দানবের পুনঃজন্ম

যে খবরটিতে দেশের সাধারণ জনগণ তথা গোটা ভারতবর্ষ স্তম্ভিত, বিস্মিত, শঙ্কিত ও তটস্থ হইয়াছে তা হল- ‘বামশাসিত কেরলা সরকার একটি নতুন অর্ডিন্যান্স আনিয়াছে, বলাইবাহুল্য এই অর্ডিন্যান্সে কেরলার রাজ্যপাল আরিফ মহম্মদ খান ও স্বাক্ষর করিয়াছেন। উক্ত আইন অনুসারে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপত্তিকর পোস্ট করিলে 5 বছর পর্যন্ত জেল ও 10 হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হইতে পারে বা উভয় শাস্তিই হইতে পারে!’ বিরোধী দল ও বিশেষজ্ঞদের অনুমান উক্ত আইন দ্বারা যে কোন বিরোধী কন্ঠস্বর ও যৌক্তিক সমালোচনাকে কন্ঠরোধ করা সম্ভব!

এখন প্রশ্ন হল কেরালা সরকার এই আইনটি প্রণয়ন করিল কেন? কিছু দিন আগে কেরালা হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিদ্বেষমূলক পোস্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলিয়াছিল। অতঃপর সরকার এই আইনটি প্রণয়ন করিয়াছেন। এই আইনে কেরালা পুলিশকে 118 A দ্বারা অধিক ক্ষমতা প্রদান করা হইয়াছে। এই আইন অনুসারে কেরলা পুলিশ, সোশ্যাল মিডিয়ায় যেকোন আপত্তিকর পোস্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে এবং সেই পোস্ট শেয়ার করিলে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হইতে পারে, সেইসঙ্গে বিদ্বেষমূলক ও অন্যের মানহানিকর পোস্টের বিরুদ্ধে ও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য এই আইনের ফলে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের ও একটি সম্ভবনা রইয়াছে।

এখন প্রশ্ন হল আপত্তিকর পোস্ট, বিদ্বেষমূলক বা মানহানিকর পোস্ট বলতে কি বোঝায়? উল্লেখ্য উক্ত বিষয়গুলি শাসকের দৃষ্টিভঙ্গীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত! এখন কোন ধর্মান্ধ ব্যাক্তি যদি তাঁর ধর্মের যৌক্তিক সমালোচনা দেখে তখন সেটি তাঁর কাছে আপত্তিকর বা বিদ্বেষমূলক পোস্ট মনে হইতে পারে। অন্যদিকে কোন সরকারের নীতির যৌক্তিক সমালোচনা করিলে তাহা ও শাসকের চোখে আপত্তিকর বা মানহানিকর পোস্ট বলে মনে হইতে পারে, এখন এগুলির ভিত্তিতে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ কতটা যৌক্তিক? এখন প্রশ্ন হল কোন পোস্ট বা লেখালেখির জন্য হাজতবাস এটি কি ভারতীয় সংবিধানের 19 (1) নম্বর ধারার ‘মত প্রকাশের অধিকারকে’ বিঘ্নিত করছে না? এটি কি বর্বর সমাজব্যবস্থার নিদর্শন নয়? স্মরণে রাখা প্রয়োজন এমনি একটি আইন 66A ধারা প্রয়োগ করিয়া রাজ্য সরকার মুখ্যমন্ত্রীর (মমতা ব্যানার্জি) সমালোচনা কারি একটি কার্টুন পোস্ট করার অপরাধে অম্বিকেশ মহাপাত্র মহাশয়কে গ্রেফতার করিয়াছিল। তাই সরকার দ্বারা সোশ্যাল মিডিয়া সংক্রান্ত আইনের দুঃপ্রয়োগ হবে না এর কি কোন গ্যারান্টি রহিয়াছে?

এমন আইনের ফলশ্রুতি কি হইতে পারে সে বিষয়ে প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে বিশেষ শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন রহিয়াছে! প্রতিবেশি দেশ বাংলাদেশে 57 ধারা নামে এক কালা আইন বিদ্যমান, এই আইনবলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করিবার নিমিত্তে সরকার পোস্টকারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা লইতে পারে। বলাইবাহুল্য এই কালা আইনের বলি হইতেছেন সমাজের প্রগতিশীল মানুষেরা! ধর্মানুভূতিতে আঘাত ও সরকারের সমালোচনা করার অভিযোগে বহু প্রগতিশীল মানুষ সেদেশে জেলবন্দি অন্যদিকে ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী শক্তিরা অবাধে তাঁদের মতাদর্শের প্রচার করিয়া চালিতেছে! এর ফলশ্রুতি হিসাবে বাংলাদেশ বর্তমানে ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির এক মুক্তাঞ্চলে পরিণত হইয়াছেে, পাকিস্তানের অবস্থা আরও ভীতিপ্রদ! তাই কেরালা সরকারের কাছে প্রশ্ন রইল ভারতকে ও কি একইরকম ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক শক্তির মুক্তাঞ্চলে পরিণত করা যথার্থ? তাই এমন যেকোন কালা আইনের বিরুদ্ধে সমাজের প্রগতিশীল মানুষদের বিনাবাক্যে প্রতিবাদ সংগঠিত করা উচিত!

কেরালা ভারতবর্ষের সর্বাপেক্ষা উন্নত রাজ্যগুলির অন্যতম, সেইসঙ্গে গ্রগতিশীল বাম সরকারের এমন দানবীয় আইন প্রণয়ন সত্যিই নিন্দাজনক! বলাইবাহুল্য এই আইনটি পূর্বের কালাকানুন 66A এর পুনঃজন্মের সমতুল্য, উল্লেখ্য এই আইনটি সুপ্রিমকোর্টের রায়ে অসাংবিধানিক ঘোষিত হইয়াছে। তাই নতুন এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করা খুবই জরুরি। তবে আশার কথা হল বিরোধীদল কংগ্রেস ও বিজেপি দ্ব্যর্থহীন ভাবে এই আইনের বিরোধীতা করিয়াছে, বাম শরিক সিপিআই ও এই আইনের বিরোধীতা করিয়াছে, বামেদের একাংশ ও এই আইনের সমালোচনা করিয়াছে। বিজেপির এক নেতা এরই মধ্যে ব্যাক্তিগতভাবে এই আইনকে হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করিয়াছে। দেশের সমস্ত বড় বড় সংবাদ মাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করিয়াছে। তাই পরিস্থিতির চাপে পড়িয়া কেরলা সরকার আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে নতুন করিয়া চিন্তা করতে বাধ্য হইয়াছেন যা অবশ্যই শুভ সংবাদ!

যদিও কেরলার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন বলিয়াছেন ‘মতপ্রকাশের অধিকার ও ব্যাক্তি স্বাধীনতা রক্ষা করিতেই এই আইনের সংশোধন, তিনি এটাও বলিয়াছেন এই নতুন আইনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হইবে না’। বলাইবাহুল্য শাসক এমন দাবি করলে ও ইতিহাস সাক্ষী এমন কালা আইনের অপপ্রয়োগ হবে না এর নিশ্চয়তা রয়েছে কি? ইতিহাস সাক্ষী এমন কালা আইনের পরিণতি গণতন্ত্র ও সমাজব্যবস্থার পক্ষে অমঙ্গলকর!

একদিকে বাম রাজনীতির এই যদি প্রকাশভঙ্গি হয় অন্যদিকে বিজেপির মতো ডানপন্থী দল ‘লাভ জেহাদের’ নামে যেরকম কালা আইন প্রণয়নের চেষ্টা করিতেছে উভয়ই সমাজের পক্ষে অমঙ্গলকর! তাহলে প্রশ্ন হল জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষা দমন পীড়নে ডান বা বাম রাজনীতির পার্থক্য কোথায়? ডান বাম নির্বিশেষে শাসকের কি এটাই চরিত্র প্রশ্নাতীত আনুগত্য?

তাই সাধারণ মানুষের উচিত যে কোন শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করা ও সত্যের পথে এগিয়ে চলা! পরিশেষে এটাই বলিতে পারি দেশের বিচার ব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল! ভারতের ইতিহাস সাক্ষী এমন বহু কালা আইন ভারতীয় বিচার ব্যবস্থা ও গণতন্ত্র নিক্ষিপ্ত করিয়াছে, আশাবাদী ভারতীয় গণতন্ত্র ও এর ঠিকই বিচার করিবে এবং জন গণ মনের শাসন প্রতিষ্ঠা হইবে!

তথ্যসূত্র:-

1) The Hindu.

https://www.thehindu.com/news/national/kerala/uproar-over-kerala-law-to-curb-abusive-content/article33155905.ece

2) The Times of India.

https://timesofindia.indiatimes.com/blogs/toi-editorials/66as-rebirth-a-kerala-law-presaging-the-same-chilling-effect-takes-the-ordinance-route/

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 − = 9