প্রকাশ্যে নারীধূমপান যখন নারীমুক্তির প্রতীক

“আপনার কাজটি করা উচিত হয়নি“ এক নারীর উদ্দেশ্যে বললেন এক পুলিশ এবং পরক্ষণেই কাটি মুলকাহে নামের সেই নারীকে গ্রেফতার করলেন। ঘটনাটি ঘটেছিল আমেরিকার নিউ ইয়র্ক শহরে ১৯০৮ সালের ২২শে জানুয়ারি। কাটি‘র অপরাধ? সে প্রকাশ্যে ধূমপান করেছিল! তার ঠিক একদিন আগে নিউইয়র্ক সিটি একটি অধ্যাদেশ পাস করেছিল যা প্রকাশ্যে নারীদের ধূমপান নিষিদ্ধ করেছিল।এবং পুরুষরা দিব্যি যেকোন জায়গায়, যেকোন সময়ে  ধূমপান করতে পারতো।

বিশ শতকের শুরুতে ইউরোপ কিংবা আমেরিকাতে নারীধুমপান ছিল সামাজিক ট্যাবু, যেমনটা এখন বাংলাদেশে। নারীরা ধূমপান করলে তাদেরকে দেখা হতো, ‘বেশ্যা’, ‘খারাপ মেয়েমানুষ’ হিসেবে। সেই সামাজিক ট্যাবুকে ভাঙতে প্রকাশ্যে নারীধুমপান হয়ে উঠেছিল নারীমুক্তির এক প্রতীক।

ধূমপান নারী-পুরুষ-তৃতীয় লিঙ্গনির্বিশেষে সবার জন্য ক্ষতিকারক। কিন্তু এক নির্দিষ্ট লিঙ্গের ধূমপান  যদি পরিবেশ নষ্ট করে, ধূমপায়ীর চরিত্র বিশ্লেষণ করে, তা শুধুমাত্র  ক্ষতিকারক তামাক কিংবা নিকোটিনের বিষয় না, সেটা তখন লিঙ্গভিত্তিক রাজনীতির মাঠ হয়ে ওঠে। 

নারী ধূমপায়ীদের আরো বেশি দৃশ্যমানতা বাড়াতে হবে। আর তাতেই ভাঙবে এই ট্যাবু। এই ক্ষেত্রে তাই প্রকাশ্যে নারীধূমপানই হয়ে উঠবে নারীমুক্তির প্রতীক।

১৯২৯ সালে আমেরিকান এক সিগারেট কোম্পানির এক বিতর্কিত মার্কেটিং কিংবা ক্যাম্পেইনঃ ‘Torches of Freedom’ অর্থাৎ ‘স্বাধীনতার মশাল’  নারী ধূমপায়ীদের সামাজিক বৈধতা এবং সামধিকার এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এডওয়ার্ড বার্নয়েস ছিলেন সেই কোম্পানির পাবলিক রিলেশন বিভাগের দায়িত্বে। তিনি আয়োজন করেন, ‘নিউ ইয়র্ক ইস্টার প্যারেড মার্চ ১৯২৯’। সেই মার্চে নারীরা দলবধ্য হয়ে  প্রকাশ্যে ধূমপান করেছেল।

সিগারেট কোম্পানির ক্যাম্পেইনঃ ‘স্বাধীনতার মশাল’

নারীমুক্তি নয়, বরং এখানে নারীধূমপানকে বুর্জোয়াদের স্বার্থে মার্কেটিং টুল হিসেবে ব্যবহার  করা হয়েছে। কিন্তু সামাজিক রীতিনীতিগুলোকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য প্রকাশ্যে ধূমপান হয়ে উঠেছিল একটি শক্তিশালী মাধ্যম । সেই লড়াইয়ে  Torches of Freedom এর ভূমিকা ছিল। 

নিউ ইয়র্ক ইস্টার প্যারেড মার্চ ১৯২৯’- নারীরা প্রকাশ্যে ধূমপান করছে

এছাড়াও প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে  নারীরা প্রচলিত “পুরুষ” পেশা গ্রহণ করে। তারা ট্রাউজার, প্যান্ট পরতে শুরু করে, বাইরে খেলাধুলা করা, চুল ছোট করে কাটে এবং ধূমপান শুরু করেছিলেন। আর পুরুষরা গিয়েছিল যুদ্ধে। নারীর আচরণ সম্পর্কে ঐতিহ্যগত ধারণাগুলির প্রতি চ্যালেঞ্জের জন্য নারীরা আরও বেশি করে সিগারেটকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করেছেল। জার্মান নাৎসিদের এমনকি একটা  স্লোগান ছিল, “Die deutsche Frau raucht nicht, die deutsche Frau trinkt nicht” অর্থাৎ „জার্মান নারী ধূমপান করে না, জার্মান নারী মদ পান করে না“ ।

 

সিগারেট নতুন প্রতীক হয়ে ওঠে এবং নারীদের আচরণ এর বাঁধাধরা সংজ্ঞাতে পরিবর্তন আনে। ইউরোপ, আমেরিকাতে নারীরা যে স্বাধীনভাবে ধূমপান করতে পারছে তার পেছনেও রয়েছে অনেক লড়াই। আর সেই লড়াইতে একমাত্র প্রতিপক্ষ ছিল পুরুষতন্ত্র এবং তাদেরই তৈরি ধর্মগ্রন্থ।

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীমুক্তির আন্দোলনে প্রকাশ্যে নারীধূমপান এক শক্তিশালী মশাল। যা দেখতে এই ভঙ্গুর  সমাজ অভ্যস্ত না, সেটাই বার  বার দেখাতে হবে।

সদ্য রাজশাহীর সার্কিট হাউস রোডের সামনে এক নারীর ধূমপানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। দেখা যায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে এক ব্যক্তি ওই ধূমপায়ী নারীকে উদ্দেশ্য করে  চিৎকার করছেন। আরো অনেকে এগিয়ে এসে ওই নারীকে অপমান অপদস্ত করছে।  ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে নারীটিকে বলতে শোনা যায়, এখানে অনেকেই তো ধূমপান করছে তাহলে শুধুমাত্র তাকে কেন এভাবে বলা হচ্ছে? 

শুধুমাত্র সামাজিকভাবেই না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ধূমপান করার কারণে নারী শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের  ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী সিগারেট কিনতে বা  কনজিউম করতে কোন নির্দিষ্ট লিঙ্গের কথা উল্লেখ নেই, তাহলে সামাজিকভাবে কেন এই হেনস্তা? ১০ সেকেন্ডের সিগারেটের এক টানে একজন নারীর সারাজীবনের কাজ, শিক্ষা ইত্যাদি সব উধাও হয়ে যায়, ফ্যাক্ট একটাই সে „খারাপ মেয়ে“।

বিভিন্নভাবে আমাদের জানান দিতে হবে, আমার শরীর, আমার স্বাস্থ্য, আমার অভ্যাস এবং আমার সিদ্ধান্ত, কোন দণ্ডধারী এসে আমাকে নিষিদ্ধ করতে পারবে না।

নিউ ইয়র্কে ধূমপানের কারণে গ্রেফতার হওয়া সেই নারী আদালতে বিচারকে বলেছিলেন, “I never heard of this new law, and I don’t want to hear about it, No man shall dictate to me.” অর্থাৎ আমি কখনোই এই সম্পর্কে শুনিনি এবং আমি শুনতেও চাই না, কেউ আমাকে আদেশ দিতে পারে না“

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

33 + = 34