মোল্লাতন্ত্র এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশে মোল্লাতন্ত্র যেভাবে আগাচ্ছে, তাতে করে এটা ভালভাবেই প্রতীয়মান যে, নৈরাজ্য সৃষ্টি করা ছাড়া তাদের দ্বারা গঠনমূলক কিছু করা সম্ভব নয়। কেউ কেউ মনে করেন এই নৈরাজ্যেরও প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু কাদের নিমিত্তে, কীসের নিমিত্তে তাদের এই নৈরাজ্য সৃষ্টির অপপ্রয়াস, তা ভাবতে গেলে ইহজাগতিক কোন সমাধান পাওয়া যায় না।

সমস্যা তখনই হচ্ছে, যখন তারা পরকালের চিন্তাকে ইহজাগতিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত করছে। তাদের বোঝা উচিত, এই ইহজগতে তাদের ধর্মের লোকই শুধু বসবাস করছে না, অন্য ধর্মের লোকেরাও আছে। এই ইহজগতের বর্তমান-ভবিষ্যত নিয়ে তাদেরও চিন্তা আছে।

বাংলাদেশের এই সংকট অতিক্রম করতে প্রচলিত প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন বা বুদ্ধিজীবিতা কোন ভূমিকাই রাখতে অক্ষম, তার কারণও রয়েছে। পরিবার বা সমাজের তথাকথিত রক্ষণশীলতা বা গোষ্ঠীগত দুর্নীতির বা স্বজনপ্রীতির যে কালচার, পুরাতনকে ভেঙ্গে নতুনের চিন্তার অভাব, সবকিছুকে প্রশ্নহীন মেনে নেয়া, এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে ন্যায়সঙ্গত এবং গ্রহণযোগ্য কোন অবস্থানে পৌঁছে দিচ্ছে না।

ছবি : ডয়চে ভেলে

এখন বাংলাদেশে কোন বুদ্ধিজীবী নেই যিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানেন। এখন বাংলাদেশের সংস্কৃতির কর্মীরা নিজেরাই দিকহারা। তারা একাত্তরে পাকিস্তানীদের হিন্দুদের বিরুদ্ধে বিশোদ্গারের থিওরিটাকে ধরতে পারেন, কিন্তু ২০১৩ তে এসে কট্টর ইসলামপন্থীদের প্রদত্ত নাস্তিক ট্যাগ এবং নাস্তিক প্রতিহিংসার মতলবটাকে ধরতে পারেন না। তাই দেখা যায় সাংস্কৃতিক কর্মীদের শহীদ মিনারের পবিত্র অঙ্গনে গিয়ে ব্লগার এবং অনলাইন এক্টিভিস্টদের নসিহত করতে, ধর্মের বিরুদ্ধে যেন কিছু না বলতে। আমি কিছুতেই ভেবে পাই না, সাংস্কৃতিক কর্মীরা কিভাবে প্রচলিত রাজনীতির দাসত্ব মেনে নেয়। তারা যদি তাদের বিবেককে মুক্ত না করে, তবে কিভাবে তারা শিল্পের সেবা করবে?  কিভাবে তাদের লব্ধ অনুসন্ধিৎসাকে তাদের শিল্পভাবনায় সম্পৃক্ত করবে? আর এ কারণেই দেখা যায় দেশের ব্লগার এবং বাউলদের প্রাণনাশ হলেও সংস্কৃতি কর্মীদের পর্যাপ্ত​ নীরবতা।​ বিচ্ছিন্নভাবে যা হয়, তাতে কোন বড় অর্জন সম্ভব নয়। এইখানে তাদের অন্য সাধারণের মতই নাস্তিক ব্লগারদের দোষের দিকে চোখ যায়। আমি অবাক হই, ধর্মের টোটা সাংস্কৃতিক কর্মীদের মানস জগতে বেশ ভালভাবে কাজ করে গেছে। তারাও ধর্ম সম্পর্কে  অনুসন্ধিৎসু না হওয়ায় তার উর্ধ্বে অবস্থান নিতে পারে নি। এটা একটা সংকট, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মীদের বড় একটা সংকট, যে সংকটে  তারা ’৭১-এ পড়েনি। আশির দশক থেকে নব্বইয়ে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে পড়ে নি। এর সাথে যোগ হয়েছে, ’৯০-এর তথাকথিত গণতন্ত্রে উত্তরণের পর রাজনৈতিক দলগুলোর দলদাস হয়ে পড়া।

আমি মগজ দিয়েই বিশ্বাস করি, ব্লগার এবং অনলাইন এক্টিভিস্টদের নেতৃত্বে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনটা শুরু না হলে কাদের মোল্লাসহ যুদ্ধাপরাধী বড় রুইকাতলাদের গলায় ফাঁসির দড়ি পরানো যেত না। যুদ্ধপরাধী শিবিরে আগুন ধরিয়ে দেবার কারণেই নাস্তিক ট্যাগ-টাতে  দাবানল বিরুদ্ধ পক্ষের দিকে ধেয়ে আসে। ফলশ্রুতিতে, আপামর সাংস্কৃতিক কর্মীরাও ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। একাত্তরে কিন্তু প্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল এই মৃত্যু এবং গণহত্যায়। স্বাধীন দেশেও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল সাংস্কৃতিক কর্মীরা জোট বেঁধে। তবে এখন নয় কেন?

একটু গভীরে চিন্তা করলে দেখা যায়, প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় যে সাংস্কৃতিক কর্মীরা সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় – গান, নাটক, আবৃত্তি, চলচ্চিত্র, কবিতায় – তারা ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর সচতুর চালটা বুঝে উঠতে পারে নি। তাদের উদ্দেশ্য এবং বিধেয় কি? যদিও বুঝে থাকে, বিশাল উন্মত্ত ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস করে নি। তবে এই অবস্থা কেন?

বিগত চার দশক ধরে সারা দেশ জুড়ে যে সংখ্যায় মাদ্রাসা সৃষ্টি হয়েছে, যার অর্থের উৎস ছিল মূলতঃ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশ, যারা ওহাবিজমের প্রচারকে উৎসাহিত করেছে, পাশাপাশি ওয়াজ মাহফিলের যে ব্যাপক প্রচার এবং প্রসার হয়েছে, সে তুলনায় সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চিন্তার বিস্তৃতি ঘটেনি, গভীরতা বাড়ে নি। ব্লগার এবং অনলাইন এক্টিভিস্টদের মধ্যে ধর্ম, সমাজ, দেশ নিয়ে যে বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা হয়েছে, মনে হচ্ছে, তার ছিটেফোঁটাও সাংস্কৃতিক কর্মীদের স্পর্শ করেনি। ব্লগাররা শুধু বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাই করেনি, প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মিথ্যা, অন্যায় এবং উম্মাদনার বিরুদ্ধে কলম চালিয়েছে। এজন্যই তারা এত সহজে শাহবাগ আন্দোলন গড়ে তুলতে পেরেছে। সেক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক কর্মীদের অবস্থান ছিল যথেষ্ট দূরত্বে।

বলা হচ্ছে, বাঙ্গালিরা ধর্ম ভীরু। এখানে বাংলাদেশের মুসলমান বাঙ্গালিদের কথাই বলা হচ্ছে। এই ধর্ম ভীরুতা যে একসময় কাল হয়ে দাঁড়াবে সেই অন্তর্দৃষ্টি জাতির মাঝে জাগেনি। কারণগুলো খুবই পরিষ্কার। অথচ এই জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে, বিশেষ করে একাত্তর, ভালভাবে বোঝা যায়, কট্টর ধর্মীয় হিংস্র উম্মত শক্তি  কিভাবে জাতিকে গ্রাস করতে চায়। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর কিভাবে এই ভয়াবহ দুষ্টচক্র সুশৃঙ্খল এক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছে, সেটা কমবেশি সবার জানা থাকলেও সে অনুযায়ী ধনাত্মক শক্তি নিজেদের গড়ে তুলতে পারে নি। না পারার কারণও ধর্ম। এটা এত শক্তভাবে আমাদের মনো এবং অবচেতন জগতে বিরাজিত যে, সাধারণ মানুষ এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের ধর্মকে সমালোচনার দৃষ্টিতে বিচার করার মত উর্ধ্বে অবস্থান সম্ভব নয়। মুষ্টিমেয় হাতেগোনাদের দ্বারাই তা সম্ভব। এই মুষ্টিমেয় হাতেগোনাদের বিপরীতে মসজিদ-মাদ্রাসা কেন্দ্রিক যে বিশাল ধার্মিক গোষ্ঠী আছে, তাদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক কর্মীদের পেরে উঠার কথা না। তাছাড়া অধিকাংশ সাংস্কৃতিক কর্মীদের ধর্মের উর্ধ্বে উঠা সম্ভব নয় বলে ধর্মের অমানবিক দিক বা কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করার নৈতিক কোন বল থাকে না।

অথচ বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই বা বিতর্কে ধর্মীয় মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীল ব্লগাররা কখনোই মানবিক চিন্তার ব্লগারদের সাথে পেরে উঠতে পারে নি। উপরন্তু বাংলা ব্লগে মানবিক এবং মুক্তমনা ব্লগারদের প্রাধান্য ও আধিপত্য এক চেটিয়া। সুতরাং এসব ব্লগারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের অনুসারীদের ক্ষোভ এবং প্রতিহিংসা যতটা না ধর্মীয়, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। এসব মানবিক ব্লগাররা সব ধরণের সংস্কারের বাইরে থেকে ধর্মকে মুক্তমনেই বিশ্লেষণ করেছেন, প্রশ্ন তুলেছেন, চ্যালেজ্ঞ ছুঁড়ে দিয়েছেন, এমন কি ধর্মের অমানবিক বিষয়গুলোকে ক্ষতবিক্ষত  করেছেন। অতএব, এই সুযোগটাই যুদ্ধাপরাধীদের অনুসারী হিংস্র ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি তুলে নিয়েছে। মানবিক এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার ব্লগারদের নাস্তিকতা বা নিরীশ্বরবাদীতাকে জনসম্মুখে হেয় করে, গুপ্ত হত্যা করে, দেশ জুড়ে কট্টর ইসলামী জঙ্গি শক্তি প্রাধান্য বিস্তার করে। পরাস্ত, বিধ্বস্ত হয়েছে, বাঙ্গালি, বাঙ্গালিত্ব। এই সংকটকালকে মোকাবেলা করার জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে সৃষ্ট হওয়া সাংস্কৃতিক দলগুলোর কোন জোরালো পরিকল্পনা ছিল না। আদৌ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে কী না, সে ভাবনাটা কতদূর ছিল, সেটা গবেষণার বিষয় হতে পারে।

বড় কথা হলো, ব্লগাররা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা এবং বাক-স্বাধীনতার যে আন্দোলনটা অনলাইনে শুরু করেছে, ধর্ম, সমাজ, ইতিহাস, সভ্যতা নিয়ে সে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সাংস্কৃতিক কর্মীদের পাওয়া গেল না। অথচ মুক্তিবুদ্ধির চর্চাটা এই সময়ের দাবী। তা না হওয়াতে যুক্তি ও বিজ্ঞানের বিপরীতে অন্ধ-উন্মাদনা দানা বেঁধেছে।  এটাই এই অঞ্চলের অগ্রগতির সংকট, সভ্যতার ভয়াবহ সংকট। এই সংকট অব্যাহত থাকলে আপামর শিল্পী-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মীদের তাবৎ কর্মকান্ড ধীরে ধীরে অনিরাপদ হয়ে উঠবে। এই অচলাতন ভাঙার মত সাহস, শক্তি এবং সংগঠনের প্রয়োজন।

ইউরোপও একসময় এই ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, নিদেনপক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনায়। ধর্মের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের এখনো সম্বিত ফিরেনি। সাংস্কৃতিক কর্মীরা এখনো বুঝে উঠতে পেরেছে কী না, এটাও তাদের নৈতিক দায়িত্বের মাঝেই পড়ে। এটা নতুন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পূর্ব শর্ত। কাজটা দুরূহ এবং মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। আরজ আলী মাতুব্বর কিন্তু এই গ্রামে থেকেই নিজের জ্ঞানের পরিধি যেমন বিস্তৃত করেছেন, তেমনি ধর্মসহ তাবৎ কিছুকে প্রশ্ন করে গিয়েছেন, যুক্তির প্রয়োজনীয়তাকে উপলব্ধি করেছেন। বই লিখেছেন। দেশের সর্বত্র এবং আনাচে-কানাচে যেসব সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে, তারা সমস্যা বা সঙ্কট মোকাবেলায় সেরূপ ধীশক্তির পরিচয় দেবেন।

যুদ্ধাপরাধীদের অনুসারীরা নেপথ্যে ভীষণ সক্রিয় ও সুশৃঙ্খল।  তারা তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আর মাদ্রাসাকেন্দ্রিক মোল্লা শ্রেণী রাস্তায় নেমে তাদের উন্মত্ত শক্তি প্রদর্শন করছে। এক আশংকাজনক চাপের মুখে আছে বাংলাদেশের সরকার এবং তার জনগণ। ফলাফল কি সেটা ভবিষ্যতই জানে। তবে মোল্লাতন্ত্রের বর্তমান আচরণ যে নৈরাজ্যকর তা সরকারের মৌনতায় প্রমাণিত।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

75 + = 82