ক্রন্দনশিল্প

আমার বন্ধু ফোন করে জানায় যে, তার মা আর বেঁচে নেই। আমি দৌড়ে বন্ধুর বাসায় যাই এবং দেখি বন্ধুর বাবা হাউমাউ করে কান্না করছে। আমি এর আগে কোন পুরুষকে এভাবে কান্না করতে দেখি নি। বাসার অনেক মানুষই কান্নাকাটি করছিল কিন্তু সকল মানুষের বেদনাকে ধূলিসাৎ করে বন্ধুর বাবা সবার শীর্ষে অবস্থান করে নিচ্ছিলেন।
আমি অবাক হয়ে বন্ধু বাবাকে লক্ষ্য করতে থাকি- আর দেখি, তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। তিনি ঠিক মতন কথাও বলতে পারছিলেন না। আশেপাশের উৎসুক জনতা বন্ধুর বাবাকে থামাতে ও কিছু খাওয়াতে চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু বন্ধুর বাবা কান্নাকাটি প্রতিযোগিতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী তাতে আমার কোন সন্দেহ আর থাকে না।
বন্ধুর মাকে কবরে নামানোর সময় মনে হচ্ছিল বন্ধুর বাবাও কবরে চলে যেতে চাচ্ছেন। তিনি কোনভাবেই তার স্ত্রীকে মাটির নিচে চাপা দিতে দিবেন না। বন্ধুর বাবার আর্তনাদ সবার হৃদয়কে স্পর্শ করছিল।
আমি প্রায় দুই সপ্তাহ বন্ধুর সাথে শারীরিক ও মানসিকভাবে উপস্থিত ছিলাম। সেই দুই সপ্তাহে যতবার বন্ধুর বাবাকে দেখেছি- মনে হয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে আবেগপ্রবণ ও নিষ্পাপ হৃদয়ের একজন মানুষ তিনি। ভালোবাসা কী- এটা আসলেই এই মানুষের থেকে শেখা উচিত।
দুই সপ্তাহ পর, আমি বন্ধুর বাবাকে শক্ত হতে বলি।
বন্ধুর বাবা উত্তর দেন, ‘একটা কিডনি নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব কিন্তু ভালো থাকা সম্ভব না।’
বন্ধুর বাবার এই সংলাপ শুনে আমি নিজেকে প্রশ্ন করি, এই জীবনে কী করলাম! না হতে পারলাম বন্ধুর বাবার মত মানুষ হতে, না হতে পারলাম বন্ধুর বাবার মত প্রেমিক হতে!
বন্ধুর মায়ের মৃত্যুর ৪৫ দিন পর, বন্ধু ফোন করে বলে, সর্বনাশ হয়ে গেছে।
আমি জিজ্ঞেস করি, কী হল?
বন্ধু উত্তর দেয় না। শুধু বলে, সর্বনাশ, সর্বনাশ, সর্বনাশ।
আমি ভাবলাম, এবার মনে হয় বন্ধুর বাবা মারা গেছে।
আমি দ্রুত বন্ধুর বাসায় পৌঁছাই।
বাসায় ঢুকে দেখি ড্রয়িংরুম ওলটপালট। আমি ভয় পাই। আর ভাবতে থাকি, চোর ডাকাত এসে সবকিছু চুরি করে নিয়ে গেল না তো! আবার ভাবি, বন্ধুর বাবা কই? ডাকাতি করতে এসে আবার বন্ধুর বাবাকে মেরে ফেলে নি তো? আমার আশংকা বাড়তে থাকে। অন্যদিকে বন্ধু বিড়বিড় করে গালি দিয়ে যাচ্ছে।
আমি এক রুম থেকে আরেক রুমে যাওয়ার সময় দেখি বন্ধুর বাবা তো জীবন্ত। তাহলে কাহিনী কী?
আমি মূলকক্ষের দরোজায় দাঁড়িয়ে বন্ধুর বাবাকে জিজ্ঞেস করি, আঙ্কেল কী হয়েছে?
বন্ধু সাথে সাথে চিৎকার করে বলে, নির্লজ্জ একটা লোক।
বন্ধুর বাবা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। আর আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘বাবা, তুমি তো জানোই- একটা কিডনি নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব কিন্তু ভালো থাকা সম্ভব না।’
আমি ভ্রু কুঁচকে বন্ধুর বাবার দিকে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি, এই বাক্যটি বলার কারণ কী? কিছুক্ষণ পর দেখতে পাই- পঁচিশ, ছাব্বিশ, সাতাশ বছরের একজন তরুণী বন্ধুর বাবার বাহু ধরে লেপটে আছে।
আমি কিছুক্ষণ বেক্কলের মত ভাবতে থাকি- ‘একটা কিডনি নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব কিন্তু ভালো থাকা সম্ভব না।‘ সেইদিন এই বাক্যটি তিনি কোন অর্থে ব্যবহার করেছিলেন? অথচ আমি ভেবেছিলাম সম্পূর্ণ বিপরীত।
ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 4 =