“সাপ্তাহিক দিননামায় শুক্রবার কেন জুম্মাবার”

বুড়ো হতে চলেছি রে ভাই বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, যৌবনের যাহা দেখা যাহা শেখা আর যেটাই উপলব্দি করেছি সেগুলোকে এখন ভাবনার সাগরে বিশ্লেষণ করেও কোন কুল কিনারা পাচ্ছি নারে ভাই, এখন আমি বুড়ো হতে চলেছি।
ইতিমধ্যে বুড়ো হয়ে শিক্ষা দীক্ষা জ্ঞান বিজ্ঞান হারিয়ে এখন অন্ধকারে সাগরের কুল খুঁজে বেড়াচ্ছি। বাকি যারা এখনো বুড়ো হয়নি তাদের কলমের কালি সেই কবেই শেষ, এখন শুধু শুধুই বল্লার চাকে ঢিল মেরে ভো দৌড়ে পালাচ্ছেন, টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রায় প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর মাতৃভূমির টানে দেশে যাই, খাইদাই আত্মীয় সজনদের সাথে দেখা হয় ভালো লাগে কৈশোরের স্মৃতি বিজড়িত এলাকায় ঘুরে বেড়াতে, ছোট বেলার বন্ধুদের সাথে কয়েকদিন হৈ হুল্লোড়ে মেতে থাকি কিন্তু মনের গভীরে অনুভব করি আমার সাথে সমাজের মানুষের চিন্তা চেতনায় অনেক অনেক দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। এই দূরত্ব মনটাকে নিদারুণ ভাবে পীড়া দিলেও কেউই নেই যে সেই কষ্টটা অনুভব করে, সবাই কেমন যেন তাচ্ছিল্যের মনোভাব নিয়ে পরিহাস করে। আমাদের সমাজের অসামাজিক চিত্রটা দিন দিন যতটা প্রকট ভাবে উপলব্ধি করেছি সেটা হয়তো এর আগে ততটা প্রকট ভাবে চিন্তা চেতনায় ধরা পড়েনি। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বলা যায় বুড়ো হতে চলেছি।
আমার কৈশোরের বন্ধুরা মাঝেই ফেইসবুক মেসেঞ্জারে প্রবাসে কেমন আছি কি ভাবে চলছে এসব বিষয়াদি নিয়ে জানতে চেয়ে মাঝে মাঝেই খবরা খবর নিয়ে থাকেন, সব প্রশ্নের মাঝে যে প্রশ্নটা বেশ গুরুত্বের সাথেই উত্থাপন করেন সেটা হচ্ছে জুম্মাবারটা কেমন কাটে, নিয়মিত নামাজ কালাম করছি কিনা জাতিও। আমিও বেশ হেসেই পাল্টা উত্তর দেই “জুমাবারে জামাতে যাবার আগে পথে ঘাটে অর্ধ উলঙ্গ নারীদের দেখলেই তো অজু ভেঙ্গে যায় তাই জামাতে আর যাওয়া হয়ে ওঠে না, আমিও তো মানুষ তাই সৃষ্টির অপরূপ সুন্দরটা দেখে তো আর চোখ বন্ধ করে রাখতে পারি না।” যদিও আমার ধারণা মানুষ সুন্দরের পুজারী আর সুন্দর কিছু দেখলেই মন থাকে পাক পবিত্র।
বন্ধুটি বেশ রাগান্নিত হয়েই উত্তর দেয়, “মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়ে নামাজ কালাম করিস না? এ কেমন কথা?”
বন্ধুর কথা শুনে মনে হলো আমি যেন প্রবাসে এসে বাবা মায়ের ধর্ম রক্ষার ঠিকাদারী নিয়েছি, এস ইফ, আমার মা বাবা আমার জন্মের আগেই এই ধর্মীয় ঠিকাদারী দিয়ে রেখেছেন বা আমি নিয়ে রেখেছি।
ধর্ম কর্মটা প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত বিষয় হওয়া উচিত কে ধর্ম পালন করছে আর কে করছে না সেটা উপর ভিত্তি করে বন্ধুত্বের মাপ কাঠি নির্ধারণ করতে হবে আর সেটা এই আধুনিক সমাজে কতটা যুক্তি সঙ্গত তা ভাববার বিষয় বটে। এবার বুঝে দেখুন এইসব বন্ধু নামের জঞ্জালরা বন্ধু সমাজে দিনের পর দিন কতটা বিরক্তকর পরিবেশ সৃষ্টি করছে। যাকযে সে সব কথা এবার সাপ্তাহিক জুম্মাবার নিয়ে খানিক আলোচনা করে দেখা যাক।
সপ্তাহের সকল নামের সাথে যে প্রাচীন গ্রীক দেব দেবীর নাম জড়িত সে বিষয়টি অনেকেরই জানা নাই আর সে বিষয়ে জানলেও খুব একটা আপত্তি আছে বলে মনে হচ্ছে না। রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি ও শনিবার পর্যন্ত তাদের কাছে ঠিকই থাকে কিন্তু শুক্রবারটাই এইসব ধর্মান্ধ বন্ধু নামের জঞ্জালদের মাঝে বিশেষ মাথা ব্যথা হয়ে দাড়িয়েছে, তাদের ধারণা শুক্রবারটাকে জুম্মাবার আখ্যায়িত করতে বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিতেও তারা প্রস্তুত।
এবার আশা যাক সপ্তাহের দিনগুলো নাম করনের ইতহাসটা খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে জেনে নেই:-
রবিবার – সূর্যের দিন। গ্রিক পুরাণমতে, হেলিওস হচ্ছেন এক শক্তিশালী দেবতা। ইনি সূর্যদেব হিসেবেও খ্যাত। গ্রিক ‘হেলিওস’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সূর্য। রোমান ভাষায় Sol বলতে সূর্যরূপী দেবতাকেই বোঝানো হয়, যাকে স্যাক্সন ভাষায় বলা হতো Sunne, আর সেখান থেকেই ইংরেজি Sun. পৃথিবীর আকাশ থেকে দেখতে পাওয়া জ্যোতিষ্কগুলোর মধ্যে সূর্যই সবচেয়ে উজ্জ্বল, যার আলোয় পুরো পৃথিবী আলোকিত হয়। সূর্যই অন্যসব জ্যোতিষ্ক শাসন করে বলে ল্যাটিন ভাষায় রবিবারকে dominica বলে, যা Lord’s Day নামেও পরিচিত।
সোমবার – Monday: চাঁদের দিন। এটা আসলে Moon’s day থেকে পরিবর্তিত হয়ে এই রূপে এসেছে। গ্রিক পুরাণ মতে, selenes হচ্ছেন চাঁদের দেবী। রোমান ভাষায় এই চাঁদকে বলে Moon. আরেকটি বহুল প্রচলিত নাম হচ্ছে Luna, যিনি কিনা Sol (সূর্য) দেবতার পরিপূরক এক নারী সত্ত্বা।
মঙ্গলবার – Tuesday: গ্রিক শাস্ত্রমতে, Ares নামে এক দেবতা আছেন, যিনি যুদ্ধ আর ধ্বংসের প্রতীক। এর নামে আকাশে দৃশ্যমান মঙ্গলগ্রহের নাম রাখা হয়েছে Ares. আর এই গ্রহের নাম অনুসরণ করেই আবার গ্রিক ভাষাতে মঙ্গলবারের নাম রাখা হয়েছে আর্সে, মানে ‘Ares এর দিন’। রোমান ভাষায় অনুরূপ দেবতা হচ্ছেন Mars। তবে, স্যাক্সনদের ধর্মবিশ্বাস মতে, Mars এর অনুরূপ দেবতা মানে যুদ্ধ আর ধ্বংসের দেবতা হলেন Tiu, সেখান থেকেই ইংরেজি Tuesday.
বুধবার – Wednesday: গ্রিক পুরাণ মোতাবেক দেবতা জিউসের এক সন্তানের নাম হারমিস। এই হারমিস দেবতা বাণিজ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট। Hermes দেবতার নামানুসারে গ্রিক ভাষায় সূর্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী গ্রহের নাম রাখা হয়েছে Hermes. আর বুধবারের নামও তাই। ওদিকে রোমান মাইথোলজি বলে, ব্যবসা-বাণিজ্যের দেবতা হচ্ছেন Mercury. তবে ইংরেজি ভাষায় কিন্তু দিনটির নাম Mercury Day নয়; বরং Wednesday, যা এসেছে জার্মান প্রভাবিত বিশেষ দেবী Woden এর নাম থেকে। এই ওডেন দেবীর জন্য বরাদ্দকৃত দিনের নাম Woden’s Day বা Wednesday.
বৃহস্পতিবার – Thursday: Thursday মানে Thor’s day. অ্যাংলো-স্যাক্সন বিশ্বাস মোতাবেক থর হলেন থান্ডার বা বজ্রপাতের দেবতা। তাই, তার নামে একটি দিনের নাম রাখা হলো Thursday. গ্রিক ভাষায় এই ‘বজ্রপাতের পিতা’ খ্যাত দেবতাটি হচ্ছেন জিউস। তাই তো গ্রিক ভাষায় সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহটির নাম প্রচলিত গল্পগাথার সাথে মিলিয়ে রাখা হয়েছে ‘জিউস’, আর বারের নামটিও ‘জিউসের বার’। অবশ্য এই গ্রহকে ইংরেজিতে আমরা কিন্তু ‘থর’ বা ‘জিউস’ নামে চিনি না, চিনি রোমান ‘জুপিটার’ নামে।
শুক্রবার – Friday: ‘আফ্রোদিতি’ বা রোমান ‘ভেনাস’ হচ্ছেন সৌন্দর্য, প্রেম ও কামনার দেবী, তার নামেই শুক্রগ্রহের নাম। আবার এই গ্রহের নামেই দিনটির নাম ‘আফ্রোদিতির বার’ (গ্রিক) আর ‘ভেনাসের বার’ (রোমান)। অ্যাংলো-স্যাক্সনদের কাছে অবশ্য সৌন্দর্যের দেবী হলেন ফ্রিগ, সেখান থেকেই ইংরেজি ফ্রাই ডে নামের উৎপত্তি।
শনিবার: Saturn’s Day বা স্যাটার্নের দিন। স্যাটার্ন হলেন রোমান দেবতা যিনি খুশি হলে ভালো ফসল দেন কৃষকদেরকে। গ্রিক ভাষায় অনুরূপ দেবতা হলেন ক্রোনাস। অ্যাংলো-স্যাক্সন ভাষায় এই নামের কোনো প্রতিশব্দ পাওয়া যায়নি। ইংরেজিতে Saturday নামটি সরাসরি রোমান থেকে আত্তীকরণ করা হয়েছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ভাষায়, এ দিনকে বোঝাতে যে শব্দ ব্যবহৃত হয়, তার অর্থ ‘স্নানবার’। সেখানকার স্থানীয় অধিবাসীরা সপ্তাহের শনিবারে কেবল স্নান করতো, এজন্যই হয়তো এমন নাম।
দেব দেবীর নাম নিয়ে আপত্তি নাই কিন্তু এবার যারাই এই শুক্রবারকে জুম্মাবার বানাবার জন্যে রাজপথে বুকের তাজা রক্ত পর্যন্ত ঢেলে দিতে প্রস্তুত তারা নিশ্চয়ই সপ্তাহের প্রতিটি দিনের কথাই মন দিয়ে খানিক ভেবে দেখবেন।
— মাহবুব আরিফ কিন্তু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

42 − = 34