একটি মার্জারের কাহিনী

ছোট্ট একটি মার্জার গুটি গুটি পায়ে এসেছিল আমার বাড়ির উঠোনে, চেয়ে দেখি মায়ের স্নেহ ছায়ায় বেশ হৃষ্টপুষ্ট চেহারা হয়েছে! মায়ের সঙ্গে আগত এই নতুন অতিথিকে বেশ ভালোই লাগল, তাঁর ছোট ছোট ডাক আর ভীতু ভীতু অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ সত্যি বলতে কি মন ছুঁয়ে যায় ও ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়! ছোট বলে তাঁকে একটু বেশিই স্নেহ করে খাবার দিতাম আর সে ভয়ে পালিয়ে যেত ও পরে আবার এসে খেত, এভাবেই ধীরে ধীরে আমাদের পরিবারের এক সদস্যে পরিণত হয়!

একবার খাবারে মুখ দিয়ে মাছ চুরি করে খেয়েছিল যাঁর জন্য মা ওকে বকে ছিল এবং এক ঘা মেরে ও ছিল! এইগুলি করতে আমি মা কে বারণ করি যাইহোক ও কিন্তু এরপর বেশকিছু দিন আর বাড়ির দিকে আসেনি। আসলে পশুপাখির অনুভূতি কত তীব্র তা এথেকেই বোঝা যায়! যথারীতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওর মা কোথায় চলে গেল, জানা যায়নি। ছোট্ট মার্জার শাবকটি ও পূর্ণ বয়স্কতে পরিণত হল! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাঁর দাপটে ইঁদুরের উৎপাত অনেকটাই কমে আসে, মাঝে মাঝে কিছু ইঁদুরের দেহাবশেষ ও দেখতে পাওয়া যায়! আসলে এগুলি আমাদের ছোট্ট ‘বাচ্চুর’ বড় শিকারী হয়ে ওঠার নিদর্শন মাত্র!

যাইহোক, এভাবেই দিন কেটে যায় একদিন মা আবিষ্কার করল আমাদের ‘বাচ্চু’ আর ছোট নেই সে এখন রীতিমত সন্তান সম্ভবা হয়েছে! তাই এইসময় আমরা ওর বিশেষ খেয়াল রাখতাম। বেশ কিছু দিন পর আমরা খেয়াল করলাম ও আর বিশেষ নিচে আসে না বরং চিলেকোঠার ঘরেই থাকে, একদিন মা আবিষ্কার করল ওর তিনটে সন্তান হয়েছে! যথারীতি আমরাও সেগুলি দেখি, ছোট্ট ফুটফুটে সন্তানগুলি দেখে মন ভরে যায়! আমরা যখনই দেখতে পাই ও ওর সন্তানদের লুকিয়ে রাখে! এভাবে বেশকিছু দিন অতিবাহিত হওয়ার পর দেখি ওর ছোট্ট বাচ্চাগুলি বেশ বড়ো হয়েছে আওয়াজ শুনলেই লুকিয়ে পড়ে, বেশ চলতে শিখেছে দেখে মন ভরে যায়! এভাবে সময় কাটে আমরাও যথারীতি আনন্দে থাকি এর কিছুদিন পর ছাদে দেখি এক গোসাপের আবির্ভাব এবং এরপর থেকে শাবকগুলিকে আর দেখা যায়নি, বুঝলাম ছোট্ট শাবকগুলির অন্তর্ধান রহস্যের জন্য হয়তো ইনিই দায়ী!

কিছুদিন এদিক ওদিক খোঁজাখুঁজির পর আমাদের ‘বাচ্চু’ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। পরবর্তীতে সে আবার সন্তান সম্ভবা হয়ে ওঠে। এবার কিন্তু সে আর আগের ভুল করেনি এবার সে নীচের ঘরেই সন্তান প্রসব করে। বোনের ঘরে সন্তান প্রসব হওয়ায় ওর একটু সমস্যা হচ্ছিল, তাই বাজার থেকে একটা বিস্কুটের পিচবোর্ডের বাক্স কিনে আমাদের সিঁড়ি ঘরের তলায় রাখা হয়। সেখানেই দুটি সন্তান নিয়ে ‘বাচ্চু’ আবার নতুন জীবন শুরু করে। প্রায় প্রতিদিন ও শাবকদের দুধ খাওয়ায় আর তাঁরা চোখ বন্ধ করে ঘুমায়। এভাবেই দিন কাটছিল, এ দৃশ্য দেখতে বেশ ভালো লাগছিল। শাবকগুলি বেশ কিছুটা বড় হয়ে উঠেছিল তবুও তাঁদের চোখ ফোটেনি, তাঁরা সারাদিন দুগ্ধপান করে ও ঘুমায়। আমরাও যথারীতি তাঁদের উপর নজর রাখি। রাত্রিবেলা আলো জ্বালিয়ে দেখি সব ঠিক আছে কিনা? মা ও তাঁর সন্তানদের সুখী সংসার দেখলে মন আনন্দে ভরে যায়!

এরই মধ্যে এক বিপদ এসে হাজির হল, কোথা থেকে অন্য এক বেড়াল এসে হাজির হয় সে প্রায় লুকিয়ে লুকিয়ে বাচ্চাগুলিকে দেখত। আমরা ভাবতাম হয়তো ও ভালোবেসে বাচ্চাগুলিকে দেখছে তবুও আমরা যখনই দেখি তাঁকে তাড়িয়ে দিতাম। মা বেড়াল যখনই দেখে সে রনংদোহি লড়াইয়ের মাধ্যমে তাকে ভাগিয়ে দিত!

এভাবেই চলছিল বেশ কিন্তু একদিন দুপুরে যখন বাড়ির সকলে ঘুমাচ্ছিল ও মা বেড়ালটি কাছেপিঠে ছিল না, সেই সুযোগে ওই হুলো বেড়ালটি এসে তাঁর কাজ করে দেয়! বাচ্চা শাবক দুটির মাথা চিবিয়ে দেয় এবং গলগল করে রক্ত পড়তে থাকে। এমতাবস্থায় আমি এসে পড়ায় চলে যায়, সে কি বিভৎস দৃশ্য! না দেখলে বোঝানো যাবে না! একদিকে ছোট ছোট বাচ্চা শাবক পড়ে রয়েছে এবং মা এসে তাঁদের মাথার রক্ত চেটে চেটে পরিস্কার করছে, যেন বলতে চাইছে, ‘বাছা সব ঠিক হয়ে যাবে তোমরা উঠে পড়!’ অন্যদিকে বাচ্চাগুলি না ওঠার জন্য বারবার আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে যেন বলতে চাইছে এরা কেন উঠছে না? এরা কেন কথা বলছে না? তুমি একটু দেখ! তুমি একটু সাহায্য কর!

বস্তুত এমন মর্মভেদী চোখের ভাষা খুব একটা দেখা যায় না, সত্যি বলতে কি তাঁর না বলা কথাগুলি, হৃদয়ে যেন তীরের মতো বিঁধতে লাগল! নিজেকে বড় অসহায় মনে হতে লাগল, অথচ  তখন আমার সত্যিই কিছুই করার ছিল না! বস্তুত তখন আমার কাছে একটা কথা খুব পরিস্কার মায়ের মমত্ববোধে একজন মানবী ও বেড়াল মায়ের কোন তফাত নেই! একজন মানব সন্তান হারালে তাঁর মায়ের যে বুক ফাটা আর্তনাদ দেখতে পাই, বেড়ালের ক্ষেত্রে ও তাঁর ব্যতিক্রম নেই! সমস্ত পশু, পাখি, প্রাণীর মমত্ববোধ যেন এক সূত্রে গাঁথা!

বস্তুত এভাবে তাঁর সন্তান পড়ে থাকার পর বাবা অনেক পরে মৃত শাবক গুলিকে বাইরে ফেলে দেয়। বস্তুত আমার মায়ের ও চোখে জল এসে যায় এবং আমাদের পরিবারের সকলে এই সন্তান হারানোর ব্যথা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারি! এরপর শুরু হয় মা বেড়ালের কি মর্মভেদী আর্দনাত! বেড়াল বাড়ির সর্বত্র তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ায় আর ‘মিয়াও, মিয়াও’ করে নিজের সন্তানদের ডাকতে থাকে! সন্তান হারা মায়ের যে বুক ফাটা আর্দনাত তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা নেই, মা রনে, বনে, জঞ্জলে সর্বত্র তাঁর সন্তানদের খুজতে থাকে ও ডাকতে থাকে কিন্তু হায়! তাঁর সন্তানরা তখন চলে গেছে না ফেরার দেশে! কিন্তু অভাগা! সে কি একথা বুঝতে পারছে? না, বুঝে ও বুঝতে চাইছে না? নাকি নিজের মৃত শাবকদের দেহগুলিকেই বুকে আগলে ধরে রাখতে চাইছে?

সৃষ্টির কি অদ্ভুত নিয়ম হায়! সৃষ্টিকর্তা যদি থেকে থাকে তাঁর কাছে প্রশ্ন এত নিষ্ঠুর, এত নির্দয়  জগতের নিয়ম কেন বানালে? যেখানে এক শ্রেণী বেঁচে থাকার জন্য অপরকে হত্যা করে? কেন এক প্রজাতির প্রাণী নিজের প্রজাতির কোল খালি করে?

বস্তুত এই বিষয়গুলিকে ছোট ঘটনা মনে হলে ও, মানুষের এই ছোট ছোট প্রাণীদের কাছ থেকে অনেক কিছুই শেখার রয়েছে! আজ সমাজে অনেক পরিবারকেই দেখি যাঁরা তাঁদের সন্তানকে ভালোবাসে না, তাঁদের ঠিক মতো খেতে দেয় না, তাঁদের সন্তানদের সময় দেয় না! অথচ পশুরা কিন্তু নিজের জীবনের শেষ বিন্দু দিয়ে হলেও নিজের সন্তানদের রক্ষা করতে চেষ্টা করে! তাই পশুর কাছ থেকে কি মানুষের অনেক কিছু শেখার নেই? আজ মানব সভ্যতার বিকাশ যেভাবে ঘটছে সেখানে কি মানুষের আজ ভেবে দেখার সময় আসেনি যে পৃথিবী শুধু মানবের একার বাসস্থান নয়? পৃথিবীতে সমস্ত পশু, পাখি এবং জীব জগৎ সকলেরই সমান অধিকার রয়েছে? এটা আমরা আর কবে বুঝব? কবে বুঝব শুধু নিজের জন্য নয় সমগ্রের জন্য বাঁচো, নিজে বাঁচো ও অপরকে বাঁচার সুযোগ করে দাও?

মানুষ বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে তবে পশু, পাখিরা বিশ্বাসঘাতকতা করে না, একটু ভালোবাসা পেলে তাঁরা ও দ্বিগুণ ভালোবাসা ফিরিয়ে দেয়, এটাই মানুষ ও পশু, পাখির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য! একটু ভালোবাসা ও যত্ন পেলে তাঁরা ও আমাদের বন্ধু হতে পারে! তাঁরা ও ভালোভাবে জীবন নির্বাহ করতে পারে!

যাক পরিশেষে একথা বলা যায়, মানুষ সবচেয়ে উন্নত প্রাণী তাই প্রকৃতির কাছে আমাদের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। আমরা এমন শিক্ষায় শিক্ষিত হই যেন কেউ কোন পশু, পাখির উপর অত্যাচার না করে, কোন দুর্বলকে আঘাত না করে এবং মানুষের পাশে দাঁড়ায়, এটাই মানবতা! এটাই মানবতার শিক্ষা! একশ্রেণীর পশুপ্রেমিক কুকুরকে ভাত দেয় যত্ন করে কিন্তু মানুষকে খেতে দেয় না! এমন মানবতার কোন প্রয়োজন নেই বরং এমন মানবতার প্রয়োজন যেখানে মানুষ, পশু, পাখি সকলে পাশাপাশি সহাবস্থান করে চলতে পারে!

দিনের শেষে একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, ‘মানব সন্তান ও মার্জার সন্তান বা মানব মা ও মার্জার মায়ের মধ্যে অনুভূতির মৌলিক কোন পার্থক্য নেই! তাই সকলে, আমরা সকলের তরে!’ এই মৌলিক বাক্যটিকে জীবনের মূল আদর্শ হিসাবে মেনে চলতে হবে!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 2 =