নারীদের শিক্ষার অধিকার ও ঋতুমতী সময়

বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় কতটুকু অগ্রগতি বা আধুনিকায়ন হয়েছে সে বিষয়ে অনেক প্রশ্ন থাকলেও পরিষ্কার দৃষ্টিতে এ কথাটি সত্য যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষার্থীর হাতে বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে বই বিতরণ করে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের হাতে প্রায় সারে পাঁচ কোটি বই বিনামূল্যে তুলে দেয়া অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে।
লেখার শুরুতেই কিছু বিষয় জানিয়ে রাখছি, ২০১৬ সাল থেকে স্কটল্যান্ড হচ্ছে বিশ্বের প্রথম দেশ যে দেশে সকলের জন্য নারীদের পিরিয়ড (ঋতুস্রাব) পণ্য বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃপক্ষের এখন আইনগত কর্তব্য রয়েছে যে সকল নারীদের জন্যে ট্যাম্পনস এবং স্যানিটারি প্যাড বিতরণ করা। সে দেশে প্রায় ২ হাজারেরও বেশি স্কুল গামী নারীদের উপর সমীক্ষায় দেখা গেছে যে স্কটল্যান্ডের স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারজন উত্তরদাতাদের মধ্যে একজন প্রতি মাসে পিরিয়ডের পণ্যগুলি ক্রয় করতে বাড়তি টাকা যোগার করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, এখন আমাদের বাংলাদেশের গরীব ঋতুমতী স্কুল ছাত্রীদের কথা একবার ভেবে দেখা যায় কি? নারী হয়ে জন্ম নেয়া যদি অপরাধ না হয়ে থাকে তবে একজন ছাত্রীর শিক্ষা জীবনের পথটাকে মসৃণ রাখতে আমাদের এই সামান্য ট্যাম্পনস এবং স্যানিটারি প্যাড বিনামূল্যে বিতরণের ব্যবস্থা করা যায় কি? ট্যাম্পনস এবং স্যানিটারি প্যাড প্রস্তুত কারীদের জন্যে চল্লিশ ভাগ ভ্যাট ছাড় ও স্কুল কলেজে বিনামূল্যে তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপনের সুযোগ করে দিলে অবশ্যই আমাদের দেশের গরীব নারীদের শিক্ষা জীবন অনেকটাই মসৃণ হবে।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নিউজিল্যান্ডের সরকার দারিদ্র্য বিমোচনের প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে নিউজিল্যান্ডের সমস্ত স্কুলে জুন মাস থেকে বিনামূল্যে ছাত্রীদের জন্যে ট্যাম্পনস এবং স্যানিটারি প্যাড বিতরণ ও সরবরাহ করতে যাচ্ছে, সমীক্ষায় দেখা গেছে যে উদ্বিগ্ন কিছু ছাত্রী ঋতুমতী সময়ে ক্লাস এড়িয়ে চলেছে কারণ তারা ট্যাম্পন এবং স্যানিটারি প্যাডের মতো পণ্য সময় মতো ক্রয় বা যোগার করতে পারে না, সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে যে ছাত্রীদের লেখাপড়া ও স্কুলে মনোযোগ দেবার মাত্রা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে যদি সরকার বিনামূল্যে স্কুল কলেজে ছাত্রীদের জন্যে ট্যাম্পনস এবং স্যানিটারি প্যাড বিতরণের ব্যবস্থা করে।
একটি উন্নত সমাজে প্রতিটি পরিবারেই শিক্ষিত বাবার যেমন প্রয়োজন ঠিক তদ্রূপ স্বাবলম্বী শিক্ষিতা মায়েরও প্রয়োজন সম পরিমাণ। সমাজে নারী পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করতে হলে ছেলে মেয়েদের জীবন ধারার অধিকারকেও পরিচালিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া উচিত, একজন সাবালিকা ছাত্রী স্কুল জীবনে দশ কি এগারো বছর বয়সেই ঋতুমতী হয়ে উঠে, মাসের কয়েকটা দিন একজন গরীব সাবালিকা ছাত্রী পড়ালেখার পাশাপাশি স্কুল গমন কালীন সময়ে তাদের হাতে বিনামূল্যে স্যানিটারি প্যাড বিতরণের ব্যবস্থা করা গেলে বিষয়টি অবশ্যই বহির্বিশ্বে আরও বেশী প্রশংসিত হবে।
ইদানীং কালে শহর ভিত্তিক আর্থিক সচ্ছল ও সামাজিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত বা সচ্ছল ও শিক্ষিত সমাজে ছেলে মেয়েরা তাদের নিজেদের পছন্দমত সঙ্গী বেছে নিলেও বিবাহের প্রাক্কালে দুই পরিবারের সমঝোতার মাধ্যমেই সামাজিক গ্রহণ যোগ্যতার খাতিরে বিবাহের কার্যক্রম সম্পাদিত হয়, যদিও এ ধরনের বিবাহ এখন পর্যন্ত একটি সীমিত পরিসরেই সীমাবদ্ধ, তাই স্বল্প পরিসরের চিত্রটাকে সার্বজনীন হিসাবে স্বীকৃতি দেবার কোনই প্রয়োজন নেই যেখানে আশি ভাগ মানুষ সেই শত বছরের বিবাহের নিয়মের মাঝেই আটকে আছে। একটি আধুনিক ও মানবিক সমাজ গঠনে আমারেও ভূমিকাটাও উন্নত মানসিকতার হওয়া চাই। উন্নত বিশ্বে কর্মক্ষেত্রে নারী পুরুষের হার যদি একই রকম হয় তবে আমদের সমাজ কেন পিছিয়ে থাকবে, ঋতুস্রাব যদি মেয়েদের জীবন প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক বিষয় তবে একজন মেয়েকে আড়ালে আবডালে দোকানে গিয়ে স্যানিটারি প্যাড বা অনুরূপ উপাদান কিনতে হবে কেন? এর একটি কারণ হচ্ছে আমাদের ছেলে মেয়েরা শিশুকাল থেকেই সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারে কারণে এখন পর্যন্ত এতটাই অন্ধকারে আছে যে অনেক কলেজ-গামী ছাত্ররাও সাবালিকা ছাত্রীদের ঋতুস্রাব বিষয়ে কোনই ধারণা রাখে না আর এটাকে নিশ্চয়ই সভ্যতা বলা যায় না। বাংলাদেশে প্রাথমিক স্কুল পর্যায় থেকে এ বিষয়গুলো নিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের শিক্ষা দান করা শুরু করলে সমাজ অনেকাংশেই কুসংস্কার মুক্ত হবে।
— মাহবুব আরিফ কিন্তু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

91 − 84 =