৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে

আমাদের ক্লাসের ইসমাইল নামের ছেলেটি আমাকে প্রায় সময়ই বাহবা দেয়। আমি যখনই শিক্ষক ও সকলের উদ্দেশ্যে বলি, ইউরোপে ডানপন্থীদের উত্থানে মুসলিমদের ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়- যা গণতন্ত্র ও মানবাধিকার এবং ইউরোপের সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক – তখনই ইসমাইল আমার দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে ইশারায় জানায় যে, আমি যা বলছি তা সম্পূর্ণ সঠিক।
আমি যখনই বলি, ইন্ডিয়াতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা মুসলিমেরা প্রায় সময়ই আক্রান্তের শিকার ও মিয়ানমারের বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের দ্বারা রোহিঙ্গারা নির্যাতিত, চীনের উইঘুর মুসলিমদের সাথে যা ঘটে চলছে তা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে, একইসাথে একাধিক কনভেনশন বা ট্রিটিবিরুদ্ধ; হীনা নামের মেয়েটি আমাকে এসে বলে ‘তুমি আমাদের পক্ষের মানুষ’!
আমি খুব অবাক হই তাদের কথাবার্তা শুনে; আমি তাদের বলি, আমি তোমাদের বা কারো পক্ষের মানুষ নই; আমি শুধুমাত্র নির্যাতিত ও নিপীড়িত এবং অবহেলিত মানুষের পক্ষে।
তারা আমাকে বাহবা দেয়। আর বলে, প্রতিটি মানুষ যদি তোমার মতো করে চিন্তা করতো তাহলে কতোই না শান্তি বিরাজ করতো! তাদের কথা শুনে আমার ভালো লাগে, যদিও আমি জানি যে, তাদের চিন্তাধারা আমার মন-মানসিকতার সাথে একদমই যায় না।
আমি যখন বলি, সৌদি মুসলমানেরা যেভাবে ইয়েমেনের মুসলমানদের হত্যা করছে তা মেনে নেওয়া যায় না। অথচ মুসলিমবিশ্ব এই বিষয়ে নীরব। আমি তাদের দুজনের দিকে লক্ষ্য করি; এবং উপলব্ধি করতে পারি যে, তাদের এই বিষয়ে অন্য সকল মুসলিমদের মতো তীব্র প্রতিবাদ নেই।
আমি যখন বলি, আমার দেশের উগ্রবাদী মুসলমানেরা লেখার কারণে নাস্তিক লেখকদের হত্যা করে, সমকামীদের জবাই করে, হিন্দুদের নির্যাতনের ঘটনা ও সংখ্যা অকল্পনীয়, পোশাকের অজুহাতে ধর্ষণ বৈধ ঘোষণা করে কোটি মানুষ, ধর্ম অবমাননার মিথ্যে নাটক সাজিয়ে আগুনে পুড়ে মারে মুসলমানেরা, আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে মাদ্রাসা থেকে শুরু করে মসজিদের ইমাম ধর্ষণ ও বলৎকার করে বাঙলাদেশ, পাকিস্তান, সিরিয়া, তুরস্ক, আফগানিস্তানসহ অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে, আজারবাইজানে সমকামী ও ট্রান্সজেন্ডারের উপর নির্যাতন করা হয়, তাজিকিস্তানের দক্ষিণপ্রান্তে রাস্তা থেকে নারীদের তুলে নিয়ে যায় মুসলমানেরা, মিশর তো লেখক ও নারীবাদীদের জন্য ভয়ংকর স্থান- তুরস্ক ও সিরিয়াতে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গি ও উগ্রবাদীতে প্রশিক্ষণের প্রমাণ আছে ইত্যাদি- আমি লক্ষ্য করি সেই দুজনের অঙ্গভঙ্গি খুবই বিব্রতকর; কোন প্রতিবাদ নেই।
আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, আজকের আলোচনা তোমাদের কেমন লেগেছে?
তারা ভদ্রতার খাতিরে মিষ্টি হাসি গিয়ে বলে, আমরা তো ভেবেছিলাম তুমি আমাদের পক্ষের, অথচ তুমি মুসলিমদের যেভাবে আক্রমণ করেছ তাতে ব্যথিত হয়েছি।
আমি তাদের জিজ্ঞেস করি, আমি কি কোন মিথ্যে বা ভুল তথ্য উপস্থাপন করেছি?
তারা কিছু বলে না। তারা জানে যে, আমি যা বলেছি তা মিথ্যে বা ভুল নয় কিন্তু তা স্বীকার করতেও পারবে না। কোন এক অদৃশ্যভীতি তাদের মধ্যে বিরাজমান।
আমাদের দেশে প্রায় সময়ই শোনা যায়, ৯০ শতাংশ মুসলমানের দেশে নাস্তিক থাকতে পারবে না, ৯০ শতাংশ মুসলমানদের দেশে সমকামী বাঁচতে পারবে না, ৯০ শতাংশ মুসলমানদের দেশে মূর্তি থাকতে পারবে না, ৯০ শতাংশ মুসলমানদের দেশে ভাস্কর্য থাকতে পারবে না, ৯০ শতাংশ মুসলমানদের দেশে মুসলমানদের দেওয়া নিয়মনীতি ব্যতীত হিন্দু ও বৌদ্ধরা থাকতে পারবে না, ৯০ শতাংশ মুসলমানদের দেশে ওয়েস্টার্ন পোশাকধারী থাকতে পারবে না আরও কতো কী!
কিন্তু কেনো থাকতে পারবে না? মুসলমানেরা কি সাম্প্রদায়িক? মুসলমানেরা কি জঙ্গি? মুসলমানেরা কি সন্ত্রাসী? মুসলমানেরা কি ধ্বংসাত্মক? মুসলমানেরা কি হিংসাত্মক? মুসলমানেরা কি অসহিষ্ণু? তাহলে শান্তিবাদী দাবী করে কীভাবে?
উপরের উল্লেখিত কথাগুলো মুসলমানেরা বললে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় না! কাউকে অপমান করা হয় না। সাম্প্রদায়িকতা থাকে না।
কিন্তু, একই কথাগুলো উলটো করে যদি বলা হয় ’৯০ শতাংশ খ্রিস্টান বা হিন্দু বা বৌদ্ধ বা নাস্তিক সংখ্যাগরিষ্ঠের দেশে মুসলমান থাকতে পারবে না‘, তখনও কি মুসলমানের একমত হবে?
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 5 =