-প্রিয়তমা নিপা পারভীনের আগে আমার মৃত্যু-

যখন আমার মৃত্যু হবে তোমার আগে।  যেহেতু আমি নাস্তিক। আমার শরীর আগেই ডোনেট করে দিয়েছি, তাই আমার কোন কবর থাকবে না , যদি থাকত, তবে সত্যি চাইতাম তোমার দুই স্তনের মাঝে আমার কবর হয়।

যখন লাশ কাটা ঘরের সামনে গিয়ে দাড়াবে হয়তো দিন বা রাত হবে।  অদ্ভুত বিষন্ন একটা ঘর, আধো আলো আধো অন্ধকার, চারিদিক সুনশান নিরবতা, দায়িত্বে থাকা মানুষ টি যখন সামনে এসে দাড়াবে, তোমার কয়েক মুহূর্ত সময় লাগবে,  তুমি আসলে ‘কাকে’ দেখতে এসেছ সেটা বলতে। কি বলবে তুমি, তুমি আমার কে হও।

লো পাওয়ারের বাল্ব এর, আলোতে দেখবে মেঝে তে শুয়ে আছে ২/৩ টা লাশ। সাদা প্যাকেটে মোড়ানো লাশ গুলো থেকে রক্ত গড়িয়ে জমেছে আছে মেঝেতে। সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে যাবে “ফ্রিজের” কাছে। পা কেঁপে কেঁপে উঠবে, গা-গুলানো তীব্র গন্ধ। তোমার আমার শেষ দেখাটা এভাবে হবে ভাবোনি। বাস্তবতা বোধহয় মাঝে মাঝে কল্পনাকেও হার মানায় দিবে।

ফ্রিজের প্রথন ড্রয়ারটা টান দিবে লোকটা। সাথে সাথে ভিতরে তাকাবে তুমি। না তুমি নও। লোকটা ‘ওহ’ বলে ড্রায়ারটা লাগিয়ে দ্বিতীয়টা টান দিবে।  তুমি প্রথম বারের চেয়েও দ্রুততার সাথে তাকাবে ড্রায়ারের গভীর বরফে। জীবনে প্রথম বাস্তবে দেখেব, সেই চেনা মুখ। আমার মুখ! নিথর, শিরশিরে কপালে হাত রাখতেই তোমার সাম্রাজ্য টলে উঠবে। কালো পাপড়িতে বন্ধ চোখ দুটোতে কী বিষাদ। এরপর আবারো পরম মমতায় ছুঁয়ে দেখবে আমার মুখ। না, তোমার কান্না পাবে না।।  অদ্ভুত শুন্যতা অনুভব করবে। নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাড়ানোর শক্তি পাবে না বলে ড্রয়ার টা ধরে দাঁড়িয়ে স্পষ্টত তাকিয়ে দেখবে আমাকে। আমারর না থাকা ‘তোমাকে’।

প্রচন্ড কষ্টে তোমার চেহারা জুড়ে থাকবে হাহাকার। চোখ একবারের জন্যও ঝাপসা হয়ে উঠবে তোমার চেহারা। তোমার ভালোবাসার মানুষ, কতদিন বাদে প্রথম তাকে দেখছি বাস্তবে। তুমি কেন কাদঁবে তুমি, কেন! কিছুক্ষণ বাদে নিজেই মর্গ থেকে বের হয়ে আসবে । নিজেকে আড়াল করতে চাইবে। কত স্মৃতি আমাদের। শীতার্ত স্মৃতিদের আনাগোনায় তীব্র গরমেও তোমার কেমন জানি শীত শীত অনুভূত হতে লাগবে। ভালোবাসার মানুষ টার নিথর শরীর ফ্রিজে রেখে কিভাবে বাসায় যাবো তুমি।

তুমি ভাববে কি অদ্ভুত জীবন আমাদের। ভীষণ হাসি খুশি মানুষ টা আজ শুয়ে আছে লাশ কাটা ঘরে। কোথাও কেউ নেই। তীব্র বিভৎস গন্ধের মাঝে বসে থাকবে আরো কিছুক্ষন। যেন তোমারও কোথাও যাবার নেই। কিচ্ছু করার নেই। কান্না নেই, বেদনা নেই, আপোস নেই, উপোস নেই। খুব কঠিন কিছু আটকে আছে পাজর জ়ুড়ে। তুমি নত মুখে বের হবে মর্গ থেকে। আমি শুয়ে থাকবে একা, সকালে পোষ্ট মার্টেমের অপেক্ষায়।

দেখা না হওয়া বছর কত দ্রুত গেছে। না কিচ্ছু বদলাই নি। তুমিও না- আমিও না। অনেক গুলো প্রশ্নের উত্তর মেলাতে ইচ্ছে করবে তোমার। ডোম লোকটা নিশ্চয় জেনে যাবে, আমার  হৃদয় জুড়ে কতখানি বাস্তবতা ছিলো আর কতখানি না-পাওয়া। কতখানি অন্যরা ছিলো আর কতখানি তুমি। তোমার কি জমানে কোনো কথা ছিলো? যা আমাকেই বলবে বলে রেখে দিয়েছিলে।

আমার নিথর হয়ে থাকা দেহে কী অদ্ভুত অচঞ্চলতা। তুমি আমার কপালে যখন হাত রাখবে, ভীষণ রকম কান্না পাবে তোমার। কামহীন-ক্রোধহীন-বেদনাহীন স্পর্শ। অন্যরা দোয়া পড়ার তাগাদা দিবে। বিড় বিড় করে তুমি কেবলি বলে যাবে ভালোবাসি-ভালোবাসি-ভালোবাসি। আমার চোখের পাতা দুটো কি একটু কেঁপে উঠেবে। তুমি কি প্রাণপনে তোমার কষ্ট লুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েবে।  আমার ঠোঁটে থাকবে “হারিয়ে দিয়ে গেলাম ধরনের ‘বিদ্রুপের’ হাসি”। নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকবে, যেন তোমার কোথাও যাওয়ার নেই এই বলে। তুমি তো সবকিছু থেকে লুকাতে চেয়েছিলে, হারিয়ে গেলে কেন?

সকালেই স্থায়ী ঠিকানার উদ্দেশ্যে এ শহর ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে যাবো আমি। চেনা রাস্তা টুকু পেরিয়ে গিয়ে, তোমার নিশ্চয় ফিরে আসতে ইচ্ছে করবে, অচেনা ভুবন থেকে। আমাকে গল্প শুনাতে ইচ্ছে করবে, যখন খুশি চলে এসো। পুরোনো গল্প নতুন করে শুনবে। এবার অন্তত নিজের কথা ভেবো।

 

প্রাপ্তিযোগে, পুনরায় একলা হবে তুমি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 47 = 52