হেফাজত- সরকারের প্রতিবন্ধকতা নাকি হাতিয়ার?

অর্ধমাস ফেসবুক জগতের বাইরে ছিলাম, ফিরে দেখি রাজনৈতিক ঘোরপ্যাঁচের একটা ঘোরতর জটলাক্রান্ত দেশ। দেশব্যাপী হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ, ক্ষেত্রবিশেষে দাবী দাওয়া নিয়ে পক্ষবিপক্ষ সংঘর্ষ মাঝখানে দর্শক হিসেবে অনেকে। এর মধ্যে আমার কাছে একটা বিষয় প্রহসনের মতোন ঠেকছে- স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশে এলো একজন, যাকে নিয়ে এতো বাকবিতন্ডা, ঘাত-প্রতিঘাত- সংঘাতের অলাতচক্র, তাকে একরকম অভ্যর্থণা করে জামাই আদরে আনলো সরকার। আর এদিকে আরেক দল জটলা, বিক্ষোভ, হরতালের নামে ভাঙচুর করছে আম জনগণের সম্পদ- নিজেরাও হতাহত হচ্ছে, আবার আম জনতাকেও ফেলছে বিপাকে। আপনি স্বাধীন দেশে অযৌক্তিক কোনো বিষয়ের প্রতিবাদে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-মানববন্ধন করতেই পারেন, আমার বক্তব্য সেখানে না, তার সমালোচনা করাও আমার লক্ষ্য না। নেতারা হয়তো এখানে এলিবাঈ দিতে পারেন- বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যেহেতু ভারত অস্ত্র, জনবল ও আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছে, এখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে সেই দেশের প্রতিনিধিস্বরুপ প্রধাণমন্ত্রীকে ডাকা উচিত। একটি বিপক্ষ যুক্তিও এখানে দাঁড় করানো যায়, ভারতে তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের সাথে বর্তমানদের সাপে নেউলে সম্পর্ক তুলে ধরে। আরো বহুমুখী আলাপ আলোচনা চলতে পারে, সে আপনারা করবেন- আমি মোদ্দা কথায় আসি। আমি শুধু একটা অভিমত দিতে চাই, ভারতের প্রধাণমন্ত্রী আসা ও তাকে আনার বিষয়ে এদেশের সাধারণ জনতা তো কোনো প্রকারেই জড়িত না- এ ব্যাপারে আপনি দায়ী করতে পারতেন- প্রথমত, যে এসেছে তাকে এবং বাঁধা দিতে পারতেন। সেখানে যখন ব্যর্থ হয়েছেন দ্বিতীয় মতে, যেহেতু সরকার তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং তার আতিথেয়তা করেছে, আপনারা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, আন্দোলনে নামতে পারেন। যেহেতু আপনারা নিজস্ব জানজনের ভয় বাড়িতে রেখেই নেমেছেন এবং প্রশাসন ও সরকারকে আপনারা তোয়াক্কা করছেন না- তাহলে আপনারা সরাসরি এর সাথে জড়িতদের সাথেই যুজে দেখুন- প্রধাণমত্রীর কার্যালয়ে যান, রাষ্ট্রপতির বাসভবনে গিয়ে সভাসমাবেশ, আল্টিমেটাম দিয়ে যা যা করার করুন। তা না করে সাধারণ জনতার উপরে চড়াও হয়ে, জানমালের ক্ষতি করে কি লাভ! যে চাচার রিকশা আপনি হরতালের নামে আটকে দিচ্ছেন, দ্যাখা যাবে দিনশেষে কেবল ওই একটা রিকশার আয়ে তার পুরো সংসারের পাঁচ-পাঁচটা পেট চলে, আপনি তাদের রিজিক ছিনিয়ে নিলেন। যে বাসটাতে আপনি বা আপনাদের হাঁক-ডাক-সমর্থনে কোনো যুবক অথবা আপনাদের আন্দোলনের সুযোগে অন্য যে ই হোক, আগুন ধরিয়ে দিলো সেই বাসের কন্ডাক্টরের আগামী একমাস/কয়েকমাস কিভাবে রুটিরুজির যোগান হবে/ আদৌ হবে কিনা ভেবেছেন? কেউ আবার পুলিশ আক্রান্ত হচ্ছে দেখে আহ্লাদে আটখানা, পুলিশের দোষ আছে হয়তো, কিন্তু তারা তো হুকুমের দাস। এক্ষেত্রে ব্যাপারটা ক্যাথ্রেসিস এর মতো লাগছে, একজনের জ্বালা আপনি আরেক অপেক্ষাকৃত কম ক্ষমতাধরের উপর প্রয়োগ করতে দেখে আত্মিক সুখ অনুভব করছেন। মোদি আসা, থাকা বা চলে যাওয়ার সাথে দেশের সাধারণ দিনমজুর কোনো প্রকারেই জড়িত না- অথচ তার আসা যাওয়া নিয়ে আপনি চড়াও হচ্ছেন আপনারই দেশের কোনো ভাইয়ের জীবিকার উপর। মোদি তো বরং এসব দেখে মজাই পাবে ‘কি, ক্যামন দিলাম!’ ধরনের।

এতোক্ষণের কথাগুলো আম জনতা লেবেলের- এবার সরকার ও হেফাজত নিয়ে একান্ত নিজস্ব কিছু অভিমত দিই, এগুলোকে হাইপোথিসিস বলা যেতে পারে। যেহেতু সরকারই বলে দেশে বাক-স্বাধীনতা আছে। এবার বলে কয়ে তার কিছু উপযোগ করি(আগেই বলেছি যেহেতু আমার ধারণা)-

আমার ধারণা,
এক, সরকার অনেক আগে থেকেই হেফাজতের সাথে একাগ্র ভাবে যুক্ত হয়ে আছে নাড়ী-নক্ষত্রগত দিক থেকে- আইমিন রাঘোব বোয়ালদের থ্রু- যেদিন থেকে প্রধাণমন্ত্রী কওমী স্বীকৃতি ও দাবী দাওয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন তখন থেকেই একটা আভ্যন্তরীণ সুয়েজ খাল তৈরি হয়েছে আদান প্রদানের, শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকারী নেতারা হয়তো এই ব্যাপারে জ্ঞাত।
দুই, অথবা সরকার বুঝে শুনে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় হেফাজতকে বাড়তে দিচ্ছে ও বিরুদ্ধ শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ করে দিচ্ছে- যাতে যতোটুক প্রয়োজন ততোটুকু করার ইচ্ছানুযায়ী আবার তাদের হটিয়ে দেয়া যেতে পারে।

এখন বলবেন আমার এই মাথামুন্ডুহীন বক্তব্য অন্তঃসারশূন্য। সরকার কেনো নিজের বিরুদ্ধে শত্রু নিজে যোগান দেবে-
কারন, আমেরিকাতে এখন ডেমোক্রাটরা ক্ষমতায় ওই সময় যখন ভাস্কর্য ইস্যু ইন্টারনেট মিডিয়ার মাধ্যমে সারাবিশ্ব তথা পশ্চিমাবিশ্বেও ছড়িয়েছে। তখন তারা দেখেছে ‘বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, আর এর বিরুদ্ধ পক্ষে যারা আছেন তারা ক্ষমতাসীনরা। সুতরাং যে মতেই হোক তাদের পক্ষালম্বন করাই আমাদের জন্য সদাচার’- এর মাধ্যমে সরকার পেয়ে গেলো বৈদেশিক সমর্থন, যা তাদের জন্যে সবচেয়ে প্রয়োজন ছিলো এই সময়ে। কেননা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ক্ষমতাসীন সরকার যেমনই হোক, ভালো অথবা মন্দ, উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভাসিয়ে দিলেও তাদের বিপক্ষে নির্বাচনে একটা ফ্যাক্টর কাজ করে যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘এন্টি রিকাম্বেন্সি ফ্যাক্টর’ বলে। আমাদের চাহিদা যেহেতু সীমিত ও অভাব অসীম, আর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে দুয়ের ফারাক আরো প্রকট ও নির্লজ্জ। তাই জনগণের মধ্যে অসন্তোষ থেকেই যায়, সেই লা পাওয়া থেকে হয় ক্ষমতাসীনদের প্রতি রোষ আর বিপরীতের যেকোনো দল তা ততোধিক খারাপ হোক তবু তাদের প্রতি একটা স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন চলে আসে। ব্যাপারটা কিছুটা ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ সূত্রের মতোই।

তাই গদীতে আসীন হতে এখন সরকারের সবচেয়ে বেশি দরকার বড়ো বড়ো রাষ্ট্রের গদীওয়ালাদের সমর্থন- আমেরিকা এই ব্যাপারে অবিকল্প। আর যেহেতু বিএনপির লুকিয়ে চুপিয়ে হোয়াটসএপ চেয়ারপারসন এখন ওই দেশেই বাসরত সম্পর্ক ভালো হলে কেননা তাকেও দেশে এনে সাজার আওতাধীন করা যাবে।

যাইহোক ওই সময়কার দাপুটে ভাস্কর্য আন্দোলনকারীরা কই গেলো? আপনারা কি মনে করছেন ভয়ে তারা সেঁটিয়ে গেছে- তাহলে আবার নতুন ইস্যুতে তারা ভয় কাটিয়ে জেগে উঠলো এতো তাড়াতাড়ি তা ও সদর্পে- আপনার মনে কি প্রশ্ন জাগে না দেশের বাঘা বাঘা রাজনৈতিক দলগুলোকে তোয়াক্কা না করা সরকার কেন হেফাজতের মতকে এতোটা গুরুত্ব দিচ্ছে?- কারনটা কি জনসমর্থন? আপনার কি মনে হয় ওই বস্তুটির তোয়াক্কা ক্ষমতাসীনরা করেন! আপনি দেখুন এই কয়েকমাসে সরকারবিরোধী আন্দোলনে কতজন লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা গ্রেফতার ও মামলার স্বীকার হয়েছেন, অনেকে জামিন পাননি, পেয়েছেন আবার জেলহাজতে মারা গেছে এমনও আছে- বিরোধীদলের কথা বাদই দিলাম। এখন কথা হলো আপনি কি শুনেছেন- হেফাজতের অমুক নেতা গ্রেফতার হয়ে জামিনের অভাবে জেল খাটছেন? অথবা অমুক নেতা রিমান্ডে। আপনার কি মনে হয় খালেদা জিয়ার চেয়ে দেশে এখন হেফজতের রফিকুল ইসলাম ওরফে বাচ্চা হুজুরেরও সমর্থনও বেশি? যে ধরার সাথে সাথে তাকে ছেড়ে দিতে হলো?- তাহলে কিছু বলার নেই, আপনি মায়ের পেটে আছেন।

এই আমেরিকার একই উদাহরণ নরেন্দ্র মোদির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য- আপনি মানুন আর নাই মানুন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত একটা ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মতো একটা ক্ষুদ্র উপরন্তু প্রতিবেশী(ভারতের পেটের ভিতর) অবস্থিত একটা রাষ্ট্রে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারতের সমর্থন যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা আপনি নিজে না বুঝলে আমি বুঝাতে অক্ষম। স্বাধীনতা যুদ্ধ সময় থেকেই বাংলাদেশ তৈরির প্রতি চীনের একটা ঋণ মনোভাব ছিলো, সেই মনোভাব সরকারদলীয়দের প্রতি এখনো বহাল আছে কিনা জানি না। তবে এই ভ্রমণের পর ভারত ওরফে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে একটা জোরদার অবস্থান নেবে তা ভাবতে দূরবর্তী চিন্তা করতে হয় না। মোদি এদেশে এসে যখন হুজুরদের এতো বিরুদ্ধাচারন দেখেছেন আর বিপরীতে ক্ষমতাসীনদের আদর আপ্যায়ন, তার পক্ষে বোঝাটা স্বাভাবিক যে বিপক্ষে যারা আছে তারা তার ও তার দলের জন্য খতরনক। বন্ধুর সাথে বন্ধুতা রক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ- এ সফরে তারও লাভ হয়েছে বিস্তর, সেইসব না বলি কারন ওসব আমাদের আলোচ্য না- ইংরেজিতে একটা কথা আছে,’কার্টেসি বিগিনস এট হোম’ ‘বাংলায় আপনি বাঁচলে বাপের নাম’- আমি বলি চৌদ্দপুরুষের নাম।

সুতরাং আবেগের বশে ভাঙচুর করবেন/দুগ্ধপোষ্য শিশুকে লাঠিসোটা হাতে আন্দোলনে পাঠানোর আগে ব্যাপারগুলো নিয়ে অল্পবিস্তর ভাবুন- কেননা আন্দোলন/প্রতিবাদ/বিক্ষোভ রাঘোব বোয়াল নেতাদের মৃত্যুসংবাদ খুবই কম শোনা যায় ইতিহাসে- তবু ইতিহাসে তাদের নামই লিপিবদ্ধ হয়, চুনোপুঁটিরা সংখ্যায় বেশি বলে ইতিহাসের খাতায় তাদের টুকে রাখা কষ্টকর, রাখেও না। এখন আপনি আর্থিক ক্ষতিপূরণ নিয়ে সুখী থাকবেন কিনা সেটা আপনার মানসিক স্ট্যাবিলিটির উপর নির্ভর করে, অবশ্য তা নিয়েও আন্দোলনে নামতে হবে কিনা সন্দেহ, যদিও এর সাথে নিজস্ব ব্যক্তিগত অনুভব-অনুভূতি জড়িয়ে থাকলে সে ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই- আপনার এতোসবের পর ভাবুন আতাঁতেই হোক, আর সদিচ্ছায়- হেফাজত আদতে সরকারের প্রতিবন্ধকতা নাকি হাতিয়ার?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

53 − 49 =