ধর্ম নির্ভর বিদ্যা শিক্ষা।

ম্যাসেঞ্জারে কথা হচ্ছিল আমি যে এলাকায় আমার বাল্যকাল ও কৈশোর কাটিয়ে এসেছি যথা চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার শ্রদ্ধ্যেয় জনাব Mizanur Rahman ভাইয়ের সাথে, তিনি একাধারে আমার খেলাধুলার জগতে একজন প্রাক্তন ফুটবলার ও সরকারী কর্মকর্তা, হঠাত প্রশ্ন করে বসলেন,
-আরিফ তুমি এতো পড়াশোনা করলে কখন, তুমি তো ফুটবল খেলতে খেলতেই জীবনটা পার করলে ? কিন্তু হঠাত এতো কিভাবে জানো তুমি।
ভীষণ রকম লজ্জায় পরে গেলাম, হঠাত নিজাম ভাই যে এরকম একটা প্রশ্ন করে বসবেন তা কল্পনাতেই ছিল না, অগত্যা উত্তর তো একটা দিতেই হয়,
– কি যে একটা লজ্জায় ফেলে দিলেন নিজাম ভাই, আসলে আমি তো “উচ্চ শিক্ষার্থে পল্লী যাত্রা” ছাত্র, পরীক্ষার হলে ঢুকতেই পকেটের যা চোথা ছিল সব নিয়েই ধরা খেলাম, নকল করবো সেই উপাদানগুলোও হাত ছাড়া হয়ে গেল, ভাগ্যিস প্রশ্ন কমন পড়ে গিয়েছিল।
শ্রদ্ধেয় নিজাম ভাইয়ের হাসা হাসিতেই দফারফা।

আমরা এমন একটি সমাজে বসবাস করছি যেখানে গির্জায় পাদ্রীর হাতে বাতাসা খেয়ে যিনি ধন্য হয়েছেন, পুরোহিতের মন্ত্র বাণীতে যার মন শুদ্ধ হয়েছে, খোতবা শুনে যিনি জ্ঞানী হয়েছেন, ওয়াজ শুনে যিনি বিজ্ঞানী হয়েছেন তার কাছে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা মানেই বাতুলতা সর্ব ক্ষেত্রেই তিনি সুন্নত ও তার বরকত খুঁজে বেড়ান কাজই শিক্ষার বিষয়টিও অনেকটা ধর্ম নির্ভর। ধর্মের বাণী তার কাছে যুদ্ধ জয়ের অস্ত্র সরূপ, আর বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়াতে আমি কি হনুরে জাহির করে বিশাল রাজনীতি বনে যাওয়া ব্যবসার ধান্দা মাত্র।

তবে একটা বিষয় বাংলাদেশ ফেইসবুক ক্যাটাগরির গুলোতে আসলেই বোঝা যায় পরিচিতদের মেধা বা শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ এখানে অন্যের মাঝে ঈর্ষার সৃষ্টি করে কাজেই আমিও সাপ ব্যাঙ খাচ্ছে, ছাগল গাছে ওঠে, কলা গাছে কাঁঠাল, মাছের গায়ে আরবী ভাষা জাতিও ছবি দিয়ে এইসব গ্রুপগুলো ভরে রাখি। কাউকে ঈর্ষা বা অপছন্দ করার একটি বিশেষ কারণ যদি তার মেধা ও শিক্ষাই মূল কারণ হয়ে দাড়ায় তবে একটি শিক্ষিত জাতি তৈরি করতে আমাদের হাটতে হবে অনেকদূর। অনেক অনেক দীর্ঘ সময় প্রবাসে পশ্চিমা দেশের একটি আধুনিক ও সভ্য সমাজ ব্যবস্থায় থাকতে থাকতে ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা হিংসা বিষয়গুলো থেকে যোজন যোজন দুরে চলে এসেছিলাম। সোশাল ডেমোক্রেট রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সবাই মানুষ সবাই সমান, সবার মানবিক অধিকার ও প্রাপ্য একই রকম, এসব দেশে ধনী গরীবের ব্যবধান থাকে না তাই তাদের মাঝে ঈর্ষা বিষয়টি কাজ করে না, যে যার মতো খেয়ে পড়ে ভালই আছে। এখানকার ছেলে মেয়েরা স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে কারণ পড়াশোনায় তাদের আগ্রহ আছে পড়াশোনা করতে ভালো লাগে, আনন্দ পায় তাই এখানকার স্কুল কলেজের ছেলে মেয়েদের আমি কখনো দেখিনি না শুনিনি কেউ কারুর সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। আমি যদি বাংলাদেশী প্রবাসী না হতাম এই বিষয়গুলো এভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম না। আমাদের বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় অনেক কিছুই সুন্দর ভালো, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের আতিথীয়তা, আমাদের ইতিহাস কি দারুণ ভাবে আমাদের গর্বিত করে আর এসব ভাবতে গেলেই গর্বে বুকটা ভরে ওঠে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমি আবার সেই একই দেশে “উচ্চ শিক্ষায় পল্লী যাত্রা ছাত্র” ভাবতেই আবারও লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসে। এবার নিশ্চয়ই পাঠক সমাজকে বোঝাতে পেরেছি আমাদের সত্যিকারের শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ অনেক।

স্কুল ও কলেজ জীবনের শিক্ষা কাল কেটেছে বাংলাদেশে, কলেজ শেষ করে দুই বছরের মাথায় প্রবাসে চলে আসার পর বুঝতে পেরেছিলাম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে যেটা বোঝায় তার বিন্দু মাত্র শেখা হয়নি বা আমার মাঝে নেই। প্রশ্ন কমন না পরলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার যে কাগজখানা দিয়ে প্রবাসে শিক্ষার বাহানা তুলে চলে আসা সেটা ছিল নিজের বিবেকের কাছে চরম অবমাননাকর, সেই দিনগুলোর কথা চিন্তা করলে আজও লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসে। পত্রিকাতে দেখতাম মেধাবী ছাত্র ছাত্রীরা উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে যায় আর আমি কিনা কলেজের গণ্ডি পার হতেই পল্লী যাত্রা করেছিলাম। শুধু আমি একা নই আমরা অনেক বন্ধুরাও দল বেধে উচ্চ শিক্ষা নিতে শহর ছেড়ে পল্লী যাত্রা করেছিলাম। বাবা মাকে জিজ্ঞাস করেছিলেন – “খোকা এই হোল্ডল বেডিং পত্র বেধে কোথায় যাচ্ছে?”, মা সেদিন বাবাকে উত্তর দিয়েছিলেন পরীক্ষা দিতে পল্লী যাচ্ছে, বাবাও বেশ অবাক হয়ে বলেছিলেন – “আমি এরকম কথা জীবনেও শুনি নাই যে কেউ কিনা পরীক্ষা দিতে শহর ছেড়ে গ্রামে যায়।”

আসলে পড়াশোনা হচ্ছে ভালো লাগার বিষয়, প্রতিযোগিতা বা সিলেবাস পড়ে কমন প্রশ্নের জন্যে নয়। প্রবাসে এসেই পড়াশোনার যে ঘানি টানতে হয়েছে তা যদি ব্যাক্ষা করতে যাই তবে একটা উপন্যাস রচিত হয়ে যাবে। প্রবাসে না আসলে বুঝতেই পারতাম না আসলেই আমি কতো কম জানি ও জেনেছি,যাও জেনেছি তা ওই সিলেবাস ও পরীক্ষার হলে পাওয়া কমন প্রশ্ন।
শিক্ষা হল আধুনিক কালের মানব জীবনের সংযোজিত বিষয় গুলির মাঝে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিষয় অথচ আমরা এখানেই কতো কম জানি ও শিখি। ব্যক্তি তথা সমাজের উন্নয়নে যে বিষয়ের উপর আমাদের সর্বাধিক জোর দেবার প্রয়োজন তা হচ্ছে শিক্ষা, প্রতিরক্ষা বাজেট ও শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের বরাদ্দ কতো তা যদি একবার নিজেরাই দেখে নেন তবে শিহরিত হয়ে উঠবেন নিশ্চয়ই। শিক্ষা ও আমাদের উপমহাদেশ নিয়ে ভবিষ্যতে একটা লেখা তৈরি করছি, আশা করছি আমার ক্ষুদ্র তুলনামূলক গবেষণা সমাজের উপকারে আসবে।
আসলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রজন্মকে প্রাথমিক পর্যায় থেকে সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা বা সরকারী সিভিল একাডেমীর শিক্ষার আদলে আচরণ বিধি শিক্ষা দেবার পদক্ষেপ না নিলে মানুষের মাঝে সভ্যতার আলো পৌঁছানো সম্ভব হবে না, কেউ যদি মনে করে দেশটা শেষ হয়ে যাচ্ছে, সমাজ থেকে সভ্যতা, মানবিকতা ও মানবতা অধঃপতনে চলে যাচ্ছে সে ক্ষেত্রে আমি বলবো চলে যাচ্ছে নয় চলে গেছে।
— মাহবুব আরিফ কিন্তু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 31 = 33