তুমি খেয়েছো

প্রিয় নিপা পারভীন, ,

তোমার একটু অবহেলা আমাকে যতটা কষ্ট দেবে, ঠিক ততটা কষ্ট সাত কোটিবার যন্ত্রণাময় মৃত্যুতেও হবে না আমার। তোমার একটু মন খারাপ আমাকে যতটা বিষণ্ণ করে তোলে, ঠিক ততটা বিষণ্ণতা মেঘজমা আকাশেও জমে না কখনো। তোমার একটু নীরবতা আমাকে যতটা নিথর করে দেয়, ঠিক ততটা নিথর পৃথিবীর সমস্ত মৃতদেহেও নেই। তোমার একটু অভিমান একটু দূরে থাকা আমাকে যতটা দূরত্বে ঠেলে দেয়, ঠিক ততটা দূরত্ব পৃথিবীর জন্ম আর ধ্বংসের মাঝেও নেই। আর তুমি যদি কখনো ভুল করেও ভালোবাসি বলো, আমি ঠিক যতটা উৎফুল্ল হই; তার উদাহরণ এই পৃথিবীতে একটিও নেই।

ভাগাভাগির উষ্ণতা ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষাই যদি এতো তীব্র হয়, ভাইবা দেখ – লক্ষ কোটি তারার উৎসবে, ভালবাসার আকাঙ্ক্ষা কতো তীব্র হইতো? আমার নিজস্ব সমুদ্র সৈকতে ভীষণ ঘন এক রাতে তোমার ঠোঁটে ডুবে যাই নাই কখনো। পাহাড়ের ঢালে ভরা চাঁদের শীতের রাতে Cigarettes After Sex এর Opera House শোনা হয় নাই। বাকেট লিস্টেই থাইকা গেছে – ওয়াইন গ্লাসে রেড ওয়াইনের উপর দুজনা’র ছবি ফেইসবুকে পোস্ট করে দুজনে হাইসা গইলা যাওয়াটাও।

কি ভীষণ অবিচার! আমাদের একসাথে পাহাড়ে যাওয়া বাকি, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় যেখানে তুমি আর আমি ছাড়া আমাদের থাকবে না আর কোন উষ্ণতার আশ্রয়… Fly Me to the Moon আর যন্ত্রণা এই গান দুইট নিয়ে সমস্ত হোমওয়ার্ক হয়ে গেছে, এই দুইটার Valenitines Day আর বর্ষা রিলিজের কী হবে?

যে স্বপ্নের সাথে আঁকড়ে থাকে ভালবাসা আর জীবনের গল্প, জীবন কে ধারণ না করে যাপনের আকাঙ্ক্ষা, সে স্বপ্ন ছাড়া আর কোন স্বপ্নের হিসেব বাকি থাকলে জীবনের বিশেষ ক্ষতি হয়ে যায়? বলতে পারো?

অতিমানবী, স্বপ্ন ছিল চেখে দেখবো পৃথিবীর সমস্ত রুপ ও রস, এক সাথে। কী কঠিন বিশ্বাসে René Descartes কে আমি স্তব্ধ করছিলাম, বলছিলাম I think. Therefore I am এই theory ঠিক নাই, মনে আছে তোমার? স্বপ্ন দেখার সাহস আছে বলেই না আমরা মানুষ, We dream. Therefore we are, তাই না? তুমি স্বপ্ন দেখতে শিখা নিও, নিজেকে ভালবাসতে শিখা নিও।

আমার ঈশ্বর আমাকে পুনর্জন্মের শিক্ষা দেন নাই। জাইনা রাখো, যে ভালবাসা বাসে নাই কেউ কখনো, আমরা তা বাইসা দেখাবো, এই জন্মেই। আমাদের হাতে সময় যে খুবই কম।

আমাকে খুঁজতে তুমি কোথায় যেতে চাও? আমি বৃষ্টির মাঠে নগ্ন একা ভিজি। একদিন মানুষ হবো, একদিন দোয়েল হব। ঘর্মাক্ত কৃষকের কানে শিস দিয়ে গাইবো নবান্নের গান। কখনও হব শৈশব। স্কুল ব্যাগ, রঙিন পোস্টার, দুরন্ত ছক্কায় হয়ে যাব বিজয়ীর উল্লাস। ঘাশফুল হয়ে তোমার কোমল পায়ে চুমু খাবো; চুমু খেয়ে হব তৃপ্ত অধর। বিবাগী কিশোরের করুণ কৈশোর ভেঙ্গে চুরে নিরাশার পৃথিবীতে হব বিপ্লবের ইতিহাস। কোনদিন অলস দুপুরে তোমার চোখের তারায় হব স্বপ্ন, লালচুরি, সবুজ চুড়ি, টিপ, হবো সংসার। হবো নিঃসঙ্গ শালিক তোমার বুকে ভয়ের কাঁপন জাগানিয়া শঙ্কা মুছে ফেলে হব নীরব প্রার্থনা।

তারপর একদিন,

একটি কোমল কাব্য লিখে ফেলে আবারও আমি মানুষ হব।

সবশেষ এইটুকু তোমাকে বলব নিপা, এই পৃথিবীতে কেউ কাউর জন্য অপেক্ষ করে না, অগ্রাধিকার দিয়ে সে তার জীবনের প্রতিটি কাজ করে যায়। তুমি একজন মা। আশা করব বুঝতে সমস্যা হবে না যে কথাটি এখন তোমাকে বলতে যাচ্ছি আমি। তুমি জানো, মা বেচেঁ নেই, খুব মিস করি মাকে। মা জীবিত থাকতে আমি কর্মের জন্য গ্রামে,ঢাকায়,খাগড়াছড়ি এবং সৌদি থাকা অবস্হায় কখনও মা আমি খাবার না খাওয়া পর্যন্ত, কখনও মুখে খাবার তোলেনি। সকাল-দুপুর-রাত ফোন দিয়ে জানতো “বাবা” তুই খায়ছছ? অথবা বাড়ীতে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করত। তখনই আমি বুঝে গেছি, ভালোবসার মানুষকে কিভাবে ভালোবাসতে হয়। সত্যি বলতে ০৭/১২/২০১২ইং সালে মায়ে মৃতু্্য’র ঠিক এক মাস পর থেকে আমি তোমার খাবারের পর আমি খাবার মুখে নিয়েছি। তুমি না খাওয়া পর্যন্ত আমি খাবার মুখে নেইনি (হাহাহাহা করে হাসছ? মিথ্যা বলছি, ব্যালকমেইল করছি, ইমোশন আঘাত হানার চেষ্টা করছি তা ভাবতে পারো, সমস্যা নেই)। হ্যাঁ তুমি যাই ভাবো না কেন, ইহাই সত্যি আমি মুখে খাবার নেয়নি যতক্ষন না খেয়ছো তুমি।

* কখনও কথার ছলে জিজ্ঞাসা করে নিতাম তুমি খেয়েছো কিনা। জানার পর আমি খাবার মুখে নেই।

* যেদিন সকালে কথা হয়না তোমার সাথে, সেইদিন বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টার পর আমি খাবার মুখে নেই। (ভেবে নেই, এতক্ষন তুমি না খেয়ে থাকতে পারবে।)

* যেদিন দুপুরে কথা হয়নি তোমার সাথে, সেইদিন বাংলাদেশ সময় বিকেল ৮টার পর আমি খাবার মুখে নেই। (ভেবে নেই, এতক্ষন তুমি না খেয়ে থাকতে পারবে।)

* যেদিন রাতে কথা হয়না তোমার সাথে, সেইদিন বাংলাদেশ সময় রাত ২টার পর আমি খাবার মুখে নেই। (ভেবে নেই, এতক্ষন তুমি না খেয়ে থাকতে পারবে।)

* ছুটিতে দেশে গিয়ে সকালে নাস্তা করতাম- ২টার পর, দুপুরের খাবার খেতাম-৬-৭টা মধ্যে, আর রাতে খাবার ১টা। এই নিয়ে ফাতেমার সাথে কয়েকবার ঝগড়া হয়ছে। বুকটা ফাটতো বলতে পারতাম না, কেন খাই না। কথা না বলা মানে মনের ভাব প্রকাশ না করার একজন শ্রমিকের ত্রিশ দিনের শ্রমের টাকা না পাওয়ার চেয়ে কষ্টের চেয়েও তীব্র আমার কাছে। পরিবার খাবার খেতো নিয়মমাফিক, আমি টেবিলের সামনে বা ফ্লোরে বা বিছানার পরিবারের সামনে বসে থাকতাম। মিথ্যা বলতাম, পেটে গ্যাস, মুখে রুচি নেই, জ্বর, শরীরটা কেমন জানি লাগছে, বমি বমি ভাব, একটু পরে খাবো বলে বাচ্চাদের খাইয়ে দিতাম। মাহিন তো বড় হয়ে গেছে, একটু কম আসত। মেঘলা, মাশফি খুব ছোট ওরা। ওরা যখন মুখে খাবার দিয়ে বলত, আব্বু একটু খাও। তখনের না খাওয়ার অনুভতি আমি লিখে তোমাকে বুঝাতে পারব না, বুঝে নিও।

তোমাকে প্রতিদিন জিজ্ঞাসা করতে পারতাম খেয়েছো কিনা? অবশ্য তুমি হ্যাঁ বা না বলতে বা বলতে পরে খাবো তাই না? না আমি এই কাজ করিনি কারন একই কথা আমরা মানুষরা বার বার শুনতে অভ্যস্ত নই। ২০১২ সাল থেকে ২০২১ সাল আজ পর্যন্ত যদি দিন হিসেব করি সম্ভবত দিনের সংখ্যা দাড়াবে- ৩১৮৮ দিন। এবার ৩১৮৮দিন যদি তিন (তিন বেলা) দিয়ে ভাগ দেই সর্বমোট দিন দাড়াবে ৩১৮৮x৩=৯৫৬৪দিন।

যদি ৯৫৬৪ বার “খাবার খেয়েছো” শুনতে, তুমি কি বিরক্ত হতে না?

৯৫৬৪ দিন গুলোর কসম, তোমার ভালোবাসায় আমি হারিয়ে গেছি, তোমাকে বড্ড ভালোবাসি, তোমাকে যতবার আমি হৃদয়ে আসা-যাওয়ায় রাখি, তুমি শ্বাস-প্রশ্বাস নাও কিনা আমার সন্দেহ হয়। তোমাকে ভেবে পুরো জাগা, তোমাকে ভেবে আমার জীবনের প্রতিটি কাজ কর্ম করা, ইভেন টাকা পয়সার লেনদেনর সময়। মোদ্দা কথা: সর্বক্ষন মাথার মগজে তুমি।

জানি কখনও, যখন তখন তোমাকে পাবো না।

জানি কখনও, যখন তখন তোমার হাত ধরতে পারব না।

জানি কখনও, যখন তখন চুলে ঘ্রান নিতে পারবো না।

জানি কখনও, যখন তখন আমার কোন ইচ্ছে পূরন হবার নয়।

জানি কখনও, যখন তখন জ্বালাতে পারব না।

জানি কখনও, যখন তখনন বলতে পারব না তোমাকে চাই।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, একটু কাছে বস।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, আজ বেড়াতে যেও না তোমাকে চাই পুরো দিন।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, তোমাকে নিজ হাতে গোসল করিয়ে দিতে।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, উলঙ্গ শরীরের তোমার সৌন্দর্য দেখা, মুগ্ধ হই।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, আমি খাবার নিয়ে আসি, তোমাকে নিজে হাতে খাইয়ে দিব।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, চল মধ্য রাত পুকুরে গোসল করে আসি।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, চল মধ্য রাত ঢাকার পুরো শহরটা দেখে আসি।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, চল মধ্য রাত বাসায় খাবোনা, কোন রেস্তোরায় খাবো।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, চল মধ্য রাত সঙ্গম করি।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, চল মধ্য রাত নৌকায় ঘুরি।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, তুমি না খেলে, আমি খাবো না।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, তোমার পিরিয়ডের ব্যাথায় আমি ব্যথি, তোমাকে জড়িয়ে ধরতে পারব না।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, আজ আমি রান্না করি, তুমি দেখিয়ে দাও।

জানি কখনও, যখন তখন বলতে পারব না, আজ “ভালোবাসি”।

তবুও হৃদয় অপেক্ষায় দিন কেটে যায়।

 

-অনু।

১৫.০৩.২০২১ইং

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

81 − 73 =