২২৫: আল-ফুলস হামলা-১: হাতেম তাঈ গোত্রে আগ্রাসন!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

আমাদের এই উপমহাদেশে ‘দাতা হাতেম তাঈ’ এক অতি পরিচিত নাম। তিনি মূলত: তার মহানুভবতা ও দানশীলতার জন্যে সুবিখ্যাত ও সুবিদিত। তাঁর আসল নাম ছিল হাতেম বিন আবদুল্লাহ বিন সা’দ আত-তাঈ; এক আরব কবি। অধিকাংশ মুসলমানেরই সাধারণ ধারণা এই যে তিনি ছিলেন একজন ‘মুসলমান’; যা সত্য নয়। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে; স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদের (সাঃ) এর ইসলাম প্রচার শুরু করার (৬১০ খ্রিস্টাব্দ) প্রায় বত্রিশ বছর পূর্বে।

দাতা হাতেম তাঈয়ের পুত্র আ’দি বিন হাতেম তাঁর নিজ ভগ্নী (হাতেম তাঈয়ের কন্যা) ও গোত্রের লোকদের বিপদের মুখে ফেলে রেখে কী কারণে সিরিয়ায় পলায়ন করেছিলেন; অতঃপর তাঁর অনুপস্থিতিতে মুহাম্মদ অনুসারীরা তাঁর গোত্রের লোকদের ওপর’ অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে কীভাবে তাঁর ভগ্নী ও তাঁর গোত্রের (‘বানু তাঈ’) বহু নিরপরাধ লোককে বন্দী করে মদিনায় ধরে নিয়ে এসেছিলেন; অতঃপর কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি মদিনায় মুহাম্মদের কাছে এসে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন; ইত্যাদি বিষয়গুলোর বর্ণনা ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), আল-ওয়াকিদি (৭৪৭-৮২৩ খৃষ্টাব্দ), মুহাম্মদ ইবনে সা’দ (৭৮৪-৮৪৫ খৃষ্টাব্দ), আল তাবারী (৮৩৯-৯২৩ খৃষ্টাব্দ) প্রমুখ বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকরা তাঁদের নিজ নিজ ‘পূর্ণাঙ্গ’ সিরাত গ্রন্থে বিভিন্নভাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।

আদি উৎসের এই সকল ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, নবী মুহাম্মদের অতর্কিত আগ্রাসী আক্রমণের খবরটি জানার পর ভীত হয়ে আ’দি বিন হাতেম সিরিয়ায় পলায়ন করেছিলেন ও তার পলায়নের পর মুহাম্মদ অনুসারীরা তাঁর গোত্রের ওপর এই হামলাটি চালিয়েছিলেন। কিন্তু, কীভাবে ও কী অমানুষিক নৃশংসতায় মুহাম্মদ অনুসারীরা এই হামলাটি সংঘটিত করেছিলেন, তা মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও আল-তাবারীর বর্ণনায় অনুপস্থিত। অন্যদিকে, আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় তা বিস্তারিত ও প্রাণবন্ত; আর মুহাম্মদ ইবনে সা’দের বর্ণনায় তা সংক্ষিপ্ত।

ইসলামের ইতিহাসে এই হামলাটি (‘সারিয়া [Sariyyah]: যে হামলাগুলোতে নবী মুহাম্মদ নিজে অংশগ্রহণ করেন নাই’) সংঘটিত হয়েছিল হিজরি ৯ সালের রবিউল আওয়াল মাসে (জুলাই-আগস্ট, ৬৩০ সাল)। নবী মুহাম্মদের মক্কা বিজয়, হুনায়েন আগ্রাসন ও তায়েফ অবরোধ শেষে মদিনায় প্রত্যাবর্তনের (পর্ব: ১৮৭-২২০) সাড়ে তিন মাস পর।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনা: [1]
(আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ) [2]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২২৪) পর:

‘আমাকে বলা হয়েছে যে, আদি বিন হাতেম যা বলতো, তা হলো: “কোন আরবই আমার চেয়ে বেশী আল্লাহর নবীকে অপছন্দ করতো না যখন সে প্রথম তাঁর সম্বন্ধে শুনতে পেতো। আমি ছিলাম উচ্চবংশজাত এক প্রধান, এক খ্রিস্টান, আর আমি তখন আমার লোকদের কাছ থেকে তাদের মজুত ধন-ভাণ্ডারের এক চতুর্থাংশ আদায় করার উদ্দেশ্যে তাদের মাঝে ঘুরে বেড়াতাম। ধর্মীয় বিষয়গুলোতে আমি ছিলাম নিজেই নিজের গুরু, আমার লোকদের শাসক ও এভাবেই আমি ছিলাম বিবেচিত। [3]

আল্লাহর নবীর বিষয়টি শোনার পর আমি তাঁকে অপছন্দ করি ও আমার উটের দেখাশোনায় নিযুক্ত এক ভৃত্যকে বলি:

“আমার জন্য কয়েকটি প্রশিক্ষিত ও হৃষ্টপুষ্ট উটের আয়োজন করো ও সেগুলোকে আমার নিকটে রাখো, ও তুমি যখন আমাদের এলাকায় মুহাম্মদের সেনাবাহিনী আসার খবরটি শুনতে পাবে, আমাকে তা জানিও।”

একদিন সকালে সে আমার কাছে আসে ও বলে, “মুহাম্মদের অশ্বারোহীরা আপনার এখানে উপস্থিত হওয়ার পূর্বে আপনার যা করতে ইচ্ছা করে, আপনি এখনই তা করুন; কারণ আমি পতাকাগুলি দেখেছি ও আমি জেনেছি যে তারা মুহাম্মদের সেনাবাহিনী।”

আমি তাকে আমার উটগুলো নিয়ে আসার নির্দেশ দেই ও সেগুলোর ওপর আমি আমার পরিবার ও সন্তানদের বসায় ও সিরিয়ায় আমার সমগোত্রীয় খ্রিস্টানদের সাথে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। আমি হাতেমের কন্যাদের একজন কে এলাকাটি তে ফেলে রেখে সুদূর আল আল-জায়ুশিয়া (ইবনে হিশাম: ‘অথবা আল-হাওশিয়া [নাজাদে অবস্থিত]’) পর্যন্ত গমন করি। সিরিয়ায় পৌঁছার পর আমি সেখানে অবস্থান করি। [4] [5]

আমার অনুপস্থিতিতে আল্লাহর নবীর অশ্বারোহীরা এসে পৌঁছে ও তারা যাদের কে বন্দী করে ধরে নিয়ে যায় তাদের মধ্যে ছিল হাতিমের কন্যা; অতঃপর তাকে তাইয়ি বন্দীদের সাথে আল্লাহর নবীর কাছে ধরে নিয়ে আসা হয়। আল্লাহর নবী আমার সিরিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি শুনেছিলেন।’ —–

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) বিস্তারিত ও অতিরিক্ত বর্ণনা: [6]
আল-ফুলসে (Al-Fuls) আলী ইবনে আবু তালিবের অভিযান:

‘সে বলেছে: আবদ আল-রহমান বিন আবদ আল-আযিয আমাদের-কে বর্ণনা করেছে, ‘আমি শুনেছি মুসা বিন ইমরান বিন মাননাহ-কে আবদুল্লাহ বিন আবি বকর বিন হাযম বলেছিল, যখন তারা আল-বাকি (al-Baqī) তে বসেছিল, “তুমি কি ফুলস হামলাটির বিষয়ে জানো?” মুসা জবাবে বলে, “আমি এই হামলাটির বিষয়ে শুনি নাই।” সে বলেছে: অতঃপর ইবনে হাযম হেসে উঠে ও বলে:

“আল্লাহর নবী আলী-কে ১৫০জন লোক-কে সঙ্গে দিয়ে একশো-টি উট এবং পঞ্চাশ-টি ঘোড়া সহ প্রেরণ করেন। শুধুমাত্র আনসাররাই [আদি মদিনা-বাসী মুহাম্মদ অনুসারী] ও যার অন্তর্ভুক্ত ছিল আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকেরা, এই হামলায় অংশগ্রহণ করেছিল। তারা বেদুইন উপজাতি লোকদের আক্রমণ করার পূর্ব পর্যন্ত ঘোড়াগুলোর পাশাপাশি উটগুলো-কে পালাক্রমে ব্যবহার করে। সে হাতেম পরিবারের এলাকা সম্পর্কে খোঁজখবর নেয় ও অতঃপর তাদের সন্নিকটে এসে হাজির হয়। অতঃপর, প্রত্যুষে তারা তাদের ওপর হামলা চালায়। তারা তাদের হাত ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের বন্দী করে; তাদের গবাদি পশু ও মেষগুলো আটক করে। তারা তাঈ গোত্রের ‘আল-ফুলস (Al-Fuls)’ প্রতিমাটির ওপর আক্রমণ চালায় ও তা ধ্বংস করে। অতঃপর তারা ফিরে আসে ও মদিনায় প্রত্যাবর্তন করে।

আবদ আল-রহমান বিন আবদ আল-আজিজ বলেছে: আমি মুহাম্মদ বিন উমর বিন আলী কে এই হামলাটির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি ও সে বলে: “আমি মনে করি না যে ইবনে হাযম সঠিকভাবে এই অভিযানটি ব্যাখ্যা কিংবা বর্ণনা করেছে।”
আমি বলি, “তাহলে তুমিই বলো।”

সে বলে: “আল্লাহর নবী ‘আল-ফুলস’ ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আলী-কে একশত পঞ্চাশ জন আনসার সহকারে প্রেরণ করেন। একজন মুহাজিরও [মদিনায় হিজরতকারী মক্কাবাসী মুহাম্মদ অনুসারী] তাদের সঙ্গে ছিল না; আর তাদের সঙ্গে ছিল পঞ্চাশটি ঘোড়া ও পশু। তারা উটগুলোর ওপর সওয়ার হতো ও ঘোড়াগুলো [ওপর সওয়ার] এড়িয়ে চলতো। আল্লাহর নবী তাকে এই হামলার প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন।

আলী তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে যাত্রা শুরু করে; তার সাথে ছিল একটি কালো পতাকা ও একটি সাদা ব্যানার। তাদের কাছে ছিল বর্শা ও প্রত্যক্ষগোচর অস্ত্রশস্ত্র। সে তার পতাকাটি সাহল বিন হুনায়েফ-কে ও ব্যানারটি জব্বার বিন সাখর আল-সুলামি কে প্রদান করে। সে বানু আসাদ গোত্রের হুরায়েথ নামের এক পথপ্রদর্শক-কে সাথে নিয়ে যাত্রা শুরু করে ও তাদের সঙ্গে সে ফায়াদের পথ ধরে রওনা হয়। তাদের-কে নিয়ে এক নির্দিষ্ট স্থানে এসে পৌঁছার পর সে বলে,

“তোমাদের ও তোমাদের অভীষ্ট গোত্রটির দূরত্ব এক দিনের পথ। আমরা যদি দিনের বেলা যাত্রা করি তবে আমরা তাদের সীমানা ও তাদের মেষপালকদের (shepherd) কাছে পৌঁছে যাবো, তারা তাদের গোত্রের লোকদের সতর্ক করবে ও তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবে; আর তাদের কাছ থেকে তোমরা তোমাদের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে পারবে না।

সুতরাং এই দিনটি-তে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা আমাদের এই অবস্থানে অপেক্ষা করবো।অতঃপর, আমরা ঘোড়াগুলোর পিঠে চড়ে রাত্রিকালে ভ্রমণ করবো ও তাদের আক্রমণ করবো; আমরা তাদের কে ভোরের অন্ধকারে সম্ভাষণ জানাবো।”

তারা বলে, “এটাই হলো সিদ্ধান্ত!”

তারা শিবির স্থাপন করে ও উটগুলো চারণ করতে দেয়; তারা একটি দল বাছাই করে ও তাদের চারপাশে যা আছে তা অনুসন্ধানের জন্য পাঠায়। তারা আবু কাতাদা, আল-হুবাব বিন আল-মুনধির ও আবু নাইলা কে বেছে নেই। তারা তাদের ঘোড়াগুলোর পিঠে চড়ে শিবিরের আশেপাশে রওনা হয়। তারা এক কালো যুবক কে আটক করে ও বলে, “কে তুমি?” সে জবাবে বলে, “আমি যা চাই তার সন্ধান করছি।” তাই তারা তাকে আলীর কাছে ধরে নিয়ে আসে। সে বলে, “কে তুমি?”

সে জবাবে বলে, “আমি যা চাই তার সন্ধান করছি।” তাই তারা তাকে হুমকি প্রদান করে।
অতঃপর সে বলে, “আমি তাইই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত বানু নাভান গোত্রের এক লোকের ভৃত্য। তারা এই পরিস্থিতি সম্বন্ধে আমাকে নির্দেশ দিয়েছে। তারা বলেছে, ‘তুমি যদি মুহাম্মদের ঘোড়া দেখতে পাও তবে ফিরে এসে তা আমাদের জানাবে।’ আমি কোনও লোকের কাছে পৌঁছায় নাই। আমি যখন তোমাদের দেখেছি, আমি তাদের কাছে যেতে চেয়েছিলাম। অতঃপর আমি নিজেকে বলি, আমি তাড়াহুড়ো করে আমার সহচরদের কাছে যাবো না যতক্ষণে না আমি তোমাদের সংখ্যা ও তোমাদের ঘোড়া ও পশুদের সম্পর্কে স্বচ্ছ প্রমাণ না আনতে পারি। আমি আশঙ্কা করি নাই যে তোমরা আমার নাগাল ধরতে পারবে ও আমাকে বেঁধে ফেলবে, যতক্ষণে না তোমাদের অনুসন্ধানী লোকেরা আমাকে আটক করে।”

আলী বলে, “আমাদের কে সত্য বলো, তোমার পিছনে কী আছে?”
সে জবাবে বলে, “সবচেয়ে কাছের গোত্রটির দূরত্ব সুদীর্ঘ এক রাত্রির পথ। তোমাদের অশ্বারোহীরা যদি সকালে রওনা হয় তবে তারা তাদের নাগাল ধরতে পারবে।”
আলী তার সঙ্গীদের বলে, “তোমাদের কী ধারণা?”

জব্বার বিন সেখর বলে, “আমরা মনে করি যে আমরা আমাদের ঘোড়া-গুলোয় চড়ে রাত্রি কালে রওনা হবো ও সকাল বেলায় ঐ সম্প্রদায়ের সম্মুখে উপস্থিত হবো, অতঃপর আমরা তাদের ভিতরে বলপূর্বক প্রবেশ করবো ও তাদের হামলা করবো। আমরা এই কালো দাসটি-কে সঙ্গে নিয়ে রাত্রিতে রওনা হবো। আমরা হারিথ-কে এই শিবিরের দায়িত্বে রাখবো, তারা পরে আসবে, যদি আল্লাহ চায়।”

আলী বলে, “এটিই হলো সিদ্ধান্ত!”

তারা কালো দাসটি-কে সঙ্গে নিয়ে রওনা হয়, সে ঘোড়াগুলোর সাথে দৌড়ে আসে। সে তাদের কিছু লোকের পিছনে পালাক্রমে চড়ে বসে, অতঃপর পালাক্রমে অন্য কিছু লোকদের পিছনে; এবং সে ছিল বন্দী অবস্থায়। যখন দিনের আগমন ঘটে, দাসটি মিথ্যা বলে ও জানায়, “আমি রাস্তা ভুল করেছি ও আমি তা পিছনে ফেলে এসেছি।” আলী বলে, “তাহলে যেখানে ভুল করেছো সেখানে ফিরে যাও!” তাই সে এক মাইল কিংবা তার চেয়ে বেশী পথ ফিরে আসে ও অতঃপর বলে, “আমি ভুল করেছি।”

আলী বলে, “সত্যিই তোমার ব্যাপারে আমরা প্রতারিত হয়েছি। গোত্রটির কাছ থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছু তুমি কামনা করো নাই। তাকে নিয়ে এসো! আমাদের-কে সত্য বলো, নতুবা আমরা তোমার কল্লাটি কেটে ফেলবো!”

সে বলেছে: সে সম্মুখে অগ্রসর হয় ও তার তরবারিটি দাসটির গর্দানে তাক করে; আর দাসটি যখন বিপদ দেখতে পায়, সে বলে, “কেন আমি তোমাদের সত্য বলবো? তাতে কী আমার লাভ হবে?” তারা বলে, “হ্যাঁ।”

সে বলে, “প্রকৃতই, আমি যা করেছি তা তোমরা দেখেছো। সাহসের অভাবে লোকদের যা হয় আমার তাই হয়েছে। আমি নিজেকে বলেছিলাম, আমি মুসলমানদের নিকটবর্তী হয়েছি ও বিনা পরীক্ষায় আমি তাদের-কে গোত্রটির উদ্দেশ্যে পথ দেখিয়েছি। তথাপি তাদের কাছ থেকে আমার নিরাপত্তার কোনও নিশ্চয়তা নেই, সুতরাং তাদের কবল থেকে আমি নিজেকে রক্ষা করবো। তোমাদের কাছ থেকে আমি যা কিছু দেখেছি, আমি ভীত হয়েছি এই ভেবে যে তোমরা হয়তো আমাকে হত্যা করবে, যে কারণে আমার এই অজুহাত। আমি তোমাদের-কে বড় রাস্তায় নিয়ে যাবো।”

তারা বলে, “সত্য কী তা বলো!” সে জবাবে বলে, “গোত্রটি তোমাদের নিকটে।” সে গোত্রটির নিকটবর্তী না হওয়া পর্যন্ত তাদের সাথে যাত্রা করে, অতঃপর তারা কুকুরের ডাক, চারণভূমিতে গবাদি পশু ও ভেড়াগুলোর নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পায়। সে বলে: “এগুলোই হলো সেই গোষ্ঠী ও এটি একটি অঞ্চল (ফার্সাখ)।”

তারা একে অপরের দিকে তাকায় ও বলে, “হাতেমের লোকেরা কোথায়?”
সে জবাবে বলে, “তারা এই গোষ্ঠীগুলোর মাঝখানে।”

লোকদের কেউ কেউ তাদের কিছু লোককে বলে: “আমরা যদি গোত্রটি-কে আতঙ্কিত করি, তারা চিৎকার করবে ও তাদের কিছু লোক ভীত হবে ও কেউ কেউ রাতের অন্ধকারে তাদের উপদল-কে আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখবে। অতএব চারিদিকে ভোর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমরা লোকদের বিরত রাখবো, সত্যিই এর উদয়কাল নিকটবর্তী। অতঃপর আমরা আক্রমণ করবো। যদি তাদের কিছু লোক কাউকে সতর্ক করে, তবে তারা কোথায় যায় তা আমাদের কাছে লুকানো থাকবে না। তাদের কাছ থেকে পলায়নের জন্য এই লোকদের কোন ঘোড়া নেই, আর আমরা ঘোড়াগুলোর উপর চড়ে আছি।”

তারা বলে, “সিদ্ধান্ত এটিই যা তুমি ইঙ্গিত করেছো।”

সে বলেছে: “যখন ভোরের উদয় হয়, তারা অতর্কিত হামলা করে ও লোকদের হত্যা করে যাদের-কে হত্যা করা হয়েছিল ও তাদের-কে বন্দী করে। তারা তাদের শিশুদের ও নারীদের তাড়িয়ে নিয়ে আসে এবং ভেড়া ও গবাদি পশুগুলো জড়ো করে।

তাদের কেহই লুকিয়ে ছিল না, কিংবা অনুপস্থিত ছিল না; এভাবেই তারা নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেই গোত্রের এক মেয়ে যে কালো দাসটি-কে দেখেছিল – তার নাম ছিল আসলাম ও তাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল – বলে, “তার ব্যাপারটি কী, সে কি পাগল! এই হলো তোমাদের বার্তাবহ আসলামের কাজ। সে যেন কখনও শান্তি না পায়। তাদের-কে সে তোমাদের কাছে এনেছে। তাদের-কে পথ দেখিয়ে সে তোমাদের দুর্বল স্থানটিতে নিয়ে এসেছে।”

সে বলেছে: কালো লোকটি বলে, “সংক্ষেপ করুন, হে অভিজাত-বংশের কন্যা; তারা আমার কল্লা কেটে ফেলার হুমকি না দেওয়া পর্যন্ত আমি তাদের-কে পথ দেখায় নাই!”’ ——

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

>>> ইসলামের ইতিহাসের আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো, দাতা হাতেম তাঈ গোত্রের কোন লোক নবী মুহাম্মদ কিংবা তাঁর কোন অনুসারীদের ওপর আক্রমণ করতে আসেন নাই। বিনা উস্কানিতে নিরপরাধ বানু তাঈ গোত্রের লোকদের ওপর অতর্কিত আগ্রাসী হামলাকারী দল-টি ছিল স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর অনুসারীরা।

“আর তারা এই হামলাটি সংঘটিত করেছিলেন ‘অতি প্রত্যুষে’, যখন বানু তাঈ গোত্রের লোকেরা ছিলেন সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত!”

বানু তাঈ গোত্রের লোকদের একমাত্র অপরাধ ছিল এই যে তাঁরা তখনও মুহাম্মদ-কে নবী হিসাবে স্বীকার করে তাঁর মতবাদে দীক্ষিত হয় নাই। ব্যাস, এটুকুই! আর তাঁদের সেই অপরাধের শাস্তি হলো, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের এই অতর্কিত আক্রমণ! এই অতর্কিত হামলায় মুহাম্মদ অনুসারীরা বানু তাঈ গোত্রের ঠিক কতজন লোক-কে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিলে, কতজন লোক-কে জখম করেছিলেন, কতজন নারী ও শিশুদের বন্দী করে মদিনায় ধরে নিয়ে এসেছিলেন, কিংবা কী পরিমাণ “লুটের মাল” হস্তগত করেছিলেন; তা এই বর্ণনায় অনুপস্থিত।

নবী মুহাম্মদের প্রবর্তিত “ইসলাম’ নামের বিধানে অবিশ্বাসী গোত্র ও জনপদের ওপর বিনা নোটিশে রাতের অন্ধকারে, কিংবা অতি-প্রত্যুষে এরূপ অতর্কিত আগ্রাসী হামালায় তাঁদের-কে খুন ও জখম; তাঁদের নারী-পুরুষ-শিশুদের জোরপূর্বক ধরে নিয়ে এসে দাস ও যৌন-দাসীতে রূপান্তর ও ভাগাভাগি; তাঁদের যাবতীয় সম্পদ লুণ্ঠন ও ভাগাভাগি; ইত্যাদি কর্মকাণ্ড শুধু যে সম্পূর্ণরূপে বৈধ ও হালাল তাইই নয় – তা বিবেচিত হয় সর্বোৎকৃষ্ট সৎকর্ম-রূপে! ইসলামের পরিভাষায় যার নাম হলো, “জিহাদ!”

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল ওয়াকিদির বর্ণনার মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি; ইবনে ইশাক ও আল তাবারীর রেফারেন্স: বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক তথ্যসূত্র এক ও দুই:]

The narratives of Al-Waqidi: [6]

‘He said: ‛Abd al-Raḥmān b. ‛Abd al-‛Azīz related to us, I heard ‛Abdullah b. Abī Bakr b. Ḥazm say to Mūsā b. ‛Imrān b. Mannāḥ while they were seated in al-Baqī‛, “Do you know the Raid of Fuis?” Mūsā replied, “I have not heard about this raid.” He said: Then Ibn Ḥazm laughed and said, “The Messenger of God sent ‛Alī with a hundred and fifty men on a hundred camels and fifty horses. Only the Anṣār, and that included the Aws and the Khazraj, participated in the raid. They went alongside the horses and took turns on the camels until they attacked the tribes of the Bedouin. He inquired about the region of the families of Ḥātam, then he alighted upon them. Then they raided them with the dawn. They took prisoners until their hands were full, and cattle and sheep. They attacked al-Fuls, the idol of the Ṭayyi’ and destroyed it. Then they turned and returned to Medina.

‛Abd al-Raḥmān b. ‛Abd al-‛Azīz said: I mentioned this raid to Muḥammad b. ‛Umar b. ‛Alī and he said, “I do not think Ibn Ḥāzm explained the transmission of this expedition or narrated it properly.” I said, “Then you bring it!” He said: The Messenger of God sent ‛Alī b. Abī Ṭālib with a hundred and fifty of the Anṣār to destroy al-Fuls. There was not a single Muhājirūn with them, and they had fifty riders and beasts. They mounted the camels and avoided the horses. The Messenger of God commanded him to make a raid.

‛Alī set out with his companions; he had a black flag and a white banner. They had spears and [Page 985] obvious weapons. He gave his flag to Sahl b. Ḥunayf, and his banner to Jabbār b. Ṣakhr al-Sulamī. He set out with a guide from the Banū Asad called Ḥurayth, and he went with them on the road of Fayd. When he brought them to a certain place he said, “Between you and the tribe you desire is a whole day. If we march to it by day we will reach their extremities and their shepherds, and they will warn the tribe and it will disperse, and you will not take from them your need. So we will stay this day of ours in our position until the evening. Then we will travel by night on the backs of the horses and raid them, and we will greet them in the blind darkness of the dawn.” They said, “This is the decision!”

They camped and let the camels graze; they picked, and sent a group of them to penetrate what was around them. They chose Abū Qatāda, al-Ḥubāb b. al-Mundhir, and Abū Nā’ila. They set out on the backs of their horses and went around the camp. They captured a black youth and said, “Who are you?” He replied, “I am looking for what I desire.” So they brought him to ‛Alī He said, “Who are you?” He replied, “One who seeks his desires.” So they threatened him. Then he said, “I am the slave of a man from the Ṭayyi’ of the Banū Nabhān. They ordered me about this situation. They said, ‘If you see horses of Muḥammad, come forth and inform us.’ I did not reach any people. When I saw you, I wanted to go to them. Then I said to myself I will not hurry to my companions until I can bring them clear evidence about your numbers, your horses and your beasts. I did not fear you would overtake me and bind me, until your scouts captured me.” ‛Alī said, “Tell us the truth, what is behind you?” He replied, “The foremost of the tribe are one long night away. Your cavalry will take them when they leave in the morning.” ‛Alī said to his companions, “What do you think?” Jabbār b Sakhr said, “We think that we will depart on our horses at night until we arrive in the morning before the community, [Page 986] and they will be penetrated and we will raid them. We will set out with the black slave by night. We will appoint Ḥārith in charge of the camp, until they follow, God willing.” ‛Alī said, “This is the decision!”

They set out with the black slave running with the horses. He was in the rear of some of them for a turn, then he settled in the rear of another for a turn, and he was bound. When it became day, the slave lied and said, “I was wrong about the road and I have left it behind.” ‛Alī said, “Then return to where you erred!” So he returned a mile or more, and then he said, “I have made a mistake.” ‛Alī said, “Indeed we are deceived about you. You do not desire except to divert us from the tribe. Bring him! Tell us the truth or we shall cut off your head!” He said: He came forward and pointed his sword at the slave’s head, and when the slave saw the damage, he said, “Why would I tell you the truth? Will it profit me?” They said, “Yes.” He said, “Indeed, I did what you see. It happened to me what happens to people out of timidity. I said to myself, I approach with the community of Muslims, guiding them to the tribe without a trial. Yet, I have no guarantee, so I will protect myself from them. When I saw from you what I saw, I feared that you would kill me, which was to me an excuse. I will take you on the road.” They said, “Tell the truth!” He replied, “The tribe is close to you.” He set out with them until he was close to the tribe, and they heard the barking of dogs, the movement of the cattle in the pasture, and the sheep. He said: These are the groups and it is one area (farsakh). They looked at each other and said, “Where are the people of Ḥātam?” He replied, “They are in the center of these groups.” Some of the people said to some, “If we frighten the tribe, they will shout and frighten some of them, and some will hide their faction from us in the darkness of the night. But we will hold back the people until the dawn rises throughout, indeed, its rising is near. Then we will attack. If some of them warn some, it will not be hidden from us where they go. The people do not have horses to flee from them, and we are on horses.” [Page 987] They said, “The decision is what you indicate.”

He said: When the dawn rose, they raided and killed those who were killed and took prisoners. They drove the children and women and gathered the sheep and cattle. None were hidden or absent, so they were in control. A girl from the tribe who saw the black slave—his name was Aslam—and he was tied up, says, “What is the matter with him, is he crazy! This is the work of your messenger, Aslam. May he never have peace. He brought them to you. Guided them to your weakness.” He said: The black one says, “Be brief, O daughter of the nobility, I did not guide them until they threatened to strike off my head!” —–

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬৩৭-৬৩৮
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী, ভলুউম ৯, Translated and Annotated by Ismail K. Poonawala; ISBN 0-88706-692—5; পৃষ্ঠা ৬৪-৬৫
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[3] Ibid আল-তাবারী: নোট নম্বর ৪৫৬; পৃষ্ঠা ৬৬: “আরব ডিকশনারীবিদদের মতে, প্রাক-ইসলামিক যুগের অনুশীলনটি ছিল এই যে, লুটের মালের এক চতুর্থাংশ হিস্যা কমান্ডার-ইন-চিফ হিসাবে দলনেতার জন্য বরাদ্দ থাকতো। এটি দক্ষিণ আরবীয় অঞ্চলেও অনুশীলন করা হতো। ইসলামে, লুটের মালের বিলিবন্টনের আগে প্রথমেই এক-পঞ্চমাংশ হিস্যা আল্লাহর জন্য আলাদা করে রাখা হতো।”
[4] Ibid মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: ইবনে হিশামের নোট নম্বর ৮৯০; পৃষ্ঠা ৭৮৬।
[5] Ibid আল-তাবারী: নোট নম্বর ৪৫০- “আল জায়ুশিয়া (al-Jaushiya /Al-Jushiyyah) স্থানটি ছিল নাজাদ ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী একটি জায়গা।”

[6] “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক: আল-ওয়াকিদি; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob; ISBN: 978-0-415-86485-5; ভলুম ৩, পৃষ্ঠা ৯৮৪-৯৯৭, ইংরেজি অনুবাদ: পৃষ্ঠা ৪৮২-৪৮৪
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[7] অনুরূপ বর্ণনা: “কিতাব আল-তাবাকাত আল-কাবির- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে সা’দ, ইংরেজি অনুবাদ – এস মইনুল হক, ভলুম ২; পৃষ্ঠা ২০২-২০৩
https://www.exoticindiaart.com/book/details/kitab-al-tabaqat-al-kabir-set-of-2-volumes-NAG992/

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

67 − 65 =