বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ও তার প্রভাব

ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সদ্যসমাপ্ত চার রাজ্য ও এক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ও তার প্রভাব খুবই গুরুত্বপূর্ণ! 2021 সালের এই বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ, অসম, তামিলনাড়ু, কেরালা ও পুদুচেরিতে নির্বাচন সংগঠিত হয়েছে। বলাইবাহুল্য এই নির্বাচনের ফলাফল রাজ্য তথা জাতীয় রাজনীতিতে ও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে, এবার দেখা যাক এই নির্বাচনের ফলাফল কোন রাজ্যে কেমন হয়েছে।

প্রথমেই আসা যাক পশ্চিমবঙ্গের কথায় 294 আসন বিশিষ্ট পশ্চিমবঙ্গে করোনায় মৃত্যুর কারনে 292 টি আসনে ভোট সংগঠিত হয় (2 টি আসনে পরে নির্বাচন হবে)। এর মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস 213 টি আসনে জয়ী হয়, বিজেপি 77 টি আসনে, বাম, কংগ্রেস ও আইএসএফ জোট 1 টি ও অন্যান্যরা 1 টি আসনে জয়ী হয়। ভোটের শতাংশের বিচারে তৃণমূল কংগ্রেস 47.9 %, বিজেপি 38.1%, বাম 4.6% এবং কংগ্রেস 3% ভোট পায়।

অসমের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় 126 আসন বিশিষ্ট বিধানসভায় বিজেপি 75 টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে অন্যদিকে কংগ্রেস জোট 50 টি আসন ও অন্যান্যরা 1 টি আসন পায়।

কেরলার ক্ষেত্রে 140 আসন বিশিষ্ট বিধানসভায় 44 বছর পর নতুন ইতিহাস রচনা করে (কেরলা রাজ্যে 5 বছর অন্তর যে পরিবর্তনের ধারা ছিল তা এবার পরিবর্তন হয়) বাম জোট (LDF) 94 টি আসন নিয়ে ক্ষমতা দখল করে। অন্যদিকে কংগ্রেস জোট (UDF) 40 টি আসনেই সীমাবদ্ধ থাকে। বিজেপি অনেক আশা জাগিয়ে ও একটি ও আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। অন্যান্যরা 6 টি আসনে জয়লাভ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে পিনারাই বিজয়নের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও কাজের জন্য কেরলায় পুনরায় বামেরা ক্ষমতা দখল করতে পেরেছে।

এবার আসা যাক তামিলনাড়ুর কথায় 234 আসন বিশিষ্ট বিধানসভায় এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ডিএমকে জোট 160 টি আসনে জয়লাভ করে অন্যদিকে এডিএমকে জোট 74 টি আসন দখল করে ক্ষমতাচ্যুত হয়। বস্তুত এবারই প্রথমবার তামিলনাড়ুর রাজনীতির দুই মহারথী এম করুণানিধি (ডিএমকে) ও জয়ললিতার (এআইডিএমকে) অনুপস্থিতিতে নির্বাচন সংগঠিত হয়। তাই এবারের নির্বাচনে কারা জয়লাভ করবে সেটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বস্তুত ব্যাক্তিগত ভাবে নিজেকে নাস্তিক দাবিদার ও প্রগতিশীল বলে পরিচিত এম কে স্টালিনের জয়ে প্রগতিশীল মহল যথেষ্ট খুশি!

একমাত্র কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির ক্ষেত্রে দেখা যায় কংগ্রেস জোট পরাজিত হয়। 30 টি আসন বিশিষ্ট বিধানসভায় এনআরসি জোট 16 টি আসন পায়, কংগ্রেসে 8 টি ও অন্যান্যরা 4 টি আসন পায়।

বলাইবাহুল্য এই নির্বাচনের ফলাফল ভারতের রাজনীতিকে এক নতুন মোড়কে পুনর্লিখিত করবে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে স্ট্যালিন, পিনারাই বিজয়ন ও মমতা ব্যানার্জির জয়ের ফলে কেন্দ্রে বিরোধী শক্তি শক্তিশালী হল। যা দেশে ক্ষমতার সমবন্টন আনবে। যে কোনো গণতন্ত্র সফলভাবে পরিচালিত হওয়ার জন্য শক্তিশালী  বিরোধী শক্তির প্রয়োজন। এভাবে আঞ্চলিক শক্তি গুলির উঠে আসার কারণে অনেকেই মনে করছে বিরোধী শক্তিগুলি সংগঠিত হলে ক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেসের জায়গায় বিরোধীরা মানুষের কথা গুলি তুলে ধরতে পারবে।

যাক বিশেষজ্ঞরা তাদের মতো বিশ্লেষণ করেছে তবে আমাদের মূল বিশ্লেষণের বিষয় হল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জনের কারণ কি এবং আগামী দিনে এর ফলাফল কি হতে পারে? অনুপ্রাণিত বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া সত্যটি তুলে না ধরলে ও আমাদের সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে। সেটা থেকেই বলা যায় পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের এই অভূতপূর্ব সাফল্যের মূলত কারণগুলি হল- ব্যাপক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা, দান খয়রাতির রাজনীতি, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ন্ত্রণ, বিরোধীদের দুর্বল করা, পেশিশক্তির আস্ফালন ও প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে সুবিধা আদায় ইত্যাদি ইত্যাদি। এবার একে একে প্রতিটি কারণ বিশ্লেষণ করা হবে।

□ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি- তৃণমূল কংগ্রেসের এই বিরাট জয়ের পিছনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল ব্যাপক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা। পশ্চিমবঙ্গের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা কথায় কথায় বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক দল হিসাবে চিহ্নিত করলে ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে এরা শিশুতুল্য! বলা যায় 2011 সালের আগে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু মুসলমান বলে সেভাবে কেউ পরিচিত ছিল না কিন্তু মমতা ব্যানার্জির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে পশ্চিমবঙ্গে আজ হিন্দু মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজনের রাজনীতি অব্যাহত রয়েছে। যে পশ্চিমবঙ্গ একদা শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির পীঠস্থান ছিল সেই পশ্চিমবঙ্গ এখন ধর্মান্ধদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে!

বস্তুত এলাকায় এলাকায় গিয়ে তৃণমূলের নেতা, কর্মী সমর্থকেরা এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং প্রচ্ছন্নে ও কোথাও কোথাও প্রকাশ্যে এমন ইঙ্গিত দেন যে বিজেপি এলে মুসলমানদের শেষ করে দেবে, তাড়িয়ে দেবে, গো মাংস খাওয়া বন্ধ করে দেবে, সিএএ, এনআরসি চালু করবে ইত্যাদি ইত্যাদি! বস্তুত এই ঘৃণা, সাম্প্রদায়িকতা ও ভয়ের রাজনীতির কারণেই তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি বহু ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রায় 75% মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করে (বিজেপির পক্ষে 10% ও সংযুক্ত মোর্চার পক্ষে 15% মুসলমান ভোট যায়)। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই সংখ্যালঘু ভোটের গুরুত্ব বিশাল, তৃণমূল কংগ্রেসের এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফলেই দেখা যায় মালদা, মুর্শিদাবাদের মতো কংগ্রেসের গড়ে ও কংগ্রেস ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফলেই তৃণমূল কংগ্রেস বহু বিধানসভায় জয় সুচিন্তিত করতে পারে।

□ দান খয়রাতির রাজনীতি- মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। আসলে একশ্রেণীর মানুষের মন্তব্য হল ‘কেউ কি পাঁচ টাকা দিয়ে কোন দিন সাহায্য করেছে’? সেখানে মমতা ব্যানার্জি দুই টাকা কেজি দরে চাল দিচ্ছে (যদি ও এগুলি কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থে চলে), পাঁচ টাকায় ডিম ভাত দিচ্ছে, সবুজ সাথীর সাইকেল, কণ্যাশ্রী প্রকল্পের পঁচিশ হাজার টাকা, ক্লাবে ক্লাবে অনুদান, স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্প ইত্যাদি ইত্যাদি! বলাইবাহুল্য মানুষের মধ্যে ভিক্ষাবৃত্তি প্রবণতা বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সরকারের জুড়ি মেলা ভার! আর এক শ্রেণীর জনগণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান, চাকরি ইত্যাদি নিয়ে চিন্তিত নয় তাঁরা দুই টাকা কেজি দরে চাল পেলেই খুশি।

বস্তুত এমন পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতির ফলে ভোট মেলে, ক্ষমতায় ফিরে আসা যায় বটে তবে দিনের শেষে রাজ্যের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা ধ্বংসের দিকে দ্রুত এগিয়ে যায়! পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ও রাজ্য ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে! তোষামোদি দালাল মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা এগুলিকে মমতা ব্যানার্জির মাস্টার স্ট্রোক বলে চালালেও দিনের শেষে এই মাস্টার স্ট্রোকের খেসারত কিন্তু রাজ্যের জনগণ ও বেকার যুবক যুবতীদের দিতে হবে!

বস্তুত মমতা ব্যানার্জি এই দান খয়রতির রাজনীতি বাংলার বেকার যুবক যুবতী, কর্মপ্রার্থী ও চাকরিজীবি মানুষের লাশের উপর দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে! কত বেকার যুবক যুবতীরা হাতাশায় দিন কাটাচ্ছে, কত তাজাতাজা প্রাণ অকালে শুকায়ে যাচ্ছে তাঁতে কি কারোর ভ্রুক্ষেপ রয়েছে? বস্তুত বেকারদের জীবনে চরম হতাশা নেমে আসছে! তাই দান খয়রাতির রাজনীতি দিয়ে কিছু দিন ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় সত্য কিন্তু দিনের শেষে এর চরম মূল্য রাজ্যবাসীকেই দিতে হবে। তাঁরই পরিণতি হিসাবে দেখতে পাই যে পশ্চিমবঙ্গে আগে কাজের জন্য অন্য রাজ্য থেকে মানুষরা আসত সেই পশ্চিমবঙ্গের যুব সম্প্রদায়কে কাজের খোঁজে এখন ভিন্ন রাজ্য ও বিদেশে পাড়ি দিতে হচ্ছে! পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন কতটা হয়েছে তা এগুলি থেকেই বোঝা যায়! তবে ইতিহাস সাক্ষী দান খয়রাতির রাজনীতি কিছুদিন চললে ও পরবর্তীতে তা আর চালানো যায় না। কথায় আছে চালাকির দ্বারা মহৎ কর্ম হয় না, এক্ষেত্রে এর কি প্রতিক্রিয়া হয় সেটাই দেখার?

□ মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ন্ত্রণ- তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের কন্ঠরোধের দিকে মনোনিবেশ করে। তাই আজ আমরা দেখি মেরুদণ্ডহীন মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা মমতা ব্যানার্জির শাসনের ভয়ংকর দিকটি দেখতে পান না, গত দশ বছরে সেই অর্থে মিডিয়ার কোন গঠনমূলক ভূমিকাই নেই। মিডিয়ার কাজ হল শাসকের সমালোচনা করা ও শাসকের কাজের মূল্যায়ন করা অথচ এখানে দেখা যায় কিছু মিডিয়া হাউস ও গুটিকয়েক বুদ্ধিজীবী ছাড়া সমস্ত মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা সকলেই অনুপ্রাণিত হয়ে গেছে তাই এই সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা করার কোন ভাষা নেই!

শিশু বয়সে যখন সংবাদপত্র দেখতাম তখন লক্ষ্য করতাম সব সংবাদপত্র ও মিডিয়া হাউসগুলি তদানীন্তন বাম সরকারের সমালোচনা করছে, অর্থাৎ এ থেকেই প্রমাণিত হয় বাম আমলে সংবাদপত্র ও মিডিয়া হাউসগুলির সেই স্বাধীনতা ছিল কিন্তু বিগত দশ বছরে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সমালোচনা করে কোন খবর সেই অর্থে মূলধারার সংবাদ সংস্থাগুলি প্রকাশিত করেনি। এ থেকেই বোঝা যায় বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে কি রকম ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থা প্রচলিত রয়েছে। অন্যদিকে, সারের দাম বাড়ছে কেন এই প্রশ্ন করাই মানুষকে মাওবাদী তকমা পেয়ে জেলে যেতে হয়, সামান্য এক কার্টুন পোস্ট করার অপরাধে অম্বিকেশ মহাপাত্র মহাশয়কে জেলে যেতে হয়, এছাড়া ও এরূপ বিভিন্ন ঘটনা ঘটে চলেছে। ইহাই নাকি মমতা ব্যানার্জির প্রকৃত গণতন্ত্রের নিদর্শন? তিনি নাকি গণতন্ত্র রক্ষার আপসহীন সৈনিক?

আর কিছু ধান্দাবাজ বুদ্ধিজীবী ও সংবাদমাধ্যম বলে চলেছেন ‘বাংলার নব রূপকার হলেন মমতা ব্যানার্জি’! বলাইবাহুল্য কতটা নির্লজ্জ ও চাটুকার হলে এমন বিশেষণে ভূষিত করা যায়? উল্লেখ্য হিটলারের শাসনের সময় ও তৎকালীন জার্মান মিডিয়া হিটলারকে দেবতাদের সমতুল্য করে দেখাতো কিন্তু ইতিহাস ঠিকই মূল্যায়ন করে! হিটলার আজ দেবতাদের সমতুল্য না ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থার ঘৃণা নিয়ে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে সেটা জনগণ ঠিকই বিচার করেছে! তেমনি পশ্চিমবঙ্গের এই নব্য হিটলারি শাসনব্যবস্থাকে মানুষ নব্য রূপকার হিসাবে মনে রাখবে না ঘৃণ্য স্বৈরতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার নামান্তর হিসাবে মনে রাখবে তা ইতিহাস বিচার করবে!

□ বিরোধীদের দুর্বল করা ও পেশিশক্তির আস্ফালন- মমতা ব্যানার্জির শাসনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো বিরোধী শক্তিগুলিকে যেন তেনো প্রকারণে ভেঙ্গে দেওয়া এবং শাসকদলের পোষিত গুন্ডাদের দ্বারা বিরোধী কন্ঠস্বর দমন করা! মমতা ব্যানার্জি 2011 সালে ক্ষমতায় আসার আগে বলেছিলেন ‘বদলা নয়, বদল চাই’। অথচ নির্বাচনে পর আমরা কি দেখি? একের পর এক বিরোধীদের বাড়ি ঘর ভাঙচুর, তাঁরা ঘরছাড়া, তাঁরা অত্যাচারিত, গুন্ডারা যেন যা ইচ্ছা করার ক্ষমতা পেয়ে গেছে অথচ পুলিশ প্রশাসন নির্বিকার! আসলে পুলিশ প্রশাসন ও নিরুপায় কোন পুলিশ অফিসার স্বাধীন ভাবে কাজ করতে চাইলে ও তাঁদের যেভাবে বদলির নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁদের উপর যেভাবে শাস্তির খাঁড়া নেমে আসছে তাঁতে আগামী দিনে পুলিশের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। পুলিশ ও প্রশাসনের মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিচ্ছে, আদালতকে ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, যাঁর ফল আগামী দিনে জনগণকে ভুগতে হবে!

বস্তুত এই পুলিশ, প্রশাসন ও গুন্ডাবাহিনিদের কাজে লাগিয়ে শাসকদল নিজেদের কার্যসিদ্ধি সম্পন্ন করেছে! বস্তুত এই সমস্ত কারণেই শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এক বিরাট জয় আনতে পেরেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হল নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর তৃণমূল কংগ্রেস যেভাবে বিরোধীদের উপর আক্রমণ করছে, খুন ও লুঠতরাজ চালাচ্ছে তা সভ্য সমাজের পক্ষে লজ্জাজনক! আমরা সংবাদে দেখতাম বাংলাদেশে নির্বাচনে পটপরিবর্তনের পর ব্যাপক হিংসা নেমে আসত, আজ পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ও একই ঘরাণার রাজনীতি শুরু করেছে এবং গণতন্ত্রকে কলঙ্কিত করছে!

উল্লেখ্য পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজ্যপাল জগদীশ ধনকড় যথার্থই বলেছেন, “আজ যখন মানুষের উপর এত অত্যাচার নেমে আসছে তখন নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠনগুলি, সংবাদমাধ্যম গুলি কোথায়? আমি আমার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করব এবং আক্রান্তদের পাশে দাঁড়াবো, এই কাজে কেউ আমাকে বাঁধা দিতে পারবে না, ইতিহাস মনে রাখবে পশ্চিমবঙ্গের এই হিংসার সময় রাজ্য প্রশাসনের কি ভূমিকা ছিল? মিডিয়ার কি ভূমিকা ছিল? আর এক রাজ্যপালের কি ভূমিকা ছিল?”

বলাইবাহুল্য জগদীশ ধনকড়ের এই মন্তব্যকে তৃণমূল কংগ্রেস তীব্রভাবে নিন্দা করছে এবং রাজ্যপালকে বিজেপির এজেন্ট ইত্যাদি বলে বিষোদগার করছে কিন্তু এই তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জির মনে রাখা উচিত বাম আমলে নন্দীগ্রাম ঘটনা যখন ঘটে তখন তৎকালীন রাজ্যপাল গোপাল কৃষ্ণ গান্ধী মহাশয় নন্দীগ্রামের ঘটনাটিকে “হাড়হিম করা সন্ত্রাস” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তখন বিরোধী দলনেত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জি রাজ্যপালের এই ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন, আর এখন যখন রাজ্যপাল জগদীশ ধনকড় একই রকম ঘটনার বিরুদ্ধে কথা বলছেন তখন তাঁর ‘আইনি বৈধতা’ নিয়ে কেন প্রশ্ন করা হচ্ছে? কেন তাঁকে বিজেপির এজেন্ট ইত্যাদি বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে? এটা কি মমতা ব্যানার্জির দ্বিচারিতা নয়? এটা কি মমতা ব্যানার্জির সুবিধাবাদী রাজনীতি নয়? এটা কি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির কলঙ্কিত অধ্যায় নয়?

□ এবার আসা যাক এই নির্বাচনে বিজেপি এবং বাম ও কংগ্রেস জোটের ভূমিকা কি ছিল তা নিয়ে আলোচনা করা?

প্রথমেই আসা যাক বিজেপির কথায়। 2019 সালের লোকসভা নির্বাচনে 18 টি আসনে জয়ী  হয়ে বিজেপি এবার মনে করেছিল তারা ক্ষমতা দখল করবে। বস্তুত সাধারণ মানুষের মধ্যে ও বিজেপির এই স্লোগান, ‘উনিশে হাফ ও একুশে সাফ’ যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল। একদিকে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ ও এক গুচ্ছ নেতামন্ত্রীর প্রচার ও অন্যদিকে মিডিয়ার কভারেজের কারণে মনে হচ্ছিল এবারের নির্বাচনে মূল লড়াই তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে এবং বিজেপি এই নির্বাচন জিততে ও পারে। তাহলে প্রশ্ন হল কি এমন ঘটল যে বিজেপি 77 টি আসনেই সীমাবদ্ধ রইল?

মূলত যে বিষয়গুলি উঠে এসেছে তা হল বিজেপির প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ছিল দলবদলু নেতা, এই দলবদলুদের সাধারণ মানুষ ভালো চোখে দেখেনি। আসলে এতদিন যারা শাসকদলের হয়ে যাদের উপর অত্যাচার করেছে এখন তারাই এসে নেতা হলে দলের নিচুতলার কর্মীদের মনোবল যাবে কোথায়? বস্তুত নিজেদের মধ্যে অন্তর্দন্দ ও ভুল নীতির কারণে বিজেপি থেকে বহু মানুষ দূরে সরে যায়।

এবার আসা যাক ভিন্ন প্রশ্নে বিজেপির রাজনৈতিক ক্যাম্পেন বড্ড বেশি মোদী নির্ভর। এটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই যে মোদীর জনপ্রিয়তা পশ্চিমবঙ্গে ও বিশাল, তবে পশ্চিমবঙ্গের লোকাল সমস্যা যেগুলি বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেগুলি নিয়ে তিনি কম কথা বলেন, এর চেয়ে জাতীয় বিষয় নিয়ে কথা বলতে তিনি বেশি আগ্রহী ছিলেন যা বিজেপির বিরুদ্ধে যায়। আসলে দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সব জায়গার ছোটখাটো বিষয় জানা সম্ভব নয়, তাই পরিচিত স্থানীয় স্তরের নেতা উঠে না আসার ফলে বিজেপি দুর্বল হয়। বিজেপির আর একটি সমস্যা হল এখন পর্যন্ত এই দলের সাংগঠনিক ভিত্তি খুবই দুর্বল তাই শুধু মোদীর ভরসাতেই বাংলা জয় হবে এটা ভাবা যথার্থ নয়।

বহুক্ষেত্রে দেখা যায় বিজেপি হিন্দু ভোটকে একত্রিত করার চেষ্টা করে। যোগী আদিত্যনাথের মতো নেতা লাভ জেহাদ, অ্যান্টি রোমিও গ্রুপ, গোহত্যা বন্ধ ইত্যাদির মতো বিষয় নিয়ে বলে। বলাইবাহুল্য উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে অচল। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এতটা ধর্মান্ধ নয় যে শুধু রাম, লাভ জেহাদ, গো হত্যা ইত্যাদির নামে ভোট দেবে, অন্যদিকে দিলীপ ঘোষের মতো নেতার বহু ক্ষেত্রে ‘চামড়া গুটিয়ে নেব’ ইত্যাদি মন্তব্য মানুষ ভালো চোখে দেখেনি। আসলে মানুষের কাছে একটা বড় সমস্যা এসে দেখা দেয়, বেশিরভাগ মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসের ধর্মান্ধ, সাম্প্রদায়িক ও নোংরা রাজনীতিতে অতিষ্ঠ কিন্তু বাম মনোভাবাপন্ন বহু মানুষের মনে হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ে বিজেপি আরও বেশি ভয়ংকর এই কারণ হেতু তাঁরা বিজেপিকে রুখতে ঢালাও ভাবে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে। বামেদের ‘নো ভোট টু বিজেপি’ ক্যাম্পেন এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া ও বিজেপির আত্মতুষ্টি ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস বুমেরাং হিসাবে ফিরে এসেছে। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ্য রাজনীতিতে কোন পদক্ষেপই ভুল বা ঠিক বলা যায় না কারণ যে দল জয়ী হয় তাঁর পক্ষে সকলে কথা বলে এবং পরাজিত হলে তাঁর সমস্ত পদক্ষেপ নিয়ে সমালোচনা হয়, এক্ষেত্রে ও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি!

যাইহোক তোষামোদি মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীরা যাই বলুক না কেন প্রকৃত সত্য হল পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে দুই তিনটি আসন থেকে 77 টি আসনে উঠে আসা সহজ বিষয় নয়। তাই ক্ষমতায় আসতে না পারলেও বিজেপি কিন্তু প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করেছে। তবে একটা কথা উল্লেখ্য নির্বাচনের পর যেভাবে বিরোধীদের উপর অত্যাচার চালানো হচ্ছে ও গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ করার চেষ্টা চলছে তা মোটেই কাম্য নয়! আজ যে বাম ভোটাররা মনে করেছে তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ে বিজেপি বেশি ক্ষতিকর, তাঁদের এই মনোভাব পরিবর্তন হতে বেশি সময় লাগবে না। বলাইবাহুল্য ঘটনা কিন্তু সে দিকেই এগোচ্ছে তাই তৃণমূল কংগ্রেস যদি নিজেদের সংশোধন না করে তাহলে আগামী দিনে তাঁদের কপালে দুঃখ রয়েছে।

এবার আসা যাক বাম, কংগ্রেস ও আইএসএফ জোটের প্রশ্নে। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ঘটনা যেটি ঘটেছে তা হল পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এই প্রথমবার বাম কংগ্রেস শূন্য বিধানসভা গঠিত হতে চলেছে। বস্তুত বাংলার জন্য এর চেয়ে লজ্জার আর কিছুই নেই। এখন প্রশ্ন হল বাম ও কংগ্রেসের এই হাল হলো কেন? প্রথমত একটি কথা বলা যায় নির্বাচনের ফলাফল কোন একটি কারণে সংগঠিত হয় না তবে এই ফলাফলের সবচেয়ে বড় কারণ হল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বাড়বাড়ন্ত।

একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস যেখানে মুসলমানদের বোঝাতে চাইছে বিজেপি এলে তাঁরা তোমাদের হত্যা করবে, দেশছাড়া করবে ইত্যাদি ইত্যাদি, অন্যদিকে বিজেপির প্রচার হল মমতা ব্যানার্জির ঢালাও মুসলমান তোষণের কারণে পশ্চিমবঙ্গ কার্যত পশ্চিম বাংলাদেশে পরিণত হবে। তাই কার্যত এই রকম সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িক প্রচার যখন সংগঠিত হয় তখন বামেদের কৃষকের ফসলের দাম, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, বেকারদের চাকরি, প্রতি বছর এসএসসি পরীক্ষা, টেটে নিয়োগ, রেড ভলান্টিয়ার্সদের সহযোগিতা এগুলি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে।

আসলে তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে বামেদের ফসলের দাম, শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, চাকরি ইত্যাদি বিষয়গুলি তখন বড্ড ম্যাড়মেড়ে মনে হয় বরং তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধ শক্তি হিসাবে বিজেপির গ্রহণযোগ্য অনেক বেশি মনে হয়, এটাই মূল কারণ যার ফলে মানুষ বাম রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের হয়তো এটাই কৃতিত্ব সমাজে ব্যাপক অর্থে সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি এবং Criminalization of politics এর প্রসার। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ, অনুপ্রাণিত বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া যাই বলুক না কেন, আসল সমস্যা হল পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বর্তমানে ‘ধর্মের আফিমের নেশায় বুঁদ’ হয়ে রয়েছে। তাই তাঁদের কাছে এখন ধর্মই মুখ্যবিষয় হয়ে উঠেছে, তাই এই আফিমের নেশা যতক্ষণ না  কাটে ততক্ষণ তাঁরা জীবন যন্ত্রণার কথা ভাববে না এবং বাম মতাদর্শের প্রাসঙ্গিকতা ও খুঁজে পাবে না।

তবে বামেদের এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে আইএসএফের মতো চরম সাম্প্রদায়িক একটি দলের সঙ্গে সমঝোতা করা। ফুরফুরা শরিফের পীর আব্বাস সিদ্দিকি তিনি শরিয়ত পন্থায় বিশ্বাসী তাই কোন অভিনেত্রীকে গাছে বেঁধে মারা এগুলিকে তিনি ন্যায়সঙ্গত মনে করেন। এমন এক নোংরা মানসিকতার হুজুরকে বামেরা কিভাবে নিজেদের জোট সঙ্গী করল সেটাই বুঝে উঠতে পারি না। যদি ও কিছু কিছু বাম নেতা মনে করেন আব্বাস সিদ্দিকি নির্বাচনে কোন সাম্প্রদায়িক কথা বলেননি তিনি মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন তাই তিনি সাম্প্রদায়িক নন।

এমন শিশুসুলভ যুক্তি বামেদের দীনতার প্রকাশ ঘটিয়েছে, কারণ একটি মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায় যখন সে তাঁর বন্ধু বা নিজের জগতে থাকে, বড়িতে বা বড়দের সামনে সে কিছুটা সমঝে চললে ও বন্ধুদের মাঝেই তাঁকে প্রকৃত চেনা যায়। তেমনি আব্বাস সিদ্দিকিকে প্রকৃত চেনা যায় তাঁর ওয়াজের মাধ্যমে, তিনি তাঁর ওয়াজে আর পাঁচটা হুজুরদের মতো যেভাবে ভিন্ন ধর্মের মানুষকে অপমান করেছেন এবং নরী বিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন এথেকেই বোঝা যায় তিনি দেশে শরিয়তি বিধান প্রতিষ্ঠা করতে চান অথচ এই আব্বাস সিদ্দিকিকে অসাম্প্রদায়িক বলা ‘ভবের ঘরে চুরি করার সমতুল্য’। এই আব্বাস সিদ্দিকির আসল উদ্দেশ্য হল রাজনীতির ময়দানে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠা এবং পরিচিত হয়ে উঠলে নতুন ধরনের মুসলিম লীগের জন্ম দেওয়া। অথচ দুঃখের বিষয় হল এদের উত্থান হচ্ছে তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষ বামেদের হাত ধরে যা সত্যিই খুবই দুঃখজনক! বামেদের এই জোটের কারণেই অনেকে বামেদের মুসলিম লীগের সমতুল্য মনে করেছে এবং বামেদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাই বামেদের এই নীতিহীনতা দেখলে সত্যিই খুবই কষ্ট হয়!

তবে এখানে একটা কথা বলতে হয় মমতা ব্যানার্জি যেভাবে তৌহা সিদ্দিকি, সিদ্দিকুল্লা চৌধুরি, বরকতির মতো মোল্লাদের দিয়ে যেভাবে নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চালিয়ে গেছে সেখানে বামেরা হয়তো ভেবেছে আব্বাস সিদ্দিকির মাধ্যমে যদি কিছুটা মুসলমান ভোট  ব্যাংককে ফিরিয়ে আনা যায়। মিডিয়া অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার ফলে আব্বাস সিদ্দিকির এই প্রসার। আসলে মমতা ব্যানার্জির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই বামেরা নিয়ন্ত্রিত পথে আইএসএফের সঙ্গে জোট করে। তবুও এটা বলা অসঙ্গত হবে না যে বামেদের এই নীতি বর্হিভূত কাজ তাঁদের আরও অপ্রাসঙ্গিক হতে সাহায্য করেছে, তাই যত দ্রুত এই জোট থেকে বামেরা বেরিয়ে আসতে পারবে ততই মঙ্গল!

এছাড়া বামেদের যেটা প্রয়োজন বস্তাপচা স্লোগান না আউড়ে যুগোপযোগী স্লোগান তৈরী করা, দলের মধ্যে আত্মসমালোচনা করা, বিপদে কর্মীদের পাশে থাকা, নিজেদের নৈতিক হার স্বীকার করে দায়িত্বশীল ব্যাক্তিদের পদত্যাগ করা এবং নতুন মুখগুলিকে তুলে আনা, বৃদ্ধতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে আরও নতুন মুখদের রাজনীতিতে তুলে আনতে না পারলে বামেরা আগামী দিনে শেষ হয়ে যাবে। তবে আশার কথা হল এই নির্বাচনে দেখা গেছে যেখানে যেখানে তরুণ প্রজন্মকে প্রার্থী করা হয়েছে সেখানে সেখানে বামেরা ভালো ফল করেছে আগামী দিনে ও এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। বাম নেতাদের আত্মসমালোচনা করতে শিখতে হবে এবং মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, সেই সঙ্গে ব্যাপক সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যাবহার ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় নিজেদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে তবেই ফিরে আসার পথ প্রস্তুত হবে।

বস্তুত এত কিছু না পাওয়ার মধ্যে ও বামেদের তরুণ রেড ভলান্টিয়ার্সরা যেভাবে অতিমারিতে  সাধারণ মানুষকে সাহায্য করে যাচ্ছে তা প্রশংসার দাবি রাখে! এভাবেই মানুষের পাশে থাকতে হবে এবং তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে আসতে হবে, তবেই বামেরা আবার ফিরে আসবে। পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে যদি কেউ ভাবে বামেরা শেষ হয়ে গেছে তাঁরা মূর্খের স্বর্গ রাজ্যে বাস করছে কারণ বামেদের আদর্শ আছে তাই পার্টি পরাজিত হলেও এই পার্টি কিন্তু আগামী দিনে ও থাকবে অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস কিন্তু ভোটে হারলে পার্টিটাই রাতারাতি শেষ হয়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে। যাক এভাবেই লড়াইয়ের ময়দানে থাকতে হবে, তবেই ফিরে আসা সম্ভব।

এবার আসা যাক কংগ্রেসের কথায়। পশ্চিমবঙ্গে  কংগ্রেস মূলত মালদা, মুর্শিদাবাদ, উওর দিনাজপুর ইত্যাদি জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অধীর চৌধুরির গড়ে এতদিন কেউ দাঁত ফোটাতে পারেনি কিন্তু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বলি হয়ে আজ অধীর চৌধুরি ও তাঁর গড় রক্ষা করতে পারেনি এটা বাংলার জন্য শুভ সংকেত নয়! বস্তুত বাম ও কংগ্রেসের পরাজয়ের ফলে বাংলার সংস্কৃতি, বাংলার শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির পরাজয় সম্পন্ন হয়েছে। তাই আগামী দিনে বাংলায় কি হবে বলা কঠিন। কংগ্রেসকে ও নতুন করে ভাবতে হবে কিভাবে বাংলায় প্রাসঙ্গিক হওয়া যায়?

এখন অনেকেই হয়তো বলবেন এই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের এই অভূতপূর্ব সাফল্যের ফলে, তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত দুনীর্তি ও অপশাসনের অভিযোগ গুরুত্বহীন হয়ে গেল। তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি নির্বাচনে জেতা মানেই সমস্ত অপরাধ মুছে গেল তা কিন্তু নয়, সময় হলে ঠিকই বিচার হবে।

□ এখন প্রশ্ন হল আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কি?

চারিদিকে যেভাবে মিথ্যা খবর পরিবেশন করা হচ্ছে তাঁতে সত্য চাপা পড়ে যাচ্ছে। বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ারা যেভাবে অনুপ্রাণিত হয়ে যাচ্ছে সেখানে সত্য কথাটি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা মানুষ এই নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে জানতে চাই কিন্তু তাঁরা সঠিক বিশ্লেষণটি পাচ্ছে না। তাই নিজের বিবেকের তাড়না থেকে এই লেখা। জানি অনেকেই বললেন শাসকদল যেহেতু জিতেছে তাই এই কথাগুলি মূলহীন, তবে এটা বলতে চাই শাসকদল নির্বাচনে জিততে পারে তবে, বর্তমান সমাজের রূপ তুলে ধরা একজন সচেতন নাগরিকের কর্তব্য। সেই কাজটিই করে চলেছি, আগামী দিনে কি হবে জানি না তবে এই লেখাটি বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এক ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে থাকবে। যখন বড়ো বড়ো মিডিয়া হাউস ও বুদ্ধিজীবীরা সত্য প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছে তখন এক সাধারণ মানুষের প্রকৃত সত্য তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রয়াস!

পরিশেষে বলা যায় এই নির্বাচনে শাসকদল জয়ী হলে ও পরাজিত হয়েছে বাংলার বিবেক, বাংলার সংস্কৃতি, লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক যুবতীদের বাঁচার আশা, তাই আগামী দিনে উত্তরণের পথ সহজ নয়! বাংলা জন্য দুর্দিন যেন অপেক্ষা করছে। তবুও আমরা আশাবাদী মমতা ব্যানার্জি নিজের অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে হয়তো এবার নিজের প্রতিশ্রুতি পালনে মনোনিবেশ করবেন, বেকার যুবক যুবতীদের দুঃখ ঘোচাবেন, রাজনৈতিক হিংসা মুক্ত বাংলা গড়ে তুলবেন, আমরা স্বপ্ন দেখি তিনি আমাদের কাঙ্খিত সোনার বাংলা গড়ে তুলবেন। যদিও নিন্দুকেরা বলেন তিনি বাংলাকে আরও অস্তাচলে আরও ধ্বংসের দিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাবেন! যাইহোক মমতা ব্যানার্জির শাসনকাল ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে না ইতিহাসের আবর্জনার আস্তাকুড়ে নিক্ষেপিত হবে, তাঁর উত্তর একমাত্র সময়ের গর্ভেই নিহিত রয়েছে!

তথ্যসূত্র:-

1) উইকিপিডিয়া।

https://en.m.wikipedia.org/wiki/2021_West_Bengal_Legislative_Assembly_election

2) Times of India.

https://timesofindia.indiatimes.com/india/khela-over-mamata-is-didi-beyond-bengal/articleshow/82361391.cms

https://timesofindia.indiatimes.com/city/kolkata/brand-mamata-bengali-pride-caste-math-neutralised-bjp/articleshow/82377726.cms

3) Indian Express.

https://indianexpress.com/article/opinion/post-poll-violence-in-bengal-must-stop-7301863/

4) আনন্দবাজার পত্রিকা।

https://www.anandabazar.com/india/wb-election-assembly-election-results-2021-mha-asks-government-for-report-over-post-poll-violence-in-west-bengal-dgtl/cid/1279162

5) গণশক্তি।

&category=0&date=2021-05-12&button=

6) TV 9 Bengala.
https://tv9bangla.com/elections/puducherry-elections-2021

7) বাংলার বার্তা।

8) আরামবাগ টিভি।


ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

11 − = 4