২২৭: আল-ফুলস হামলা-৩: আ’দি বিন হাতেমের ইসলাম গ্রহণ!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর অতর্কিত আক্রমণের খবর জানার পর ভীত হয়ে দাতা হাতেম তাঈ পুত্র আ’দি বিন হাতেম কীভাবে সিরিয়ায় পলায়ন করেছিলেন; তাঁর পলায়নের পর, মুহাম্মদের নির্দেশে আলী ইবনে আবু তালিব ও তাঁর ১৫০জন ‘আনসার’ অনুসারী কীভাবে দাতা হাতেম তাঈ গোত্রের লোকদের উপর অতি প্রত্যুষে অতর্কিত আক্রমণ করেছিলেন; অতঃপর তাঁদের পরাভূত ও বন্দী করার পর তারা তাঁদের ‘কোন্ লোকদের’ অমানুষিক নৃশংসতায় হত্যা করেছিলেন ও কোন্ শর্তে অন্যান্যদের মুক্তি প্রদান করেছিলেন; অতঃপর কী ভাবে তারা তাঁদের ‘আল-ফুলস’ নামের প্রতিমাটি ধ্বংস ও সম্পদ লুণ্ঠন করেছিলেন; অতঃপর সেই লুণ্ঠিত-সম্পদগুলো তারা কীভাবে ভাগ-বাটোয়ারা করেছিলেন ও তাঁদের নারী ও শিশুদের বন্দী করে মদিনায় ধরে নিয়ে এসেছিলেন; অতঃপর বন্দী হাতেম তাই কন্যা-কে (কিংবা ভগ্নী-কে) নবী মুহাম্মদ কী কারণে মুক্তি প্রদান করেছিলেন; ইত্যাদি বিশয়ের আলোচনা গত দু’টি পর্বে করা হয়েছে।

মুহাম্মদের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর হাতেম তাই কন্যা (কিংবা ভগ্নী) সিরিয়ায় আ’দি বিন হাতেমের নিকট গমন করে ও তাঁকে মদিনায় মুহম্মদের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনার পুনরারম্ভ: [1]
(আল-তাবারীর বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ) [2]
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২২৬) পর:

‘আদি বলেছে: আমি যখন আমার লোকদের মধ্যে বসেছিলাম, দেখি যে একটি ডুলি (Howdah) আমাদের দিকে নিয়ে আসা হচ্ছে তখন আমি বলি যে, “এ হলো হাতেম কন্যা”; আর আসলেই সেটি ছিল তাই।

আমার কাছে আসার পর সে আমাকে গালাগালি দেয়, এই বলে, “তুমি পাজি বদমাস, তুমি তোমার পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে এসেছো আর তোমার বাবার কন্যাটিকে করেছ পরিত্যক্ত।” আমি বলি, “হে আমার ছোট বোন, খারাপ কোনকিছু বলো না কারণ আল্লাহর ওয়াস্তে কোন অজুহাতই আমার নেই। তুমি যা বলেছ তা আমি করেছি।”

অতঃপর সে নেমে আসে ও আমার সাথে অবস্থান করে; সে ছিল এক বিচক্ষণ মহিলা। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি যে এই লোকটি [মুহাম্মদ] সম্পর্কে তার ধারণাটি কী ও সে বলে, “আমি মনে করি যে শীঘ্রই তাঁর সাথে তোমার যোগ দেওয়া উচিত, এই কারণে যে লোকটি যদি নবী হয় তবে তাঁর কাছে যারা প্রথমে আসবে, তারা পাবে অগ্রাধিকার; আর যদি সে রাজা হয় তবে তুমি আল-ইয়ামানের গৌরবে লজ্জিত হবে না, কারণ তুমি সে রকমই লোক।”

আমি বলি যে এটি যথাযথ ফয়সালা, তাই আমি আল্লাহর নবীর নিকট গমন করি; তিনি তখন মদিনায় তাঁর মসজিদের ভিতরে ছিলেন। অতঃপর আমি তাঁকে সালাম করি ও তাঁকে আমার নামটি বলি ও তিনি উঠে দাঁড়ান ও আমাকে তাঁর বাড়ীতে নিয়ে যান। আমরা যখন সেখানে যাচ্ছিলাম, এক দুর্বল বৃদ্ধা মহিলা তাঁর সাথে সাক্ষাত করে ও তাঁকে থামতে বলে, আর তিনি দীর্ঘ সময় যাবত থামেন ও সে [মহিলাটি] তার প্রয়োজনের কথা তাঁকে জানায়। আমি নিজেকে বলি, “এ কোনও রাজা নয়।”

অতঃপর তিনি আমাকে তাঁর বাড়ীতে নিয়ে যান ও একটি চামড়ার গদি, যার ভিতরে ঠাসা ছিল খেজুর গাছের পাতা, হাতে নিয়ে আমার দিকে ছুঁড়ে মারেন ও বলেন, “এর উপরে বসো।” আমি বলি, “না, এর উপর আপনি বসুন;” তিনি বলেন, “না, তুমি।”

তাই আমি তার উপরে বাসি ও তিনি বসেন মাটিতে। আমি নিজেকে বলি, “কোন রাজা এরূপ আচরণ কোন করে না।” অতঃপর তিনি বলেন, “এইবার আদি, তুমি কি আধা-খ্রিস্টান নও (আল তাবারী: ‘তুমি কি আধা খ্রিস্টান ও আধা সাবিয়ান (Rakusi) নও?)?”

আমি যখন বলি যে আমি তাই, তিনি বলেন, “তুমি কি তোমার লোকদের কাছ থেকে তাদের মজুদ সম্পদের এক চতুর্থাংশ সংগ্রহ করতে যাও না [পর্ব: ২২৫]?”

আমি যখন তা স্বীকার করি, তিনি বলেন, “কিন্তু এটি তো তোমার ধর্মে তোমার জন্যে অনুমোদিত নয়।” আমি বলি, “এটি সম্পূর্ণ সত্য।” [3] [4]

আর এটি জানার পর আমি নিশ্চিত হই যে তিনি আল্লাহর নবী, এই কারণে যে, লোকেরা সচরাচর এটি জানে না।’

অতঃপর তিনি বলেন: [অনুরূপ বর্ণনা-ইমাম বুখারী: ৪:৫৬:৭৯৩]
“সঙ্গত কারণেই এটি হতে পারে যে, যে দরিদ্রতা তুমি প্রত্যক্ষ করেছো তা তোমাকে এই ধর্মে যোগদান করা থেকে বিরত রেখেছে।

কিন্তু, আল্লাহর কসম, শীঘ্রই তাদের মধ্যে ধনসম্পদ এত প্রচুর পরিমাণে সরবরাহ হবে যে এটি গ্রহণ করার কোন লোক থাকবে না।

সম্ভবত: এটি এই যে, তুমি দেখছো যে তাদের শত্রুদের সংখ্যা কতো ও তাদের সংখ্যা কত কম। তবে, আল্লাহর কসম, তুমি শুনতে পাবে যে কাদিসিয়া থেকে এক মহিলা তার উটের পিঠে চড়ে (আল তাবারী: ‘আল্লাহ ব্যতীত’) কোনরূপ ভয়ভীতি ব্যতিরেকে এই উপাসনালয়টি (আল-তাবারী:’অর্থাৎ কা’বা) দর্শন করতে আসবে।

সম্ভবত এটি এই যে, তুমি দেখতে পাও যে অন্যদের শক্তি ও সার্বভৌমত্ব রয়েছে;

তবে আল্লাহর কসম, তুমি শীঘ্রই শুনতে পাবে যে ব্যাবিলনের সাদা দুর্গ তাদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে (আল-তাবারী: ‘দখল করা হয়েছে’)।”

অতঃপর আমি মুসলমান হই।

আ’দি বলতো যে এর দুটি ঘটনা ঘটেছিল ও তৃতীয়টি সম্পন্ন হওয়া বাঁকি ছিল। আমি ব্যাবিলনের সাদা দুর্গগুলোর বিজয় ও কাদিসিয়া থেকে এক মহিলা তার উটের উপর চড়ে নির্ভয়ে উপাসনালয়টি-তে তীর্থযাত্রার জন্য আসতে দেখেছি। আল্লাহর কসম, তৃতীয়টি কার্যকর হবে: “এত প্রচুর ধনসম্পদ সরবরাহ হবে যে তা গ্রহণ করার কোন লোক থাকবে না।”

আল-তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ খ্রিস্টাব্দ) অতিরিক্ত বর্ণনার পুনরারম্ভ: [6]

আল-তাবারীর অন্য এক বর্ণনায় মহিলাটি ছিল দাতা হাতেম তাঈয়ের ভগ্নী, যাকে মুহাম্মদ মুক্তিদান করেছিলেন; যার আলোচনা গত পর্বে করা হয়েছে। অতঃপর মহিলাটি সিরিয়ায় গমন করেন।

পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২২৬) পর:

(‘মুহাম্মদ বিন মুথাননা <মুহাম্মদ বিন জাফর < শুবাহ < সিমাক হইতে বর্ণিত: 'আমি শুনেছি, আদি বিন হাতেম হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আববাদ বিন হুবায়েশ বর্ণনা করেছে, যে বলেছে [পৃষ্ঠা ৬৩])

আ'দি বিন হাতেম [হইতে বর্ণিত]: ‘সে [ফুপু] আমার কাছে আসে ও বলে, "তুমি এমন কিছু করেছো যা তোমার বাবা হয়তো করতো না। আন্তরিকতা ও ভীতি চিত্তে তাঁর (অর্থাৎ, আল্লাহর নবী) কাছে যাও। অমুক অমুক ব্যক্তি তার নিকট গিয়েছে, আর দেখ, সে যথাযথ আচরণ প্রাপ্ত হয়েছে।" তাই আমি তাঁর নিকট গমন করি ও বিস্মিত হয়ে দেখি যে তাঁর সঙ্গে ছিল একটি মহিলা ও দুটি কিংবা একটি বালক। [7]

(অতঃপর বর্ণনাকারী, [অর্থাৎ আববাদ বিন হুবায়েশ] আল্লাহর নবীর সাথে তাদের নৈকট্যের [সম্পর্কের] কথা বর্ণনা করে।) তাই আমি জানতে পারি যে তিনি না ছিলেন খসরুর (কিসরা) মতো, কিংবা না ছিলেন সিজারের (কেইসার) মতো। [8]

তিনি আমাকে বলেন, "হে আ'দি বিন হাতেম, "কী তোমাকে 'আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নাই' বলা থেকে পালাতে বাধ্য করেছে? আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ কি আছে? কী তোমাকে 'আল্লাহ সবচেয়ে মহান' বলা থেকে পালাতে বাধ্য করেছ? আল্লাহর চেয়ে বড় আর কি কেউ আছে?"

তাই আমি ইসলাম গ্রহণ করি ও তাঁর মুখমণ্ডলে দেখতে পাই যে তিনি আনন্দিত।'

সহি বুখারি: ভলুম ৪, বই নম্বর ৫৬, হাদিস নম্বর ৭৯৩:[9]

‘আদি বিন হাতেম হইতে বর্ণিত: আমি যখন নবীজীর শহরে ছিলাম তখন একজন লোক এসে তাঁর (নবী) নিকট দীনতা ও দারিদ্র্যতার অভিযোগ করে। অতঃপর আর একজন এসে ডাকাতির (পথিমধ্যে দস্যুতা) অভিযোগ করে।

আল্লাহর নবী বলেন, “আ’দি! তুমি কি আল-হিরাই (Al-Hira) ছিলে?”
আমি বলি, “আমি তথায় ছিলাম না, তবে এ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “তুমি যদি দীর্ঘকাল জীবিত থাকো তবে তুমি অবশ্যই দেখতে পাবে হাওদার ভিতরে থাকা এক মহিলা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও ভয়ে ভীত না হয়ে আল-হিরা থেকে যাত্রা করে (নিরাপদে মক্কায় পৌঁছে) কা’বা তাওয়াফ করবে।” আমি নিজেকে বলি, “তাঈ গোত্রের ডাকাতদের কী হবে যারা দেশের সর্বত্র অমঙ্গল ছড়িয়ে দিয়েছে?”

আল্লাহর নবী আরও বলেন, “তুমি যদি দীর্ঘকাল জীবিত থাকো, [দেখবে যে] খসরুর ধন-দৌলত দখল করা হবে (ও লুঠের মাল হিসাবে তা হস্তগত করা হবে)।”

আমি জিজ্ঞাসা করি, “আপনি কি হরমুজ পুত্র খসরু-কে বোঝাতে চাচ্ছেন?”

তিনি বলেন: “খসরু, হরমুজ পুত্র [পর্ব: ১৬৩-১৬৪]। আর তুমি যদি দীর্ঘকাল জীবিত থাকো, দেখতে পাবে যে লোকেরা এক মুঠো স্বর্ণ বা রৌপ্য বহন করবে ও বাহিরে বের হয়ে তা তার কাছ থেকে গ্রহণ করার জন্য লোকদের খোঁজ করবে, কিন্তু তার কাছ থেকে তা গ্রহণ করার মতো কোন লোক তারা খুঁজে পাবে না।

আর তোমাদের মধ্যে কেউ যখন আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে, তখন তার ও আল্লাহর মাঝে কোন অনুবাদকারীর/ব্যাখ্যাকারীর (interpreter) প্রয়োজন ছাড়ায় সে তার সঙ্গে সাক্ষাত করবে; আর আল্লাহ তাকে বলবে: ‘আমি কি তোমাকে শিক্ষা দানের নিমিত্তে কোনও বার্তাবাহক প্রেরণ করি নাই?’ সে বলবে: ‘হ্যাঁ’। আল্লাহ বলবে: ‘আমি কি তোমাদেরকে ধন-সম্পদ দান ও অনুগ্রহ প্রদান করি নাই?’ সে বলবে: ‘হ্যাঁ’। অতঃপর সে তার ডানদিকে তাকাবে ও জাহান্নাম ব্যতীত কিছুই দেখতে পাবে না; এবং তার বাম দিকে তাকাবে ও জাহান্নাম ব্যতীত কিছুই দেখতে পাবে না।”

আ’দি আরও বলেছে: আমি আল্লাহর নবীকে বলতে শুনেছি, “অর্ধেক খেজুরের (দান হিসাবে দেওয়া) বিনিময়ে হলেও নিজেকে জাহান্নাম (আগুন) থেকে রক্ষা করবে, আর যদি অর্ধেক খেজুরও খুঁজে না পাওয়া যায়, তবে সুন্দর মনোরম বাক্যের মাধ্যমে।”

আ’দি (পরবর্তীতে) আরও যোগ করেছে: আমি দেখেছি যে হাওদার ভিতরে থাকা এক মহিলা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও ভয়ে ভীত না হয়ে, আল-হীরা থেকে যাত্রা করে কা’বা তাওয়াফ না করা পর্যন্ত ভ্রমণ করেছে। আর আমি ঐ লোকদের মধ্যে একজন যারা হরমুজ পুত্র খসরুর ধন-দৌলতগুলো উন্মুক্ত (দখল) করেছিল। তুমি যদি দীর্ঘকাল জীবিত থাকো, নবী আবুল কাসেম যা বলেছে তা তুমি দেখতে পাবে: এক ব্যক্তি এক মুঠো সোনা নিয়ে বেরিয়ে আসবে, ইত্যাদি।’

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-তাবারী ও ইমাম বুখারীর ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো, দাতা হাতেম তাঈ পুত্র মদিনায় মুহাম্মদের কাছে এসে মূলতঃ দু’টি কারণে ইসলামে দিক্ষীত হয়েছিলেন:

{১) ‘লোকদের কাছ থেকে তাদের মজুদ সম্পদের (কিংবা লুন্ঠিত সম্পদের) এক চতুর্থাংশ সংগ্রহ করা যে আ’দি বিন হাতেমের জন্য তার ধর্মে অনুমোদিত নয়, তা মুহাম্মদের কাছ থেকে জানার পর আ’দি “নিশ্চিত হয়েছিলেন” যে “তিনিই” আল্লাহর নবী, এই কারণে যে লোকেরা সচরাচর এটি জানে না।’ যুক্তির বিচারে এই কারণ-টি একেবারেই হাস্যকর!

{২) “ক্ষমতা ও সম্পদের প্রলোভন!” যুক্তির বিচারে এই কারণ-টি “সম্ভাব্য”, এই কারণে যে “ক্ষমতা ও সম্পদের লোভ” অধিকাংশ মানুষেরই সহজাত।

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসে গত দু’টি পর্ব (পর্ব: ২২৫-২২৬) ও ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো, দাতা হাতেম তাঈ পুত্র ইসলাম গ্রহন করেছিলেন তাঁর গোত্রের ওপর মুহাম্মদের অতর্কিত আগ্রাসী হামলা, খুন-জখম, সম্পদ-লুন্ঠন ও তাঁর গোত্র ও পরিবারের “নারী ও শিশুদের” বন্দী করে মদিনায় ধরে নিয়ে আসার পর। গত পর্বের আলোচনায় আমরা জেনেছি,

“তাঁর অনুসারীরা হাতেম তাঈ গোত্রের যে সমস্ত বন্দী প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষরা ‘মুহাম্মদ-কে নবী হিসাবে স্বীকার করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছিলেন’, তাঁদের সবাই-কে তারা হত্যা করেছিলেন।”

সুতরাং যৌক্তিক ভাবেই ধারণা করা যায় যে, তাঁরা অনুসারীরা তাঈ গোত্রের যে লোকদের-কে বন্দী করে মদিনায় ধরে নিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা ছিলেন ঐ নিহত পুরুষদের পরিবারের “নারী ও শিশুরা!”

এদের মধ্য থেকে মুহাম্মদ মুক্তিদান করেছিলেন, হাতেম তাঈ কন্যা (কিংবা ভগ্নী-কে)। মুক্তিদানের পূর্বে এই মহিলা-টি ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলেন কিনা, তা এই বর্ণনায় অনুপস্থিত। তবে তিনি যে সিরিয়ায় গিয়ে আ’দি বিন হাতেম-কে ইসলাম গ্রহনে প্ররোচিত করেছিলেন তা ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় অত্যন্ত সুস্পষ্ট; সুতরাং, প্রতীয়মান হয় যে মহিলাটি মুক্তি-প্রাপ্ত হয়েছিলেন তাঁর ‘ইসলাম গ্রহণের’ বিনিময়ে। এমনই এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আ’দি বিন হাতেম মদিনায় মুহাম্মদের কাছে আসে।

সুতরাং, নিশ্চিত রূপেই আ’দি বিন হাতেমের ইসলাম গ্রহণের প্রকৃত কারণ হলো, “তাঁর ও তাঁর পরিবার ও গোত্রের লোকদের নিরাপত্তা!” মুহাম্মদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়।

>> আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (ও আল-তাবারীর) বর্ণনায় আমরা আরও জানতে পারি যে এই সময়টি-তে তাঈ গোত্রের এক প্রতিনিধি দল মদিনায় মুহাম্মদের কাছে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, যার নেতৃত্বে ছিল যায়েদুল-খায়েল (ZAYDU’L-KHAYL) নামের এক লোক।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (ও আল-তাবারীর) বর্ণনা (কবিতা পঙক্তি পরিহার): [10]
যায়েদুল-খায়েল এর নেতৃত্বে তাঈ গোত্রের প্রতিনিধি দলের আগমন: [11]

‘যায়েদুল- খায়েলের নেতৃত্বে তাঈ গোত্রের এক প্রতিনিধি দল আল্লাহর নবীর কাছে আসে; কিছু কথোপকথনের পরে তিনি তাদেরকে ইসলামের ব্যাখ্যা প্রদান করেন; অতঃপর তারা ভাল মুসলমানে পরিণত হয়েছিল।

তাঈ গোত্রের এক ব্যক্তি, যাকে আমার সন্দেহ করার কোন কারণ নেই, আমাকে বলেছে যে আল্লাহর নবী বলেছেন, “আমি এমন কোন আরব লোকের সাক্ষাত পাই নাই যে তার সম্বন্ধে যে সর্বোত্কৃষ্ট বাক্যগুলো উল্লেখ করা হয়েছে সে তার চেয়ে কম ছিল না; ব্যতিক্রম যায়েদুল-খায়েল [আল মুহালহিল], যার সম্পর্কে যা বলা হয়েছে সে ছিল তার চেয়েও ভালো।”

অতঃপর আল্লাহর নবী তার নামটি যায়েদুল-খায়ের রাখেন ও তাকে ফায়েদ [একটি স্থান] ও সাথে কিছু জমি ও বরাদ্দ দেন; ও তদনুসারে তিনি তাকে প্রদান করেন একটি দলিল।

যায়েদ যখন তার গোত্রের লোকদের কাছে প্রত্যাবর্তন করে, তখন নবী বলেন যে তিনি আশা করছেন যে মদিনা জ্বর (Medina fever) থেকে সে পরিত্রাণ পাবে। আল্লাহর নবী এটিকে হুমমা কিংবা উম্ম মালদাম (Humma or Umm Maldam) নামে অবিহিত করেন নাই (আল তাবারী; ‘জ্বর কিংবা মিলদাম নামে অবিহিত করেন নাই’); আমার তথ্য-দাতা এটি বলতে পারে নাই যে তিনি এটিকে কী বলেছিলেন। সে যখন নাজাদের ফারদা (Farda) নামের এক জল-সেচন স্থানে এসে পৌঁছে, সে জ্বরের কবলে পড়ে ও তার মৃত্যু হয়। —- [12]

তার মৃত্যুর পর দলিলটি, যা আল্লাহর নবী তাকে দিয়েছিলেন, তার স্ত্রীর হস্তগত হয় ও সে তা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে।’ [13]

– অনুবাদ – লেখক।

>>> তাঈ গোত্রের এই প্রতিনিধি দলের মদিনায় আগমনের ঘটনা-টি সংঘটিত হয়েছিল, “তাঁদের উপর” আলী ইবনে আবু তালিব ও তার বাহিনীর অমানুষিক নৃশংস আক্রমণটি সংঘটিত হওয়ার পর। কিন্তু তা আ’দি বিন হাতেমের ইসলাম গ্রহণের পূর্বে, নাকি তার পরে; তা এই বর্ণনায় অনুপস্থিত। তাঁদের এই ইসলাম গ্রহণেরও প্রকৃত কারণ হলো, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীদের ‘আগ্রাসী আক্রমণের’ কবল থেকে পরিত্রাণের প্রচেষ্টা।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে ইবনে ইশাকের মূল ইংরেজি অনুবাদটি সংযুক্ত করছি; ইবনে ইশাক, আল তাবারী ও ইমাম বুখারীর রেফারেন্স: বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক যথাক্রমে তথ্যসূত্র এক, দুই ও নয়:]

The narratives of Ibn Ishaq: [1]

`Adiy said: `I was sitting among my people when I saw a howdah making for us and I said “It is Hatim’s daughter” and so it was, and when she got to me she reviled me, saying, `You evil rascal, you carried away your family and children and abondoned your father’s daughter.’ I said, “Do not say anything that is bad, little sister, for by God I have no excuse. I did do what you say.” Then she alighted and stayed with me; and as she was a discreet woman I asked her what she thought of this man and she said, “I think that you should join him quickly, for if the man is a prophet then those who get to him first will be preferred; and if he is a king you will not be shamed in the glory of al-Yaman, you being the man you are.” I said that this was a sound judgement so I went to the apostle when he was in his mosque in Medina and saluted him and told him my name and he got up to take me to his house. As we were making for it there met him an old feeble woman who asked him to stop and he stopped for a long time while she told him of her needs. I said to myself “This is no king.” Then he took me into his house and took hold of a leather cushion stuffed with palm leaves and threw it to me saying, “Sit on that.” I said, “No you sit on it,” and he said “No You!” So I sat on it and he sat on the ground. I said to myself, “This is not the way a king behaves.” Then he said, “Now Adiy, are you not half a Christian?” When I said that I was he said, “Don’t you go among your people collecting a quarter of their stock?” When I admitted that he said: “But that is not permitted to you in your religion.” “Quite true,” I said, and I knew that he was a prophet sent by God knowing what is not generally known. Then he said, “It may well be that the poverty you see prevents you from joining this religion but, by God, wealth will soon flow so copiously among them that there will not be the people to take it. But perhaps it is that you see how many are their enemies and how few they are? But, by God, you will hear of a woman coming on her camel from Qadisiya to visit this temple unafraid. But perhaps it is that you see that others have the power and sovereignty, but by God will soon hear that the white castles of Babylon have been opened to them.” Then I became a Muslim.’

`Adiy used to say that the two things happened and the third remained to be fulfilled. I saw the white castles of Babylon laid open and I saw women coming from Qadisiya on camels unafraid to make the pilgrimage to this temple; and, by God, the third will come to pass: wealth will flow until there will not be the people to take it.’

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬৩৮-৬৩৯
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৯-৯২৩ সাল); ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ৬৬-৬৭
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[3] Ibid আল-তাবারী, নোট নম্বর ৪৫৫: “এই শব্দটি (rakusi) এমন যা ঐ ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যে এমন এক ধর্মে বিশ্বাস কে যা খ্রিস্টান ও সাবায়িনদের (আল-সাবিয়াহ [al-sabi’ah]) মিশ্রণ।”

[4] Ibid আল-তাবারী: নোট নম্বর ৪৫৬:
“আরব ডিকশনারীবিদদের মতে, প্রাক-ইসলামিক যুগের অনুশীলনটি ছিল এই যে, লুটের মালের এক চতুর্থাংশ হিস্যা কমান্ডার-ইন-চিফ হিসাবে দলনেতার জন্য বরাদ্দ থাকতো। এটি দক্ষিণ আরবীয় অঞ্চলেও অনুশীলন করা হতো। ইসলামে, লুটের মালের বিলিবন্টনের আগে প্রথমেই এক-পঞ্চমাংশ হিস্যা আল্লাহর জন্য আলাদা করে রাখা হতো।”

[5] Ibid আল-তাবারী: নোট নম্বর ৪৫৭: আল-কাদিসিয়া – “এই জায়গাটি আল-হিরাহর (al-Hirah) দক্ষিণ-পশ্চিমে ও পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত আল-কুফা নামক স্থানটির দক্ষিণ-দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। এই স্থানটি ৬৩৫ সাল থেকে ৬৩৭ সাল (হিজরি ১৪ সাল থেকে হিজরি ১৬ সাল) পর্যন্ত সাসানিদদের [পারস্য] বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধ-বিজয়ের স্থান হিসাবে বিখ্যাত।”

[6] Ibid আল-তাবারী; পৃষ্ঠা ৬৪
[7] Ibid আল-তাবারী: নোট নম্বর ৪৪৫: “উল্লেখিত ব্যক্তিরা ছিল নবী কন্যা ফাতিমা ও তার দুই পুত্র হাসান ও হুসেইন।”
[8] পারস্য সম্রাট খসরু (কিসরা), বিশেষভাবে সাসানিদ সম্রাট; ও রোমান বাইজেনটাইন সম্রাট সিজার (কেইসার) এর আরবিয় নাম।

[9] সহি বুখারি: ভলুম ৪, বই নম্বর ৫৬, হাদিস নম্বর ৭৯৩
https://quranx.com/hadith/Bukhari/USC-MSA/Volume-4/Book-56/Hadith-793/

[10] Ibid মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬৩৭
[11] অনুরূপ বর্ণনা: Ibid আল-তাবারী; পৃষ্ঠা ১০৫-১০৬
[12] Ibid আল-তাবারী, নোট নম্বর ৭১৫: ‘মালদাম: এক ধরনের জ্বর’।
[13] Ibid আল-তাবারী, নোট নম্বর ৭১৬: ‘নাজাদ: আরবের উচ্চভূমিগুলি, যার অবস্থান উপকূলীয় সমভূমির উপরে। যার উপরের অংশটি তিহামা ও ইয়েমেন এবং নীচের অংশটি সিরিয়া ও ইরাক দ্বারা গঠিত।’

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

95 − = 88