“ট্রান্সজেন্ডার মানে হিজড়া নয়” জানেন কি?

হয়তো অনেকেই Transgender Awareness Week লেখা একটা ফেসবুক প্রোফাইল পিকে ফ্রেম দেয়া ছবি দেখতে পাচ্ছেন। আমি ভাবলাম ছবি ফ্রেম এড করে কি লাভ, তথ্যটা মানুষ কই পাবে, তাই নিজের স্বল্পজ্ঞান একটু শেয়ার করার দুঃসাহস দেখাচ্ছি। চলেন একটু ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে ভাবি। আচ্ছা খুউব বেসিক কথা বার্তা লিখার চেষ্টা করি, যদি আমার তথ্যে কোনো ভুল থাকে বিজ্ঞজনরা প্লিজ শুধরে দিবেন।

রাস্তাঘাটে পুরুষের মতো গলার স্বরের, নারীর মতো সাজগোজ করে, আপনারা তালি বাজিয়ে যাদের টাকা তুলতে দেখেন তারা কিন্তু সবাই ট্রান্সজেন্ডার নয়। এদেরকে আমরা মূলত হিজড়া বলেই জানি। ইংরেজি ট্রান্সজেন্ডার শব্দটার বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে আমরা বুঝি “হিজড়া”, যা খুউবই ভুল তথ্য। আমাদের এই ভুল জানার পরিধি এতোই ব্যাপক যে, গুগল ট্রান্সলেটরে ইংলিশে ট্রান্সজেন্ডার শব্দটা লিখলে বাংলা অনুবাদ দেখায় হিজড়া।

হিজড়া কি?
হিজড়া হচ্ছে এই দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলোর মধ্যে বিদ্যমান একটা সংস্কৃতি বা সমাজব্যবস্থা। গুরু-শিশ্য পরম্পরার এই সমাজব্যবস্থাটি গড়ে ওঠেছে হাজার বছর আগে থেকেই। রাস্তায় তালি দিয়ে টাকা তোলাকে হিজড়ারা “ছল্লা” পেশা হিসেবে সম্বোধন করে থাকে। বাংলাদেশে সাপের খেলা দেখানোর মাধ্যমে উপার্যন করে এমন একটা সম্প্রদায় আছে, যাদের আমরা বেদে সম্প্রদায় বলে জানি, হিজড়াও তেমন একটা সম্প্রদায়। হিজড়া সম্প্রদায়ের মাঝে ট্রান্সজেন্ডার মানুষের উপস্থিতি আধিক্যের কারনে আমরা একটা সংস্কৃতিকে/সমাজ ব্যবস্থাকে একটা “লিঙ্গ পরচিয়” বলে ভুল করছি। যদি বলা হয় বাঙ্গালী আপনার লিঙ্গ কিংবা বেদে কোনো লিঙ্গ সেটা যেমন হাস্যকর শোনাবে, তেমনি হিজড়াকে লিঙ্গ পরিচয় বলাটাও সমান ভাবে হাস্যকর। এই ভুলটি আমাদের সরকারের তরফ থেকেও করা হয়েছে। ২০১৩ সালে সরকার এই সম্প্রদায়ের পরিচয় দিতে গিয়ে তাদের “হিজড়া লিঙ্গ” সম্বোধন করে ফেলেছে। এটা সব সময় মাথায় রাখবেন ট্রান্সজেন্ডার মানেই হিজড়া নয়। হিজড়া হতে গেলে, ওই সম্প্রদায়ের মাঝে বিদ্যামন প্রচলিত রীতি-রেওয়াজ পালন করে তবেই হিজড়া হওয়া যায়।

তাহলে ট্রান্সজেন্ডার কারা?
যদি খুউব সিম্পল ভাবে বলি যে “ট্রান্সজেন্ডার হচ্ছে তারা, যারা জন্মেরপর ডাক্তারের/ দাইমা-এর বলে দেয়া লিঙ্গপরিচয় থেকে নিজেকে অন্য লিঙ্গ হিসেবে পরিচিত করে” – তবে, এই সংজ্ঞটি পুরোপুরি সঠিক সংজ্ঞা হবে না।

“জেন্ডার ডিস্ফোরিয়া” ব্যাপক অর্থের একটা টার্ম, এটা কেবল মাত্র সহজ শব্দ ও বাক্যদ্বারা বুঝতে গেলে ভুল হবার সম্ভবনা থাকে। এটা আমাদের স্বরণ রাখা উচিত, আমাদের সমাজের প্রচলিত দুটি বাইনারি [নারী ও পুরুষ]-এর বাইরে যত লিঙ্গ ও যৌন পরিচয় আছে, প্রত্যেকটি পরিচয় ও তার টার্মিনোলোজির পিছনে একটি রাজনীতি কাজ করে। তাই কেবলমাত্র টার্মিনোলোজি দিয়ে কারো লিঙ্গ বা যৌন পরিচয়কে প্রকাশ করার আগে, সেই টার্মিনোলোজির পিছনের রাজনীতিকেও উপলব্ধি করা প্রয়োজন। যাইহোক এটা একটা আলাদা আলোচনা হতে পারে। আমি শুধু সহজ করে বোঝার জন্য দুই ধরনের ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে তথ্য শেয়ার করতে চেষ্টা করতে পারি।

  • ক. ট্রান্সম্যান
    ট্রান্সম্যান বলতে বাংলাদেশে বর্তমানে তাদেরকেই বোঝানো হচ্ছে, যারা বায়োলজিক্যালী পুরুষ নয়, কিন্তু নিজেকে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করেন, এবং নিজেকে পুরুষ বলতে, ভাবতেই পছন্দ করেন। এখানে আমাদের মনে রাখা উচিত আমি লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে কথা বলছি, সেক্সের সময়ে রোল নয়, তাই ট্রান্সম্যান মাত্রই “টপ”-ই হবে এমন বদ্ধমূল ধারণাটা সঠিক নয়। আবার একজন ট্রান্সম্যান আইডেন্টিফাইড মানুষ, সব সময়ই পুরুষের মতো পোষাক পরবে বলে অনেকের মধ্যে একটা ধারনা কাজ করে সেটাও ঠিক নয়। একজন ট্রান্সম্যান চাইলে ১২ হাত লম্বা শাড়ী পরে, তারউপর একটা ওড়না দিয়ে ঘোমটাও দিতে পারেন, কারন পোষাকের সাথে লিঙ্গ পরিচয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। তাছাড়াও কারো মাথার চুল ছোট থাকলে, কারো মধ্যে ম্যানলী আচরণের উপস্থিতি বেশি লক্ষ্য করলে সে ট্রান্সম্যান হবে এটাও ভুল ধারনা। আর সবচাইতে বড় কথা, কেউ যদি অস্ত্রপচারের মাধ্যমে নিজের শরীরিক পরিবর্তন নাও করে, তাও যেই মুহুর্ত্ব থেকে বায়োলজিক্যালী একজন নারী নিজেকে পুরুষ হিসেবে পরিচয় দিবেন, সেই মুহুর্ত্ব থেকেই তাকে ট্রান্সম্যান বলা হবে।
  • খ. ট্রান্সওম্যান:
    উপরে ট্রান্সম্যান বলতে যা যা লিখলাম, সেখানে ট্রান্সম্যানের জায়গায় ট্রান্সওমেন শব্দটা প্রতিস্থাপন করুন, এবং বায়োলজিক্যালী নারী শব্দের জায়গায় পুরুষ শব্দকে প্রতিস্থাপণ করুন তবে ট্রান্সওম্যান সম্পর্কেও ধারনা পাবেন। এখানেও একটু যোগ করি, কারো গাল ভর্তি দাড়ি থাকলে, কেউ ছেলেদের মতো পোষাক পরলেও, যদি সে নিজেকে নারী হিসেবে চিহ্নিত করে তবে তাকে ট্রান্সওম্যানই বলতে হবে। এবং এটাও আমরা যেন মাথায় রাখি ট্রান্সওম্যান একটা লিঙ্গ পরিচয়, কারনো যৌন আচরণ বা রোল নয়।

ইন্টারসেক্স/আন্তঃলিঙ্গ/ভাবরাজ
এখানে প্রসঙ্গত না বললেই নয়। বাংলাদেশ সরকার ও দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠী হিজড়া বলতে আসলে ইন্টারসেক্স মানুষজনকে বোঝায়, যাদের বাংলায় আন্তঃলিঙ্গ ও হিজড়াদের ব্যবহৃত “উল্টি” ভাষায় “ভাবরাজ” বলে সম্বোধন করা হয়। ইন্টার কোনো ট্রান্সজেন্ডার নয়, এটি বায়োলজিক্যালী একজন মানুষ জন্মসূত্রেই ধারণ করে। এবং সকল হিজড়াই ইন্টারসেক্স নয়। তবে হিজড়াদের মাঝে কোনো ইন্টারসেক্স নেই এই তথ্যটি অনেক এক্টিভিস্টকে প্রচার করতে দেখেছি, এটিও সম্পূর্ন ভুল তথ্য, নিজে ফিল্ড লিভেলে কাজ করতে গিয়ে দেখছি হিজড়াদের মাঝেও ইন্টারসেক্স মানুষ আছেন।

ট্রান্সজেন্ডার সচেতনতা সপ্তাহ

প্রতিবছর নভেম্বর মাসের ১৩ থেকে ১৭ তারিখ পর্যন্ত ট্রান্সজেন্ডার সচেতনতা সপ্তাহ পালন করা হয়। এই সপ্তাহে, প্রতিবছর ট্রান্সজেন্ডাররা তাদের অভিজ্ঞতা, বৈষম্য, নির্যাতনের প্রতিচ্ছবি গুলো সমাজের সামনে তুলে ধরেন। এটি মূলত শুরু হয়েছে ট্রান্সজেন্ডার ডে অফ রিমেম্বারেন্স থেকে। গোয়েন্ডোলিন আন স্মিথ নামক একজন ট্রান্সজেন্ডারের মাধ্যমে, তিনি এই দিনটি পালন করা শুরু করেছিলেন রিতা হেস্টার নামক ট্রান্সজেন্ডারের প্রতি সম্মান জানানোর জন্য। রিতা হেস্টার নামক এই ট্রান্সজেন্ডারকে ১৯৯৮ সালে হত্যা করা হয়। দিনটি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে এই লিঙ্কে ভিজিট করতে পারেন।

 

নোট: কিছু শব্দকে/টার্মকে আমি পাঠকের বোঝার সুবির্ধাতে অবিকৃত রেখেই ব্যবহার করেছি, সেই শব্দ/টার্মগুলোর সাথে আরো ব্যাপক অর্থজড়িত রয়েছে এবং সেই অর্থ গুলোর প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 − 8 =