বাংলাদেশে কি ইসলামিক স্টেট কায়েম হয়ে গেছে? না হবে?

ছোট বেলায় গাছ থেকে পুকুরে ঝাঁপ দিছেন যারা তারা জানেন, হাত ছেড়ে দেয়ার পরে ঝাঁপ না দেয়ার কোনো অপশন থাকে না। ইংরেজিতে বলে পয়েন্ট অব নে রিটার্ন। মানে যে বিন্দু পার হলে আর পেছনে ফেরা যায় না। বাংলাদেশের মানুষের ধর্মান্ধত্ব এবং সাম্প্রদায়িক চরিত্র যে জঘণ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে ইসলাম শাসিত দেশে বাস করতে এখন আর কাবুল, ইসলামাবাদ, মুসুল বা মক্কায় যাবার দরকার নেই। ঢাকা সিলেট বা দেশের যে কোনো জায়গা, মানে পুরো দেশটা এখন ইসলামিক স্টেট। উগ্রবাদীরা জয়ী হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলাম কায়েম হয়ে গেছে।

সেখান থেকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে আর ফেরা সম্ভব? আমার মতে বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িকতার টিপিং পয়েন্ট পার করেছে। সামান্য দুই একটা উদাহরণ দিই: সুপ্রিম কোর্ট থেকে ভাস্কর্য সরাতে হলো, বিমানবন্দর থেকে লালনের ভাস্কর্য ভাঙা হলো, পুলিশ, আদালত কি সঠিক বিচার করতে পেরেছে? বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তৈরির বিরোধীতা করার উন্মাদটা আজও উত্তুরে বাতাস গায়ে লাগিয়ে বেড়াচ্ছে। সাকিব পূজা মণ্ডপে যাওয়ায় তাকে কো

চোখের সামনে সমস্ত উন্নয়ন সাম্প্রদায়িকতার জোয়ারে ভেসে গেলো

পানোর হুমকি দেয়ায়, ভয়ে সে মাফ চেয়ে কুল পাচ্ছে না। প্রতিদিন হিন্দু বৌদ্ধদের বাড়ি পোড়ানো হচ্ছে, পুজামন্ডপ ভাঙা হচ্ছে। ধর্ম অবমাননার ধুয়ো তুলে মানুষ পোড়ানো হচ্ছে। এর কোনো একটিমাত্র ঘটনার সুষ্টু বিচার আমাদের আদালত করতে পেরেছে? এসব অপরাধের বিচার করার সক্ষমতা সরকারের নেই তা না। সাহসও নেই। কারণ প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে আমলা, পুলিশ, উকিল, সবাই তাঁদের কর্মে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

ফলে বাংলাদেশ উন্মাদদের দখলে চলে গেছে। শেখা হাসিনার সরকার আজ আর এই উন্মাদদের হুঙ্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল আওয়ামিলীগের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক কারো দ্বারাই স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয় যে বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ এবং এই দেশে মূর্তি, মসজিদ, মন্দির সব থাকবে। এই দেশে একজন মুসলিমের যেমন ইসলামের দাওয়াত দেয়ার অধিকার আছে, একজন নাস্তিকেরও মানুষকে কাল্পনিক চরিত্রের উপর বিশ্বাসের ঘোর থেকে বের হবার আহ্বান করার সমান অধিকার আছে। এই অধিকার সাংবিধানিক অধিকার। একজন মুসলিমেরও যেমন ধর্মানুভূতি আছে, একজন বৌদ্ধেরও আছে। সবাই সবার অনুভূতিকে সম্মান করে নিজের মত প্রচার করবে। সরকার কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়কে প্রমোট করবে না, কিন্তু প্রত্যেককে প্রটেক্ট করবে। অসাম্প্রদায়িক একটা দেশের সরকারের এটিই একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব।

আওয়ামিলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকতে জেনুইন আওয়ামিলীগ বা অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষের উপর নির্ভর না করে, ধর্মীয় উন্মাদদের কাধে হাত রেখে ভুল করেছে। আওয়ামিলীগ ৯০ এর দশক থেকে ধরেই নিছে শুধু প্রগতিশীলরা তাঁদেরকে ক্ষমতায় বসাতে পারবে না। তাই ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি আওয়ামিলীগকে করতেই হবে। সেই থেকে এক সাপের ছোবল এড়াতে আরেক সাপের ঘাড়ে পা দিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে চলেছে আওয়ামিলীগ। আওয়ামিলীগ প্রগতিশীলদের চয়েস বা অপশন সম্পর্কে সম্পূর্ণ জানে। তাঁরা জানে প্রগতিশীলদের যতই দূরদূর করা হোক না কেন, ওরা আওয়ামিলীগকে ত্যাগ করে নতুন কিছু করতে পারবে না। এই স্ট্রাটেজির উপর ভর করেই আওয়ামিলীগ বারবার ক্ষমতায় এসেছে এবং উগ্রবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও (আইন, জনপ্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদি) আর অসাম্প্রদায়িক চেতনাবান্ধব হয়ে ওঠার সুযোগ পায়নি।

জরুরী ভিত্তিতে দেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র পুনর্গঠনের জন্য নানান টাস্কফোর্স গঠন করে কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না। একাবিংশ শতাব্দীর উপযোগী মানুষ বা সমাজ তৈরির জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কোনো চেষ্টা আজ পর্যন্ত সফল হয়েছে? আমাদের বর্তমান আইন প্রনয়ন এবং প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আসাম্প্রদায়িক চেতনা চর্চাকারীকে সুরক্ষা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়নি? বাংলাদেশকে ইসলামিক স্টেট হতে হলে আর কি কি ব্যর্থতা অর্জন করতে হবে? আওয়ামিলীগের চোখের সামনে, আওয়ামিলীগের পরিশ্রমে গড়া, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার জোয়ার এসে সমস্ত উন্নয়নকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

38 − = 37