী ষড়যন্ত্র এখনও চালু আছে। এখনও কওমের মনে কুফফার নৈতিকতার প্রতি দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের কথা কি বলবো গত সপ্তাহে জারিফ আজাদ ভাইকে দেখলাম এক মালাউনের মৃত্যুতে কষ্ট পাচ্ছে। সেই মালাউন নাকি আজাদ ভাইয়ের পরিচিত। লিবারেল নৈতিকতা আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে যে কুফফার ধ্বংসেও আমাদের কষ্ট পেতে হবে। কুফরের প্রতি যে ঘৃণা মু’মিনের ফিতরাত সেই ফিতরাত কে মুছে গেছে।”

“জারিফ আজাদ ভাইয়ের এধরনের ভুলগুলো নিয়ে অনেকদিন ধরেই তো আলোচনা চলছে। তবে নাস্তিক্যবাদের বিরুদ্ধে কলমের লড়াইয়ে কিন্তু উনার অবদান অনেক। উনার প্যারাডক্সিকেল আরিফ পড়ে সাধারণ মুসলিম ছেলেমেয়েদের কিন্তু অনেক উপকার হয়েছে। তাঁরা নাস্তিক্যবাদে গাঁ ভাসায়নি।”

“আমি নাস্তিকদের থেকে লিবারেলদের কে বড় হুমকি মনে করি। জারিফের লেখা কিন্তু সাধারণ মুসলিমদের মাঝে লিবারেল চিন্তাভাবনার প্রসার ঘটিয়েছে। যেমন উনার প্যারাডক্সিক্যাল আরিফে উনি লিখেছেন কুফফারদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে অসুবিধা নেই। অথচ একজন মুসলিমের সিফাত বা গুনই হলো যে সে কুফর ও কুফফারকে ঘৃণা করবে। যাকে ঘৃণা করতে হবে তাকে কীভাবে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব!”

“ভাই সেটা সাময়িক সময়ের জন্য। জারিফের লেখালেখিতে সাধারণ এই মুসলিমদের ঈমান বেঁচে গিয়েছিল। এই সাধারণ মুসলিমদের সমর্থনের উসিলাতেই আল্লাহ ওয়াজাল্লাহ আমাদের এই দাওলার হুকুমত দান করেছেন। এখন হুকুমত কায়েম হয়ে গিয়েছে, এখন ইসলামের আসল শিক্ষা, সালফে-সালেহিনের মানহাজ শিক্ষা দিয়ে আগের লিবারেল চিন্তার ভূতগুলোকে তাড়াতে হবে। জারিফ ভাইয়ের কথাই যদি ধরি তাহলে বলতে হয়, উনিও কিন্তু উনার শেষের দিকের লেখাগুলিতে সঠিক ইসলামী আকিদার দিকেই সরে আসছিলেন।”

“কাজটা কিন্তু অনেক কঠিন। আমার আন্দাজে মুসলিমদের মাঝে পঁচানব্বই ভাগই লিবারেল চিন্তা রাখে।”

“সমস্যা কেটে যাবে ভাই। সাহাবীরা আগে দেশ দখল করতেন তারপরে ইসলাম প্রচার করতেন। আমাদের হুকুমত তো কেবল কায়েম হল। লিবারেল নাপাকি ধীরে ধীরে দুর হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ!”

আমরা গাড়িতে উঠলাম। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ শক্তিশালী ভাইকে দীনের সঠিক বুঝ দান করেছেন। তিনি গাড়ির পাশের আর পেছনের সব জানালা কালো রং করে ফেলেছেন যাতে উনার পরিবারের মেয়েরা বসলে বাইরে থেকে কেউ দেখতে না পারে। পর্দা রক্ষা হয়। বিষয়টা উল্লেখ করায় শক্তিশালী ভাই বললো

“ইসলামে স্বাধীন নারীর ভূষণ হলো পর্দা। রাস্তার লোকজন আপনার মা-বোন-স্ত্রীর সাথে চোখ দিয়ে সংগম করুন সেটা কেউ চায় ভাই? তাছাড়া এর ফলে গাড়ির ভেতরে থাকা মা-বোনরাও বাইরে দেখার সুযোগ পায়না, পরপুরুষ দেখেনা তাই তাদের মনেও কোন কু-চিন্তা আসে না। ইসলাম এভাবেই হোলিস্টিক্যালি আমাদের পবিত্র রাখে। তবে এতে আমার ড্রাইভিং এর কিছু সমস্যা হয়, পেছনে দেখতে পারিনা। আমার সুরাইয়া দাসীদের আমি অবশ্য সামনেই আমার পাশে বসাই। হেল্প হয়। দাসীদের জন্য পর্দা জরুরী না। পর্দা স্বাধীন মুসলিমার ভূষণ। পর্দা তাদের সম্মান, অনেক লিবারেল মুসলিমাহ এটা বুঝতে চায়না।”

“দাসীদের নিয়ে বের হন নাকি ডাঃ শক্তিশালী ভাই?”

“কেন বের হবো না ভাই! ইসলামে তাদেরও অনেক অনেক অধিকার আছে। তাঁদের আমি বন্দী করে রাখতে পারিনা। ইসলাম এটা এলাও করে না। আমার দুটি দাসী। প্রতিদিন পালা করে একজনকে চেম্বারে নিয়ে যাই। সারাদিন অনেক রোগীর চাপ সামলাতে হয়। মাঝে মাঝে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পরি। তখন দাসীর সাথে একটু সোহবত করি, আল্লাহ সব ক্লান্তি দূর করে দেন। যাযাকাল্লাহ!”

“বারাকাল্লাহি ফিক! আপনার আব্বাহুজুরকে আল্লাহ জান্নাতবাসী করুন, তিনি আপনার নাম শক্তিশালী রেখেছিলেন। আপনি পুরুষোত্তম ডাঃ শক্তিশালী ভাই।”

“হা হা হা, মজা নিবেন না হযরত। ব্যাপারটা এতো সহজ না। দাসী রাখলে দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। অনেক কিছুই সামলাতে হয়। এর উপর আমার একজন দাসীর আনুগত্যের ঘাটতি আছে। কাজে মন নাই। কালিমা পড়িয়েছি অথচ লুকিয়ে লুকিয়ে নোংরা কৃষ্ণের পূজা করে। হিন্দু স্বভাব এখনো ছাড়তে পারেনি। দুনিয়া খুইয়েছে, এখন আখিরাতও খোয়াবে। আল্লাহ এভাবেই কুফফারদের অপমানিত করবেন। ভাবছি বিক্রয় করে দিবো। খরিদ করবেন নাকি? দেখতে ভালো, বয়সও অল্প, মাত্র পনেরো। কখনো গর্ভ হয়নি।”

“ওয়াল্লাহি শক্তিশালী ভাই! এমন মালাউন এখন সামলাতে পারবো না। আপনার কাছেই রেখে দিন। একটু ধৈর্য্য ধরুন। এই মালাউন মেয়েও একদিন ভুল বুঝতে পেরে ইসলামে ফিরে আসবে ইনশাল্লাহ। ইসলাম ফিতরাতের দীন। সবাই মুসলিম হয়েই জন্মায়, পরে পিতামাতারা কুফফার করে দেয়। আপনার দাসী বাচ্চার মা হলে আরো দ্রুত মন পরিবর্তন হবে ইনশাল্লাহ!”

“ওয়াল্লাহি সালিফ ভাই! আমি দাসীদের সাথে কনডম ইউজ করি। তাদের বাচ্চা হোক সেটা আমি চাই না। ইসলাম দাসীদের অনেক অনেক অধিকার দিয়েছে। বাচ্চা হলেই তাদের স্থায়ী ভাবে রেখে দিতে হবে। বিক্রয় করা যাবে না। তাছাড়া গর্ভ হলেতো ঘড়ের কাজ করতে কষ্ট হবে। ইসলামে দাস-দাসীদের উপড়ে তাদের সাধ্যের বাইরে অধিক কাজ করাতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই বাচ্চা কাচ্চার দিকে যেতে চাই না। আমার বিবিরাও চান না দাসীদের ঘড়ে আমার সন্তান হোক। শরয়ী সীমার মাঝে থেকেই আমার বিবিরা দাসীদের ঈর্ষা করে।”

শক্তিশালী ভাই গাড়ি স্টার্ট দিলেন। রাস্তা ফাঁকা, খুব দ্রুতই বিজয় সরণীতে চলে আসলাম। তবে জামে পরলাম ফার্মগেইটে। যাত্রাবাড়ী যেতে যেতে হযরত হানজালার বয়ান অনেকখানি হয়ে যাবে। কিই বা আর করা যাবে, ঢাকার জ্যাম। শক্তিশালী ভাই হালকা করে ইসলামী নাশিদ ছেড়ে দিলেন। বাদ্যযন্ত্র ছাড়া ইসলামী নাশিদ খুব ভালো লাগে আমার। দিলে জজবা আসে।

“আচ্ছা শক্তিশালী ভাই, ইসলাম তো ফিতরাতি দীন। মানুষের স্বাভাবিক স্বভাবধর্মই ইসলাম। কিন্তু ভেবে দেখেছেন যে শয়তান কীভাবে মানুষের এই স্বভাবে প্রভাব বিস্তার করে? এই যেমন বাদ্যযন্ত্রের কথাই ধরুন। একেবারে মাসুম বাচ্চাদেরও আমি বাদ্যযন্ত্রের তালে নাচতে দেখেছি।”

“এই ব্যাপারটা সাইকোলজিক্যাল। দেখবেন ইসলাম বাদে বাকি সব কুফফার ধর্মেই বাদ্যযন্ত্রকে হালাল করা হয়েছে। অনেক ধর্মেতো ইবাদতের অংশই বানিয়ে ফেলা হয়েছে এই নাপাক যন্ত্রগুলোকে। একমাত্র ইসলামেই বাদ্যযন্ত্র হারাম। অর্থাৎ বোঝা গেল অন্য সব ধর্মই আসলে শয়তানের তৈরি। শিশুদের গান প্রীতির ব্যাপারটিও সাইকোলজিক্যাল। শিশুর মন থাকে শুদ্ধ সাদা, তাতে সহজেই শয়তান প্রবেশ করতে পারে। এজন্য আমার বাচ্চাদের প্রথম থেকেই আমি কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি মহব্বত পয়দা করে দেই, মিউজিকের প্রতি ঘৃণাও ঢুকিয়ে দেই।”

“বারাকাল্লাহি ফিক শক্তিশালী ভাই। গান-বাদ্য, শিল্পচর্চা ও খেলাধুলা ইসলাম কায়েমের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। এগুলোতে ডুবে থেকেই উম্মাহ দীনের ফিকির থেকে দূরে সরে যায়, ইবাদতে খুশু-খুজু আনতে পারে না, জিহাদের তামান্না ও জোশ হারিয়ে ফেলে। এগুলো নফস বা মনকে কোমল করে দেয়। ইসলামে যদিও কিছু ক্ষেত্রে দাফ বাজানো ও খেলাধুলার অনুমতি দেয়া হয়েছে, কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম এবং সেটা কেবলমাত্র জিহাদের প্রয়োজনে।”

“সেটাই সালিফ ভাই। মিউজিক আমাদের দেহকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আমাদেরকে যৌন উত্তেজিত করে অশ্লীলতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিজ্ঞানও তাই বলে। গান-বাদ্য, শিল্পচর্চা ও খেলাধুলার মতন এসব সময়নষ্টকারি বেহুদা কাজকর্ম মুসলিমদের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে কিন্তু পশ্চিমারাই বিভিন্ন মিডিয়া ব্যবহার করে। আমদের শিখিয়েছে যে এগুলো চর্চা স্বাভাবিক মানব প্রবৃত্তি বা ফিতরাত। এগুলোয় কোন দোষ নেই। এভাবেই পুরো উম্মাহকে ভুলিয়ে ভালিয়ে দীনের মেহনত থেকে দূরে রেখেছে। এখন আলহামদুলিল্লাহ! এসবের আর সুযোগ নেই। ইসলামী হুকুমত কায়েম হয়ে গেছে। মুসলিমরা এখন জিহাদের ফিকিরে ও শরিয়াহ কায়েমে পরিপূর্ণ মনোযোগ দিতে পারছে। যে জজবা পয়দা হয়েছে, আগামী এক দশকের মাঝেই হোয়াইট হাউজে কালিমার পতাকা পতপত পতপত করে উড়বে ইনশাআল্লাহ! পুঁজিবাদী তাগুতের পতন আসন্ন।”

“পূজিবাদের চূড়ান্ত পতন আর পরিপূর্ণ ইসলামের বিজয় আমাদের জীবদ্দশাতেই দেখার আশা রাখি। আল্লাহ কবুল করুন।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ। ডাঃ শক্তিশালী ভাই পার্টনারশিপে ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলেছেন। পার্টনার হিসেবে ডাঃ রাফান আহমেদ আছেন।

“শক্তিশালী ভাই আপনার নতুন ডায়াগনস্টিক সেন্টার কেমন চলছে?”

“সব প্রশংসা আল্লাহর। আল্লাহ ব্যবসায় বারাকাহ দিচ্ছেন। প্রতিটি ইউনিট পূর্ণ দমে চলছে। কাস্টমারদের জন্য দীনের খাতিরে বিশেষ বিশেষ ডিসকাউন্ট রাখছি। বিভিন্ন গ্রেডে তাদের এই সুবিধা দিচ্ছি। পূরো কুরআন হেফজ করা থাকলে ৫০℅ ডিসকাউন্ট। অর্ধেকে ২৫% আর একটি বড় সুরা জানা থাকলে ১০%। মহিলাদের মাঝে যারা নিকাবের উপড়ে চোখ ঢেকে রাখছে, হাত-মোজা ও পা-মোজা পরছে তাদের জন্য আরো ১০% ডিসকাউন্ট। এই ইসলামী সমাজেও অনেক ফাহেশা রমণী চোখ আর হাত পা খোলা রাখছে, আস্তাগফিরুল্লাহ! ফলে আবার সমাজে ফিতনাহ বাড়তে পারে। ঠিক এজন্যেই এসব ডিসকাউন্ট দেয়া। এই ডিসকাউন্ট মানুষকে পরিপূর্ণ ইসলামের ঢোকার জন্য ইনসেন্টিভ হিসেবে কাজ করছে। এটা উইন-উইন। আমার মুনাফাও হচ্ছে আবার দীনের খেদমতও হচ্ছে। এই ডিসকাউন্ট দেয়ার পরে রেভিনিউ আরো অনেক বেড়ে যাচ্ছে। আরো বেশী কাস্টমার পাচ্ছি। মানুষ আসলে ইসলামকে ভালোবাসে। ইসলামইতো মানুষের ফিতরাত বা স্বভাবধর্ম। ঢাকা শহরেই আমার সেন্টারের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ইনশাল্লাহ সামনে প্রতিটি বড় শহরেই শাখা খুলবো।”

“আলহামদুলিল্লাহ শক্তিশালী ভাই! আল্লাহ ওয়াজাল্লাহ মু’মিনদের ব্যবসায় বারাকাহ দেন সব সময়।”

“আজকে শায়খ হানজালা কী বিষয়ে বয়ান করছেন সালিফ ভাই?”

“শায়েখের আজ গাজওয়ায়ে ম্যানহাটান বা নাইন-ইলেভেন এটাক নিয়ে ওয়াজ করার কথা। এই এটাক কীভাবে তাগুত সভ্যতার হাঁটু কাপিয়ে দিয়েছিলো, কীভাবে কিছু জানবাজ মুজাহিদ এই অসাধ্য সাধন করেছিলেন, তাদের ঈমানি জজবা কেমন ছিলো সেগুলো নিয়েও আলোচনা করবেন। সেই সেক্যুলার তাগুতি সময়ে আমাদের অনেক দীনি ভাই নাইন-ইলেভেন এটাককে আমেরিকার ষড়যন্ত্র বলতেন। পশ্চিমা তাগুতি পুঁজিবাদীরা তাদের মাথা এমনভাবে খেয়ে ফেলেছিলো যে মুজাহিদের এতো বড় একটি অর্জন যা পুঁজিবাদী কুফফারদের থর থর করে কাপতে বাধ্য করেছিলো তাকেই অস্বীকার করে বসল। শায়েখ উসামা, মোল্লা উমার, আল-কায়েদা এমনকি তালিবানকেও তারা আমেরিকার তৈরি বলতো, সন্ত্রাসী বলতো। পরে যখন আমেরিকা আফগান যুদ্ধে হেরে যায় তখন অবশ্য দীনি ভাইয়েরা তালিবানকে মুজাহিদ আখ্যাও দিয়েছিলো। সিরিয়ায় আইএস এর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিলো। প্রথম প্রথম বলতো যে শায়েখ বাগদাদী নাকি ইসরাইলের গুপ্তচর। এখন অবশ্য উনার নামের শেষে রহিমাহুল্লাহ ব্যবহার করেন সবাই।”

ডাঃ শক্তিশালী ভাই হাসলেন।

“সে এক সময় ছিলো ভাই! এমনকি আমরা যারা এসব ব্যাপারগুলো নিয়ে পরিষ্কার ছিলাম তারাও সরাসরি উনাদের নাম উচ্চারণ করতাম না। আইএস ও আল-কায়েদাকে আমরা দাওলাহ আর একিউ বলে সম্বোধন করতাম। সরাসরি নাম বললে আমাদের নিজেদের দীনি ভাইরাই আমাদের ধুয়ে দিতো। আশ্চর্য্য এক ডিনায়ালের মাঝে ছিলো সবাই। পশ্চিমারা কীভাবে আমাদের মগজ খেয়ে ফেলেছিলো, হায়! তবে মাঝে মাঝে ভাবি, আমরা হয়তো ঠিকই করেছিলাম। আল-কায়েদা আর আইএস এর জিহাদে কুফফারদের যে কতল করা হত, কুফফার নারীদের যে অধিকার করা হত সেটা তখনকার পশ্চিম প্রভাবিত মুসলিমরা মেনে নিতে পারেন নাই। এগুলোকে তারা জুলুম হিসেবে দেখতো। তখন যদি দীনি ভাইরা এসব সমর্থন করতেন তাহলে অনেক দুর্বল ঈমানের মু’মিন ঈমান হারাতে যেতে পারতেন। ধীরে ধীরে মুসলিমদের বোঝাতে হয়েছে যে জিহাদ, কিতাল আর গনিমত আরোহণই আসলে ইনসাফ, এটাই আল্লাহর নির্দেশ। এই যে এই বিপ্লবের পরেও কিন্তু আমরা হিন্দু নারী ও শিশুদের হত্যা করিনি। তাদের গনধর্ষন হওয়া থেকে রক্ষা করে নিজেদের ঘরে আশ্রয় দিয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা যে ইসলামে এনে তাদের অনন্তকাল জাহান্নামের আগুনে থাকা হতে বাঁচিয়েছি। এটাইতো ইসলামের ইনসানিয়াত, মানবিকতা। এখন ইনশাল্লাহ অনেকেই বুঝতে পারছে তাই সবকিছু স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করছে। ইসলামের কার্যপদ্ধতিও কিন্তু এমনই, ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা হয়, মদ কিন্তু একদিনে হারাম করা হয়নি।”

“আল্লাহু-আলাম ভাই! তবে আমার মনে হয় মূল ইসলামের শিক্ষাটা প্রথম থেকেই দেয়া জরুরী, পশ্চিমা লিবারেল চিন্তার প্রভাব কিন্তু এখনও দূর হয়নি।”

“ আমি আপনার সাথেও দ্বিমত করছি না। যাইহোক, রাস্তার জ্যামে অনেকখানি সময় নষ্ট হয়ে গেল। আমরা পৌছাতে পৌছাতে বয়ান শেষ হয়ে যাবে মনে হয়।”

“বয়ান না পেলেও আমরা প্রশ্নত্তোর পর্ব পাবো। শায়খ বয়ান শেষে ঘন্টাখানেক বিভিন্ন দীনি মাসলা-মাসায়েল বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর দেন। অনেক কিছু জানা যায়।”

আমাদের তাকদির ভালো বলতে হবে। রমনা পার হবার পরে আর তেমন কোন জ্যাম পেলাম না। দশ মিনিটের মাঝে আমরা যাত্রাবাড়ী জামে মসজিদে চলে আসলাম। মসজিদের বাইরে আবু হানজালাহ হাফিজাহুল্লাহর সাদা পাজেরো জীপ পার্ক করা। সাথে আরো কয়েকটি গাড়ি। কালো পাঞ্জাবী পরা ডজনখানেক সশস্ত্র দেহরক্ষীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। কয়েকজনকে দেখে পশ্চিমা শ্বেতাঙ্গ বলে মনে হলো। দাওলাহ ক্ষমতায় আসার পরে উনারা সব ছেড়ে এখানে হিজরত করেছেন। জান্নাতের জন্য তাঁরা দুনিয়া কুরবানি করেছেন।

মসজিদের ভেতরে পা রাখার জায়গা নেই। মিম্বারের সামনে পৌছাতে অনেক বেগ পেতে হল। এসি চলছে, তারপরেও ভেতরে ভ্যাপসা গরম। ওয়াল্লাহি! অথচ এই অবস্থায়ও মানুষ অপরিসীম শাহাদাহ প্রদর্শন করে চলেছে। কেউ উঠে চলে যাচ্ছে না। দুই কাতারের মাঝের জায়গাও পরিপূর্ণ। প্রিয়ো শায়েখের ইলম থেকে কেউ বঞ্চিত হতে চায় না। আমাদের তাকদির খারাপই বলতে হবে। বয়ান শেষ। এখন প্রশ্নত্তোর পর্ব চলছে। ডা শক্তিশালী ভাই অবশ্য নিরাশ হলেন না। কানে কানে বললেন-

“অন্তত আরো অনেক মাসলা-মাসায়েল জানা যাবে ইনশাল্লাহ! ইদানীং সংসার, চেম্বার আর ব্যবসায় অনেক সময় চলে যাচ্ছে। ইলমি পড়াশোনার সময় পাচ্ছি না। তাই লেখালেখিও প্রায় বন্ধ।”

প্রশ্নের জন্য অনেকেই হাত তুলছে। শায়েখ আঙ্গুলের ইশারায় উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করতে বলছেন।

“এই যে দ্বিতীয় কাতারে, হ্যা হ্যা আপনি, উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেন। সংক্ষেপে করবেন।”

আমাদের বয়সী এক ছেলে উঠে দাঁড়ালো

“শাইখ, আমার আম্মা সারাদিন ঘড়ে শাড়ি পরিধান করে থাকে, এমনকি নামাজ, না না, সালাহ আদায়ের সময়ও। অনেকে বলে এতে সালাহ আদায় হয়না। কারণ শাড়ির নিচে সেলাই থাকে না, তাই ফাকা থাকে, ফলে মাটি লজ্জাস্থান দেখে ফেলে। আম্মাজানকে যতই বলি বোঝে না। বলে যে এটা তার অভ্যাস, শাড়ি ছাড়া আর কিছু পরতে উনার অস্বস্তি লাগে, গরম লাগে। এখন এই বিষয়ে শরয়ী বিধান কী?”

“মাটি লজ্জাস্থান দেখে ফেলে এটা ঠিক না, এটা কুসংস্কার। তবে শাড়ি না পরাই উত্তম কাড়ন এটা মুশরিক হিন্দু নারীদের পোশাক। আর কুফফারদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে পোশাক পরা ঠিক নয়। আপনার আম্মাজান আসলে বয়স্ক, সারাজীবন শাড়ি ছাড়া অন্য কিছু পরেন নাই তাই অস্বস্তি হচ্ছে। উনাকে বুঝান যে হিন্দুদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা ঠিক না।”

ছেলেটি উত্তর পেয়ে বসে গেলো। এবার শায়েখ একজন মধ্যবয়স্ক লোকের দিকে নির্দেশ করলেন।

“হুজুর আমি নতুন একটি দাসী খরিদ করেছি। শরিয়তের হুকুমে আমি যা খাই তাকেও তাই খাওয়াই। সাধ্যমতো জামাকাপড় কিনে দেই, উত্তম বেবহার করি, কিন্তু সে আমার সাথে কিছুতেই সহবাসে রাজী না। যতই বুঝাই সে বুঝে না। এই অবস্থায় কী করতে পারি?”

“আপনি খরিদ সুত্রে তার মালিক। তাই তার অধিকার নাই বাধা দেয়ার। সহবাস করতে অনুমতির দরকার নাই। অনেক মু’মিন ভাই বলছেন অনুমতি লাগবে। অনুমতি লাগবে এমন কোন প্রমাণ নাই। আপনি সহবাস করুন।“

আবার সেই অনুমতি বা কনসেন্ট নিয়ে বাড়াবাড়ি। পশ্চিমারা আমাদের মুসলিমদের মগজ একেবারেই ধোলাই করে দিয়েছে। একটি হালাল সম্পর্ক করতে কনসেন্ট নাকি লাগবে। নইলে অপরাধ হবে। অথচ প্রেমের মত হারাম সম্পর্কে কনসেন্ট থাকলেই সহবাস করা যাবে, এটাই পশ্চিমা সেক্যুলার নৈতিকতা! কনসেন্টের ভেল্কিতে সব জায়িজ! কি অসাধারণ হিপোক্রেসি! তারা জানেনা প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক আল্লাহ ওয়াজাল্লাহ হারাম করেছেন আর দাসী-মালিকের সম্পর্ককে হালাল করেছেন।

শায়েখ অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন। এবার শায়খ এক তরুণকে প্রশ্ন করতে বললেন। কালো ঘন দাড়িওয়ালা। চোখে বুদ্ধিদীপ্ত চাহনি।

“বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। শুকরান শায়খ। আমাদের অনেক দীনি মা-বোন বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও পত্রিকায় লেখালেখি করেন, হুইচ ইজ গুড, নাথিং রঙ উইথ দ্যাট। উনারা দীনের খেদমতের নিয়তেই এগুলো করেন। কিন্তু অনেকেই দেখা যাচ্ছে যে নিজ নামে লেখেন। ছদ্মনাম ব্যবহার করেন না। এতে উনাদের পর্দার খেলাফ হয় কিনা? এই বিষয়ে করনীয় কী?”

“যাযাহকাল্লাহ! যাযাকাল্লাহ! যুবক খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছেন। ইসলামের প্রতি যুবকদের দরদ দেখলে আমার দিলটা ভরে যায়। আল্লাহ ওয়াজাল্লাহ এই তরুণদের দিয়েই ক্রিমলিন আর হোয়াইট হাউজ জয় করাবেন। এবার আপনার প্রশ্নে আসি। আপনি ঠিক ধরেছেন হে তরুণ। নারীদের নামও পর্দার অন্তর্গত। হযরত শাহ আহমাদ শফি রহিমাহুল্লাহ একবার বলেছিলেন নারীরা হল তেঁতুলের মতন। তেঁতুল দেখলেই আমাদের লালা ঝরে। আবার অনেকে আছে যাদের তেঁতুলের নাম শুনলেই লালা ঝরে। আপনাদের অনেকের ঝরে না? হে হে। একইভাবে কোন নারীর নাম শুনলেও অনেক পুরুষের দিলে লালা ঝরে। অশ্লীল চিন্তা মাথায় আসে। সেই নারীর সাথে যিনা করতে খায়েশ হয়। তাই নারীদের নিজেদের নাম প্রকাশ করে দেয়া ঠিক না। এব্যাপারে পরিবারের গাইরতওয়ালা পুরুষদের কাজ করতে হবে। আপনারা আপনাদের পরিবারের মেয়েদের বলবেন তাদের নাম লুকিয়ে রাখতে। আপনেরা কি চান আপনাদের মা-বোনের নাম শুনে বাহিরের পুরুষরা তাদের সাথে যিনা করার খায়েশ করুক। তারা মনে মনে আপনার মা-বোন-স্ত্রী-কন্যার সাথে সহবাস করুক? আমি জানি আপনেরা কেউ তা চান না। তাইলে আপনার মা-বোনকে বলুন নাম গোপন রাখতে। নারীদের নাম প্রকাশ হলে সমাজে ফিতনা ছড়াবে। তবে আমরা তাদের লেখালেখি বন্ধ করতে বলছিনা। তারা ছদ্মনামে লিখতে পারে। আবার খিয়াল রাখতে হবে ছদ্মনাম যাতে নারীসুলভ বা মেয়েলি না হয়, যেমন- বকুল, শিউলি, নদী এমন। এতেও সমাজে অশ্লীলতা ছড়াবে। উনারা নিজেদের ছেলেসন্তান বা পিতার নাম ব্যবহার করতে পারেন। যেমন- ছেলের নাম জামাল হলে উম জামাল যার অর্থ জামালের আম্মা আবার পিতার নাম জামাল হলে বিনতে জামাল অর্থ জামালের কন্যা। আবার মেয়ের বা মায়ের নাম বেবহার করা করা যাবে না। যেমন- উম কুলসুম বা বিনতে কুলসুম লেখা যাবে না। তাইলে অনেক পুরুষ পাঠকের মনে খায়েশ পয়দা হবে। মনে মনে অশ্লীলতা ছড়াবে।”

এই উত্তরে ডঃ শক্তিশালী ভাই এক্সাইটেড হয়ে উঠলেন। ফিস ফিস করে বললেন

“দেখেছেন দেখেছেন সালিফ ভাই? ইসলাম কীভাবে সমাজের প্রতিটা সমস্যার সমাধান দিয়েছে? অশ্লীলতাতো প্রথমে শুরু হয় আমাদের মনে। সেই মনেই যাতে কোন অশ্লীলতা তৈরি না হয় তার ব্যবস্থা রেখেছে ইসলাম। বেগানা নন-মাহরাম নারীর চিন্তাও যাতে মাথায় না আসে তার জন্য নারীর নাম পরিচয়ও মুছে দেয়ার রেকমেন্ডেশন আছে। সমাজ থেকে নারীর নাম-পরিচয় মুছে দিলেই না পুরোপুরি অশ্লীলতা মুক্ত হবে সমাজ। ইসলামতো কোন আংশিক সমাধান দেয়না। টোটাল সমাধান দেয়।”

এভাবে একের পরে এক প্রশ্ন আর উত্তর চলতে থাকে। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনে যেতে থাকি। একসময় শায়খ ক্লান্ত হয়ে ওঠেন। শেষ প্রশ্ন করতে বলেন। এক মধ্যবয়স্ক ছিপছিপে গড়নের লোক অনেকক্ষণ ধরেই হাত তুলছিলেন কিন্তু প্রশ্নের সুযোগ পাচ্ছিলেন না। শায়খের মনে দয়া তৈরি হলো। শায়খ ওনাকে প্রশ্নটি করতে বললেন।

“হুজুর, একমাস হলো আমি চতুর্থ বিবাহ করেছি, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ আমাকে সক্ষমতা দিয়েছেন!”

সবাই খুশিতে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠলো।

“আমার চতুর্থ স্ত্রীর কুমারী, বয়স অল্প, মাত্র এগারো, গ্রামের মেয়ে। তার সমস্যা হলো যে আমি বাইরে থাকলেই সে পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে উকি দেয়, রাস্তার মানুষজন দেখে। কোনভাবেই তাঁর এই স্বভাব ছাড়াতে পারছি না। তার সাথে শয্যা ত্যাগ করেছি, হালকা মারধোরও করি মাঝে মাঝে, কিন্তু মুখে আঘাত করি না। অথচ সে কোনভাবেই সংশোধন হচ্ছে না। এই অবস্থায় তাঁকে তালাক দিলে কি আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন?”

“সুন্দর প্রশ্ন করেছেন মাশাল্লাহ! আপনি তালাক দিয়ে তাঁকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লামের এক বিবি ছিলো, নাম ফাতিমা আল আলিয়া। তিনিও একই কাজ করতেন। উম্মুল মু’মিনিন হয়েও পর্দার ফাঁক দিয়ে রাস্তার মানুষ দেখতেন। অন্যান্য উম্মুল মু’মিনিনরা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লামের কাছে এই ঘটনা বলে দেন। একদিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহিস ওয়াসাল্লাম ফাতিমা আল আলিয়াকে এই অবস্থায় হাতেনাতে ধরে ফেলেন। তিনি সাথে সাথেই তালাক দিয়ে দেন। এই ঘটনা সিরাতে আছে। এ ধরনের রমণী ফাহেশা। এদের প্রভাবে আপনার অন্য স্ত্রী-কন্যারাও অশ্লীলতায় নিমজ্জিত হবে। আপনি নিজেও অশ্লীলতায় আক্রান্ত হবেন। মনে রাখবেন কুরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন “চরিত্রহীনা নারী চরিত্রহীন পুরুষদের জন্য, আর চরিত্রহীন পুরুষ চরিত্রহীনা নারীদের জন্য, চরিত্রবতী নারী চরিত্রবান পুরুষের জন্য, আর চরিত্রবান পুরুষ চরিত্রবতী নারীর জন্য।”

হযরত আবু হানজালার প্রশ্নত্তোর পর্ব শেষ হলো। সবাই ধীরে ধীরে উঠে যেতে লাগলেন। ভীর পাতলা হয়ে আসলে হুজুর আমার দিকে আসলেন। আমি সালাম দেয়ার সুযোগ পেলাম না। তিনিই আগে সালাম দিলেন।

“আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ সালিফ আদনান। কাইফা হাল?”

“আলহামদুলিল্লাহ শায়খ, ভালো আছি। দুঃখজনক আজকে আপনার বয়ান শুনতে পারলাম না। আসতে দেরী হয়ে গেল।”

“কোন সমস্যা নাই আখি। আল্লাহ ওয়াজাল্লাহ আপনাকে এনেছেন তাতেই আমি খুশি। আপনাকে আমাদের বিশেষ ভাবে প্রয়োজন। সেই কথায় পরে আসছি। আপনার সাথের ইনিই কি ডাঃ শক্তিশালী?”

“জ্বী শায়খ, ইনিই সেই ডাঃ শক্তিশালী। আল্লাহ ওয়াজাল্লাহ উনার লেখার উসিলায় আমাদের যুব সমাজকে আল্লাহর পথে ঘুড়িয়ে দিয়েছেন। উনি একজন অত্যন্ত প্রলিফিক লেখক ও চিন্তক।”

শক্তিশালী ভাই আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন। বিনয়ের সাথে বললেন-

“প্রসংশাতো কেবল আল্লাহ ওয়াজাল্লাহর জন্য আখি। যে সামান্য খেদমত করেছি এই কওমের জন্য তা আল্লাহ ওয়াজ্জাল্লাহই”আমাকে দিয়ে করিয়েছেন। আর যা কিছু দোষত্রুটি হয়েছে আমার কাজে তার দায় কেবলই আমার। খুব ভালো হতো যদি এই খেদমত সচল থাকতো। কিন্তু আল্লাহর চাওয়া হয়তো ভিন্ন। ইদানীং তিনি আমাকে কওমের চিকিৎসাসেবা দেয়ার মাঝেই ব্যস্ত রেখেছেন। তাই লেখালেখি তেমন একটা হচ্ছে না।”

শায়েখ ধৈর্য ধরে আমাদের কথা শুনছেন। শায়খকে ক্লান্ত ছাড়াও একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিলো।

“যাযাকাল্লাহ! আপনার কথা অনেক শুনেছি আখি, কিন্তু আপনার কোন কিতাব পড়ার সৌভাগ্য এখনো হয়নি। আল্লাহ আমাকে জিহাদ-কিতালে ব্যস্ত করে ফেলেছেন। ব্যস্ততা কমলে ইনশাল্লাহ!”

শায়খের আমাকে বিশেষভাবে কেন প্রয়োজন জানতে মন উসখুস করছিলো। আর দেরী করতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করে ফেললাম।

“গোস্তাকি মাফ শায়খ, আমাকে কী একটা প্রয়োজনে বিশেষভাবে দরকার বলছিলেন?”

“ও হ্যা, আপনি কিন্তু তরুণ যোদ্ধাদের মাঝে খুব জনপ্রিয়ো। জঙ্গের মাঠে তরুণেরা আপনার মত জ্ঞানীগুণীদের লেখা আর লেকচার শুনে অনুপ্রেরণা পায়। স্বপ্ন দেখে একসময় তারা ক্রিমলিন-হোয়াইট হাউজে পৌঁছে যাবে। খুলনার রণাঙ্গনে জংগ জমে উঠেছে। মুরতাদ বাহিনী আমাদের জোরদার হামলায় পিছু হটে যাচ্ছিলো। অবস্থা বেগতিক দেখে ভারতের মালাউনেরা এদেশি বেঈমানদের সাহায্যে সরাসরি যোগ দিয়েছে। এখন সময় একই সাথে মুরতাদ আর মালাউনদের কোমর ভেঙ্গে দেয়ার। আমাদের ফিদায়ি হামলার পরিমাণ বাড়াতে হবে। ফিদায়ি হামলাকে কুফফারেরা সবচেয়ে বেশী ভয় পায়। ফিদায়ি হামলার সরঞ্জামের কোন অভাব নাই আমাদের। বুয়েটের একজন প্রফেসরের আন্ডারে তার ছাত্ররা দিনরাত পরিশ্রম করে নতুন নতুন ডিজাইনের ভেস্ট বানাচ্ছে। এগুলো খুবই কাজে দিচ্ছে। অনেক কুফফার আর্মি ধরতেই পারছেনা যে জামার তলায় বোমা লোডেড ভেস্ট লুকানো আছে। মেটাল ডিটেক্টর দিয়েও কাজ হচ্ছেনা। ‘আল্লাহ কৌশল করেন, তারাও কৌশল করে; নিঃসন্দেহে আল্লাহ উত্তম কৌশলী’। ফিদায়ি হামলার জন্য এখন আমাদের অনেক মুজাহিদ দরকার। আপনার মত চিন্তক সুবক্তাদের তাই উম্মাহর খুব প্রয়োজন। আপনাকে ফ্রন্টে যেতে হবে। সাধারণ মুজাহিদদের বুঝাতে হবে ফিদায়ি হামলার ফজিলত সম্পর্কে। এই জিহাদ শুরুর প্রথমদিকে মুজাহিদেরা বানের মতন গনিমত লাভ করা শুরু করেছিলো। প্রায় সব মুজাহিদের ঘড়ই যুদ্ধের মাল আর দাসীতে ভরে উঠেছিলো। এর ফলে মুজাহিদরা কিছুটা দুনিয়ামুখী আর আখিরাত বিমুখী হয়ে উঠেছে। ফিদায়ি হামলার জন্য জানবাজ পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। মুজাহিদদের বুঝাতে হবে দুনিয়ার গনিমতের মালের থেকে আখিরাতের পুরস্কার অনেক উত্তম। দুনিয়ার নারী থেকে জান্নাতের নারীরা কোটি গুন বেশী সুন্দরী। শহিদ হলেই আল্লাহ মুজাহিদদের সাথে জান্নাতি নারীদের নিকাহ করিয়ে দিবেন। আর কথা বাড়াবো না। আপনি কালই খুলনা ফ্রন্টে চলে যান। মুজাহিদদের মাঝে কাজ শুরু করে দিন। আমার সেক্রেটারির কাছ থেকে আমার রেফারেন্স লেটার আর ট্রেনের টিকেট নিয়ে নিন। আল্লাহ ওয়াজাল্লাহ আপনার মেহনত কবুল করুন।”

কিছুটা ভয় লাগলো। না যুদ্ধের ভয় না। শহীদি মৃত্যুই আমার জীবনের পরম চাওয়া। আল্লাহর দীনকে দুনিয়ায় বিজয়ী করতে, কুফফারদের চরম অপমান করতে, কুফফারদের লাঞ্ছিত করতে যদি শহীদ হতে হয় তবে আমি এখনই প্রস্তুত। আমার ভয় আমার নতুন দায়িত্ব নিয়ে। কঠিন কাজ। আল্লাহ ওয়াজাল্লাহ আমাকে এই ভার বহন করার শক্তি দিবেন তো?

(চলবে)

প্রথম পর্বঃ বিপ্লব!!!

 

দ্বিতীয় পর্বঃ বিপ্লব!!!-২

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 1 =