২২৬: আল-ফুলস হামলা-২: হাতেম তাঈ গোত্র-পরিবারের পরিণতি!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

‘কুরআন’ ও আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের রচিত যে কোন “একটি” সিরাত-গ্রন্থ ও “সকল” হাদিস গ্রন্থগুলো পাঠ করেও কী কারণে হযরত মুহাম্মদে (সাঃ) এর ঘটনা বহুল নবী জীবনের স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়, তার এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো আলী ইবনে আবু তালিবের এই ‘আল-ফুলুস’ হামালা ও এই হামলা পরবর্তী সময়ে হাতেম তাই পুত্র আ’দি বিন হতেম তাঈয়ের ইসলাম গ্রহণের কারণ ও প্রেক্ষাপট। এর কারণ হলো:

ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হলো ‘কুরআন’, যার রচয়িতারা হলেন, কুরআনের ভাষায়: “মুহাম্মদ নিজে কুরান রচনা করেছেন এবং অন্যেরাও তাকে সাহায্যে করেছে (কুরআন: ২৫:৪; ১১:৩৫; ৪৬:৭-৮, ইত্যাদি)”; এ বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা ‘এ সেই কিতাব যাতে কোনই সন্দেহ নেই-এক’ পর্বে (পর্ব: ১৭) করা হয়েছে। আর এই বইটি এতই অসম্পূর্ণ যে তার মর্ম উদ্ধার করতে ও তা বুঝতে দরকার হয় “শানে নজুল” নামক এক অতি প্রয়োজনীয় উপাদানের, যার ঠিকানা হলো আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের রচিত ‘সিরাত ও হাদিস’ গ্রন্থ (বিস্তারিত: পর্ব-৪৪)। কুরআনে এই হামলাটির বিষয়ে কোন আলোকপাত করা হয় নাই।

সময়ের ধারাবাহিক ক্রমানুসারে ইসলামের ইতিহাসের “সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ’ সিরাত” গ্রন্থের লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ইবনে ইয়াসার (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), আর তা লিখা হয়েছে মুহাম্মদের মৃত্যুর পর নিরবচ্ছিন্ন মুহাম্মদ অনুসারী মুসলিম শাসন আমলের প্রায় ১১০ বছর পর। অতঃপর আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) ‘কিতাব আল-মাঘাজি’ গ্রন্থ; অতঃপর মুহাম্মদ ইবনে সা’দের (৭৮৪-৮৪৫ খৃষ্টাব্দ) “কিতাব আল-তাবাকাত আল-কাবির’ গ্রন্থ ও অতঃপর আল-তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ সাল) “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক” গ্রন্থ। আদি উৎসের এই সকল সিরাত লেখকদের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, মুহাম্মদের অতর্কিত আগ্রাসী আক্রমণের খবরটি জানার পর ভীত হয়ে, দাতা হাতেম তাই পুত্র আ’দি বিন হাতেম, সিরিয়ায় পলায়ন করেছিলেন ও তাঁর পলায়নের পর মুহাম্মদ অনুসারীরা তাঁর গোত্রের ওপর এই হামলাটি চালিয়েছিলেন। কিন্তু, কীভাবে ও কী অমানুষিক নৃশংসতায় মুহাম্মদ অনুসারীরা এই হামলাটি সংঘটিত করেছিলেন, তা “শুধুমাত্র” আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় বিস্তারিত, আর মুহাম্মদ ইবনে সা’দের বর্ণনায় তা অতি সংক্ষিপ্ত।; যার আলোচনা গত পর্বে করা হয়েছে।

“অর্থাৎ শুধুমাত্র ইবনে ইশাক ও আল-তাবারীর সিরাত-গ্রন্থটি অধ্যয়ন করে এই হামলাটি বিষয়ে আদৌ কোন ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়; আর মুহাম্মদ ইবনে সা’দের সিরাত-গ্রন্থটি অধ্যয়ন করে এই হামলাটির বিশদ বিবরণ জানা অসম্ভব।”

একইভাবে, আদি উৎসের ‘পূর্ণাঙ্গ সিরাত গ্রন্থগুলোর’ এই সকল লেখকদের বর্ণনায় আমরা আরও জানতে পারি, এই হামলাটির প্রাক্কালে আলী ইবনে আবু তালিব ও তাঁর সঙ্গীরা হাতেম তাঈয়ের গোত্রের লোকদের বন্দী করে মদিনায় ধরে নিয়ে এসেছিল, যার অন্তর্ভুক্ত ছিল হাতেম তাঈয়ের এক কন্যা (আল-তাবারীর অন্য এক বর্ণনায়, ‘ফুপু’) ও অতঃপর সেই কন্যাটি যখন মুহাম্মদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন, তখন নবী মুহাম্মদ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন।

“কিন্তু কী ভাবে তারা এই লোকদের বন্দী করে ধরে নিয়ে এসেছিলেন তা ইবনে ইশাকের বর্ণনায় অনুপস্থিত; মুহাম্মদ ইবনে সা’দের বর্ণনায় অতি সংক্ষিপ্ত ও আল-তাবারীর বর্ণনায় মাত্র কয়েক লাইন।”

সামগ্রিকভাবে আল-ওয়াকিদির ‘আল-মাঘাজি’ গ্রন্থে এই হামলাটি সহ মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের প্রায় সকল হামলাগুলো বর্ণনা বিস্তারিত ও প্রাণবন্ত। তা সত্বেও,

“এই হামলাটির পর হাতেম তাই পুত্র আ’দি বিন হাতেম কী কারণ ও পরিস্থিতিতে মদিনায় মুহাম্মদের কাছে এসে ‘ইসলামে দীক্ষিত’ হয়েছিলেন তা আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় অনুপস্থিত; কিন্তু ইবনে ইশাক ও আল-তাবারী তা লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।”

আর প্রধান সিহাহ সিত্তাহ হাদিস সংকলন ও লিপিবদ্ধ করা শুরু হয়েছে ইবনে ইশাকের ‘পূর্ণাঙ্গ’ সিরাত গ্রন্থটি রচিত হওয়ার ৯০ বছরেরও অধিক পর; মুহাম্মদের মৃত্যুর পর নিরবচ্ছিন্ন মুসলিম শাসন-আমলের ২০০ বছরের ও অধিক পরে। হাদিস গ্রন্থগুলোতে এই হামলাটির বর্ণনা লিপিবদ্ধ করা হয় নাই।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনার পুনরারম্ভ: [1]
(আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ) [2]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২২৫) পর:

‘হাতেমের কন্যাকে রাখা হয়েছিল মসজিদের দরজায় পাশে ঘেরাও করা এক স্থানে যেখানে বন্দীদের ধরে রাখা হয়েছিল ও আল্লাহর নবী তার [হাতেম কন্যা] পাশ দিয়ে গমন করছিলেন। সে তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্যে উঠে দাঁড়ায়, এই কারণে যে সে ছিল এক ভদ্র-নম্র (Courteous) মহিলা; অতঃপর সে বলে,

“হে আল্লাহর নবী, আমার পিতার মৃত্যু হয়েছে ও যে ব্যক্তিটির আমার পক্ষে কাজ করা উচিত সে চলে গেছে। যদি আপনি আমাকে নিষ্কৃতি দেন তবে ঈশ্বর আপনাকে নিষ্কৃতি দেবে।”

তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন যে তার সেই লোকটি কে; সে যখন তাঁকে বলে যে সে হলো আ’দি বিন হাতেম, তিনি চিৎকার করে বলেন, “ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ ও তার রসুলের কাছ থেকে পালিয়ে গিয়েছে।” অতঃপর তিনি তাকে রেখে প্রস্থান করেন।

পরের দিন ঠিক একই ঘটনা ঘটে, আর তার পরের দিন সে [হাতেম কন্যা] হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অতঃপর তাঁর পিছনে থাকা এক লোক ইশারায় তাকে দাঁড়াতে ও তাঁর সাথে কথা বলতে বলে। সে ঠিক আগের কথা-গুলো বলে; তিনি জবাবে বলেন, “আমি সেটি করেছি, তবে তাড়াহুড়া করো না যতক্ষণে না তুমি এমন একজন লোক খুঁজে পাও যাকে তুমি বিশ্বাস করো ও যে তোমাকে তোমার এলাকায় নিয়ে যাবে, তারপর আমাকে তা জানিও।”

যে ব্যক্তি-টি আমাকে [হাতেম কন্যা] কথা বলার জন্য ইশারা করেছিল আমি তার নাম জিজ্ঞাসা করি ও আমাকে বলা হয় যে সে ছিল আলী। আমার কাছে বালী কিংবা কু’দা (Bali or Qudaa) থেকে কিছু সওয়ারি লোকদের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত আমি অবস্থান করি। আমি একমাত্র যা চেয়েছিলাম তা হল সিরিয়ায় আমার ভাইয়ের কাছে যাওয়া। আমি আল্লাহর নবীর কাছে যাই ও তাঁকে বলি যে আমার লোকদের ভিতরে কিছু খ্যাতিসম্পন্ন ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিরা আমার জন্য এসেছে। আল্লাহর নবী আমাকে পরিধান-বস্ত্র প্রদান করেন ও আমাকে একটি উটের উপর চাপিয়ে দেন ও আমাকে টাকা-পয়সা দেন; অতঃপর আমি তাদের সাথে রওনা হই ও সিরিয়ায় এসে পৌঁছি।’ [3] ——-

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) বিস্তারিত ও অতিরিক্ত বর্ণনার পুনরারম্ভ: [4]
(মুহাম্মদ ইবনে সা’দের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, আল-ওয়াকিদির বর্ণনারই অনুরূপ) [5]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২২৫) পর:

হাতেম তাঈ গোত্রের লোকদের পরিণতি:

‘লোকেরা শিবির স্থাপন করে, ও তারা বন্দীদের আলাদা করে রাখে ও তারা ছিল নুফায়ের (Nufayr) অঞ্চলে। তারা হাতেমের পরিবারের কাছ থেকে পাকড়াও করা শিশুদের আলাদা করে রাখে ও তারা আলাদা করে রাখে আ’দির ভগ্নি ও তার সাথে থাকা নারীদের।

আসলাম আলী-কে বলে, “কেন তুমি আমাকে ছেড়ে দিতে অপেক্ষা করছো?” সে বলে, “তুমি সাক্ষ্য দেবে যে আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নাই ও মুহাম্মদ তার রসূল।”

সে জবাবে বলে, “আমি আমার সম্প্রদায়ের ধর্ম অনুসরণ করি, যারা হলো ঐ বন্দীরা। তারা যা কিছু করে, আমি তাই করি!”
সে [আলী] বলে, “তুমি কী তাদের-কে বাঁধা অবস্থায় দেখছো না? আমারা কী তোমাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে তাদের ওখানে রাখবো?”

সে বলে, “হ্যাঁ, মুক্ত অবস্থায় অন্যদের সাথে থাকার চেয়ে তাদের সাথে বাঁধা অবস্থায় থাকায় আমার বেশী কাম্য। তাদের সম্পর্কে যা সত্য, আমার সম্পর্কেও তাই সত্য।”
হামলাকারীরা এ নিয়ে হেসে উঠে। তাকে বেঁধে ফেলা হয় ও বন্দীদের ভিতরে নিক্ষেপ করা হয়। সে বলে, “তোমরা তাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমি তাদের সাথেই থাকবো।”

বন্দীদের একজন তাকে বলে, “আমরা তোমাকে স্বাগত জানাই না। তুমি তাদের-কে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছো।” অন্য একজন বলে, “তোমাকে স্বাগতম। তুমি যা করেছো তার চেয়ে বেশি কিছু করতে পারতে না। আমরা যদি এমন কিছুর সম্মুখীন হতাম যার সম্মুখীন তুমি হয়েছো, তবে আমরাও হয়তো একইরকম কাজ করতাম, কিংবা এর চেয়েও খারাপ। সুতরাং, নিজেকে সান্ত্বনা দাও!”

সৈন্যরা এসে সমবেত হয়। তারা বন্দীদের নিকটে আসে ও তাদের-কে ইসলামের দাওয়াত দেয়। যারা ধর্মান্তরিত হয় তারা প্রস্থান করে, ও যারা তা অস্বীকার করে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যতক্ষণে না তারা আল-আসওয়াদের কাছে আসে।

তারা তকে [আল-আসওয়াদে-কে] ইসলামের দাওয়াত দেয়। সে বলে, “ঈশ্বরের কসম, তরোয়ালের ভয়ে ভীত হওয়া লজ্জাকর। যা কোন স্থায়ী অবস্থান নয়।” গোত্রের এক লোক, যে ধর্মান্তরিত হয়েছিল, বলে, “তুমি অদ্ভুত লোক। এটি কি সেই জায়গা নয় যেখানে তোমাকে ধরা হয়েছিল; যেখানে যাদের-কে হত্যা করা হয়েছিল, নিহত হয়েছিল; ও যাদের-কে বন্দী করা হয়েছিল, পাকড়াও হয়েছিল। আমাদের মধ্যে যারা ধর্মান্তরিত হয়েছে তারা ইসলাম কামনা করেছে, তোমার যা ইচ্ছা হয় তাই বলো। ধিক তোমাকে, ধর্মান্তরিত হও ও মুহাম্মদের ধর্ম অনুসরণ করো!”

তাই সে ধর্মান্তরিত হয় ও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। রিদ্দার [যুদ্ধের] পূর্ব পর্যন্ত সে প্রতিশ্রুতি দিতো অত:পর তা পূরণ করতো না। সে খালিদ বিন ওয়ালিদের সাথে আল-ইয়ামামা [যুদ্ধ] প্রত্যক্ষ করেছিল। তার ভাল এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

সে বলেছে: আলী ‘আল-ফুলস [তাঈ গোত্রের প্রতিমা]’ এর নিকট আসে ও তা আক্রমণ ও ধ্বংস করে।

সে তার মন্দিরে তিনটি তরোয়াল খুঁজে পায়: ‘রাসুব, আল-মিখধাম’ ও অন্য একটি তরোয়াল যার নাম ছিল ‘ইয়ামানি’; আর ছিল তিনটি বর্ম। আর তার সাথে পরিধানের জন্য ছিল একটি পোশাক।

তারা বন্দীদের জড়ো করে ও আবু কাতাদা-কে তাদের দায়িত্বে নিযুক্ত করে। তারা আবদুল্লাহ বিন আল-আতিক কে নিযুক্ত করে গবাদি পশু ও অস্থাবর সম্পত্তির (আসবাব ও অন্যান্য জিনিসপত্র) দায়িত্বে।

অতঃপর তারা যাত্রা করে ও ‘রাকাক’ নামক স্থানে এসে পৌঁছে। তারা বন্দী ও লুণ্ঠন-সামগ্রীগুলো ভাগাভাগি করে নেয়। আল্লাহর নবী তাঁর অংশ হিসাবে প্রথমে ‘রাসুব ও আল-মিখধাম’ আলাদা করে রাখেন। অতঃপর, তাঁর কাছে আসে আরও একটি তরোয়াল। তিনি এক-পঞ্চমাংশ আলাদা কারে রাখেন, আর তিনি আলাদা করে রাখেন হাতেমের পরিবারের লোকদের। সে তাদের সাথে মদিনায় পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত তাদের-কে ভাগাভাগি করেন নাই।’

(ইবনে সা’দ: ‘—রাকাক নামক স্থানে এসে যখন তারা যাত্রা বিরতি দেয়, তারা লুণ্ঠন-সামগ্রীগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয় ও রাসুব ও আল-মিকধাম আল্লাহর নবীর বিশেষ হিস্যার অংশ হিসাবে আলাদা করে রাখে, তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হউক। অতঃপর অন্য তরোয়াল-টি ও তাঁর হিস্যার অন্তর্ভুক্ত হয়। তারা আল-খুমুস [লুণ্ঠন-সামগ্রীর এক-পঞ্চমাংশ, আল্লাহ-নবীর হিস্যা – কুরআন: ৮:৪১] ও হাতেমের পরিবারের সদস্যদের আলাদা করে রাখে ও তাদের-কে আল-মদিনায় নিয়ে আসে।’) [5]

হাতেম তাঈ পরিবারের লোকদের পরিণতি:
(ইবনে ইশাক ও আল-তাবারীর বর্ণনা, আল-ওয়াকিদির বর্ণনারই অনুরূপ): [1] [2]

‘আল-ওয়াকিদি বলেছেন: কথিত এই ঘটনাটি (Tradition) আমি আবদুল্লাহ বিন জাফর আল-যুহরীর নিকট বর্ণনা করি ও সে বলে: ইবনে আবি আউন আমাকে যা বলেছে, তা হলো,

‘বন্দীদের মধ্যে ছিল আদি বিন হাতিমের এক ভগ্নী, যাকে ভাগাভাগি করা হয় নাই। তাকে ধরে রাখা হয়েছিল রামালা বিনতে আল-হারিথের বাড়িতে। আলীর গতিবিধির খবরটি শোনার পর আদি বিন হাতিম পলায়ন করে। মদিনায় তার এক গুপ্তচর ছিল, যে তাকে সতর্ক করেছিল, তাই সে আল-শামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। আল্লাহর নবী যখন আ’দির ভগ্নীটির পাশ দিয়ে যেতেন তখন সে বলতো,

“হে আল্লাহর নবী, [আমার] পিতার মৃত্যু হয়েছে ও প্রতিনিধি লোকটি অনুপস্থিত। সুতরাং আল্লাহ আপনাকে যা দিয়েছে তা থেকে আমাদেরকে কিছু দান করুন।”
তখন, নবী তাকে জিজ্ঞাসা করেন, “কে তোমার প্রতিনিধি?”
সে বলে, “আদি বিন হাতেম।”
অতঃপর তিনি বলেন, “আল্লাহ ও তাঁর রসূলের কাছ থেকে পলাতক”, তাই সে সে আশা হারিয়ে ফেলে। চতুর্থ দিনটি-তে যখন নবী তার পাশ দিয়ে গমন করে, সে কোনও কথা বলে না। এক ব্যক্তি তার দিকে ইশারা করে বলে, “ওঠো ও তাঁর সাথে কথা বলো।” তাই সে কথা বলে ও তিনি তাকে অনুমতি প্রদান করেন ও তাঁর প্রতি সদয় হোন। যে ব্যক্তিটি তাকে ইশারা করেছিল সে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলা হয়েছিল, “‘আলী।’ সে হলো ঐ ব্যক্তি যে তোমাকে বন্দী করেছে। তুমি কি তাকে চেনো না?”

সে বলেছিল, “না, আল্লাহর কসম, আমাকে বন্দী করার দিনটি থেকে এই বাড়িতে আসার পূর্ব পর্যন্ত আমি আমার পোশাকটি আমার মুখের উপরে রেখেছিলাম। আমি তার কিংবা তার কোন সঙ্গীরই মুখ দর্শন করি নাই।”’

আল-তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ খ্রিস্টাব্দ) অতিরিক্ত বর্ণনা: [6]

‘এই বছর (অর্থাৎ, হিজরি ৯ সাল), রবিউল আওয়াল মাসে আল্লাহর নবী আলী-কে এক সেনাদল (সারিয়া [sariyyah]) সহ তাঈ গোত্রের এলাকায় প্রেরণ করেন। সে তাদের-কে অতর্কিত আক্রমণ ও বন্দী করে, ও মন্দিরের দুটি তরোয়াল হস্তগত করে: একটি-কে বলা হতো “রাসুব” ও অন্যটি “মিখধাম” নামে পরিচিত। এই তরোয়াল দুটি আল-হরিথ বিন আবি শিমর এই মন্দিরটি-তে দান করেছিল ও তা ছিল সুপরিচিত। বন্দীদের মধ্যে ছিল আ’দি বিন হাতেমের ভগ্নী।’ [7] [8] [9]

‘আবু জাফর (আল-তাবারী): আ’দি বিন হাতেম সম্বন্ধে যে রিপোর্ট-গুলো আমার নাগালে পৌঁছেছে তাতে সময়কাল নির্দিষ্ট করা হয় নাই ও আলী কর্তৃক বন্দী আদি বিন হাতেমের ভগ্নী সম্পর্কে যে বিবরণগুলো আল-ওয়াকিদি উদ্ধৃত করেছেন তার উল্লেখ করা হয় নাই।’

‘মুহাম্মদ বিন মুথাননা (আল-বাসরি) < মুহাম্মদ বিন জাফর (আল-হুদালি আল-বাসরি) < শুবাহ (বিন আল-হাজ্জাজ আল বাসরি) < সিমাক (বিন হারব আল কুফি) হইতে বর্ণিত: [10]

'আমি শুনেছি, আদি বিন হাতেম হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আববাদ বিন হুবায়েশ (আল-কুফি) বর্ণনা করেছে, যে বলেছে: 'আল্লাহর নবীর অশ্বারোহী বাহিনী, অথবা আল্লাহর নবীর বার্তাবাহকদের আগমন ঘটে ও তারা আমার ফুপু ও আরও কিছু লোকদের বন্দী করে নবীর সম্মুখে ধরে নিয়ে আসে; যেখানে তাদের-কে সারিবদ্ধ ভাবে রাখা হয়।

(আমার ফুপু) বলে, "হে আল্লাহর নবী, যে ব্যক্তিটির আমার পক্ষে কথা বলা উচিত সে অনেক দূরে, আমার পুত্রকে (আমার কাছ থেকে) আলাদা করা হয়েছে ও আমি এক বৃদ্ধ মহিলা যে (কারও কাছে) কোন কাজে আসে না। হে আল্লাহর নবী, আমার প্রতি সদয় হোন, ঈশ্বর আপনার প্রতি সদয় হবে।"

তিনি বলেন, "কে সেই ব্যক্তি যার তোমার বিশয়ে কথা বলা উচিত?" সে বলে, "আদি বিন হাতেম।" তিনি বলেন, "(ঐ লোকটি) যে আল্লাহ ও তার রসুলের কাছ থেকে পালিয়ে গিয়েছে।" অতঃপর তিনি তার অনুরোধ-টি মঞ্জুর করেন, আর তার পাশের এক ব্যক্তি যে সম্ভবত ছিল আলী, তাকে বলে যে সে যেন তাঁর কাছে এক সওয়ারি পশুর জন্য আবেদন করে। সে তার একটির জন্য আবেদন করে ও আল্লাহর নবী তাকে তা প্রদান করার আদেশ করেন।' —-

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

ইসলামের ইতিহাসের আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো, মুহাম্মদের নির্দেশে আলী ইবনে আবু তালিব ও তাঁর সঙ্গী অন্যান্য মুহাম্মদ অনুসারীরা বানু তাঈ গোত্রের লোকদের নৃশংসভাবে হত্যা ও বন্দী ও তাঁদের সম্পদ লুণ্ঠন করেছিলেন, “শুধুমাত্র এই কারণে” যে তাঁরা মুহাম্মদ-কে নবী হিসাবে স্বীকার করে ইসলামে দীক্ষিত হয় নাই। এটিই ছিল তাঁদের একমাত্র অপরাধ!

‘কুরআন’ ও আদি উৎসের কোন “একটি” সিরাত-গ্রন্থ ও “সকল” হাদিস গ্রন্থগুলো পাঠ করেও কী কারণে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ঘটনা বহুল নবী জীবনের স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়, তার আরও আলোচনা “রক্তের হোলি খেলা-‘নাইম’ দুর্গ দখল” এবং “আবু জানদাল বিন সুহায়েল উপাখ্যান’ পর্বে (পর্ব: ১৩৪ ও ১২০) করা হয়েছে।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল ওয়াকিদির বর্ণনার মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি; ইবনে ইশাক ও আল তাবারীর রেফারেন্স: বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক তথ্যসূত্র এক ও দুই:]

The narratives of Al-Waqidi: [4]

The people camped, and they isolated the prisoners, and they were in the region of Nufayr. They isolated the children they took from the family of Ḥātam, the sister of ‛Adī and the women with her, and they isolated them. Aslam said to ‛Alī, “Why do you wait to set me free?” He said, “You will witness that there is no God but Allah, and that Muḥammad is His messenger.” He replied, “I follow the religion of my community who are those prisoners. Whatever they do, I do!” He said, “Do you not see them tied up? Shall we put you with them in ropes?” He said, “Yes, to be with those tied up is more desirable to me than that I be with others, free. What holds true about them is true about me.” The people of the raid laughed about it. He was tied and thrown in with the prisoners. He said, “I shall be with them until you have judged them.” One of the prisoners said to him, “We do not bid you welcome. You brought them to us.” Another said, “Welcome to you. You couldn’t do more than what you did. If we faced what you faced we would have done the same and worse. So console yourself!”

The soldiers came and gathered. They came close to the prisoners and offered them Islam. Those who converted were left, and those who refused were executed, until they came to al-Aswad. They offered him Islam. He said, “By God, indeed to worry about the sword is ignoble. There is no permanence.” A man from the tribe who converted says, “O you are strange. [Page 988] Was this not the place where you were taken, where those who were killed, were killed, and those who were imprisoned, imprisoned. Those who converted among us desired Islam, say whatever you say. Woe unto you, convert and follow the religion of Muḥammad!” He said, “I will convert and follow the religion of Muḥammad!” So he converted and was released. He used to promise and not fulfill until the Ridda. He witnessed al-Yamāma with Khālid b. al-Walīd. His experience was a good one.

He said: ‛Alī went to al-Fuls and attacked and destroyed it. He found three swords in his house: Rasūb, al-Mikhdham, and a sword called Yamānī; and three armors. And there was a garment to wear with it. They gathered the prisoners and employed Abū Qatāda over them. They employed ‛Abdullah b. al-‛Atīk al-Sulamī over the cattle and chattel (paltry furniture, etc). Then they marched until they alighted at Rakak. They apportioned the prisoners and the plunder. The Prophet isolated his first portion Rasūb and al-Mikhdham. Then later, there came to him another sword. He isolated the fifth, and he isolated the family of Ḥatam. He did not apportion them until he arrived in Medina with them.

Al-Wāqidī said: I narrated this tradition to ‛Abdullah b. Ja‛far al-Zuhrī and he said: Ibn Abī ‛Awn related to me saying: There was with the prisoners a sister of ‛Adī b. Ḥatam who was not apportioned. She was kept in the house of Ramla bt. al-Ḥārith. ‛Adī b. Ḥatam had fled when he heard about the movement of ‛Alī. He had a spy in Medina, who warned him, so he set out to al-Shām. [Page 989] The sister of ‛Adī used to say when the Messenger of God passed by, “O Messenger of God, the father is destroyed and the ambassador is absent. So give us from what Allah gave you.” At that, the Prophet asked her, “Who is your ambassador?” She said, “‛Adī b. Ḥatam.” And he says, “The fugitive from God and His messenger,” so she lost hope. When it was the fourth day, the Prophet went by and she did not talk. A man pointed to her saying, “Rise and talk to him.” So she talked and he gave her permission and was kind to her. She asked about the man who pointed to her. It was said, “‛Alī. He is the man who imprisoned you. Don’t you know him?” She said, “No by God, I kept my garment on my face, since the day I was imprisoned, until I came into this house. I have not seen his face or that of any one of his companions.”’ —–

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬৩৮
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৯-৯২৩ সাল), ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ৬৫ https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[3] Ibid আল-তাবারী, নোট নম্বর ৪৫৩: বালী অথবা কু’দা (Bali or Qudaa) – ‘দক্ষিণ আরবিয় গোত্র।’

[4] “কিতাব আল-মাগাজি”- লেখক: আল-ওয়াকিদি, ভলুম ৩ – পৃষ্ঠা ৯৮৭-৯৮৯; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail and Abdul Kader Tayob, পৃষ্ঠা ৪৮৪-৪৮৫
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[5] অনুরূপ বর্ণনা: “কিতাব আল-তাবাকাত আল-কাবির- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে সা’দ (৭৮৪-৮৪৫ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ – এস মইনুল হক, ভলুম ২; পৃষ্ঠা ২০৩
https://www.exoticindiaart.com/book/details/kitab-al-tabaqat-al-kabir-set-of-2-volumes-NAG992/

[6] Ibid আল-তাবারী: ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ৬২-৬৩
[7] Ibid আল-তাবারী, নোট নম্বর ৪৩২: সারিয়া (sariyyah) – ‘সারিয়া, যার বহুবচন হলো সারায়া (Saraya), যা নবী কর্তৃক প্রেরিত সেনাবাহিনী অর্থে প্রয়োগ করা হয়; অন্যদিকে ঘাজওয়া বা গাজওয়া (ghazwah), যার বহুবচন হলো ঘাজওয়াত বা মাঘাজি (ghazawat, also maghdzi), যার অর্থ হলো সেই অভিযানগুলো যেখানে আল্লাহর নবী নিজেই অংশগ্রহণ করেছিলেন।’

[8] Ibid আল-তাবারী, নোট নম্বর ৪৩৩: “এই হামলাটি আলীর সারিয়া ‘আল-ফুলুস (বা ফলস, বা ফিলস)’ নামে অভিহিত, যেটি ছিল নাজাদে অবস্থিত বানু তাঈ গোত্রের লোকদের উপাস্য এক প্রতিমা।”
[9] Ibid আল-তাবারী, নোট নম্বর ৪৩৭: আ’দি বিন হাতেম – ‘তিনি ছিলেন খ্যাতিমান কবি হাতেম আল-তাঈয়ের এক পুত্র ও (পরবর্তীতে) আলীর একজন সমর্থক। তিনি ৬৮৭-৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ৬৮ সাল) মৃত্যুবরণ করেন।’

[10] Ibid আল-তাবারী, নোট নম্বর ৪৩৯ -৪৪২:
“মুহাম্মদ বিন মুথাননা আল-বাসরি, মৃত্যু ৮৬৬ সাল; মুহাম্মদ বিন জাফর আল-হুদালি আল-বাসরি, মৃত্যু ৮০৮-৮০৯ সাল; শুবাহ বিন আল-হাজ্জাজ আল বাসরি, মৃত্যু ৭৭৬-৭৭৭ সাল; সিমাক বিন হারব আল কুফি, মৃত্যু ৭৪০-৭৪১ সাল।”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1