শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন প্রয়োজন

ছাত্র রাজনীতি আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। দেশের জন্মলগ্ন থেকেই ছাত্র রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে, ৬৯ সালের গণঅভূত্তানে, ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে এবং ৯০ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছাত্র সমাজের ভূমিকা ছিল খুবই প্রশংসনীয়। ষাট, সত্তর ও নব্বইয়ের দিকে আমাদের ছাত্র রাজনীতি ছিল মানুষের কল্যাণে, জনস্বার্থ রক্ষায়, সহপাঠিদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু আজ দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে বর্তমান ছাত্র রাজনীতির করুণ ইতিহাস। বর্তমানে ছাত্র রাজনীতি ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয়েছে!

ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছাত্ররা আজ মেধার প্রতিদ্বন্ধিতা করার পরিবর্তে নিজ দলের আধিপত্ত বিস্তার, হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন ধরণের অপরাদমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছে। মেধাশক্তির পরিবর্তে বর্তমানে ছাত্র রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েলেরর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে দেশি বিদেশি অস্ত্রশস্ত্র। ছাত্র রাজনীতির নীতি ও আদর্শ থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজের দলের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে ভোট কেন্দ্র দখল করতেও দেখা গেছে। এক কথায়, ৫২, ৬৯, ৭১ ও ৯০’র দশকে ছাত্র রাজনীতি আমাদেরকে যা দিয়েছে, বর্তমানে তার থেকে কয়েক শতগুন বেশি কেড়ে নিয়েছে এবং নিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা:
মাদক সেবীকে রক্ষা ও প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) বিভিন্ন স্থানে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, অর্ধশতাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা।

মঙ্গলবার (২৭ মার্চ) রাত ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর ক্যাম্পাসের সর্বত্রই আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মহান স্বাধীনতা দিবসের খাবার না পাওয়ায় মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন শাহ হলের প্রভোস্ট অফিসে থাকা রেজিস্ট্রার খাতা, ওয়াইফাইয়ের রাউটারসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে যায় ছাত্রলীগের সভাপতি শাহিনুর রহমান শাহিন গ্রুপের নেতাকর্মীরা।

ওই ঘটনার পর সন্ধ্যা ৬টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালেয়ের লালন শাহ হলে অভিযান চালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি। এসময় হলের দক্ষিন ব্লক থেকে ১০ বোতল ফেনসিডিল ও কয়েকটি চাপাতিসহ ছাত্রলীগের সভাপতি গ্রুপের কর্মী আকাশ, বহিরাগত দানিয়েলকে আটক করে প্রক্টরিয়াল বডি। এসময় সেখান থেকে রফিকুল নামের আরেক বহিরাগত পালিয়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি গ্রুপের কর্মীরা আটককৃতদের এবং চাপাতি ও ফেনসিডিল কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে।

পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির কাছ থেকে ছাত্রলীগের নেতা কর্মীরা আকাশকে ছিনিয়ে নিয়ে আসে। এরপর আটককৃত বহিরাগত দানিয়েলকে ইবি থানায় সোপর্দ করা হয়।

এই ঘটনার জের ধরে সন্ধ্যা সাতটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদ্দাম হোসেন হল এবং লালন শাহ হলের সামনে অবস্থান নিতে থাকে ছাত্রলীগের সভাপতি গ্রুপের নেতা কর্মীরা। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে দুই হলের নেতা কর্মীরা একত্রিত হয়ে প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমানের পদত্যাগের দাবিতে মিছিল করে। এসময় তারা ‘প্রক্টরের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে,’ ‘প্রক্টরের চামড়া তুলে নিব আমরা’, ‘প্রক্টরের কালো হাত ভেঙ্গে দাও গুড়িয়ে দাও’ সহ বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকে।

এরপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঠা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা ভাংচুর করতে করতে প্রশাসন ভবনের দিকে যায়। পরে মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিসি ও মেইন গেট এলাকায় গিয়ে টিএসসিসি’র সিসিক্যামেরা ও জানালার গ্লাস, মেইন গেটে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নান্দনিক জলের ফেয়ারাসহ বিভিন্ন ফ্রেম ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এরপর তারা মেইন গেটের কাছে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব’ এ ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে।

এসময় তারা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশতাধিক কক্টেলের বিস্ফোরণ ঘটায়। এই ঘটনার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বত্রই এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ছাত্রী নিপীড়নে জড়িত ছাত্রলীগ কর্মীদের বহিষ্কারের দাবি পূরণ না হওয়ায় গত ২৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, প্রক্টর কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচির সময় ভাঙচুরের অভিযোগে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেওয়ার দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানকে। পরে সেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই তাকে উদ্ধার করেছে আন্দোলনকারী সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের পিটিয়ে।
সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী ও মিডিয়া কর্মীদের পিটানোর পরও গত ২৪ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদে, নির্লজ্জের মত মিছিল, মানববন্ধন আর অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ছাত্রলীগ। ২৪ জানুয়ারী বুধবার উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেছিলেন “যদি আমার বাবাকে রক্ষা করতে গিয়ে, আমার শিক্ষককে রক্ষা করতে গিয়ে আমাকে জেলে যেতে হয়, মৃত্যুবরণ করতে হয় আমি তাতেও রাজি আছি।” ছাত্রলীগ সভাপতি আবিদ আল হাসান আরো বলেছিলেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পতি ভাংচুর করবে, আর আমরা বসে বসে তা দেখবো, তা হতেই পারেনা। তিনি বলেছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পতি এভাবে নষ্ট করতে দেয়া যায় না। তাই ২৩ জানুয়ারি আমরা আন্দোলনকারীদের হাত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ রক্ষা করেছি। অথচ গত ২৭ মার্চ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ভাংচুর করল, অগ্নিসংযোগ করল, অর্ধশতাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরালে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করল! তখন আবিদ আল হাসান কোথায় ছিলেন? অন্য কেউ এসব করলেই যত দোষ! কিন্তু ছাত্রলীগে করলে কোন দোষ নেই কেন?

রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য ছাত্রদের হাতে তুলে দিচ্ছে অস্ত্র। ফলে তারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ঠিকাদারি,দখলদারিতে জড়িয়ে পড়ছে। যারফলে ছাত্র সংগঠনগুলো সামান্য কারণেই প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির অপশিকার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে অনেকে মেধাবী শিক্ষার্থী। গত ৩১ মার্চ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ”ঢাবি ক্যাম্পাসে আহত ছাত্রের মৃত্যু” শিরোনামে দেখেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সান্ধ্যকালীন এমবিএ’র ছাত্র তানভীরকে কলাভবনের পেছনে গুরুতর আহত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

তাই দেশকে বাঁচাতে হলে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বাঁচাতে হলে, দেশের শিক্ষাঙ্গনকে রণক্ষেত্রের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের স্বার্থের পরিবর্তে দেশের স্বার্থের কথা ভাবতে হবে, নিজেদের কল্যাণের পরিবর্তে জনগণের কল্যাণের কথা ভাবতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্রসংগঠনকে তাদের দলের হাতিয়ার ও শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন গড়ে তুলতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, প্রতিযোগিতা আর প্রতিহিংসা এক জিনিস নয়। শিক্ষার মূল লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিক্ষাঙ্গনের সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ছাড়া শান্ত ও সুন্দর শিক্ষাঙ্গন আশা করা যায় না। তাই ততদিন পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত থাকবে; যা দেশ ও জাতিকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যাবে এবং দেশের জন্য যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করার পথকে বাধাগ্রস্ত করবে। তাই শিক্ষাঙ্গনে সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে সব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এগিয়ে আসার অনুরোধ ব্যক্ত করছি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 73 = 82