আমাদের সমাজে শিশুদের অধিকার

সমস্যা কিন্তু বিশাল কারণ বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় সন্তান লালন পালনের ক্ষেত্রে যতটা সহজে তাদের পাপ ও পুণ্য বিষয়ে জ্ঞান দান করি ঠিক ততটা সহজে তাদের ন্যায় অন্যায় শিক্ষা দিতে পারছি না। পরকাল নিয়ে আমরা যতটা চিন্তিত থাকি বর্তমানে সমাজ সভ্যতা নিয়ে ঠিক ততটা চিন্তিত থাকি না বিধায় সন্তানদের সঠিক শিক্ষা দিতে পারছিনা, সমাজে চলতে গেলে ন্যায় অন্যায়ের উপর ধারণা থাকতে হবে, লাল বাতি থাকলে রাস্তা পারাপারের সময় জেব্রা ক্রসিং পার হওয়া অন্যায়, ভিক্ষা করা ও ভিক্ষা দেয়া উচিত নয় বরং দুঃস্থদের পুনর্বাসনের জন্যে সমাজকে উদ্বুদ্ধ করা উচিত, সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের কল্যাণে দুঃস্থদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসা আর আমরা আমাদের সন্তানদের সে শিক্ষা না দিয়ে তাদের পুণ্য আদায়ের পন্থা শিখিয়ে দিতে ব্যস্ত সময় পার করছি। ধর্মীয় বিশ্বাস ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো যতক্ষণ সেই বিশ্বাস সমাজ, সংবিধান ও সভ্যতার নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক নয়, বিধর্মীদের সাথে বন্ধুত্ব করা যাবে না, নারী নেতৃত্ব মেনে নেয়া যাবে না, মূর্তি পূজা বা মূর্তি স্থাপনা অন্যায় ও ধর্ম প্রতিষ্ঠায় সংঘাত সৃষ্টি করে ধর্মের নাম জিহাদ করা বিষয়গুলো সংবিধান ও সভ্যতার সাথে সাংঘর্ষিক বিধায় এসব শিক্ষা শিশুদের না দিয়ে সমাজে কোন কর্মটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায় সেটাই শিশুদের জন্যে উত্তম শিক্ষা, তাই আসুন পাপ ও পুণ্য শিক্ষা দেবার আগে শিশুদের ন্যায় অন্যায় শিক্ষা দিতে উদ্বুদ্ধ হই।

নিজেদের মোডারেট ধার্মিক প্রমাণ করতে গিয়ে “পৃথিবীর সকল ধর্মই মানব কল্যাণ ও সম্প্রীতির কথা বলে” বক্তব্য দিয়ে আধুনিক সাজার চেষ্টা করি, আসলে আমরা নিজেরই জানি না যে বিশ্বে আনুমানিক চার হাজার দুইশত বিভিন্ন ধর্ম রয়েছে এবং এগুলি কয়েকটি প্রধান ধর্মে শ্রেণিবদ্ধ করা যেতে পারে। এর মধ্যে খ্রিস্টান, রোমান ক্যাথলিক, ইসলাম, হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ এবং ইহুদী ধর্ম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যদিও রোমান ক্যাথলিক ধর্ম প্রায়শই খ্রিস্টান ধর্মের অধীনে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়, আরও দুঃখের সাথে জানাতে হচ্ছে যে অনেক ধর্মই সভ্যতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিধাতাকে খুশি রাখতে হেন জঘন্য কর্ম নাই যে তাদের বিধানে লেখা নাই আর সে বিষয়ে মোডারেট ধার্মিকদের ধারণা জ্ঞানের অতলে পরে আছে।

পিতা মাতা হবার অধিকার নাগরিকের কিন্তু সেটা হবার আগে প্রকৃত নাগরিকদের অভিভাবক তৈরি করার দায়িত্ব সমাজ, রাষ্ট্র বা সরকারের। মাতৃসদন কেন্দ্রে থেকেই প্রতিটি নাগরিককে পিতা মাতা হবার আগেই সন্তান লালন পালনের পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেবার দায়িত্ব সরকারের, যা কিনা সভ্য দেশগুলোতে নিয়ম করেই বেধে দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সমাজ বিজ্ঞান ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিচালনা করার উপর অগাধ জ্ঞান না থাকলে একটি অন্ধকার সমাজ সব কিছুই বিধাতার হাতে অর্পিত করে বা অসহায় পিতামাতার উপর দায় দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। যেমন, সন্তান যখন বাবাকে জিজ্ঞাস করলো -বাবা বাস কখন ছাড়বে, বাবা উত্তর দিলেন -আল্লাহ যখন চায়, কিংবা বাবা ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করবার সময় মাস্টার মশাইকে বলে দিয়ে আসলেন, -স্যার, ছেলেকে মানুষ করতে চামড়াটা আপনার আর হাড্ডিগুলো আমার। এরকম একটি অন্ধকার সমাজে অভিভাবক তৈরী করার দায়িত্ব কার? মানবতা ও মানবিকতা বাংলাদেশের সমাজে প্রতিটি মানুষের ধারণা মানবতা মানুষের জন্যে কিন্তু মানবতা যে এই মহাজগতের সকল কিছুর জন্যেই নির্ধারিত তা বুঝতে গেলে সমাজে অভিভাবক আকাশ থেকে টুপটাপ বৃষ্টির মতো ধরাতে এসে পরে না।
“নীতি নৈতিকতা এবং অবক্ষয় রোধে একের পর এক ভাল প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে আমাদের। এর প্রধান দায়িত্ব যৌথ ভাবে আপনার আমার, প্যারেন্টস বা অভিভাবক ও সরকারের সমাজ উন্নয়ন সংস্থার।”

ধারাবাহিক ভাবে আপনার এবং শিশু উভয়েরই তথ্য নেয়ার দায়িত্ব মাতৃ সদন কেন্দ্রের উপর অর্পিত করা যেতে পারে, যা কিনা অতীব গুরত্বপূর্ণ।
উদাহরণস্বরূপ, একজন শিশুর জন্যে মানসিক ও শারীরিক চিকিত্সা পদ্ধতিতে কি অবস্থান নেয়া যেতে পারে সেটা সরকারের নিদৃষ্ট সাস্থ্য বিভাগ তার দায়িত্ব নেবে, কারণ হিসেবে উল্লেখ করছি যে পিতা মা বা অবিভাবক চাইলে শিশুর শারীরিক চিকিত্সা ব্যবস্থায় যেন শুধু মাত্র কালিজিরার, ঝর ফুক বা পানি পড়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে না পরে। সুতরাং অবিভাবিককে সরকারের অংশীদার হতে সক্ষমতা অর্জন করা, হওয়া ও উভয়ই তথ্যটি আদান প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ বুঝতে হবে।

পরীক্ষা নিরীক্ষা, যত্ন এবং শারীরিক ও মানসিক চিকিত্সার জন্য কী কী পদ্ধতি নেয়া যেতে পারে তা অবিভাবক ও সরকারের নিদৃষ্ট চিকিত্সা বিভাগ যত্ন সহকারে ফলাফল প্রত্যাশা করবে।
রোগ বা আঘাত রোধে কী কী পদ্ধতি রয়েছে,
জটিলতা এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াগুলির ঝুঁকিগুলি কী কী?
এইডস, করোনা বা যৌন রোগ কি ও তার উপলব্দিতে যত্ন নিয়ে অবশ্যই সন্তানের জানার প্রয়োজনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
সব শিশুদের বিভিন্ন চাহিদা রয়েছে এবং যত্ন সহকারে এনকাউন্টারে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন। যতদূর সম্ভব, আপনার এবং সাস্থ্য কর্মীদের সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করা উচিত। শিশু এবং যুবক-যুবতীদের সবসময় তাদের যা মনে হয় তা বলতে দেওয়া উচিত। সন্তানের দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে বের করার এবং তারপরে পরিদর্শন, পরীক্ষা এবং চিকিত্সা যথাসম্ভব মানিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব সরকারী তত্ত্বাবধায়কের।

কীভাবে স্বাস্থ্যসেবা শিশুদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিতে পারে তার উদাহরণগুলির মধ্যে রয়েছে:
সন্তানের জন্যে ও যে কোনও পরীক্ষা বা চিকিত্সা বাধাগ্রস্ত হলে তা অন্য সময়ে আবার চেষ্টা করতে সক্ষম হওয়া উচিত।

কীভাবে ওষুধ খাওয়া উচিত বা যখন বেশ কয়েকটি সমতুল্য বিকল্প রয়েছে তখন পরীক্ষা কীভাবে করা উচিত সে সম্পর্কে শিশুদের অবশ্যই সিদ্ধান্তগুলি প্রভাবিত করার সাথে জড়িত থাকতে হবে।
যে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা দরকার তাদের যতদূর সম্ভব পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে যত্ন নেওয়া উচিত। যদি একজন শিশু মানসিক বা শারীরিক কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয় তবে বাচ্চাকে অবশ্যই তার সাথে কমপক্ষে একজন নিকটাত্মীয় থাকার অনুমতি দেওয়া উচিত।

সন্তানের যত্ন সম্পর্কে কে সিদ্ধান্ত নেয়?

এটি প্রাথমিকভাবে প্রাপ্তবয়স্করা যারা সন্তানের যত্ন এবং যত্নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন তবে বাচ্চাদের অবশ্যই সর্বদা অংশগ্রহণের এবং তাদের মতামত দেওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত।
শিশু কখন কোন অংশ সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার কোনও বয়সসীমা নেই, কোনও শিশু কখন জড়িত থাকতে পারে এবং যত্নের পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে তারও কোনও বয়সসীমা নেই। সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়ার সন্তানের অধিকার প্রতিটি পৃথক সন্তানের বয়স এবং পরিপক্কতার উপর নির্ভর করে।

বয়স হ’ল একমাত্র জিনিস যা সন্তানের পরিপক্কতা নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণস্বরূপ, যে শিশু দীর্ঘকাল ধরে অসুস্থ রয়েছে বা যার অক্ষমতা রয়েছে তারা একই যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে একই বয়সী অন্য সন্তানের চেয়ে তাদের যত্নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও পরিণত হতে পারে।

হ্যাঁ বা না বলতে স্বাস্থ্য সেবাতে বাচ্চা যত বড় হবে, তত বেশি বার শিশু এবং অভিভাবক হিসাবে উভয়েরই দেওয়া যত্নটি হ্যাঁ বলা দরকার। একে বলা হয় নিজের সম্মতি দেওয়া বা সম্মতি নেওয়া।
যারা যত্ন নেওয়ার জন্য দায়বদ্ধ তারা কোনও শিশু কখন এবং কীভাবে জড়িত থাকতে পারে তা নির্ধারণ করে এবং যত্নের পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সাধারণত আপনি জড়িত হন এবং সেই মূল্যায়ন করেন। সন্তানের জন্য সর্বোত্তম বিষয় হ’ল যদি আপনি এবং সাস্থ্য কর্মীরা একত্রে সন্তানের যা প্রয়োজন তা বিবেচনা করে এবং সন্তানের উপস্থিতেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
অভিভাবক হিসাবে, আপনি আপনার সন্তানের নির্দিষ্ট যত্ন নেওয়ার জন্য বলতে পারেন। এমনকি যদি আপনি কোনও কিছুতে নিজের সম্মতি দিয়েছেন, আপনি যে কোন সময় তা পরিবর্তন করে এ সিদ্ধান্তটি আবার নিতে পারেন।

আপনি যে পরিস্থিতিতে কঠিন তাতে অংশ নিতে না বলতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, এটি হতে পারে যে সাস্থ্য কর্মীরা চান আপনি একটি অপ্রীতিকর পরীক্ষা বা চিকিত্সার সময় শিশুটিকে ধরে রাখুন। পরিবর্তে আপনি আগে এবং পরে বাচ্চাকে সান্ত্বনা এবং সমর্থন করার জন্য পাশে থাকতে বেছে নিতে পারেন।
শিশু যখন ১৮ বছর বয়সে পৌঁছে, তখন সে আইনী অধিকারে প্রাপ্ত বয়স্ক হয় এবং তার নিজের যত্ন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়।

কখনও কখনও যত্ন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া-
যদি শিশু এবং আপনি একমত না হন তবে সাধারণত যত্নের জন্য দায়বদ্ধ ব্যক্তিই হবেন যে পরিস্থিতি কীভাবে সমাধান করা উচিত তা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দু’জন অভিভাবক যখন সন্তানের যত্নের সাথে একমত না হন তখন কখনও কখনও পরিচর্যার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে অবশ্যই সামাজিক পরিষেবাগুলি সাহায্যের জন্য জিজ্ঞাসা করতে হবে। একজন সন্তানের যত্ন এবং সর্বোত্তম সম্ভাব্য স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার প্রয়োজন সমাজের। স্বাস্থ্য পরামর্শ, উদাহরণস্বরূপ, গর্ভনিরোধক এবং ভাল জীবনযাপন সম্পর্কে পরামর্শ হতে পারে, তা দিতে পারে সরকারের নিদৃষ্ট সংস্থা ও এটা ওদের দায়িত্ব। সন্তানের সাথে বৈঠকেও গুরুত্বপূর্ণ ও সন্তানের উপস্থিততে সেটা করা উচিত এবং সন্তানের সুরক্ষা এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার আগে তা যত্নশীল সাস্থ্য কর্মীদের অবহিত করা উচিত।

— মাহবুব আরিফ কিন্তু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

14 − = 6