“মেয়েটি এখন আর আমাকে মিষ্টি খেতে দেয় না”

“মেয়েটি এখন আর আমাকে মিষ্টি খেতে দেয় না”
প্রবাস থেকে যতবারই দেশে আসি মা প্রচণ্ড খুশী মনে থাকলেও মা’র মনের মাঝে সারাক্ষণ একটি দুঃচিন্তা ঘুরপাক খায় সেটা হচ্ছে ছেলের বিয়ে। যদিও এ বিষয়ে মা আমাকে সোজাসুজি কিছু না জানালেও বুঝতে পারি পুরো পরিবারেই আমাকে নিয়ে এই দুঃচিন্তা সারাটা সময় বিরাজ করছে, মা আমাকে এতটাই ভালো জানেন যে ছেলের মন মানসিকতা, চিন্তা চেতনা স্বভাব বিষয়গুলো বলতে গেলে মা’র সম্পূর্ণরূপেই জানা।
আমাদের সমাজে বিয়ে বিষয়টি অনেকটা, ছেলেকে বিয়ের হাটে নামিয়ে দেয়া হয়, ছেলে এই বিয়ের হাটে নিজেকে একজন যুতসই পাত্র হিসেবে জাহির করে কোরবানির গরু দেখার মতো করে পাত্রীর খোঁজে বেরিয়ে পরেন, সেই সাথে ঘটক মশাই তো আছেনই, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ যারা আছেন তারও এই ঘটকের দায়িত্ব পালন করেন মাঝে মধ্যে। আমার পক্ষে ঢাক ঢোল পিটিয়ে পাত্রী দেখা কখনই সম্ভব হবে না, একজন রক্ত মাংসে গড়া মানুষকে বিয়ে করার তাগিদে কোরবানির গরুর হাটে গরু দেখার মতো দেখতে যাওয়া যে কতটা অমানবিক ও জঘন্য তা আমি বাসায় কাউকেই বোঝাতে পারছি না, সবার ওই এটাই কথা বিয়ে তোমাকে করতেই হবে কিন্তু হায় আমার মতো একজন প্রবাসীকে কোন মেয়ে যে ভালোবেসে কাঁধের উপর মাথা রেখে নিশ্চিন্ত মনে বলবে “তোমাকে আমার হৃদয়ে আশ্রয় দিতে চাই” এমন কেউই যে নেই সেটা আমার জানা।
আমি তো কারুর কাছে করুণা চাইতে আসিনি, চাওয়ার মাঝে শুধু একটাই যে কিনা আমার অন্তরকে দেখতে পাবে, বুঝতে পারবে আমি তাকে কাছে পেয়ে দায়িত্ব নিতে চাই। ভালোলাগার যে বিষয় সেটার জন্যে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ে একজন ছেলেকে জানবে, চেনার চেষ্টা করবে সেই সমাজ তো আমাদের এখনো তৈরী হয়নি, মেয়ের বাবাদের শুধু একটাই চিন্তা এমন একজন ছেলে চাই যে কিনা তার মেয়েকে পালতে বা ভরণপোষণ করতে পারবে, ছেলেটি ঠিক যেন একটি মেয়েকে গৃহপালিত নারী হিসেবে গ্রহণ করবে, নারী স্বামীর জন্যে ঘরের মাঝে অপেক্ষায় থাকবে, আনন্দ চিত্তে প্রিয় স্বামী নামের প্রভুর জন্যে গলদা চিংড়ির ভুনা রান্না করে জীবনের ষোলকলা পূর্ণ করবে।
নাহ এভাবে তো সম্ভব নয়, বাবা প্রতিদিন হাড়ি হাড়ি মিষ্টি সমেত বিয়ের হাটের আকর্ষণীয় ক্রেতাকে সাথে নিয়ে বাবার বন্ধুদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর আমি মুখ বুজে এই অরাজকতাকে সহ্য করে যাচ্ছি, আমার মাঝে এক অসহায়ত্ব বোধ প্রতি ক্ষণে ক্ষণে নিজেকে দংশন করে চলেছে কিন্তু কাউকেই বোঝাতে পারছি না যে আমি এ সমাজ সংস্কৃতি থেকে অনেক দুরে চলে এসেছি, ফিরে আসার পথ খোলা নেই।
মা যদিও ছেলেকে খুবই ভালো বোঝেন কিন্তু মনের মাঝে ওই একটাই আশা ছেলের জন্যে গৃহ পালিত একজন লাল টুকটুকে মেয়ে এই বিয়ের হাটে যোগার হয়েই যাবে।
ঈদের দিন সকাল বেলা শহরের অপর প্রান্তে ছোট বোনের বাসায় বেড়াতে গিয়ে কিছুটা আনন্দ উৎসবে নিজেকে শপে দিলাম, দুপুরের মাঝেই আনন্দটা খানিক বেশী হয়ে যাওয়াতে ছোট বোন বাসায় ফোন করে ছোট ভাইকে জানিয়ে দিল বড় ভাইকে খানিক বেসামাল অবস্থায় ড্রাইভারকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি সে যেন বড় ভাইকে সামাল দিয়ে নিজের ঘরের ভেতর বিশ্রামের ব্যবস্থা করে রাখে আর কেউ যেন টের না পায় যে আজ বড় ভাইয়ের আনন্দের পরিমাণটা একটু বেশী হয়ে গেছে।
লম্বা একটা ঘুম দিয়ে বিকেল বেলা বাড়ির গেটের বাইরে আসতেই চোখে পরলো ছোট বেলার বন্ধু তার স্ত্রী ও শ্যালিকা সমেত রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে ,
– “কিরে কাউসার, এ ভাবে এক সাথে দুইজন মহা সুন্দরীদের নিয়ে হেটে যাচ্ছিস আর তোর বন্ধু যে এই ধু ধু মরুভূমিতে একা একা প্রখর দুপুরে অশান্ত মন নিয়ে ক্ষুধার্ত কপোতের মতো বসে আছে সে দিকে তোর কোনই খেয়াল নেই?”
আমার কথা শুনেই বন্ধুর সাথে থাকা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা মেয়েটি এক মুহূর্তেই দশ হাত দূরত্বে চলে গেল, মনে মনে ভাবছি কি এক কপাল নিয়ে জন্মেছি, অভাগা যেদিকে তাকায় সাগরও শুকায়। কাউসারের সহধর্মিণী আমার অবস্থা দেখেই তার স্বামীকে বলে বসলো,
– যাও তোমার বন্ধুকে ঘরের ভেতরে দিয়ে এসো, উনার বিশ্রামের প্রয়োজন।
ইতিমধ্যে বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা মেয়েটি বেশ অনেক দুরে চলে গেছে, অনেক চেষ্টা করেছিলাম অন্তত দু একটা কথা বিনিময় হবে, কিন্তু হায় অভাগা যে দিকে তাকায় সাগরও শুকায়।
রাত তখন খুব একটা গভীর হয়নি হঠাত মা জানালেন “কাপড় পরে তৈরী থাক কারণ তোমাকে নিয়ে তোমার বাবার আপিসের একজন কলিগের বাসায় নিয়ে বেড়াতে যাবো,” আমিও মাকে সোজাসুজি জানিয়ে দিলাম আমাকে নিয়ে এই বিয়ের হাটের ক্রেতা হিসেবে যদি কোথাও হাজির করবে তবে আমি যাচ্ছিনা, এবার মা বেশ নরম সুরেই বললেন,
– “আরে বোকা তা না, তোকে ছোটবেলায় যিনি অংক আর ফিজিক্স পড়াতেন আজ সেই বাসায় একবার তোকে নিয়ে দেখা করে আসব এই যাহ”।
আমি যেন কিছুতেই সেই বিকেল বেলা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা মেয়েটিকে ভুলতেই পারছি না, দুঃখ শুধু একটাই দুদণ্ড দাড়িয়ে কথা বলার জন্যেও কি মেয়েটি দাড়াতে পারল না? কি এমন ক্ষতি হতো খানিক কথা বলে পরিচিত হওয়া যেতো, আসলে দেশে এসেই বুঝতে পারছি বিয়ের হাটের এই উৎকৃষ্ট ক্রেতাটির কারুর কাছেই কোন দাম নেই, প্রেম তো দুরের কথা ভালোলাগা কি ভালোবাসা এসবেরও কোনই দাম নেই। নিজের উপর এক ধরনের আস্থাহীনতা আমাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে, নাহ আমি না হয় সেই প্রবাসেই ফিরে যাই।
ছোট বোনটিও ইতিমধ্যে বাসায় চলে এসেছে, রিক্সা করে আমি মা আর ছোট বোন বাসা থেকে অদূরে আমার ছোটবেলার সেই শিক্ষক গুরুর বাসায় চলে এলাম যিনি এখন বাবার সাথে একই আপিসে চাকুরী করেন, বাড়ির গেটের কাছে এসে কড়া নাড়তেই জানালার ফাঁক দিয়ে বেশ লম্বা চুলে মুখ ঢাকা পরা একজন বাড়ির দারোয়ানকে ডেকে বলে উঠলো,
– “রফিক ভাই গেটটা খোলো, দেখ তো কারা এসেছেন।
আমার শিক্ষা গুরুর অবশ্য আগেই জানা যে আজ আমরা উনাদের বাসায় বেড়াতে আসছি, কিন্তু সেই লম্বা চুলে মুখ ঢাকা মেয়েটিকে দেখেই মনের খুব গহীনে একটা বসন্তের হিমেল বাতাস দোলা দিয়ে গেল যেন, হঠাত মনে হচ্ছে এরকম একটি বসন্ত আমার জীবনে কি কখনই আসবে না? প্রতিদিনই তো সূর্য ওঠে আবার ডুবে যায়, এই অস্ত যাওয়া আর ডুবে যাওয়ার মাঝে কতো মানুষের জীবনে বসন্ত আসে কিন্তু হায় এই অভাগা যে দিকেই তাকায় শুধুই ধু ধু মরুভূমি বসন্ত এই মরুভূমিতে কখনোই আসে না। মা খানিক আড় চোখে আমাকে দেখে নিয়ে কি বুঝলেন তা বিধাতাই জানেন। ইতি মধ্যে গেট খুলে গেল, আমরা ঘরের ভেতরে চলে এলাম, আমাদের বসার ঘরে বসতে দেয়া হলো আর আমি একাই বসার ঘরে বসে আছি, মা আর বোন ভেতরের ঘরে চলে গেলেন কিন্তু লম্বা চুলে মুখ ঢাকা মেয়েটিকে তো দেখছি না, আচ্ছা এমন যদি হয় বিকেল বেলার বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা মেয়েটিই যদি এই মেয়ে তবে কি দারুণ একটা কাণ্ডই না ঘটে যাবে। হঠাত ঘরের ভেতর থেকে কাউসারের গলার আওয়াজ আসলো,
– “খোকা একটু বোস আমি আসছি”।
আমি এই অপ্রত্যাশিত ভাবে কাউসারের গলা শুনে কিছুতেই অঙ্ক মেলাতে পারছি না অথচ আমি এসেছি আমরা ছোট বেলার অঙ্কের শিক্ষা গুরুর বাসায়, এবার নির্ঘাত ধরে নিলাম আসলে আমি ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চেরই ছাত্র আমার দ্বারা ক্লাসের ফার্স্ট বেঞ্চে কখনই বসা হয়নি আর হবেও না। এবার বুঝতে পারছি লম্বা চুলে ঢাকা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা মেয়েটি এ বাসাতেই থাকে হয়তো , এটাই যদি সত্যি হয় তবে আমার ফিরে যাওয়ার পথ থাকবে না, ইচ্ছে হচ্ছিলো এই মুহূর্তে চিৎকার করে তাকেই জানিয়ে দেই,
বধু কোন আলো লাগলো চোখে ।।
বুঝি দীপ্তি রূপে ছিলে সুর্যলোকে
ছিল মন তোমারই প্রতীক্ষা করি
যুগে যুগে দিন রাত্রি ধরি
ছিল মর্ম বেদনা ঘন অন্ধকারে
জনম জনম গেল বিরহ শোকে
বধু কোন আলো লাগলো চোখে ।।
অস্ফুট মঞ্জরি কুঞ্জ বনে
সংগীত শুন্য বিষন্ন মনে ।।
বসার ঘর ও ডাইনিং স্পেসের মাঝে একটি কাঁচের স্লাইডিং দরজা, বাসার ভেতরে মানুষ জনের আওয়াজ আসছে বৈকি কিন্তু লম্বা চুলের সেই মেয়েটিকে দেখতে পাবার কোনই সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না আর কাউসারের আসার নাম গন্ধটিও এখন পর্যন্ত নেই। খুব কষ্ট আর হতাশা মনের মাঝে ভিড় জমাচ্ছে, ইচ্ছে হচ্ছে ওই কাঁচের দরজা ভেদ করে একবার ভেতরে গিয়ে সেই লম্বা চুলে মুখ ঢাকা মেয়েটিকে বলে আসি তোমার কি একটি বাসন্তী রঙের শাড়ি চাই? আমি এক্ষুনি স্বর্গ মর্ত তন্ন তন্ন করে বাসন্তী রঙের শাড়ি আনতে প্রস্তুত, ইচ্ছে হচ্ছে প্রাণের সকল আকুলতা তাকে ব্যক্ত করি, বলি,
– “কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল কেউ কথা রাখেনি
ছেলেবেলায় এক বোসঠুমি তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল –
শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে
তারপর কত চন্দ্রভুক অমাবস্যা এসে চলে গেল, কিন্তু সেই বোসঠুমি আর এল না,
পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায় আছি।
ভালবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি
দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেধেছি লাল কাপড়
বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮ টি নীল পদ্ম
তবুও কথা রাখেনি বরুনা, এখন তার বুকে শুধু মাংসের গন্ধ
এখনও সে যে কোন নারী,
কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখে না।
কাঁচের দরজাটা খানিক নড়ে উঠতেই আমার বুকের ভেতর মোচর দিয়ে এক যন্ত্রণা পিঠের শিরদাঁড়া দিয়ে ওপরের দিয়ে উঠে যাচ্ছে, মাথাটা ঝিম ঝিম করছে, বুঝতে পারছি আমি হয়তো আবার উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি, তুবও স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে হয়, আমিও তো মানুষ তাই বলে সারাটা জীবন আমাকে ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চেই বসে থাকতে হবে?
– চা নাকি কফি, কোনটা পছন্দ?
বিশ্বাস করুন আমার গলা দিয়ে কোন শব্দ বের হচ্ছে না, কথা বলার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেছি, তবে কি আমি কর্পূরের মতো উবে যেতে বসেছি। হঠাত মনে হলো পৃথিবী কতটা নিষ্ঠুর, ঠিক এরকম একটি মুহূর্তে আমি বাক শক্তি হারিয়ে ফেলছি, হায় বিধাতা আমার এখন কি হবে, কাকেই বা দোষ দেবো, এরকম যে আগে কখনো অনুভব হয়নি, এক সেকেন্ড দুই সেকেন্ড এভাবে হয়তো অনন্তকাল পার হয়ে যাচ্ছে, চেষ্টা করছি গলা দিয়ে কফি শব্দটা বের হলেই আমার এ যাত্রায় বিশ্ব জয় করা হয়ে যাবে, ভাবছি গ্রেট আলেকজান্ডারও কি এরকম কোন দুর্যোগের মাঝে পরেছিলেন কিনা? এরকম তো কোথাও পড়িনি যে আলেকজান্ডারকে কেউ চা নাকি কফি প্রশ্ন করেছিল, আমারও জানার ইচ্ছা আলেকজান্ডার আসলে কতটা সাহসী, হঠাত লম্বা চুলে মুখ ঢাকা বিকেল বেলায় বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা মেয়েটি আরও একবার মুচকি হেসে আবারও জিজ্ঞাস করে বসলো,
– ” বলি, শুনতে পারছেন? বাংলা হয়তো ভুলে গেছেন, বলি কফি অর টি? কোনটা চাই?”।
এক রাশ আশা নিয়ে যেটা বলার ছিলো সেটা আর বলা হলো না, চেষ্টাও করেছি, আর হয়তো কোনদিনই বলা হয়ে উঠবে না,
দিবস রজনী, আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি।
তাই চমকিত মন, চকিত শ্রবণ, তৃষিত আকুল আঁখি॥
চঞ্চল হয়ে ঘুরিয়ে বেড়াই, সদা মনে হয় যদি দেখা পাই–
‘কে আসিছে’ বলে চমকিয়ে চাই কাননে ডাকিলে পাখি॥
জাগরণে তারে না দেখিতে পাই, থাকি স্বপনের আশে–
ঘুমের আড়ালে যদি ধরা দেয়, বাঁধিব স্বপনপাশে।
শুধু এতটুকুই বলতে পেরেছিলাম দুধ চিনি ছাড়া কফি তাও ওই টুকুনি বলতে পারাটা হয়তো গ্রেট আলেকজান্ডারও বলতে পারতেন না, সেদিক থেকে ভাবলে বলতে হবে আমি গ্রেট আলেকজান্ডার চাইতে কম কিসে। সে চলে গেল ঘরের ভেতরে কিন্তু কাউসারের দেখা এখন পর্যন্ত পাচ্ছি না হঠাত কাউসার দরজার ফাঁক দিয়ে জানিয়ে গেল,
– “তুই বসে বসে আমার শালীর সাথে গল্প কর, আমি একটু জরুরী কাজে বাইরে যাচ্ছি”।
ইচ্ছে হলো কাউসার বলি, দোস্ত তোমার এখন না আসলেও চলবে তবে এই অভাগাকে একটি পথ দেখিয়ে দিও,
-এই যে পথের এই দেখা
হয়তো পথেই শেষ হবে
তবুও হৃদয় মোর বলে
সঞ্চয় কিছু যেন রবে
ক্ষণিকের এই জানাশোনা
স্মরণে করে যে আনাগোনা
ক্ষণিকের এই জানাশোনা
স্মরণে করে যে আনাগোনা
তারই সুরে বাজে যেন বাঁশি
মরমের শত অনুভবে
এই যে পথের এই দেখা
হয়তো পথেই শেষ হবে।
কফি সমেত মেয়েটি বসার ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই আমার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
– “শুনেছি আপনি পাত্রী দেখতে ব্যস্ত, তা খুঁজে পেলেন কি? খুঁজে না পেলে আমার কাছ থেকে একটা হারিক্যান নিয়ে যাবেন তবে খুঁজতে সুবিধা হবে”।
কি উত্তর দেবো ভেবে পাচ্ছি না তবে এবার বেশ রাগ হলো, আমিও বেশ নম্র সুরেই উত্তর দিলাম,
– “দেখুন আমি বিয়ের হাটে কোরবানির গরু খুঁজতে আসিনি, আর যারা আমাকে বিয়ের হাটের আকর্ষণীয় ক্রেতা বানাতে চাইছেন আপনি বরং তাদেরকেই জিজ্ঞাস করুন। আর হারিক্যানটা নিজের জন্যে রেখে দিন কাজে লাগবে। তা যদি কিছু মনে না করেন আপনার নাম ঠিকটা জানতে পারলে একটা হারিক্যান আমি আপনার জন্যে পার্সেল করে পাঠিয়েও দিতে পারি”।
এবার মেয়েটি খিলখিল করে মিনিট খানেক হেসে নিলো, মেয়েটির নাম বাবলী ওরফে বাবু নিজের নামটা আমাকে জানিয়ে বললেন
– “আপনার দেখছি খুব রাগও আছে, তবে তা বেশ ভালো, ছেলেদের রাগ দেখলে আমারও ভালো লাগে, ঝগড়াটা জমে ভালো।”
এবার আমার ধর্য্যের বাঁধ আর ধরে রাখতে পারছি না, আমাকে এভাবে এতটা অবজ্ঞা করা হচ্ছে যা মোটেই ভালো ঠেকছে না। আমার সব স্বপ্ন আশা আকাঙ্ক্ষা খানখান করে ভেঙ্গে যাচ্ছে, আমি কি এতটাই অপাংতেয় যে এভাবে অবজ্ঞা করা হচ্ছে,
– “দেখুন, আমাকে জানার আগ্রহ হয়তো আপনার নেই বা কখনোই হবে না, কিন্তু তাই বলে এভাবে অবজ্ঞা করাটা মোটেই শোভনীয় নয়, আপনার সাথে বিকেল বেলা দেখা হয়েছে, এও বুঝতে পেরেছি আপনি সুন্দরী তাই বলে অসুন্দর ছেলেদের সাথে কথা না বলাটা নিশ্চয়ই সুন্দর মনের পরিচয় হতে পারে না?
হঠাত ভেতর থেকে বাবলীর ডাক এলো, খুব বিনয়ের সাথেই বলে গেল,
– “যাবেন না, আমি একটু শুনেই আসছি কেন ডাকছে”।
বেশ কিছুক্ষণ বসার ঘরেই একা একা বসে আছি, মনটাও খুবই বিষণ্ণ, লম্বা চুলে মুখ ঢাকা মেয়েটি এভাবে আমাকে একহাত নিয়ে গেল অথচ আমি কিছুই বলতে পারিনি। ছোট বোনটি কি মনে করে বসার ঘরে চলে এসে একেবারে গা ঘেঁষে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে গেল,
– “বাসায় মিষ্টি যা ছিলো সব শেষ, তুমি আজ রাতেই দোকানে গিয়ে বেশ কিছু মিষ্টি কিনে নিয়ে আসবে, কথার যেন নড়চড় না হয় বলেই উঠে যাচ্ছিল ইতিমধ্যে মেয়েটি প্লেটে করে মিষ্টি নিয়ে বসার ঘরে ঢুকে পরতেই ছোট বোনকে আর জিজ্ঞাস করতে পারলাম না মিষ্টি কেন আবার? আমাদের একা রেখেই ছোট বোন আবার ভেতরের ঘরে চলে গেল, যাবার সময় আরও একবার বলে গেল,
– “যা বলেছি মনে থাকে যেন”।
মাথা মন্ডু কিছুই মাথায় ঢুকছে না, এত রাতে আবার মিষ্টি কিনতে যেতে হবে কেন, মেয়েটি এবার প্লেটের মিষ্টি থেকে খানিক মিষ্টি চামচে করে আমার মুখের কাছে এগিয়ে ধরতেই বেশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম,
– “তা, আপনি আমাকে চামচে করে মিষ্টি খাওয়াতে যাচ্ছেন কেন, আমি মিষ্টি খুবই কম খাই, দিন চামচটা আমার হাতে দিন আমি নিজেই খানিক খেয়ে নিচ্ছি।”
এবার আরও অবাক হবার পালা মেয়েটি তার হাতের একটি আঙ্গুলে একটি সোনার আংটি আমার নাকের ডগার সামনে এনে দেখি বললো,
– “দেখুন, এই আংটিটা আপনার মা আমার আঙ্গুলে এই মাত্র পরিয়ে দিলেন, আর এখন আমারই দায়িত্ব আপনাকে চামচে তুলে মিষ্টি খাওয়ানো, কারণ আজ বিকেলেই আমি বুঝতে পেরেছি আপনার দ্বারা মুখ ফুটে কোন কিছু বলার সাহস নেই, তাই এবার থেকে আমি যে ভাবে চাইবো ঠিক সে ভাবেই হবে, নিন এবার হা করে মিষ্টিটা খেয়ে নিন, এবার থেকে আমার কথাগুলো মেনে চলার চেষ্টা করুন।”
দীর্ঘ পঁচিশটা বছর পেরিয়ে গেল, এখন চাইলেও মিষ্টি আর খাওয়া হয়না, লম্বা চুলের মুখ ঢাকা মেয়েটি মিষ্টি বানালেও তা লুকিয়ে রাখে।
— মাহবুব আরিফ কিন্তু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

66 − 56 =