২২৯: তাবুক যুদ্ধ-২: অনুসারীদের অনিচ্ছা ও নারী প্রলোভন!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

‘কুরআন’ ও আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের লিখিত পূর্ণাঙ্গ সিরাত ও হাদিস গ্রন্থের বর্ণনায় যা সুস্পষ্ট, তা হলো, মুহাম্মদের বহু অনুসারী বিভিন্ন অজুহাতে ‘জিহাদ’ থেকে অব্যাহতি চাইতেন ও হযরত মুহাম্মদ (সা:) তাঁর এই সমস্ত অনুসারীদের বিভিন্ন প্রলোভন ও হুমকির মাধ্যমে তাঁর আদেশ পালনে উদ্বুদ্ধ ও বাধ্য করতেন। এ বিশয়ের বিস্তারিত আলোচনা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে (পর্ব: ১৮১-১৮৩)।

তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে এই পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করে। এই যুদ্ধের প্রাক্কালে মুহাম্মদের বহু অনুসারী কী ভাবে মুহাম্মদের আদেশ পালনে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছিলেন ও অতঃপর মুহাম্মদ তাঁদেরকে কীভাবে “তাঁর আল্লাহর” নামে যথারীতি হুমকি-শাসানী ও ভীতি প্রদর্শন করেছিলেন তা আ’দি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকরা তাঁদের পূর্ণাঙ্গ সিরাত ও হাদিস গ্রন্থে বিভিন্নভাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। মুহাম্মদ তাঁর এই সমস্ত অনুসারীদের “মুনাফিক” নামে আখ্যায়িত করেছিলেন।

আল-তাবারীর (৮৩৯ সাল-৯২৩ সাল) বর্ণনা: [1] [2] [3]
(মুহাম্মদ ইবনে ইশাক ও আল-ওয়াকিদির বর্ণনা, আল-তাবারীর বর্ণনারই অনুরূপ)
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২২৮) পর:

‘একদিন যখন আল্লাহর নবী অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন, তিনি বানু সালিমাহ গোত্রের জাদ বিন কায়েস-কে বলেন, “হে জাদ, তুমি কী এ বছর বানু আসফারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ইচ্ছুক?” [4]

সে বলে, “হে আল্লাহর নবী, (এ ব্যাপারে) আমাকে ক্ষমা করুন ও আমাকে প্রলুব্ধ করবেন না। আল্লাহর কসম, আমার লোকেরা জানে যে আমার চেয়ে বেশী নারী-প্রেমী আর কেউ নেই। আমার আশঙ্কা এই যে, আমি যদি বানু আসফার নারীদের দেখি তবে আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবো না। (ইবনে ইশাক: ‘সে জবাবে বলে:

“আমাকে কি আপনি থেকে যাওয়ার অনুমতি দেবেন ও প্রলুব্ধ করবেন না; কারণ সকলেই জানে যে আমি নারীদের প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত ও আমার আশঙ্কা এই যে আমি যদি বাইজেন্টাইন নারীদের দেখি তবে আমি আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবো না।”)

(He replied, ‘Will you allow me to stay behind and not tempt me, for everyone knows that I am strongly addicted to women and I am afraid that if I see the byzantine women, I shall not be able to control myself.’)

আল্লাহর নবী তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন ও বলেন, “আমি তোমাকে অব্যাহতি দান করছি।” আল-জাদ সম্পর্কে নিম্নলিখিত আয়াতটি নাজিল হয়: [5]

“আর তাদের কেউ বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং পথভ্রষ্ট করবেন না। শোনে রাখ, তারা তো পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট এবং নিঃসন্দেহে জাহান্নাম এই কাফেরদের পরিবেষ্টন করে রয়েছে। (কুরআন: ৯:৪৯)

[“আমাকে প্ররোচিত করবেন না”] এর অর্থ হলো এই যে, সে বানু আসফারের মহিলাদের প্রলোভনের আশঙ্কা করছিলো। কিন্তু আল্লাহর নবীর সাথে (যুদ্ধে) না গিয়ে তার নিবৃত থাকাটা কি প্রলোভন নয়? মানব অভিলাষের শিকার হয়ে সে আরও বেশি প্রলোভনে পড়েছে। নিশ্চয়ই, জাহান্নাম তার পিছনে রয়েছে (ইবনে ইশাক: ‘অর্থাৎ, সে যে বাইজেন্টাইন নারীদের ব্যাপারে প্রলোভনের ভয় পেয়েছে তা নয়: সে যে প্রলোভনে পড়েছে তার চেয়েও বেশি হলো এই যে, সে আল্লাহর নবীকে অগ্রাহ্য করে নবীকে খুশী করার পরিবর্তে নিজেকে খুশি করার চেষ্টা করেছে। আল্লাহ বলেছে, “সত্যই তার পিছনে জাহান্নাম রয়েছে”)।

যুদ্ধের প্রতি বিতৃষ্ণা ও সত্যের প্রতি সংশয়ের কারণে মুনাফিকদের একজন (ইবনে ইশাক: ‘মুনাফিকদের এক দল’) আল্লাহর নবী সম্পর্কে মিথ্যা গুজব রটনা করে; অন্যদের বলে যে, এই উত্তাপে তাদের বাহিরে যাওয়া উচিত নয়। [6]

তাদের বিষয়ে আল্লাহ নাজিল করে:
“পেছনে থেকে যাওয়া লোকেরা আল্লাহর রসূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে থাকতে পেরে আনন্দ লাভ করেছে; আর জান ও মালের দ্বারা আল্লাহর রাহে জেহাদ করতে অপছন্দ করেছে এবং বলেছে, এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না। বলে দাও, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচন্ডতম। যদি তাদের বিবেচনা শক্তি থাকত। অতএব, তারা সামান্য হেসে নিক এবং তারা তাদের কৃতকর্মের বদলাতে অনেক বেশী কাঁদবে। (কুরআন: ৯:৮১-৮২)

আল্লাহর নবী সঙ্কল্প-চিত্তে অভিযানের প্রস্তুতির জন্য এগিয়ে চলেন ও লোকদের দ্রুত প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশ জারী করেন। এর খরচ জোগানোর নিমিত্তে (সরবরাহ পূরণ) সহায়তা প্রদানের জন্য তিনি আর্থিকভাবে সচ্ছল লোকদের অনুরোধ ও প্ররোচিত করেন। আর্থিক-সচ্ছল লোকেরা আল্লাহর কাছ থেকে পুরষ্কারের প্রত্যাশায় সওয়ারি পশু সরবরাহ করে। এই অভিযানে উসমান বিন আফফান প্রচুর পরিমাণে ব্যয় করে, তার চেয়ে বেশী আর কেউই ব্যয় করে নাই। (ইবনে হিশাম: ‘এই অভিযানে উসমান এক হাজার দিরহাম ব্যয় করেছিল।’) [7] —–

কিছু সংখ্যক বেদুইন, যারা [যাত্রা থেকে] নিজেদের বিরত রেখেছিল, ক্ষমা-প্রার্থনার আবেদন নিয়ে হাজির হয়; কিন্তু আল্লাহ তাদের অজুহাত গ্রহণ করে নাই। আমাকে যা বলা হয়েছে, তা হলো, তারা ছিল বানু গিফার (Ghifar) গোত্রের লোক; যাদের একজন ছিল খুফাফ বিন ইমা বিন রাহদাহ (আল-ওয়াকিদি: ‘তাদের সংখ্যা ছিল বিরাশি জন।’)।’ —–

আল্লাহর নবী তাঁর যাত্রা শুরুর পর থানিয়াত আল-ওয়াদি নামক স্থানে তাঁর শিবির স্থাপন করেন; পক্ষান্তরে তার নীচে আবদুল্লাহ বিন উবাই বিন সালুল পৃথকভাবে তার শিবিরটি স্থাপন করে, যা ছিল থানিয়াত আল-ওয়াদির নিম্নভাগে ও আল-জুবানা নামক স্থানের ধুবাব পর্বতটির দিকে মুখ করা। (বর্ণনাকারীর) দাবী এই যে, এই দুই শিবিরের মধ্যে পরের জনের [আবদুল্লাহ বিন উবাই এর] শিবিরটি ছোট ছিল না। [8]

আল্লাহর নবী যখন যাত্রা শুরু করেন, তখন আবদুল্লাহ বিন উবাই মুনাফিক ও দ্বিধান্বিত লোকদের সাথে পিছনে অবস্থান করে। আবদুল্লাহ বিন উবাই ছিল বানু আউফ বিন আল-খাযরাজ গোত্রেই এক ভাই [পর্ব: ৫১-৫২]; আবদুল্লাহ বিন নাবতাল ছিল বানু আমর বিন আউফ গোত্রের এক ভাই; ও রিফা বিন রিফাহ বিন যায়েদ আল-তাবিত ছিল বানু কেউনুকা গোত্রের এক ভাই। তারা ছিল মুনাফিকদের মধ্যে নেতৃস্থানীয়, যারা তাদের কারুকার্যমূলক চক্রান্তের মাধ্যমে ইসলাম ও এর [ইসলাম] অনুসারীদের ক্ষতি সাধন করছিলো।’ —-

ইবনে হুমায়েদ <সালামাহ < ইবনে ইশাক < আমর বিন উবায়েদ < আল-হাসান আল বাসরি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে: [9] [10]

তাদের সম্বন্ধে আল্লাহ নাজিল করে:
“তারা পূর্বে থেকেই বিভেদ সৃষ্টির সুযোগ সন্ধানে ছিল এবং আপনার কার্যসমূহ উল্টা-পাল্টা করে দিচ্ছিল। (শেষ পর্যন্ত সত্য প্রতিশ্রুতি এসে গেল এবং জয়ী হল আল্লাহর হুকুম, যে অবস্থায় তারা মন্দবোধ করল)।”‘ (কুরআন: ৯:৪৮) –

ইবনে হিশামের (মৃত্যু ৮৩৩ সাল) অতিরিক্ত বর্ণনা: [6]

‘মুহাম্মদ বিন তালহা বিন আবদুল রহমান হইতে <ইশাক বিন ইবরাহিম বিন আবদুল্লাহ বিন হারিথা হইতে <তার পিতা হইতে <তার দাদা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এক বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি আমাকে বলেছে:

“আল্লাহর নবী শুনতে পান যে মুনাফিকরা সুয়ায়েলিম (Suwaylim) নামের এক ইহুদির বাড়িতে একত্রিত হচ্ছে ও লোকদের আল্লাহর নবীর সাথে তাবুক অভিযানে যোগদান থেকে ফেরানোর চেষ্টা করছে। তাই আল্লাহর নবী তাদের বিরুদ্ধে তালহা বিন উবায়েদুল্লাহ-কে তার কিছু বন্ধুদের সাথে এই নির্দেশ সহকারে প্রেরণ করেন যে তারা যেন তাদের সাথে সুয়ায়েলিমের বাড়িটি পুড়িয়ে ফেলে। তালহা তাই করে; আল-দাহহাক বিন খালিফা বাড়িটির ছাদে থেকে লাফ দেয় ও তার পা ভেঙ্গে যায়, আর তার বন্ধুরা ছুটে পালিয়ে যায়। আল-দাহহাক এ বিশয়ে বলে:

আল্লাহর মসজিদের পাশে মুহাম্মদের আগুন
দাহহাক ও ইবনে উবাইরিক-কে করেছিল দগ্ধ প্রায়
আমি সুয়ায়েলিমের বাড়ির ছাদে করেছিলাম গমন
অতঃপর পুরো একটি পা ও কনুইয়ে হামাগুড়ি দিয়ে গিয়েছিলাম দূরে
তোমাকে মোর সালাম, আমি আর কখনও এমন করব না
আমি ভীত। যার চারিপাশে জ্বলছিল আগুন হয়েছিল সে দগ্ধ।'”

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) বিস্তারিত ও অতিরিক্ত বর্ণনা: [3]

আল্লাহর নবী আল-জাদ বিন কায়েস কে বলেন,

“আবু ওহাব, তুমি কখন আমাদের সাথে যুদ্ধের জন্য বের হবে, সম্ভবত তুমি তোমার সাথে বাইজেন্টাইন নারীদের আনতে পারবে?”

আল-জাদ জবাবে বলে, “আমাকে অনুমতি দিন ও আমাকে প্রলুব্ধ করবেন না। আমার লোকেরা অবশ্যই অবগত আছে যে নারীদের সম্পর্কে আমার চেয়ে বেশী কল্পনাপ্রবণ ব্যক্তি আর কেউ নেই। কিন্তু আমার আশঙ্কা এই যে, আমি যদি বাইজেন্টাইনদের কোনও নারীকে দেখি তবে আমি তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করতে পারবো না”

আল্লাহর নবী তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন ও বলেন, “আমি তোমাকে অনুমতি দিলাম।”

তার পুত্র আবদুল্লাহ বিন জাদ তার নিকট আসে – সে বদরে উপস্থিত ছিল ও সে ছিল তার মায়ের সম্পর্কে মুয়াদ বিন জাবালের ভাই; অতঃপর সে তার পিতাকে বলে, “তুমি কেন আল্লাহর নবীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে? আল্লাহর কসম, তোমার চেয়ে বেশি সম্পত্তি বানু সালিমা গোত্রের আর কারও নেই, তথাপি তুমি বাইরে যাবে না বা কাউকে প্রেরণ করবে না!”

সে জবাবে বলে, “হে আমার ছোট ছেলে, কেন আমি এই বাতাস ও গরম ও অসুবিধার মধ্যে বাইজেন্টাইনদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবো? আল্লাহর কসম, যেখানে আমি খুরবায় আমার এই নিজ বাড়ীতে বাইজেন্টাইনদের ভয় থেকে নিরাপদ নই, সেখানে কী ভাবে আমি তাদের উদ্দেশ্যে রওনা হবো ও তাদের হামলা করবো? হে আমার ছোট ছেলে, অবশ্যই আমি জীবনের চক্র সম্পর্কে জ্ঞানসম্পন্ন।”

তার পুত্রটি তার সাথে অভদ্র আচরণ করে। সে বলে, “না; আল্লাহর কসম, এটা ভণ্ডামি!

আল্লাহর কসম, তোমার সম্পর্কে আল্লাহর নবীর কাছে কুরআন নাজিল হবে ও তারা তা পাঠ করবে।”

সে বলেছে, “অতঃপর সে (তার পিতা) তার নিজের স্যান্ডেলটি উত্তোলন করে ও তা দিয়ে তার পুত্রের মুখমণ্ডলে আঘাত করে। অতঃপর তার পুত্র তার কাছ থেকে ফিরে যায় ও তার সাথে কথা বলে না।

কাপুরুষটি তার লোকদের নিরুৎসাহিত করা শুরু করে। সে জব্বার বিন সাখর ও তার সাথে থাকা বানু সালামা গোত্রের একদল লোকদের উদ্দেশ্যে বলে, “হে বানু সালামার লোকেরা, এই গরমে তাড়াহুড়া করো না।” সে বলে, “এই গরমে বাইরে যেও না।

আল্লাহর নবীর ব্যাপারে এই ঘটনা ও গুজবটি নিয়ে সন্দেহ আছে।”

সর্বশক্তিমান আল্লাহ এ সম্পর্কে তাঁর কাছে অবতীর্ণ করে:
“তারা বলেছে, এই গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না (কুরআন: ৯:৮১-৮২),” এখান থেকে তার এই বাণী পর্যন্ত, “অতএব, তারা সামান্য হেসে নিক এবং তারা তাদের কৃতকর্মের বদলাতে অনেক বেশী কাঁদবে।”

তার বিশয়ে নাজিল হয়, “আর তাদের কেউ বলে, আমাকে অব্যাহতি দিন এবং পথভ্রষ্ট করবেন না (কুরআন: ৯:৪৯)।” যেন সে বাইজেন্টাইন নারীদের প্রলোভনের ভয় পেয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটি তা ছিল না। বরং, সে মিথ্যা অজুহাতে নিজেকে বিরত রেখেছিল। যে প্রলোভনে সে পড়েছে, তা যা সে আশঙ্কা করেছিল তার চেয়েও খারাপ। সে আল্লাহর নবীর কাছ থেকে দূরে থাকে ও নিজেকে দূরে রাখে। আল্লাহ বলেছে, “জাহান্নাম অবিশ্বাসীদের দ্বারা পরিপূর্ণ।”

এই আয়াতটি যখন নাজিল হয়, পুত্রটি তার পিতার কাছে এসে বলে, “আমি কি তোমাকে বলি নাই যে তোমার সম্পর্কে কুরআন নাজিল হবে ও মুসলমানরা তা পাঠ করবে?”

তার পিতা বলে, “এই কুলাঙ্গার, আমার বিষয়ে চুপ থাক্! আমি কখনই তোর কাজে আসবো না। আল্লাহর কসম, অবশ্যই তুই আমার সাথে মুহাম্মদের চেয়ে বেশী কঠোর।”–

তারা বলেছে: মুনাফিকদের ভিতর থেকে লোকেরা আল্লাহর নবীর কাছে এসে বিনা কারণে বিরত থাকার অনুমতি প্রার্থনা করে, তিনি তাদের অনুমতি দেন। যে মুনাফিকরা অনুমতি চেয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় আশি জন।

যখন আল্লাহর নবী যাত্রা শুরু করেন, ইবনে উবাই ঐ মুনাফিকদের সাথে পিছনে অবস্থান করে যারা বিরত ছিল। সে বলে, “এই ক্লান্তি, গরম ও স্থানের দূরত্ব সত্ত্বেও মুহাম্মদ বাইজান্টাইনদের আক্রমণ করবে, যেখানে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষমতা তাঁর নেই! বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে লড়াইকে কি মুহাম্মদ খেলা মনে করে? যারা তার সাথে জড়িত ছিল তাদের মতামতও ছিল একই রকম।” অতঃপর ইবনে উবাই বলে, “আল্লাহর কসম, আগামীতে আমি তাঁর সঙ্গীদের দড়ি বাঁধা অবস্থায় দেখবো।” সে আল্লাহর নবী ও তাঁর সাহাবীদের ব্যাপারে সন্দেহ করেছিল।’ ——–

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

আলোচনা শুরুর আগে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি আলোকপাত করা প্রয়োজন, তা হলো: ‘নবী মুহাম্মদের জীবনের “সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ জীবনী গ্রন্থ” এর লেখক মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ সাল)। তাই, এই বইটিই হলো মুহাম্মদ ইবনে ইশাক পরবর্তী ইসলাম ইতিহাসবিদদের লিখিত মুহাম্মদের জীবনী-গ্রন্থের (সিরাত) মূল রেফারেন্স। জিয়াদ বিন আবদুল্লাহ আল-বাক্কায়ি ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের ছাত্র। তিনি ইবনে ইশাকের সম্পূর্ণ বইটির দু’টি কপি সংরক্ষণ করেছিলেন, যার একটি অবশ্যই আবু আল-মালিক বিন হিশামের [সংক্ষেপে, ইবনে হিশাম – মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ] কাছে পৌঁছেছিল। ইবনে হিশাম সেই বইটি সংশোধিত (Recension) রূপে ‘সিরাত রাসুল আল্লাহ’ নামে বই আকারে সম্পাদনা করেছেন। ইবনে হিশাম সম্পাদিত ‘সিরাত রাসুল আল্লাহ’ বইটিই হলো মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের মূল বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্করণ। ইবনে হিশাম সম্পাদিত ‘সিরাত রাসুল আল্লাহ বইটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন A. GUILLAUME। অন্যদিকে, সালামাহ বিন ফাদল আল-আবরাশ আল-আনসারী নামের মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের আর এক শিষ্যের সংরক্ষিত ‘ইবনে ইশাকের সম্পূর্ণ বইটির’ রেফারেন্সে মুহাম্মদ ইবনে যারির আল-তাবারী (৮৩৯-৯২৩ সাল) যে সিরাত গ্রন্থটি রচনা করেছেন, তা হলো “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক।” এ বিশয়ের বিশদ আলোচনা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে (পর্ব: ৪৪-৪৫)। ইবনে হিশাম সম্পাদিত ইবনে ইশাকের ‘সিরাত’ গ্রন্থটির বর্ণনাগুলোকে আমি “মুহাম্মদ ইবনে ইশাক” নামে; ও আল-তাবারী সম্পাদিত ইবনে ইশাকের ‘সিরাত’ গ্রন্থটির বর্ণনাগুলোকে আমি “আল-তাবারী” নামে উল্লেখ করেছি।

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসে মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-তাবরী ও আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট, তা হলো, মুহাম্মদ তাঁর জাদ বিন কায়েস নামের এক অনুসারী-কে তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন “নারী-প্রলোভনের” মাধ্যমে, এই বলে,

“সম্ভবত তুমি তোমার সাথে বাইজেন্টাইন নারীদের আনতে পারবে।”

জাদ বিন কায়েস তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এই বলে যে, মুহাম্মদ যেন তাঁকে “প্রলুব্ধ না করে থেকে যাওয়ার অনুমতি দেন।” তাঁর এই উক্তির পরিপ্রেক্ষিতে মুহাম্মদ “তাঁর আল্লাহর” নামে জাদ বিন কায়েসের সমালোচনা করেছিলেন ও তাঁকে হুমকি প্রদান করেছিলেন।

আল-ওয়াকিদির ওপরে বর্ণিত অতিরিক্ত বর্ণনায় আমরা আরও জানতে পারি, জাদ বিন কায়েসের পুত্র আবদুল্লাহ বিন জাদ, মুহাম্মদের পক্ষ নিয়ে তাঁর পিতার এই আচরণের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি ভীত ছিলেন এই আশংকায় যে,

“মুহাম্মদের কাছে এ বিশয়ে ওহী নাজিল হবে, যা মুসলমানরা পাঠ করবে।”

যার সরল অর্থ হলো, মুহাম্মদ তাঁর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ‘আল্লাহর নামে’ ওহী নাজিল করে তা তাঁর অনুসারীদের বারংবার পাঠ করার ব্যবস্থা করতেন, এমনকি তা তারা করতেন “নামাজ পড়ার” সময়টিতে ও!

“আল্লাহ-কে” ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ-কে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার এটি ছিল মুহাম্মদের এক বিশেষ কৌশল (পর্ব: ১২)।

আর ইবনে হিশামের ওপরে বর্ণিত অতিরিক্ত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, মুহাম্মদের যে সমস্ত অনুসারীরা সুয়ায়েলিম নামের এক ইহুদির বাড়িতে বসে শলাপরামর্শ করেছিলেন ও লোকদের তাবুক অভিযানে যোগদান থেকে ফেরানোর চেষ্টা করছিলেন, মুহাম্মদ তাঁদের-কে সহ সেই বাড়িটি পুড়িয়ে ফেলার হুকুম জারী করেছিলেন। এই বর্ণনায় যে বিষয়টি সুস্পষ্ট, তা হলো, মুহাম্মদের আদেশে যখন তালহা বিন উবায়েদুল্লাহ নামের এক মুহাম্মদ অনুসারী ও তার বন্ধুরা ঐ বাড়ীতে আগুন দিয়েছিলেন, তখন মুহাম্মদের প্রতিপক্ষ ঐ অনুসারীরা (মুনাফিক) ছিলেন ঐ বাড়ীর ভিতরে।

আর আ’দি উৎসের সকল মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায়, যা আমরা নিশ্চিতরূপে জানি তা হলো:

‘কোন বিশেষ ঘটনা সংঘটিত হওয়া বা কোন বিষয়ে জ্ঞানার্জনের পর মুহাম্মদ ‘তাঁর আল্লাহর’ নামে সে বিষয়ে ওহী নাজিল করতেন ও সেই ওহীর মাধ্যমে তিনি বিষয়ের আলোচনা, সমালোচনা, আদেশ ও নির্দেশ; প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রলোভন, হুমকি-শাসানী-ভীতি প্রদর্শন, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য; ইত্যাদি কার্যকম সমাধা করতেন! এটিই ছিল মুহাম্মদের ওহী নাজিলের প্রক্রিয়া!’

কুরআনের যাবতীয় বাণী ও বর্ণনার ‘স্রষ্টা হলো’ মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা (পর্ব: ১৭-১৯)। মুহাম্মদ তাঁর উদ্দেশ্য সাধনের প্রয়োজনে “তাঁর আল্লাহ-কে” সৃষ্টি করেছিলেন। এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার (যদি থাকে) সাথে মুহাম্মদের সৃষ্ট এই আল্লাহর কোনই সম্পর্ক নেই।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল-ওয়াকিদির মূল ইংরেজি অনুবাদের প্রাসঙ্গিক অংশটি সংযুক্ত করছি; আল তাবারী ও ইবনে ইশাকের রেফারেন্স: বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক তথ্যসূত্র নম্বর এক ও দুই।]

The narratives of Al-Waqidi: [3]

The Messenger of God said to al-Jadd b. Qays, “Abū Wahb, when you come out with us for this battle, perhaps you might bring back Byzantine girls with you?” Al-Jadd replied, “You grant me permission but you do not tempt me. Surely my people know there is none with a greater vanity about women than I. But I fear that if I saw a woman of the Byzantines I would not be patient about them.” The Messenger of God turned away from him and said, “I grant you permission.”

His son, ‛Abdullah b. Jadd came to him — he was at Badr, and he was the brother of Mu‛ādh b. Jabal by his mother, and he said to his father, “Why did you reject the proposition of the Messenger of God? By God, the Banū Salima do not have more property than you, but you will not go out nor will you send anyone!” He replied, “O my little son, why should I go out [Page 993] in the wind and heat and difficulties to the Byzantines? By God, I am not secure from fear of the Byzantines in my own house in Khurbā‛, so how will I go out to them and raid them? Indeed, my little son, I am knowledgeable about the cycles of life.” His son was rude to him. He said, “No, by God, it is hypocrisy! By God, a Qur’ān will be revealed about you to the Messenger of God and they will read it.” He said: And he [the father] raised his sandal and struck his son’s face with it. And his son turned from him and did not speak to him.

The coward began to discourage his people. He said to Jabbār b. Sakhr and a group with him from the Banū Salama, “O Banū Salama, do not hurry in the heat.” He says, “Do not go out in the heat, be moderate in your efforts. There is doubt in the facts and rumors about the Messenger of God.” God most high revealed to him about it: They said: Do not go out in the heat (Q. 9:81, 82) until His words, as a reward for what they used to do. About him was revealed: And among them were those who say: You permit me, but you do not tempt me (Q. 9:49). As if he feared the temptation of Byzantine women. But that was not so. Rather, he excused himself with falsehoods. The temptation that he fell in was worse than what he feared. He stayed away from the Messenger of God, and kept himself away. God says: Hell is filled with disbelievers. When this verse was revealed the son came to his father and said, “Did I not say to you that a Qur’ān would be revealed about you and the Muslims will read it?” His father says, “Be silent about me, O disgrace! I will never be of use to you. By God, surely you are more severe with me than Muḥammad.” ——-

They said: People from the Hypocrites came to the Messenger of God and asked permission to be absent without cause, and he permitted them. There were roughly eighty Hypocrites who asked permission. —–

When the Messenger of God set out, Ibn Ubayy stayed behind with those Hypocrites who stayed behind. He said, “Muḥammad raids the Byzantines despite the strain of the situation and the heat and the distance of the land when he has no power over them! Does Muḥammad consider fighting the Byzantines a game? Those who pretend with him are of a similar opinion.” Then Ibn Ubayy said, “By God, tomorrow I will see [Page 996] his companions tied up in ropes.” He doubted the Messenger of God and his companions.’ —–

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী; ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ৪৮-৫১
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[2] অনুরূপ বর্ণনা: লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬০২-৬০৪
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[3] “কিতাব আল-মাগাজি”- আল-ওয়াকিদি, ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ৯৯২-৯৯৩ ও ৯৯৫-৯৯৬;
ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail & Abdul Kader Tayob, পৃষ্ঠা ৪৮৬-৪৮৮
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[4] Ibid আল-তাবারী-নোট নম্বর:
৩৪৩ – জাদ বিন কায়েস: “যদিও সে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তিনি ছিলেন মুনাফিক।” ৩৪৫ – বানু সালিমাহ: “খাযরাজ গোত্রের এক উপগোত্র।”
৩৪৬ – বানু আসফার: “আরবরা বাইজেন্টাইনদের বানু আসফার নামে অভিহিত করতো।”

[5] কুরআনের উদ্ধৃতি ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত তরজমা থেকে নেয়া। অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। http://www.quraanshareef.org/
কুরআনের ছয়জন বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদকারীর ও চৌত্রিশ-টি ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ: https://quran.com/ ]

[6] Ibid মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: ইবনে হিশামের নোট নম্বর ৮৫৮; পৃষ্ঠা ৭৮২
[7] Ibid মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: ইবনে হিশামের নোট নম্বর ৮৫৯; পৃষ্ঠা ৭৮৩
[8] Ibid আল-তাবারী-নোট নম্বর ৩৫৯: “ধুবাব অথবা ধিবাব – মদিনার নিকটবর্তী একটি পাহাড়।”
[9] Ibid আল-তাবারী-নোট নম্বর ৩৬২: “আমর বিন উবায়েদ বিন বাব, যিনি আরও পরিচিত ছিলেন ইবনে কায়সান আল-তামিমি নামে। তিনি আনুমানিক ১৪২ হিজরি সালে (৭৫৯-৭৬০ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যুবরণ করেন।”
[10] Ibid আল-তাবারী-নোট নম্বর ৩৬৩: “আল-হাসান আল বাসরি ছিলেন উমাইয়া আমলের এক বিখ্যাত ধর্মপ্রচারক। তিনি ১১০ হিজরি সালে (৭২৮ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যুবরণ করেন।”

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

53 − = 43