আপনি কি একজন উগ্রবাদী বাঙালি মুসলমান? বৈজ্ঞানিক উপায়ে পরীক্ষা করে আজই জেনে নিন।

আরও অনেক লক্ষণ আছে, তবে নীচের তিনটির ভিতরে যে কোনো একটি লক্ষণ থাকলে বুঝে নেবেন আপনি একজন উগ্রবাদী বাঙালি মুসলমান:

১. আপনার কি মনে হয় বাংলাদেশ ৯২% লোক মুসলমান, তাই বাংলাদেশ ইসলাম মোতাবেক চলা উচিত? হ্যাঁ অথবা না এই দুইয়ের ভিতরে যে কোনো একটা উত্তর বেছে নিন।

ব্যাখ্যা: বাংলাদেশ একটি গণপ্রজাতন্ত্রী দেশ। একটা দেশ কোন নিয়মে চলবে তা সেই দেশের মানুষ মিলে ঠিক করে। বাংলাদেশ কোন নিয়মে চলবে তা গণতন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্য আর সমাজতন্ত্রের কিছু বৈশিষ্ট্য মিলে তৈরি করা হয়েছে সেই ১৯৭২ সালে। বাংলাদেশ চলে গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশের সংবিধানের নিয়ম আনুযায়ী, যেখানে চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রজাদের মনোনীত প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত। মুক্তিযুদ্ধ ছিলো গণমানুষের যুদ্ধ, প্রজাদের যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের বাবা-মায়েরা কোনো ধর্মীয় পরিচয়, বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য যুদ্ধে যায়নি। ইসলাম কায়েম করার জন্য যুদ্ধে যায়নি। তাঁরা বাংলা, খেয়াল করেন, ইসলাম বা সনাতন ধর্ম না, একটা ভৌগলিক সীমানার জাতি পরিচয়কে স্বাধীন করতে, মুক্ত করতে অস্ত্র ধরেছিলো। মুক্তিযুদ্ধ ছিলো বাঙালির মুক্তির জন্য যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ কোনো জিহাদ ছিলো না। তাই আমাদের বাবা-মায়েরা যখন সংবিধান তৈরি করেছিলো, তাঁরা এই দেশটার উপর সবার যেন সমান অধিকার থাকে, সেটাই নিশ্চিত করেছিলো। বাংলাদেশে তাই ছাত্রলীগ-যুবদল, কাফের-হাফেজ, কোটিপতি-ভিখারী বলে কারো কোনো পার্থক্য নেই। একই সাথে এই ভূখণ্ডে অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক, খেয়াল করুন, ধর্মীয় না, নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী যারা বাঙালি না, তাঁদেরও বাঙালিদের মতোই সমান অধিকার। কারণ তাঁরা আদিকাল থেকে এই ভূখণ্ডেরই অধিবাসী। ধর্ম এখানে কারোরই মুখ্য কোনো পরিচয় না, অথচ অনেকেরই নিজ নিজ ধর্ম ছিলো, আছে, থাকবে। তবে সেটা নিজ নিজ ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের ভিতরেই সীমাবদ্ধ। রাষ্ট্র কেমন চলবে না চলবে তার সাথে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ ধর্ম আসলেই বিভেদ আসে, ঘৃণা আসে, বড়াই আসে। আর এখানেই আমাদের সংবিধান আমাদের গর্বের বিষয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের সংবিধান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংবিধানগুলোর ভিতরে একটা, তার একটা কারণ এটাই। ৯২%, মানে সংখ্যায় বেশী বলে বেশী অধিকার ভোগ করবে, বাংলাদেশ সেই নিয়মে চলে না। সংখ্যাধিক্যের এই নিয়মকে সত্যি মনে করে ধর্মের ছোবল খেয়ে বাঙালি ১১৯০৫ আর ১৯৪৭এ দুইবার পা ভেঙেছে। সেই সুযোগে পাকিস্তানিদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে। বাঙালি এই ফাঁদে আর পা তো দেবেই না, বরং আপনার মনে যদি এই দেশে ইসলাম কায়েম করার ইচ্ছা থাকে, তাহলেই আপনি উগ্রবাদী। যখনই আপনি ধর্ম কায়েম করার কথা মুখ ফুটে বলে ফেলবেন, ঠিক তখন থেকেই আপনি রাষ্ট্রদ্রোহী, জঙ্গী।

 

২. আপনি কি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন আল্লাহ আপনার স্ত্রীকে আপনার পাঁজরের হাড় থেকে, আপনার চেয়ে কম শক্তিশালী করে তৈরি করেছেন? হ্যাঁ অথবা না এই দুইয়ের ভিতরে যে কোনো একটা উত্তর বেছে নিন।
ব্যাখ্যা: বিজ্ঞান বলছে না শুধু, নিজের চারপাশে খেয়াল করে দেখেন: পৃথিবীতে নারী পুরুষ উভয়ে শক্তিতেও সমান, কথায়ও সমান, চিন্তা করার সক্ষমতায়ও সমান। কিন্তু আপনি আপনার বৌকে, বোনকে রান্নাঘর আর বাচ্চা সামলানোর ধোঁকা দিয়ে টাকা ইনকামটা নিজের কাছে রেখেছেন। কেন রেখেছেন জানেন? কারণ, প্রথমতঃ যেন বাড়িতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাটা শুধু আপনার একার কাছে থাকে। দ্বিতীয়তঃ আপনাকে টাকা ইনকাম ছাড়া দুনিয়ার আর কোনো দায় দায়িত্ব যেন নিতে না হয়। একজন সভ্য পুরুষ বাড়ি, অফিস বা রাস্তায় নারীদের স্বাধীনতাকে সম্মান করে আনন্দিতবোধ করে। একজন প্রকৃত পুরুষ নারীদের সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে শুনতে বা মেনে নিতে নিজেকে অপমানিতবোধ করে না। একজন সফল পুরুষ সকল ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব বা ক্ষমতার সাথে দায়িত্বও সমান ভাগ করে নিতে ভয় পায় না। নারী দেখলে আপনার কি প্রথমেই যৌনতার পাল্লায় মাপা হয়ে যায়? যৌনতার বাইরে, লুচ্চামির বাইরেও যে নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব হতে পারে মানতে কষ্ট হয়? তাঁদের যুক্তিকে সম্মান করতে, মেনে নিতে বিরক্ত লাগে? আপনি এগুলোকে ধামাচাপা দিতে কুরআন হাদিসকে সুবিধামতো যখন যেটা লাগে যায়গামতো ব্যবহার করেন? নারীর প্রতি আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গী স্রেফ ঠাণ্ডা মাথায় উগ্রবাদী আচরণ। একটা অসুস্থ্য সমাজে আপনার মতো পুরুষদের হাতে সমাজের ক্ষমতা, তাই আপনি পার পেয়ে যান।

৩.  আপনার কাছে কি আরবীয় ভাষা, আরবীয় নাম, আরবীয় পোষাক বাংলা ভাষা, বাংলা নাম বা বাঙালি পোষাকের চেয়ে প্রিয়? হ্যাঁ অথবা না এই দুইয়ের ভিতরে যে কোনো একটা উত্তর বেছে নিন।

ব্যাখ্যা: যার ভাষা তার কাছে পবিত্র শুধু তা না। ভালো মানুষ হিসাবে যেটা আপনার মাতৃভাষা না, সেটাকেও আপনার সমান শ্রদ্ধা করার কথা। আরবী লেখা দেখলেই যদি আপনার কপালে ঠুঁকে চুমু খেতে ইচ্ছে করে, আর বাংলা লেখা দেখলে কিছুই মনে আসে না, তাহলে বুঝবেন আপনি ধর্মান্ধ। ঠিক তেমনি শাড়ি, টিপ, কাজল, লুঙ্গি, প্যান্ট, শার্ট, মালা ইত্যাদি, মানে আরবীয় পোষাকের বাইরে যে কোনো পোষাকের মানুষ, বিশেষত নারীদের দেখলে যদি আপনার হিন্দু-ইহুদী-নাসারা-কাফেরদের পোষাকের কথা মনে আসে তাহলে আপনি বাঙালি সংস্কৃতিকে ঘৃণা করছেন। মানে আপনি এই বাংলার মাটির সাথে, আলো, জল, বাতাস, আগুনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। ওহ! আর হ্যাঁ, কারো সাথে নতুন পরিচয় হবার সময়, তাঁর নাম শোনার পরে যদি আপনার মনে প্রশ্ন জাগে এই ব্যক্তি মুসলিম কিনা নাম শুনে বোঝা যাচ্ছে না, তাহলে বুঝবেন আপনার মন বিভেদ এবং ঘৃণা করার জন্য অযুহাত খুঁজছে। ধর্ম পরিচয়ের সূত্র ধরে আপনি ছলে-বলে-কলে-কৌশলে অন্যকে ছোট, দুর্বল করার কু-উপায় খুঁজে থাকেন। তার মানে বিশ্বাসগত পার্থক্যকে ব্যবহার করে ওই লোকটার উপরে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, জুলুম করার জন্য আপনার মন নিশপিশ করে। আপনার মন উগ্র, মানে আপনি মনে মনে উগ্রবাদী। চাঞ্চ পেলেই আপনি জঙ্গীপনা করবেন।

 

তাহলে উপায়?
আপনার কাজ হবে নিজের মনটা পরিষ্কার করা। মন কিভাবে পরিষ্কার করতে হয়? খুবই সহজ। নির্মোহ যুক্তিনির্ভর চিন্তার অভ্যাস করুন। এযাবত কালে আপনাকে যা যা সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ শেখানো হয়েছে, সত্য বলে মেনে নিয়েছেন, সেগুলোকে ধরে ধরে প্রশ্ন করুন। প্রশ্ন করতে বা ভাবতে ভয় লাগবে প্রথম প্রথম। এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা প্রাকটিস করেছে, সবাই বলেছে ভয়টা খুবই ক্ষণস্থায়ী। যুক্তির পরে যুক্তি দাঁড় করান। ধর্ম বা সমাজের শেখানো যুক্তি বা সত্যগুলোকে চ্যালেন্জ করুন। বেশি দিন না, গুনে গুনে ২১ দিন যদি লেগে থাকতে পারেন, তাহলে দেখবেন চার পাশের সেই চির পরিচিত সত্য, যা এতিদন খুবই এমনকি একমাত্র সত্য মনে হতো, তা কেমন জানি নতুন লাগছে। কিছু সত্যকে আর সত্য মনে হচ্ছে না। কিছু যুক্তি ভেঙে পড়ছে, কিছু রয়ে যাচ্ছে। এটাই স্বাভাবিক। ধর্ম বা সমাজ আপনাকে আমাকে যা শিখিয়েছে, তার ভিতরে কিছু সার্বজননীন সত্য, যুক্তিযুক্ত বিষয়ও আছে। তবে মনে হবে আরে!! আগে কখনও এমন করে ভাবিনি তো!! হঠাত জোশ জোশ একটা ফিলিংস কাজ করবে আপনার মনে। চির চেনা যুক্তিগুলোকে নির্মোহ যুক্তি দিয়ে যাচাই করে নতুন করে পাওয়ার সে যে কি আনন্দ! সেই জোশটা আপনি থামাতেই পারবেন না। লেগে থাকলে শিগ্গিরিই মুসলিম থেকে, পুরুষ থেকে, আপনি হয়ে উঠবেন মানুষ।

হ্যাঁ, একজন মানুষ। আর প্রকৃত মানুষ যদি একবার হয়ে উঠতে পারেন, দেখবেন নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান, ধনী-ফকির, রোগা-বলবান সবাইকে একই রকম লাগছে। কাউকেই ঘেন্না করতে মন থেকে সায় আসছে না। কাউকেই দেখে আপনার আর ভয়ও লাগছে না, আবার আপনার চাইতে কাউকে দুর্বলও মনে হচ্ছে না। কোপাকুপি, ধর্ষণ, গালাগালি কোনোটাই করতে আগের মতো আর আগ্রহ পাচ্ছেন না। এমনকি চাইলেও আপনি কারো উপরে আর আগের মতো রাগতে পারছেন না। সুখ-দুঃখ, লোভ, ভয় কোনোটাই আপনাকে আর কাবু করতে পারছে না। তাই বলে জীবনটা কি পানসে হয়ে গেছে? না। একদম না। আপনি কেবল সবকিছুর উপরে ভেসে থাকা শিখেছেন। আপনার রাতে ভালো ঘুম হচ্ছে। দিনভোর ফুরফুরে মেজাজ। নিজেকে হাল্কা লাগছে। সারাদিন মনে মনে হাসছেন। সবকিছুকে মায়া করতে, ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে। আপনার জন্য শুভ কামনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 71 = 79