মুক্তিযুদ্ধের এক বিষাদময় আখ্যান: মেঘমল্লার

মেঘমল্লার একটি রাগের নাম। ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের এই রাগ-সঙ্গীত এমনই এক আবহ বিরাজ করে যে; এতে বর্ষার গুরুগম্ভীর ভাবটি অদ্ভুতরকম করে যেনো এই প্রকৃতিতে ধরা দেয়। এই রাগে বর্ষা যেনো ঝরঝর করে অবিরাম ঝরতেই থাকে। শ্রবণেন্দ্রীয়ের সমস্ত ইথারকে খুলে দিয়ে চোখ দু’টি বন্ধ করে একবার এই আকুল সাঙ্গিতিক আবাহন কান পেতে শুনলেই সেই সঙ্গীত নিমিষেই যে কাউকেই বিহ্বল করে তুলবে। জনশ্রুতি আছে, বর্ষাকালে এই রাগ সঙ্গীতের সুরে সুরে অনাবৃষ্টি অঞ্চলেও বৃষ্টিপাত হয়। আর এই রাগ সঙ্গীতকেই পুরো সিনেমার আবহ সঙ্গীত হিসেবেই ব্যবহার করেছেন নির্মাতা-পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জন। পুরো বর্ষার গুরু-গম্ভীর এই গুমোট প্রকৃতির সাথে বাংলাদেশের রক্তাক্ত ইতিহাস, যুগসন্ধিক্ষণের যে যোগ-সূত্র নির্মাতা-পরিচালক বিনির্মাণ করেছেন, তা এই সিনেমাটি না দেখলে অনেকের পক্ষে বুঝা সম্ভবপর নয়। ‘মেঘমল্লার’ সিনেমার শুরু থেকে শেষ অবধি প্রতিটি শটে, প্রতিটি দৃশ্যে যে বিষাদময় এক আখ্যান আমরা পর্দায় দেখি, তা হ্নদয়ঙ্গম করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়ঙ্কর সময়কালকে মনেপ্রাণে পুরোপুরি ধারণ করতে না পারলে এরকম গল্প নিয়ে সিনেমা তৈরি করা সম্ভব না। নিজের সাথে, নিজের জাতিস্বত্ত্বার সাথে এই বোঝাপড়াটুকু আর সব মিলিয়ে পরিমিতিবোধ না থাকলে এরকম একটি মাস্টারপিস সিনেমা তৈরি করা সম্ভবও না। যা পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জন তাঁর প্রথম সিনেমা হিসেবে ‘মেঘমল্লার‘ নির্মাণ করে তা দেখিয়ে দিয়েছেন।
আহা! বৃষ্টির ঝমঝম বোল। এই বৃষ্টির মেয়াদ আল্লা দিলে পুরো তিন দিন। কারণ শনিতে সাত মঙ্গলে তিন, আর সব দিন দিন। এটা জেনারেল ষ্টেটমেন্ট। স্পেসিফিক ক্লাসিফিকেশনও আছে। যেমন, মঙ্গলে ভোররাতে হলে শুরু, তিনদিন মেঘের গুরুগুরু। তারপর, বুধের সকালে নামলে জল, বিকেলে মেঘ কয় এবার চল। বৃহস্পতি শুক্র কিছু বাদ নাই।
কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘রেইনকোট’ গল্পের শুরু হয় বৃষ্টি-বাদলের কোনো এক সকালে। মফস্বলি কলেজের রসায়নের শিক্ষক নুরুল হুদার পরিবার বলতে স্ত্রী ও এক কন্যা সন্তান সুধা। যার বয়স চার। আর স্ত্রী আসমা। অবশ্য সংসারে আরেকজনও ছিলো। সে এখন এই সরকারি কোয়ার্টারে আর থাকে না। সে হলো আসমার ভাই। মিন্টু। সময়কাল ১৯৭১ সাল। বর্ষাকাল। অন্ধকার ঘোর বরষা। চারদিক থেকে যেনো আসমান ভেঙে পড়েছে অবস্থা। দিনরাত্রি অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। এইরকম ঝড়-বৃষ্টিমুখর ভয়-বিদূর পরিবেশের মধ্যেও ভীত-সন্ত্রস্ত অধ্যাপক নুরুল হুদাকে নিত্য দাড়ি কামিয়ে, ফরমাল পোশাকে রোজ রোজ কলেজে যেতে হয়। নুরুল হুদা খুব ভীত স্বভাবের। সে আচরণে যতোটা না ভীত তারচেয়ে বেশি ভীত এখন এই মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে। সময়টা অত্যন্ত খারাপ। পাকিস্তানি সেনারা হুটহাট যাকে খুশি তাকেই পাখির মতো গুলি করে মেরে ফেলছে। এইরকম ভয়ঙ্কর সময়ে গোঁদের উপর বিষফোঁড়া হলো; তার শ্যালক মিন্টু স্থানীয় গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিয়ে সে তাদের আশেপাশেই যুদ্ধে করছে। আর নুরুল হুদা অনেকটা অসহায় নিরুপায় হয়ে না পারছে তার চাকুরি, স্ত্রী-সন্তান রেখে যুদ্ধে যেতে, না পারছে পাকিস্তানের পক্ষালম্বন করতে। দিনরাত্রি দুরুদুরু বুকে জপে চলেছে, লা ইলাহা ইল্লাহ আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ জোয়ালেমিন!
এরকম ভয়-আতঙ্ক, নৃশংস ঘটনার আলোকে ইতিহাহাসশ্রিত সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত স্বরূপ ফুটিয়ে তুলতে গেলে যে রকম প্রস্তুতি আর অবকাঠামোর দরকার হয় তা নির্মাতা হিসেবে জাহিদুর রহিম অঞ্জন বলতে গেলে তাঁর ‘মেঘমল্লার’ সিনেমায় প্রায় নিখুঁতভাবেই সেই কাজটি করেছেন। বিশেষত আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের এই গল্পটির চিত্ররূপ এই ‘মেঘমল্লার‘ সিনেমা দেখতে বসলে পাঠক-দর্শকের মনে হবে; গল্পের প্লট আর চরিত্রেরা গল্পপাঠে মাথার ভেতর যেরকমভাবে ধরা দেয়, এই সিনেমায় ঠিক একেবারে যেনো জীবন্ত হিসেবেই পর্দার সামনে থেকে দর্শককে সেই বরষাক্রান্ত সময়ে মুক্তিযুদ্ধের যে ভয়াবহ গম্ভীর-গুমোট দিনগুলি তা টাইমমেশিনে যেনো খানিকটা ঘুরিয়ে নিয়ে আসে। মূল গল্পপাঠ আর সিনেমাপাঠের এই-ই হলো মূল তফাৎ। যদি মূল আখ্যানটি যথাযথ কারিগরের হাতে পড়ে, তাহলে এরকম প্রায় জীবন্ত করে তোলা যায়। সিনেমার এই প্রাণস্পর্শী ভাষা অন্যান্য মাধ্যম থেকে তাই আজতক শক্তিশালী এক অনন্য মাধ্যম। কাহিনি-দৃশ্য, শব্দ-ধ্বনিতে যে বিমূর্তটুকু মূর্ত হয়ে উঠে তা পাঠে প্রায় অসম্ভব। এই কাহিনি, এই সুর-শব্দকে যূতবদ্ধ করতে পারে একমাত্র সিনেমাই।
মুক্তিযুদ্ধের এইরকম এক অবরুদ্ধ সময়ের এক ভীত অসহায় কলেজ শিক্ষক আর তার স্ত্রীর যে গুমরে গুমরে এক অজানা ভবিষ্যতের অপেক্ষার প্রহর গোনা; তা এই সিনেমায় পুরো ব্যাপারটিকে পুরোপুরি পর্দায় ধারণ করতে শহীদুজ্জামান সেলিম আর অপর্ণা ঘোষ তাঁদের দিক থেকে সেরা কাজটিই সম্ভবত করেছেন। একজন ভীতু কলেজ শিক্ষক নুরুল হুদা ও তার স্ত্রী আসমা আর তার গেরিলা ভাইয়ের বোন হিসেবে এই দু’জনের চরিত্রের যে বোঝাপরা তা দেখে বিস্মিত না হলেও খানিকটা অবাক হয়েছি। শহীদুজ্জামান সেলিম গুনী অভিনেতা এতে কোনো সন্দেহ নেই। মঞ্চ নাটক থেকে টিভি নাটকে এসবে তাঁর ভুরি ভুড়ি উদাহরণ আছে। কিন্তু সিনেমায় তাঁকে এর আগে কেউ সেভাবে সুযোগ দেয় নি। ‘মেঘমল্লার’ সিনেমায় মাধ্যমে শহীদুজ্জামান সেলিম সম্ভবত তাঁর ক্যারিয়ারের এ যাবৎ শ্রেষ্ঠ কাজটি করেছেন। আর অপেক্ষাকৃত নবীন হিসেবে অপর্ণা ঘোষ অসম্ভব ভাগ্যবান যে, এরকম একটি ইতিহাসকেন্দ্রিক সাহিত্য নির্ভর সিনেমায় তিনি প্রধান চরিত্র হিসেবে আছেন। যা তাঁর সিনিয়র ও সমসাময়িক অনেক গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সে সুযোগ পান নি।
পোস্টার
মেঘমল্লারের পোস্টার
আসমা চরিত্রে অপর্ণার দিনান্তিক বিষাদমাখা অপেক্ষা আর মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় প্রহর গুণতে দেখলে মনে হবে, এই বিরহী নিষ্ঠুর বরষা থামবে কবে, কবে…!? শহীদুজ্জামান সেলিমকে নুরুল হুদার ভূমিকায় পর্দায় দেখে বারবার কেনো জানি হুমায়ূন ফরিদীর কথা মনে পড়ছিলো। আমাদের কী শক্তিমান এক অভিনেতাকে আমরা সিনেমায় প্রায় বলতে গেলে কোনো কাজেই লাগাতে পারিনি। মঞ্চ আর টিভি নাটক ছাড়া সারা অভিনয় জীবনের বলতে গেলে তাঁকে আমাদের সিনেমার কোনো নির্মাতাই সেভাবে কাজে লাগাতে পারেন নি। আফসোস!
জাহিদুর রহিম অঞ্জন তারেক মাসুদ পরবর্তী শক্তিমান গুণী এক পরিচালক। যার শুরুটাও হলো অসম্ভব ভালো এক সিনেমা দিয়ে। পাশাপাশি এই সিনেমার নেপথ্যের কারিগর হিসেবে সুধীর পালসানের সিনেমাটোগ্রাফির কথা না বললেই নয়। আহা! কী অদ্ভুতভাবেই না তিনি তা দৃশ্য ধারণ করেছেন। তেমন করে আবহ সঙ্গীতও। যা কানকে একদম বর্ষার অপার্থিব এক অভিজ্ঞতা দেয়। সঙ্গীত-সম্পাদনা সহ সব মিলিয়ে এই সিনেমা দেখতে বসে পরিপূর্ণ তৃপ্তি পেয়েছি। পাশাপাশি এক অতৃপ্তিও আছে। তা হলো এইরকম বিষাদমাখা মেঘমল্লারের গুড়গুড় বিষাদাচ্ছন্ন, নৃশংস-নিষ্ঠুর বর্ষালেখ্যআর ইতিহাসকেন্দ্রিক সিনেমা যদি বড়ো পর্দায় দেখতে পারতাম, তাহলে হয়তো সেই ভয়ঙ্কর সময় আর বিষাদময় আষাঢ়ে ঝড়-বাদলকে আরও খানিকটা হলে হ্নদয়ঙ্গম করতে পারতাম। বহুদিন পর এইরকম চেনাজানা এক গল্পকে ঘিরে যে মাস্টারপিস উপহার দিলেন পরিচালক জাহিদুর রহিম অঞ্জন তাতে আশা করছি তিনি সামনে আরও ভালো কিছু কাজ উপহার দেবেন।
জয় হোক বাংলা সিনেমার।
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

3 + 6 =