২২৩: তামিম গোত্রের প্রতিনিধিদলের আগমন – কারণ?

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) তাঁর মক্কা বিজয়, হুনায়েন আগ্রাসন ও তায়েফ অবরোধ শেষে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করার প্রায় মাস দেড়েক পর, হিজরি ৯ সালের মহরম মাসে (এপ্রিল-মে, ৬৩০ সাল), বানু তামিম গোত্রের এক প্রতিনিধি দল মদিনায় মুহাম্মদের কাছে এসে হাজির হয়। কী কারণে তাঁরা মদিনায় মুহাম্মদের কাছে এসে হাজির হয়েছিলেন, তা মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও আল-তাবারীর বর্ণনায় অনুপস্থিত, কিন্তু আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় তা বিস্তারিত ও প্রাণবন্ত। অন্যদিকে, মদিনায় পৌঁছার পর এই প্রতিনিধি দলের লোকেরা কী ধরণের কর্মকাণ্ড সংঘটিত করেছিলেন তা তাঁরা সকলেই তাঁদের নিজ নিজ ‘সিরাত’ গ্রন্থে বিভিন্ন ভাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) বর্ণনায় ‘তাঁদের’ মদিনা গমনের কারণ: [1]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২২২) পর:

‘সে বলেছে: আল-যুহরি ও আবদুল্লাহ বিন ইয়াযিদ হইতে >সায়িদ বিন আমর হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে >মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ বিন মুসলিম আমাদের-কে বর্ণনা করেছে। তাদের উভয়ে বলেছে:

আল্লাহর নবী আল-জিররাানা থেকে রওনা হয়ে জিলকদ মাস শেষ হওয়ার তিনি দিন পূর্বে[হিজরি ৮ সাল] মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। জিলকদ মাসের অবশিষ্ট সময় ও জিলহজ মাসটি অপেক্ষার পর তিনি যখন আল-মহরম মাসের [হিজরি ৯ সাল] চাঁদ দেখতে পান, তখন তিনি ‘সাদাকা’ আদায়কারী লোকদের প্রেরণ করেন।

তিনি বুরায়েদা বিন আল-হুসায়েব কে আসলাম ও গিফারদের কাছ থেকে ‘সাদাকা (দান বা দরিদ্রদের জন্য কর)’ আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন; কিছু লোক বলেছে যে সে ছিল কা’ব বিন মালিক। তিনি আববাদ বিন বিশর আল-আশহালি-কে সুলায়েম ও মুযায়েনাদের নিকট, রিফা বিন মাকিথ-কে জুহায়েনাদের নিকট; আমর বিন আল আস-কে ফাযারাদের নিকট, দাহহাক বিন সুফিয়ান আল-কিলাবি কে বানু কিলাবদের নিকট, বিসর বিন সুফিয়ান আল কা’বি কে বানু কা’ব ও ইবনে আল-লুতবিয়া আল-আযদি কে বানু যুবিয়ানদের নিকট প্রেরণ করেন; তিনি বানু সা’দ বিন হুধায়েম গোত্রের এক লোককে তাদের সাদাকা এর ব্যাপারে প্রেরণ করেন।

বিসর বিন সুফিয়ান, বানু কাব গোত্রের সাদাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়; কিছু লোক বলেছে যে, যে তাদের কাছে গিয়েছিল সে ছিল বরং নুয়ায়েম বিন আবদুল্লাহ আল নাহাম আল-আদায়ি। সে যখন পৌঁছে, [তখন] বানু তামিম গোত্রের অন্তর্ভুক্ত বানু জুহেয়েম গোত্র ও বানু আমর বিন জুনদুব বিন আতায়ের বিন আমর বিন তামিম গোত্রের লোকেরা তাদের এলাকায় অবস্থান করছিল ও তারা তাদের (বানু কাব) সাথে তাদের ধাত আল-আশতাত স্থানের এক চৌবাচ্চার পাশে মদ্যপান করছিল। কিছু লোক বলেছে যে, সে তাদের সাক্ষাত পেয়েছিল উসফান নামক স্থানে।

সে বানু খোজা গোত্রের লোকদের-কে গবাদি-পশুগুলো একত্রিত করার আদেশ জারী করে যাতে সে তাদের কাছ থেকে সাদাকা নিতে পারে। সে বলেছে: খোজা গোত্রের লোকেরা প্রতিটি অঞ্চল থেকে সাদাকা সংগ্রহ করে, কিন্তু বানু তামিম গোত্রের লোকেরা তা প্রত্যাখ্যান করে ও বলে:

“এটি কি? তোমাদের সম্পত্তি তোমাদের কাছ থেকে জোর করে নেওয়া হচ্ছে! তোমরা একত্রিত হও, বর্ম পরিধান করো ও তরোয়াল বের করো।” কিন্তু খোজারা বলে, “আমরা এমন এক লোক যারা ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করি। এই সাদাকা আমাদের ধর্মের উদ্দেশ্য।” তামিমিরা বলে, “আল্লাহর কসম, সে এখান থেকে কখনও কোন উট নেবে না!”

কর আদায়কারী লোকটি যখন তাদের-কে দেখে, সে তাদের কাছ থেকে পালিয়ে দূরে সরে যায় ও প্রস্থান করে; কারণ সে তাদের-কে দেখে ভয় পেয়েছিল। সেই সময়, বেদুইনরা ইসলামে গ্রহণ করে নাই।

বাঁকি বেদুইনরা সহ্য করে। আল্লাহর নবী মক্কা ও হুনায়েনে যা করেছিল সে কারণে তারা তাঁর তরবারির ভয়ে ভীত ছিল।

আল্লাহর নবী ট্যাক্স সংগ্রহকারীদের এই নির্দেশ দিতেন যে তারা যেন তাদের কাছ থেকে বাড়তি অংশটি নিয়ে নেয় ও তাদের সম্পদের নির্ধারিত মূল্য রেখে আসে। ট্যাক্স সংগ্রহকারী লোকটি আল্লাহর নবীর সম্মুখে এসে পৌঁছে ও তাঁকে ঐ খবরটি জানায়। সে বলে:

“হে আল্লাহর নবী, আমি তিনটি দলের সাথে ছিলাম ও খোজারা তামিমদের উপর আক্রমণ ও তাদের-কে তাদের এলাকা থেকে বহিষ্কার করেছে, এই বলে, ‘যদি তোমাদের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি না থাকতো তবে তোমরা কখনোই তোমাদের এলাকায় ফিরে যেতে পারতে না। মুহাম্মদের সাথে শত্রুতার কারণে আমাদের ওপর অবশ্যই দুর্দশা নেমে আসবে, আর তোমাদের ওপরও যদি তোমরা আল্লাহর নবীর বার্তাবাহকদের মোকাবিলা করো, তাদের-কে আমাদের সম্পত্তির কর (সাদাকা) আদায় করা থেকে দূরে সরিয়ে দাও।’ তাই তারা তাদের এলাকায় ফিরে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছে।”

আল্লাহর নবী বলেন, “কে আছো এমন যে এই লোকদের জন্য যারা এমন কাজটি করেছে?” তিনি লোকদের মধ্য থেকে প্রথমেই যাকে নিযুক্ত করেন, সে হলো, ইউয়েনা বিন হিসন আল-ফাযারি। সে বলে, “আল্লাহর কসম, আমি তাদের জন্য প্রস্তুত। আল্লাহর ইচ্ছায়, তাদের-কে আপনার কাছে ধরে আনার পূর্ব পর্যন্ত আমি তাদের গতিবিধি অনুসরণ করবো, এমন কি তারা যদি ইয়াব্রিনেও পৌঁছে তবুও। অতঃপর হয় আপনি তাদের বিচার করবেন কিংবা তারা ধর্মান্তরিত হবে।”

তাই আল্লাহর নবী তাকে বেদুইনদের মধ্য থেকে পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী সহ প্রেরণ করেন। তাদের মধ্যে একজনও মুহাজির কিংবা আনসার ছিল না। সে রাতের বেলা চলাচল করতো ও দিনের বেলা তাদের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকতো।

সে রাকুবা থেকে যাত্রা শুরু করে যতক্ষণে না সে আল-আরজ নামক স্থানে এসে পৌঁছে। সে তাদের সম্পর্কে এই খবর পায় যে, তারা বানু সুলাইয়েম গোত্রের এলাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। তাই সে তাদের গতিপথ অনুসরণ করে যতক্ষণ না সে দেখতে পায় যে তারা আল-সুকিয়ার মোড়টি ঘুরে সাহরায় অবস্থিত বানু সুলাইয়েম গোত্রের এলাকার দিকে যাত্রা করছে। তারা সেখানে থেমেছিল ও তাদের পশুচারণ করেছিল। তাদের মহিলারা ও একটি ছোট্ট দল ছাড়া আর কেউই ঘরে বসে ছিল না।

তারা যখন দলটি-কে দেখে, তারা ঘুরে দাঁড়ায় ও তাদের মধ্য থেকে তারা এগারো জন পুরুষকে ধরে ফেলে ও মহিলাদের আবাসস্থলে এগারো জন মহিলা ও ত্রিশ জন যুবককে খুঁজে পায়; অতঃপর তারা তাদের-কে মদিনায় ধরে নিয়ে আসে।

আল্লাহর নবী এই আদেশ করেন যে, তাদের-কে যেন রামলা বিনতে আল-হারিথের গৃহে বন্দী করে রাখা হয়।‘

আল-ওয়াকিদির বিস্তারিত বর্ণনায় “তাঁদের” মদিনার কর্মকাণ্ড (কবিতা পঙক্তি পরিহার): [2]
(ইবনে ইশাক ও আল-তাবারীর বর্ণনা, আল-ওয়াকিদির বর্ণনারই অনুরূপ) [3][4]

‘অতঃপর তাদের দশ জন (আল-তাবারী: “বিশাল প্রতিনিধি দল [আশি জনেরও বেশী], যাদের মধ্যে ছিল ইউয়েনা বিন হিসন) নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি উপস্থিত হয়: তারা ছিল, আল-উতারিদ বিন আল-হাজিব বিন যুরারা; আল-যাবরিগান বিন বদর; কায়েস বিন আসিম; কায়েস বিন হারিথ; নুইয়াম বিন সা’দ; আমর বিন আল-আহতাম; আল-আকরা বিন হাবিস; রিয়াহ বিন আল-হারিথ বিন মুজাশা। [5]

তারা জোহরের পূর্বে মসজিদে প্রবেশ করে ও প্রবেশের সময় তারা তাদের বন্দীদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে ও তাদের সম্পর্কে তাদের-কে জানানো হয় ও [তাদের-কে] তাদের কাছে নিয়ে আসা হয়। শিশু ও মহিলারা কান্না-কাটি করে। অতঃপর তারা দ্বিতীয়বার মসজিদে প্রবেশ না করা পর্যন্ত ফেরৎ যায়।

সেই সময় আল্লাহর নবী আয়েশার গৃহে অবস্থান করছিলেন। বিলাল নামাযের প্রথম আজান ঘোষণা করে। নবীর বাহিরে বের হয়ে আসার জন্য লোকগুলো অপেক্ষা করছিল।

তারা তাকে বাহিরে বের হয়ে আসার জন্য তাড়া দিচ্ছিল। তারা ডাকছিল, “হে মুহাম্মদ, বের হয়ে আমাদের নিকটে আসুন!”

বেলাল তাদের সম্মুখে এসে দাঁড়ায় ও বলে, “অবশ্যই আল্লাহর নবী এখন বেরিয়ে আসছেন।” মসজিদে থাকা লোকগুলো আওয়াজ তোলে ও হাততালি দেওয়া শুরু করে। আল্লাহর নবী বের হয়ে আসেন ও বেলাল নামাযের জন্য উঠে দাঁড়ায়। যারা তার সাথে কথা বলেছিল তারা তার সাথে লেগে থাকে। বেলাল দ্বিতীয়বার নামাজের আহ্বান করার পরের কিছু সময় আল্লাহর নবী তাদের-কে কিছু সময় দেন। তারা বলে: “আমরা আমাদের বক্তা ও কবিদের সঙ্গে নিয়ে আপনার কাছে এসেছি, সুতরাং আপনি আমাদের কথা শুনুন।” নবীজি মৃদু হাসেন। অতঃপর তিনি লোকগুলোর সাথে জোহরের নামায আদায় করেন। অতঃপর তিনি তাঁর বাড়িতে ফিরে যান ও দুই রাকাত নামাজ পড়েন। অতঃপর তিনি বাইরে এসে মসজিদের আঙ্গিনায় বসে পড়েন।

তারা তাঁর সম্মুখে আসে ও আল-উতারিদ বিন আল-হাজিব আল-তামিমি কে পরিচয় করিয়ে দেয় ও সে কথা বলে, বলে:

“ঈশ্বরের প্রশংসা, যিনি আমাদের প্রতি অনুগ্রহ-শীল ও যিনি আমাদের-কে প্রভাবশালী বানিয়েছেন ও আমাদের-কে সম্পদ প্রদান করেছেন, সৎ কাজের নিমিত্তে। তিনি আমাদের-কে পূর্বাঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী সম্প্রদায় বানিয়েছেন, সর্বাধিক ধনী ও সংখ্যায় বৃহত্তম। আমাদের তুল্য সম্প্রদায় আর কে আছে? আমরা কি জনগণের নেতা ও তাদের অনুগ্রহের স্বত্বাধিকারী নই? আমাদের সংখ্যায় চেয়ে বেশী গর্বিত আর কে আছে? আর আমরা যদি ইচ্ছা করি তবে আমরা আমাদের কথা আরও বাড়াতে পারি। তবে ঈশ্বর আমাদের যা দিয়েছেন তা নিয়ে আরও বেশী কিছু বলতে আমরা বিব্রত বোধ করি। আমি আমার এই কথাগুলি বলছি এ জন্যই যে, যাতে বক্তব্য পেশ করা হয় যা আমাদের বক্তব্যের চেয়ে উত্তম!”

আল্লাহর নবী থাবিত বিন কায়েস-কে বলেন, “উঠে দাঁড়াও ও তাদের বক্তার জবাব দাও!”
থাবিত উঠে দাঁড়ায়, আর সে ঐ বিষয়ে কিছুই জানত না; সে কী বলবে সে সম্পর্কে আগে থেকে কোন প্রস্তুতি নেয় নাই, সে বলে: [6]

“প্রশংসা আল্লাহর যিনি নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছেন ও তাতে তার আদেশ পূরণ করেছেন, আর সব কিছুই যার জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। তোমার যা কিছু তা তারই অনুগ্রহে। অতঃপর আল্লাহ যা প্রতিষ্ঠিত করেছে তারই বদৌলতে সে আমাদের প্রভাবশালী বানিয়েছেন। তিনি তার সৃষ্টি থেকে আমাদের জন্য এমন একজনকে বেছে নিয়েছেন, যিনি তাদের মধ্যে বংশতালিকায় সবচেয়ে মহানুভব, বৈশিষ্ট্যে সবচেয়ে মনোরম, কথায় সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য। তিনি তাঁর কাছে তাঁর গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন। তিনি তার সৃষ্টির ভিতরে তাঁর উপর আস্থা-স্থাপন করেছেন। তার সকল উপাসকদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে সেরা। তিনি তাঁর ধর্মবিশ্বাসের প্রতি লোকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তাঁর লোকদের মধ্যে মুহাজিররা ও তাঁর পরিবার সদস্যরা বিশ্বাস স্থাপন করেছে। লোকদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের, তিনি লোকদের মধ্যে কর্ম-কাণ্ডে ছিলেন সবচেয়ে সদয়। আর আল্লাহর নবী যখন আমন্ত্রণ করেছিলেন, আমরাই ছিলাম প্রথম যারা সাড়া দিয়েছিল। আমরা হলাম আনসার, সাহায্যকারী, আল্লাহ ও তার রসুলের। আমরা লোকদের বিরুদ্ধে লড়াই করি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা বলে, “একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নাই।” যারা আল্লাহ ও তার রসূলকে বিশ্বাস করে, তাদের সম্পদ ও প্রাণনাশ নিষিদ্ধ। যে আল্লাহ-কে অবিশ্বাস করে, আমরা তার সাথে সে ব্যাপারে যুদ্ধ করবো। তার প্রাণহানি সহজ (আল-তাবারী [ও ইবনে ইশাক]:

আর যে অবিশ্বাস পোষণ করে, আমরা আল্লাহর পথে তার সাথে সর্বদায় যুদ্ধ করবো ও আমাদের কাছে তাকে হত্যা করা এক ক্ষুদ্র বিষয় [পৃষ্ঠা: ৬৯])।

আমি আমার এই কথাগুলি বলছি, আর আমি ইমানদার পুরুষ ও নারীদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।” অতঃপর সে বসে পড়ে।

তারা বলে, “হে আল্লাহর নবী, আমাদের কবি-কে অনুমতি দিন।”
তাই তিনি তাকে অনুমতি দেন। তারা যাবরিগান বিন বদর-কে পরিচয় করিয়ে দেয়, আর সে বলে: [কবিতা – সে কবিতার মাধ্যমে তাদের শৌর্যবীর্য ও মহত্ত্বের প্রশংসা করে।]

আল্লাহর নবী বলেন, “হে হাসান বিন থাবিত, তাদের-কে জবাব দাও।” তাই হাসান উঠে দাঁড়ায় ও বলে: [কবিতা – কবিতার মাধ্যমে মুসলমান ও নবী মুহাম্মদের প্রশংসা ও যুদ্ধে তাদের সাহস ও বীরত্ব-গাথা প্রকাশ।] [7]

আল্লাহর নবী মসজিদে একটি মিনবার স্থাপনের আদেশ দেন ও হাসান সেখান থেকে কথা বলে। তিনি বলেন: যতক্ষণ পর্যন্ত সে তার নবীর পক্ষে দাঁড়াবে, নিশ্চিতই আল্লাহ তার পবিত্র আত্মা (রুহ আল-কুদ্দুস) দ্বারা হাসান-কে অবশ্যই সাহায্য করবে। সেই সময়, থাবিতের পরিবর্তে হাসান ও তার কবিতার কারণে আল্লাহর নবী ও মুসলমানরা ছিল প্রসন্ন।

দলটি প্রত্যাহার করে, তাদের কিছু লোক অন্য লোকদের সাথে চলে যায়। তাদের একজন বলে, “ঈশ্বরের কসম, তোমরা নিশ্চিতরূপেই জানো যে এই ব্যক্তি সাহায্য প্রাপ্ত। লোকেরা তার জন্য হাজির। ঈশ্বরের কসম, তার বক্তা আমাদের বক্তার চেয়ে উত্তম। সত্যই, তাদের কবি আমাদের চেয়ে উত্তম। তাদের অভিব্যক্তি আমাদের চেয়ে উত্তম।”

থাবিত বিন কায়েস ছিল লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী উচ্চ-কণ্ঠ। আল্লাহ তাদের উচ্চ-কণ্ঠ সম্বন্ধে নবীর কাছে আয়াত নাজিল করে। আল্লাহ উল্লেখ করে যে তারা ঘরের পিছন থেকে নবী-কে চিৎকার করে ডেকেছিল। সে নাজিল করেছে:

“মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না” এখান থেকে “তাদের অধিকাংশই অবুঝ” পর্যন্ত [৪৯:২-৪] – এর মানে হলো তামিমরা; যেখানে তারা নবীকে চিৎকার করে ডেকেছিল। এটি নিশ্চিত করা হয়েছে যে, যখন আয়াতটি নাজিল হয় তখন নবীর সাথে থাবিত তার কণ্ঠস্বর উঁচু করে নাই।

আল্লাহর নবী বন্দীদের ফেরত দেন।

সেই সময়, আমর বিন আল-আহতাম উঠে দাঁড়ায় ও কায়েস বিন আসিম-কে অপমান করে। তাদের উভয়ই সেই [তামিম] দলে উপস্থিত ছিল। আল্লাহর নবী তাদের জন্য পুরষ্কারের আদেশ প্রদান করেন। কোন দল যখন তাঁর কাছে উপস্থিত হতো, তিনি তখন তাদের পুরস্কৃত করতেন; তাদের শ্রেষ্ঠ গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদের, সামর্থ্য অনুযায়ী কোন এক উপহার যেমনটি তিনি মনে করতেন।। আল্লাহর নবী তাদের-কে উপহার প্রদানে পুরস্কৃত করার পর বলেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে যাকে পুরষ্কার দেওয়া হয় নাই?” তারা বলে, “ঘোড়ায় চড়ে আছে এক যুবক।” আল্লাহর নবী বলেন, “তাকে পাঠিয়ে দাও, আমরা তাকে পুরস্কার দেবো।” কায়েস বিন আসিম বলে, “অবশ্য, সে এমন এক যুবক যে সম্ভ্রান্ত নয়।” আল্লাহর নবী বলেন, “যদি সে তা হতো! নিশ্চিতই সে এই দলের অন্তর্ভুক্ত ও তার অধিকার আছে।” —

মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (ও আল-তাবারীর) অতিরিক্ত বর্ণনা: [3] [4]

“—-অবশেষে তারা ইসলাম গ্রহণ করে ও আল্লাহর নবী তাদের-কে মূল্যবান উপহার-সামগ্রী প্রদান করেন।”

– অনুবাদ, টাইটেল, > ও [**] যোগ – লেখক।

আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো, তামিম গোত্রের লোকেরা নবী মুহাম্মদের প্রেরিত “কর আদায়কারী লোক-টি কিংবা তাঁর অন্য কোন অনুসারী-কে কোনরূপ “শারীরিক আক্রমণ” করেন নাই। তাঁরা খোজা গোত্রের লোকদের-কে বলেছিলেন:

“তোমাদের সম্পত্তি তোমাদের কাছ থেকে জোর করে নেওয়া হচ্ছে! তোমরা একত্রিত হও, বর্ম পরিধান করো ও তরোয়াল বের করো। — “আল্লাহর কসম, সে এখান থেকে কখনও কোন উট নেবে না!”

তারই প্রতিক্রিয়ায় “মুহাম্মদ অনুসারী” খোজা গোত্রের লোকদের প্রতিক্রিয়া ছিল, এই যে, তারা তাদের ওপর আক্রমণ করে ও বলে:

“মুহাম্মদের সাথে শত্রুতার কারণে আমাদের ওপর অবশ্যই দুর্দশা নেমে আসবে, আর তোমাদের ওপরও যদি তোমরা আল্লাহর নবীর বার্তাবাহকদের মোকাবিলা করো, তাদের-কে আমাদের সম্পত্তির কর (সাদাকা) আদায় করা থেকে দূরে সরিয়ে দাও।”

অতঃপর, তারা তামিম গোত্রের ঐ লোকদের-কে তাদের এলাকা থেকে বিতাড়িত করে। খোজা গোত্রের এই প্রতিক্রিয়ায় যা সুস্পষ্ট, তা হলো,

“মুহাম্মদ অনুসারী হওয়া সত্বেও তারা ছিলেন মুহাম্মদের ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত!”

তারা নিশ্চিত জানতেন যে, যদি তারা মুহাম্মদের আদেশ-কৃত এই ‘কর (সাদাকা)’ প্রদান না করে, কিংবা তারা কিংবা অন্য যে কোন ব্যক্তি বা সম্প্রদায় যদি মুহাম্মদের কর্ম-কাণ্ডে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করে, তবে মুহাম্মদের করাল গ্রাস থেকে তাদের পরিত্রাণ মিলবে না। “তাদের ওপর অবশ্যই দুর্দশা নেমে আসবে!” তাদের আশংকা শতভাগ সত্য ছিল। অতঃপর মুহাম্মদ ইউয়েনা বিন হিসন-কে পঞ্চাশ জন অশ্বারোহী সহ পাঠিয়েছিলেন, তামিম গোত্রের লোকদের ওপর ‘অতর্কিত আক্রমণের উদ্দেশ্যে! আর এই আক্রমণে তারা তামিম গোত্রের এগারো জন পুরুষ, এগারো জন মহিলা ও ত্রিশ জন যুবক:

মোট ৫২-জন নিরপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুদের বন্দী করে মদিনায় ধরে নিয়ে আসে।

তার পরের ঘটনা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। হাওয়াজিন প্রতিনিধি দলের মতই (পর্ব-২১৬), তামিম প্রতিনিধি দলটিও মদিনায় মুহাম্মদের কাছে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন, তাঁদের পরিবার-পরিজনদের ফেরত প্রদানের অনুরোধ নিয়ে! আর মুহাম্মদ তাঁদের এই প্রিয়জনদের মুক্তি দিয়েছিলেন, “তাঁদের ইসলাম গ্রহণের বিনিময়ে!”

এই ঘটনার সাথে কবিতা পাঠের প্রতিযোগিতায় ‘হার-জিতের কোন’ সম্পর্ক নেই। শুধু তাইই নয় যেখানে তাঁদের ৫২-জন প্রিয়জন মুহাম্মদের হাতে বন্দী ও তাদের-কে দেখে ঐসব বন্দী প্রিয়জনরা কান্না-কাটি শুরু করেছে, এমত পরিস্থিতি-তে “এই কবিতা পাঠের প্রতিযোগিতার গল্প”, একেবারেই বেমানান ও অমানবিক!

মুহাম্মদের স্ব-রচিত জবানবন্দি কুরআন ও আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত সকল মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আর যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো: প্রিয়জনদের বন্দী দশা, তাদের দুরবস্থা ও কান্না-কাটি প্রত্যক্ষ করে যখন তামিম প্রতিনিধি দলের লোকেরা মুহাম্মদ-কে তাড়াতাড়ি তাঁর বাড়ির বাহিরে আসার জন্য উচ্চ-স্বরে ডাকাডাকি করছিলেন, তা মুহাম্মদের “প্রেস্টিজে (prestige)” এতটায় আঘাত করেছিল যে, মুহাম্মদ তাঁর আল্লাহর নামে তৎক্ষণাৎ ‘তাঁদের উদ্দেশ্যে’ ওহি নাজিল করেছিলেন, এই বলে যে, “তাদের অধিকাংশই অবুঝ।” মুহাম্মদের ভাষায়: কুরআন (সূরা আল হুজরাত, আয়াত ৪):

৪৯:৪: “যারা প্রাচীরের আড়াল থেকে আপনাকে উচুস্বরে ডাকে, তাদের অধিকাংশই অবুঝ।”

স্বঘোষিত আখেরি নবী মুহাম্মদ তাঁর নিজ কর্মে “তাঁর আল্লাহ-কে” কীরূপ যথেচ্ছ ব্যবহার করতেন, তার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো এই ৪৯:৪! প্রতীয়মান হয় যে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আল্লাহর দাস নয়, বরং “আল্লাহই হলো” মুহাম্মদের দাস। অর্থাৎ, মুহাম্মদের আবিষ্কৃত আল্লাহর প্রকৃত পরিচয় হলো: “সে আবদ-মুহাম্মদ!” মুহাম্মদের দাস এই আল্লাহ-কে, অনন্ত ও অসীম এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা (যদি থাকে) রূপে ভুলেও ভুল করার কোন অবকাশ নেই! ইসলাম বিশ্বাসীরা যত দ্রুত এই সত্যটি অনুধাবন করতে পারবেন, তত দ্রুতই তাঁদের মুক্তি মিলবে।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল ওয়াকিদির অতিরিক্ত বর্ণনার মূল ইংরেজি অনুবাদের প্রাসঙ্গিক অংশটি সংযুক্ত করছি (ইবনে ইশাক ও আল তাবারীর রেফারেন্স: বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক তথ্যসূত্র তিন ও চার:]

The added narratives of Al-Waqidi: [1]

‘— Bisr b. Sufyān set out about the ṣadaqa of the Banū Ka‛b; some said, rather it was Nu‛aym b. ‛Abdullah [Page 974] al-Naḥḥām al-‛Adawī who went to them. When he arrived, the Banū Juhaym of the Banū Tamīm, and the Banū ‛Amr b. Jundub b. al-‛Utayr b. ‛Amr b. Tamīm had alighted in their districts, and were drinking with them [Banū Ka‛b] at their pool in Dhāt al-Ashṭāṭ. Some say he found them at ‛Usfān. He ordered the gathering of the cattle of the Khuzā‛a in order to take the ṣadaqa from them. He said: The Khuzā‛a collected the ṣadaqa from every region, but the Banū Tamīm refused and said, “What is this? Your property is taken from you by force! You mobilize, wear armor, and draw the sword.” But the Khuzā‛a said, “We are a people who follow the religion of Islam. This ṣadaqa is from our religion.” The Tamīm said, “By God, he will never take a camel from it!” When the tax collector saw them, he fled from them and departed turning away, for he was afraid of them. Islam, at that time, had not embraced the Bedouin.

The rest of the Bedouin stayed. They were afraid of the sword because of what the Messenger of God did in Mecca and Ḥunayn. The Messenger of God used to command the tax collectors to take the excess from them and leave the value of their property. The tax collector arrived before the Prophet and informed him of the news. He said, “O Messenger of God, I was with three groups, and the Khuzā‛a jumped on the Tamīm and expelled them from their quarter, saying, ‘If not for your relationship you would never reach your land. Misery will surely come to us from the enmity of Muḥammad, and upon yourselves when you confront the messengers of the Messenger of God, pushing them away from collecting the tax (ṣadaqa) of our property.’ So they set out returning to their land.” The Messenger of God said, “Who is for those people who did what they did?” The first of the people he appointed was Uyayna b. Ḥiṣn al-Fazārī. He said, “I am, by God, for them. I will follow in their tracks even if they reach Yabrīn, until I bring them to you, God willing, [Page 975] and you will judge them or they will convert.” So the Messenger of God sent him with fifty riders from the Bedouin. There was not a single Muhājir or Anṣār with them. He traveled by night and hid from them by day.

He set out from Rakūba until he reached al-‛Arj. He found news of them, that they intended the land of the Banū Sulaym. So he set out in their tracks until he found them turning from al-Suqyā towards the land of Banū Sulaym in Saḥrā’. They had alighted and were grazing their cattle. Not one was left behind in the houses except the women and a small group. When they saw the group they turned and took eleven men from them, and they found in the residence of the women, eleven women and thirty youths and they carried them to Medina. The Prophet commanded that they be imprisoned in the house of Ramla bt. al-Ḥārith.’ ——

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] আল-ওয়াকিদি: ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ৯৭৩-৯৭৫; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা: ৪৭৬-৪৭৭
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[2] Ibid আল-ওয়াকিদি: ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ৯৭৫-৯৮০; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা: ৪৭৭-৪৮০

[3] অনুরূপ বর্ণনা: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা: ৬২৮-৬৩১
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[4] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী: ভলুউম ৯: পৃষ্ঠা ৬৭-৭৩
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[5] Ibid আল-তাবারী: নোট নম্বর ৪৬৪; “এই প্রতিনিধি দলের সাথে ছিল আশি জনেরও অধিক লোক।”

[6] Ibid আল-তাবারী নোট নম্বর ৪৭০ -৪৭১: থাবিত বিন কায়েস বিন শামমাস ছিলেন মদিনার বানু আল-হারিথ বিন খাযরাজ গোত্রের। তিনি ছিলেন নবীর মুখপাত্র ও লেখক (orator and a scribe)।

[7] Ibid আল-তাবারী নোট নম্বর ৪৭৫: হাসান বিন থাবিত ছিলেন নবী মুহাম্মদের “রাজকবি (Poet Laureate)।” তিনি ছিলেন মদিনার খাযরাজ গোত্রের; হিজরি ৪০ সালে (৬৫৯ খ্রিস্টাব্দ) তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

[8] কুরআনের উদ্ধৃতি ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত তরজমা থেকে নেয়া। অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। http://www.quraanshareef.org/ কুরআনের ছয়জন বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদকারীর ও চৌত্রিশ-টি ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ: https://quran.com/

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

9 + 1 =