২২২: উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফির হত্যাকাণ্ড!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

ইসলামের ইতিহাসে উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফি এক সুপরিচিত নাম। তিনি ছিলেন সেই লোকদের একজন, ‘হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তির প্রাক্কালে” যাকে কুরাইশরা নবী মুহাম্মদের মক্কা-আগমনের কারণ অনুসন্ধানের নিমিত্তে মুহাম্মদের শিবিরে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি ছিলেন সেই লোক যিনি মুহাম্মদের শিবিরে গমন করে তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, “মুহাম্মদ, তুমি কী বিভিন্ন ধরণের মানুষদের সংগ্রহ ও একত্রিত করেছো ও অতঃপর তদেরকে নিয়ে এসেছ তোমার নিজের লোকদের ধ্বংস করার জন্য?” অতঃপর তিনি মুহাম্মদ-কে জানিয়েছিলেন, “কুরাইশরা তাদের মহিলা ও সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে চিতাবাঘের চামড়া পরিধান করে বাহির হয়ে এসেছে ও প্রতিজ্ঞা করেছে যে তোমার জোরপূর্বক মক্কায় প্রবেশ তারা কখনোই হতে দেবে না। আল্লাহর কসম, আমি মনে করি যে আগামীকাল এই লোকগুলো (এখানে) তোমাকে পরিত্যক্ত করবে।” আর তাঁর এই উক্তির পর, আবু বকর ইবনে কুহাফা তাকে তার উপাস্য ‘দেবী আল-লাত’ এর চরম অবমাননা করে অশ্রাব্য-গালি বর্ষণ করেছিলেন, এই বলে: “আল-লাত এর দুধ (ভগাঙ্কুর) চোষ!”

উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফি ছিলেন সেই লোক, যিনি হুদাইবিয়া সন্ধি-চুক্তির প্রাক্কালে মুহাম্মদের শিবির থেকে ফিরে এসে কুরাইশদের জানিয়েছিলেন, “আমি খসরুর সাম্রাজ্যে তাঁর সাথে দেখা করেছি, সিজারের সাম্রাজ্যে তাঁর সাথে দেখা করেছি ও নিগাস এর সাম্রাজ্যে তাঁর সাথে দেখা করেছি; কিন্তু আমি এমন কোন রাজা দেখি নাই যে তাঁর জনগণের কাছে ছিলেন এমন, যেমন তাঁর অনুসারীদের কাছে ছিলেন মুহাম্মদ। আমি ঐ লোকদের দেখেছি যারা কখনোই কোন কারণে মুহাম্মদকে পরিত্যাগ করবে না, সুতরাং তোমাদের বিবেচনা তোমরা নিজেরাই করো।” এ বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা “অশ্রাব্য-গালি ও অসহিষ্ণুতা বনাম সহিষ্ণুতা” পর্বে করা হয়েছে (পর্ব: ১১৫)

উরওয়া বিন মাসুদ ছিলেন থাকিফ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত আল-তায়েফের এক অধিবাসী। তার মাতা সুবায়া বিনতে আবদু সামস ছিলেন কুরাইশ বংশের, আর তার পিতা ‘মাসুদ’ ছিলেন আল-তায়েফের আল-থাকিফ গোত্রের। আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের কন্যা আমিনা (কিংবা, ‘মায়েমুনা’) বিনতে আবু সুফিয়ান ছিলেন তার পত্নী। স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন ‘আল-তায়েফ আক্রমণ” করে সেখানের বাসিন্দাদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন দিনের পর দিন (২০-৪০ দিন) ও ধ্বংস করেছিলেন তাদের সম্পদ, আল-তায়েফের লোকদের সেই ভয়াল ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে (বিস্তারিত: পর্ব: ২১২-২১৫) তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি তখন জুরাশ নামক স্থানে Testudo, Catapult ও অন্যান্য যন্ত্রের ব্যবহার শিক্ষা করছিলেন (পর্ব: ২১২)। নবী মুহাম্মদ তাঁর আল-তায়েফ আক্রমণ ও অবরোধ শেষে মক্কার পথে ফিরে আসার সময়টিতে তিনি আল-তায়েফে ফিরে আসেন। উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফি ছিলেন সেই মুহাম্মদ অনুসারী, যাকে নবী মুহাম্মদ “মরিয়মের পুত্র যিশুর সাথে সাদৃশ্য-যুক্ত” বলে অভিহিত করেছিলেন (সহি মুসলিম: বই নম্বর ৪১, হাদিস নম্বর ৭০৪৩) [1]

আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, উরওয়া বিন মাসুদ-কে হত্যা করেছিলেন তারই এলাকার লোকেরা; তারই গোষ্ঠীর সাথে জোটবদ্ধ এক লোক! আদি উৎসের বর্ণনায় ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনা: [2]
(আল-ওয়াকিদি ও আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ) [3] [4]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২২০) পর:

‘আল্লাহর নবী যখন তাদের-কে ছেড়ে চলে আসেন, উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফি তাঁকে অনুসরণ করে ও তাঁর মদিনা প্রত্যাবর্তনের আগে তাঁর নাগাল ধরে ফেলে, ও ইসলাম গ্রহণ করে। সে মুসলমান হিসাবে তার লোকদের কাছে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে অনুমতি প্রার্থনা করে, কিন্তু নবী বলেন – যা তার লোকেরা বলে – “তারা তোমাকে হত্যা করবে”; কারণ আল্লাহর নবী তাদের দাম্ভিক বিরোধী মনোভাবের বিষয়টি জানতেন। উরওয়া বলে যে তাদের কাছে সে তাদের প্রথম ঔরসজাত সন্তানের চেয়েও অধিক প্রিয় (ইবনে হিশাম: ‘‘তাদের চোখের চেয়েও অধিক প্রিয়’)। [5]

সে ছিল ঐ ব্যক্তি যাকে লোকেরা ভালোবাসতো ও মান্য করতো; অতঃপর সে ফিরে যায় ও তার লোকদের-কে ডেকে ইসলামের দাওয়াত দেয় ও আশা করে যে তাদের মধ্যে তার পদমর্যাদার কারণে তারা তার বিরোধিতা করবে না। সে যখন তার উপরের ঘরে গিয়ে নিজেকে তাদের সম্মুখে উন্মুক্ত করে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয় ও তাদের কাছে তার ধর্ম প্রদর্শন করা শুরু করে, তারা চতুর্দিক থেকে তাকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করে ও যার একটি তাকে বিদ্ধ করে ও সে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। বানু মালিক গোত্রের লোকদের দাবী এই যে, তাদের দলের এক লোক তাকে হত্যা করেছে; যার নাম ছিল আউস বিন আউফ, বানু সালিম বিন মালিক গোত্রের এক ভাই। আহলাফদের [উরওয়া বিন মাসুদের গোত্র] দাবী এই যে, তাদের মিত্র বানু আততাব বিন মালিক গোত্রের এক লোক তাকে হত্যা করেছে, যার নাম ছিল ওহাব বিন জাবির।’ [6]

উরওয়া-কে বলা হয়েছিল, “তোমার মৃত্যুর বিষয়ে তোমার ধারনাটি কী?” সে বলেছিল, “এটি একটি উপহার যার দ্বারা আল্লাহ আমাকে সম্মানিত করেছে ও এক শহীদের মর্যাদা যার দিকে আল্লাহ আমাকে ধাবিত করেছে। তোমাদের কাছ থেকে আল্লাহর নবীর ফিরে যাওয়ার আগে তাঁর পাশে থেকে যারা শহীদ হয়েছে, আমি তাদের মতই; সুতরাং আমাকে তোমরা তাদের পাশে কবর দিও।”

তারা তাকে তাদের পাশে সমাধিস্থ করে ও তাদের দাবী এই যে, আল্লাহর নবী তার সম্বন্ধে বলেছিলেন, “তাদের লোকদের মধ্য সে ছিল এমনই যেমনটি ছিল ইয়াসিনের বীর তার লোকদের কাছে।” (কুরআন: ৩৬:১৯)

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) বিস্তারিত ও অতিরিক্ত বর্ণনা: [4]

‘তারা বলেছে: আল্লাহর নবী যখন আল-তায়েফের লোকদের অবরুদ্ধ করে রেখেছিলেন উরওয়া বিন মাসুদ তখন [‘জুরাশে’] সাঁজোয়া গাড়ি ও ম্যাঙ্গোনেল (Mangonel) তৈরি শিক্ষা করছিল। অতঃপর, আল্লাহর নবীর প্রস্থানের পর সে আল-তায়েফে প্রত্যাবর্তন করে। সে সাঁজোয়া গাড়ি ও ম্যাঙ্গোনেল তৈরি করে ও তা প্রস্তুত করে যতক্ষণে না আল্লাহ তার অন্তরে ইসলাম ন্যস্ত করে; অতঃপর সে মদিনায় গমন করে ও আল্লাহর নবীর কাছে এসে ধর্মান্তরিত হয়।

অতঃপর সে বলে, “হে আল্লাহর রসূল, আমাকে আমার লোকদের কাছে যাওয়ার ও তাদের-কে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার অনুমতি প্রদান করুন; কারণ, আল্লাহর কসম, এরূপ কোন ধর্ম থেকে কেউ মুখ ফিরিয়ে নেবে এমনটি আমি দেখছি না। আমি আমার সহচর ও সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে যাব ও উত্তম পন্থায় আমি তাদের কে এই প্রস্তাব দেবো। আমি আমার দলের লোকদের কাছে এমন অবস্থানে পৌঁছেছি, তেমনটি আর কোন দল কখনই তার লোকদের কাছে পৌঁছায় নাই, আর অনেক পরিস্থিতিতেই আমার প্রাধান্য রয়েছে।”

আল্লাহর নবী বলেন, “তারা তোমাকে নিশ্চিতই হত্যা করবে।” সে জবাবে বলে, “হে আল্লাহর নবী, সত্যিই তারা আমাকে তাদের প্রথম ঔরসজাত সন্তানের চেয়েও অধিক ভালবাসে।” অতঃপর সে আল্লাহর নবীর কাছে দ্বিতীয় বার অনুমতি প্রার্থনা করে ও আল্লাহর নবী তাকে তাঁর প্রথম কথাগুলোরই পুনরাবৃত্তি করেন। আল্লাহর নবী বলেন, “নিশ্চিতই তারা তোমাকে হত্যা করবে।” সে বলে, “হে আল্লাহর নবী, তারা যদি আমাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখে তথাপি তারা আমাকে জাগিয়ে তুলবে না”; অতঃপর সে তৃতীয়বার তাঁর অনুমতি প্রার্থনা করে ও তিনি বলেন, “তুমি যদি ইচ্ছা করো, যাও।”

তাই সে আল-তায়েফের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। সে পাঁচ দিনের রাস্তা অতিক্রম করে ‘এশার’ সময় তার লোকদের কাছে গিয়ে পৌঁছে ও তার বাড়িতে প্রবেশ করে। কিন্তু তার লোকেরা তা অপছন্দ করে, এই কারণে যে, সে প্রতিমা দর্শন না করেই তার বাড়িতে প্রবেশ করেছিল। অতঃপর তারা বলে, “ভ্রমণের কারণে সে ক্লান্ত।”

তারা তার বাড়িতে আসে ও তাকে মুশরিকদের মত করে অভিবাদন জানায়,

আর উরওয়া মুশরিকদের মত করে করা তাদের সেই অভিবাদন প্রথমেই প্রত্যাখ্যান করে।

সে বলে, “তোমাদের ওপর জান্নাতিদের পক্ষ থেকে অভিবাদন।”

অতঃপর সে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়।

সে বলে, “হে লোকসকল, তোমরা কি আমাকে সন্দেহ করছো? তোমরা কি জানো না যে আমি তোমাদের অভিজাত লোকদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম? তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্পদশালী ও তোমাদের সেনাদলের লোকদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। সুতরাং এমন একটি ব্যাপার যা আমি ইসলামে দেখেছি যা থেকে কেউ মুখ ফিরিয়ে নেবে না, বিষয়টি ছাড়া আর কী এমন আছে যা আমাকে ইসলামে দীক্ষিত করেছে? আমার উপদেশ গ্রহণ করো ও আমার বিরোধিতা করো না; কারণ আল্লাহর কসম, অন্য কোন দল তাদের লোকদের কাছে আমার চেয়ে বেশী কল্যাণকর কোন জিনিসই তাদের লোকদের কাছে নিয়ে আসে নাই, যা আমি তোমাদের জন্য এনেছি।”

তারা তাকে অভিযুক্ত করে ও তার সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করে। তারা বলে, “আল-লাতের কসম, তুমি যখন দেবীর দর্শন কিংবা মস্তক মুণ্ডন করো নাই, তখনই আমাদের মনে হয়েছিল যে তুমি ধর্মত্যাগ করেছো।” তারা তাকে আক্রমণ করে ও তাকে আহত করে, কিন্তু সে তাদের প্রতি সহনশীল থাকে।

তারা তার স্থানটি থেকে বের হয়ে আসে ও ভোর হওয়া অবধি তার সম্পর্কে তাদের কী করা উচিত তা নিয়ে আলোচনা করে যতক্ষনে না সকাল হয় ও সে তার একটি ঘরে গিয়ে নামাজের জন্য আজান দেয় ও ওহাব বিন জাবিরের গোষ্ঠীর সাথে জোটবদ্ধ এক লোক তাকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করে; কিছু লোক বলেছে যে, যে ব্যক্তিটি তাকে তীর নিক্ষেপ করেছিল সে ছিল বানু মালিক গোত্রের আউস বিন মালিক, আর এটিই আমাদের কাছে অধিকতর নিশ্চিত।

উরওয়া ছিল এই দলের সাথে জোটবদ্ধ। সে তার শিরায় তীর-বিদ্ধ হয় ও তার রক্তপাত বন্ধ হয় না। তার লোকেরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জড়ো হয়। অন্যরাও সমবেত হয় ও প্রস্তুতি গ্রহণ করে। উরওয়া যখন দেখতে পায় যে তারা কী করছে, সে বলে, “আমার জন্য তোমারা লড়াই করো না। সত্যিই তোমাদের মধ্যে শান্তি আনয়নের লক্ষ্যে আমি আমার এই রক্ত এর প্রভু-কে (আল্লাহ-কে) দান করেছি। শহীদ হওয়া হলো আল্লাহর আশীর্বাদ, আর এর বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে অনুগ্রহ করেছে। আল্লাহ আমাকে এই কাজে চালিত করেছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ আল্লাহর রসুল। তিনি আমাকে অবহিত করিয়েছিলেন যে তোমরা আমাকে হত্যা করবে।” অতঃপর সে তার দলের লোকদের বলে, “তোমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে আল্লাহর নবীর পাশে থেকে যারা নিহত হয়েছে, সেই শহীদদের পাশে আমাকে কবর দিয়ো।” সে বলেছে: তারা তাকে তাদের পাশে সমাধিস্থ করে।

তাকে হত্যার এই খবরটি আল্লাহর নবীর কাছে এসে পৌঁছে ও তিনি বলেন, “উরওয়া হলো ইয়াসিনের বীরের মত, যে তার লোকদের আল্লাহর পথে আহ্বান করেছিল, আর তারা তাকে করেছিল হত্যা।” অন্যরা বলেছে, “প্রকৃতপক্ষে উরওয়া মদিনায় আগমন করে নাই। সে মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী স্থানে আল্লাহর নবীর সাথে মিলিত ও ধর্মান্তরিত হয়েছিল ও অতঃপর ফিরে গিয়েছিল।” প্রথম উপাখ্যানটি আমাদের-কে নিশ্চিত করা হয়েছে।

উরওয়া-কে যখন হত্যা করা হয়, তার পুত্র আবু মুলাহ বিন উরওয়া বিন মাসুদ ও তার ভ্রাতুষ্পুত্র কারিব বিন আল-আসওয়াদ বিন মাসুদ তায়েফের লোকদের উদ্দেশ্যে বলে: “আমরা কখনও কোনও কিছুর বিনিময়ে তোমাদের সাথে যোগ দেব না, কারণ তোমরা উরওয়া-কে হত্যা করেছো।” অতঃপর তারা আল্লাহর নবীর সাথে যোগদান করে ও ধর্মান্তরিত হয়। আল্লাহর নবী তাদের-কে বলেন, “তোমরা তোমাদের অভিভাবক হিসাবে যাকে ইচ্ছা তাকে বেছে নাও।” তারা বলে, “আমরা আল্লাহ ও তার রসুল-কে বেছে নিয়েছি।” আল্লাহর নবী বলেন, “তোমাদের আংকেল হলো আবু সুফিয়ান ইবনে হারব; তাকে তোমরা মিত্র হিসাবে গ্রহণ করো।” তারা তাই করে।

তারা আল-মুগিরা বিন শুবার নিকট গমন করে ও হিজরি ৯ সালের রমজান মাসে থাকিফদের একটি দল আসার পূর্ব পর্যন্ত তারা মদিনায় অবস্থান করে।’

– অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ – লেখক।

উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফির এই হত্যাকাণ্ডকে ইসলাম বিশ্বাসী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা (অধিকাংশই না জেনে) অবিশ্বাসীদের অমানুষিক নৃশংসতার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসাবে মুসলিম ও অমুসলিমদের উদ্দেশ্যে প্রচার করেন। নিঃসন্দেহে, “একান্তই আত্মরক্ষার অকাট্য কারণ ছাড়া” প্রতিটি হত্যাকাণ্ডই একান্তই গর্হিত ও মানবতা বিরোধী কার্যক্রম। তা সে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা তাঁদের “আল্লাহ ও ধর্মের নামেই” করুক, কিংবা অবিশ্বাসীরা করুক তাঁদের “ঈশ্বর ও ধর্মের নামে”, কিংবা অন্য কোন ব্যক্তি বা জন গুষ্টিই করুক না কেনো অন্য যে কোন কারণ বা অজুহাতে।

আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট তা হলো, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা তাদের “মক্কা আক্রমণে কুরাইশদের মোট ১৫-৩১ জন লোক-কে হত্যা (পর্ব: ১৯১১৯২), অতঃপর তাঁদের ও মক্কার আশেপাশের অবিশ্বাসীদের সমস্ত পূজনীয় দেবদেবীর-প্রতিমা ধ্বংস (পর্ব: ১৯৩১৯৪); অতঃপর বানু জাধিমা গোত্রের প্রায় ৩০জন লোক-কে তাঁদের আত্মসমর্পণ ও বন্দী অবস্থায় একে একে হত্যা (পর্ব: ২০১); অতঃপর হুনায়েন আগ্রাসনে কমপক্ষে ১১৮জন অবিশ্বাসী-কে হত্যা (পর্বে: ২০৯) ও তাঁদের সমস্ত সম্পদ লুণ্ঠন ও ভাগাভাগি; অতঃপর উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফির নিজ এলাকা “আল-তায়েফ’ হামলা ও অবরোধ সম্পন্ন করে যখন মদিনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন, তখন তাদের মদিনা প্রত্যাবর্তনের পূর্বেই (ইবনে ইশাকের বর্ণনা) কিংবা তাদের মদিনা প্রত্যাবর্তনের পরেই (আল-ওয়াকিদির বর্ণনা):

“এই উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফি ‘তাঁর সহচর, গোত্র ও এলাকাবাসীদের প্রতি বিশ্বাস-ঘাতকতা করে’ গোপনে মুহাম্মদের দলে যোগদান করেছিলেন!”

শুধু তাইই নয়, অতঃপর তিনি তাঁর নিজ এলাকা আল-তায়েফে প্রত্যাবর্তন করে ‘অতি অল্প কিছু দিন আগে’ তাদেরই এলাকায় “আগ্রাসী আক্রমণ, সম্পদ ধ্বংস ও ত্রাস সৃষ্টিকারী” মানুষটির দলে তদের-কে যোগদানের আহ্বানের স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন। শুধু কী তাই! আল-ওয়াকিদির বিস্তারিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে, যখন লোকেরা তার সাথে মিলিত হয়ে তাকে “তাঁদের (মুশরিকদের) রীতি অনুযায়ী অভিবাদন জানিয়েছিলেন তখন,

“প্রথমেই তিনি তাদের সেই অভিবাদন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন!”

তাঁর এই স্পর্ধায় ক্রোধান্বিত হয়ে যখন তাঁরা তার বাড়ির বাহিরে এসে তার সম্পর্কে তাঁদের কী করা উচিত তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছিলেন, তখন সে তার একটি ঘরে গিয়ে,

“নামাজের জন্য আজান দেয়া শুরু করেছিলেন!”

এমত পরিস্থিতিতে ক্রুদ্ধ তায়েফ-বাসী তাকে উদ্দেশ্য করে তীর নিক্ষেপ শুরু করেছিলেনে ও সেই তীরের আঘাতে তার মৃত্যু ঘটেছিল!

বিষয়টি আর একটু খোলসা করা যাক। ইসলামের ইতিহাসের এই সমস্ত নৃশংস উপাখ্যান গুলো পাঠের সময় প্রায়শই আমাদের ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস স্মরণে আসে। সেই সময়টিতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা বাংলাদেশের শহরে-গ্রামে-গঞ্জে নিরীহ জনপদ-বাসীর ওপর অতর্কিত আক্রমণ, সম্পদ লুণ্ঠন, ধরপাকড়, নিপীড়ন, হত্যা ও সর্বোপরি নারীদের ওপর তাদের যৌন-নির্যাতন চালিয়েছিল! এমনই এক পরিস্থিতি-তে, ধরা যাক, ‘আল-তায়েফ’ নামের এক এলাকায় এই পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা অতর্কিত আক্রমণ করে ত্রাস ও বিভীষিকার রাজত্ব শুরু করেছে। ভীত সন্ত্রস্ত এলাকাবাসী তাঁদের জীবন বাঁচানোর তাগিদে তাদের দুর্গ মধ্যে অবস্থান নিয়ে এই হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা নিয়েছে। আর হানাদার বাহিনী তাঁদের-কে অবরুদ্ধ করে রেখেছে দিনের পর দিন! অতঃপর সুবিধা করতে না পেরে তারা সেই এলাকা থেকে প্রস্থান করেছে।

তাদের প্রস্থানের পর ঐ এলাকারই উরওয়া বিন মাসুদ বিন থাকাফি নামের এক বিশ্বাস-ঘাতক গোপনে ঐ হানাদার বাহিনীর “লিডারের” সাথে দেখা করে তার দলে যোগদান করেছে। অতঃপর সেই ব্যক্তিটি তার এলাকায় এসে অত্র এলাকায় ‘সদ্য আক্রমণকারী’ এই হানাদার বাহিনীর লিডার ও তার দলের ভূয়সী প্রশংসা করে সেই দলে এলাকাবাসীদের যোগদানের আহ্বান, অতঃপর তাঁদের অবমাননা (অভিবাদন প্রত্যাখ্যান) ও সর্বোপরি অতি প্রত্যুষে উঠে উচ্চ-স্বরে সেই হানাদার বাহিনীর মতবাদের “আজান” দেয়া শুরু করেছে। এমত পরিস্থিতিতে যদি উত্তেজিত এলাকাবাসী এই উরওয়া বিন মাসুদ আল-থাকাফি নামের এই বিশ্বাসঘাতক-কে হত্যা করে, তবে কী সেই হত্যাকারী কিংবা এলাকাবাসী-কে “জঘন্য অপরাধে” অপরাধী রূপে সাব্যস্ত করা যায়? যদি এই প্রশ্নের জবাব “হ্যাঁ” হয় তবে, অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের অসংখ্য অতর্কিত আক্রমণ, খুন-জখম, সম্পদ লুণ্ঠন, নারী ধর্ষণ, তাদের দাস ও দাসী করন, দমন-নিপীড়ন – ইত্যাদি কর্মকাণ্ড-গুলোকে “কী ধরণের অপরাধ” হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়?

বিবেচনার ভার মুক্ত-চিন্তার পাঠকদের প্রতি।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল ওয়াকিদির বর্ণনার মূল ইংরেজি অনুবাদের প্রাসঙ্গিক অংশটি সংযুক্ত করছি (ইবনে ইশাক ও আল তাবারীর রেফারেন্স: বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক তথ্যসূত্র দুই ও তিন:]

The narratives of Al-Waqidi: [4]

‘They said: When Muḥammad besieged the people of al-Ṭā’if, ‛Urwa b. Mas‛ūd was learning to make armored vehicles and Mangonels. Then he returned to al-Ṭā’if after the Messenger of God turned away. He made armored cars and mangonels and prepared that until God deposited Islam in his heart, and he arrived in Medina before the Prophet and converted. Then he said, “O Messenger of God, grant me permission to go to my people and invite them to Islam, for by God, I do not see one turn away from a religion like this. I will approach my companions and my people with a good approach. A party never arrived upon its people except those who arrived with similar to what I arrive with, and I have precedence in many situations.” The Messenger of God said, “Surely they will kill you.” He replied, “O Messenger of God, indeed I am more loved by them than the eldest of their children.” Then he asked the Messenger of God’s permission twice, and the Messenger of God repeated to him his first words. The Messenger of God said, “Surely they will kill you.” He said, “O Messenger of God, if they find me sleeping they will not awaken me,” and he asked his permission a third time and he said, “If you wish, leave.” So he set out to al-Ṭā’if. He marched to them for five days, arrived before his people at ‛Ishā’, and entered his house. But his people disliked that he entered his house before he visited the goddess. Then they said, “The journey has exhausted him.”

[Page 961] They came to his house and greeted him with the greetings of the polytheist, and the first thing ‛Urwa rejected was the greeting of the polytheist. He said, “Upon you are greetings from the people of Paradise.” Then he invited them to Islam. He said, “O People, are you suspicious of me? Do you not know that I am the best of your nobility? Your most wealthy in property, the most powerful of you in troops. So what brought me to Islam except that I saw an affair from which no one will turn away? Accept my advice and do not oppose me, for by God, a party did not arrive before a people with something more gracious than what I bring you.” They accused him and were suspicious of him. They said, “By al-Lāt, it occurred to us, when you did not approach the goddess or shave your head, that you had apostatized.” They attacked him and they hurt him, but he was patient with them. They set out from his place and deliberated about what they should do about him, until when it was dawn, and he went to a room of his and proclaimed the call to prayer, a man from a group of allies called Wahb b. Jābir aimed an arrow at him; and some say Aws b. Mālik from the Banū Mālik aimed at him, and this is more confirmed with us.

‛Urwa was a man from the allies. He received the arrow in his vein, and his blood did not stop flowing. His people assembled with weapons. The others gathered and mobilized. When ‛Urwa saw what they did, he said, “Do not fight for me. Indeed I have donated my blood to its master (God) to bring peace to you. Martyrdom is a blessing of God, and God favors me with it. God drove me to it. I testify that Muḥammad is the messenger of God. He informed me that you would kill me.” Then he said to his group, “Bury me with the martyrs who were killed beside the Messenger of God before he left you.” He said: They buried him with them.’ —–

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] সহি মুসলিম: বই নম্বর ৪১, হাদিস নম্বর ৭০৪৩:
https://quranx.com/hadith/Muslim/USC-MSA/Book-41/Hadith-7023/

“—– And Allah would then send Jesus son of Mary who would resemble ‘Urwa b Mas’ud. —”

[2] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা: ৬১৪
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[3] আল-তাবারী: ভলুউম ৯: পৃষ্ঠা ৪১-৪২
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[4] আল-ওয়াকিদি: ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ৯৬০-৯৬২; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা: পৃষ্ঠা ৪৭০-৪৭১
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[5] Ibid মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: ইবনে হিশাম নোট নম্বর ৮৬৬, পৃষ্ঠা ৭৮৩।
[6] Ibid আল-তাবারী: নোট নম্বর ৩০৯:
আউস বিন আউফ – “পরবর্তীতে তিনি থাকিফদের প্রতিনিধি দলের লোকদের সাথে নবীর কাছে আসেন ও ইসলাম গ্রহণ করেন।”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

59 − 50 =