ইহুদি জাতির ইতিহাস: নির্যাতন, অভিবাসন ও ধর্মীয় রাজনীতির একটি আখ্যান (শেষ পর্ব)

ইতিহাস জুড়ে ইহুদিদের যে ধর্মীয় অভিশাপের বিষয়টি বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে তার পেছনে কিছু শক্তিশালী ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। ধর্মীয় উপকথা বলে এটিকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। ধর্মীয় উপকথা মানুষের তৈরি। মানুষ যা দেখে তাই বলে। হাজার বছরের পরিক্রমায় লোকমুখে ফিরে চলা গল্প হয়ে ওঠে উপকথা, এবং উপকথা হয়ে ওঠে ধর্মীয় বাণী। ইহুদি ধর্ম ও ধর্মীয় অভিশাপ একে অপরের সাথে সংযুক্ত। এরও একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। গবেষকরা এটি নিয়ে ধর্মতাত্ত্বিক গবেষণা করেছেন, মনোজাগতিক বিশ্লেষণ করেছে্ন। পশ্চিমা দেশগুলোতেও ইহুদি বিদ্বেষ ছিল মাত্রাতিরিক্ত। আমেরিকায় নতুন করে ইহুদি বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট পশ্চিমা বিশ্বের ঘরোয়া রাজনীতিকে প্রভাবিত করে, দক্ষিণ এশিয়ার বাজার ব্যবস্থা, সমাজকে প্রভাবিত করে। অনেকে মনে করেন, এশিয়ায় ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের পেছনে অনেকটাই দায়ী ইহুদি বিদ্বেষ, ইসলামী মৌলবাদের উত্থানের পেছনেও মূল কারণ ইহুদি বিদ্বেষ।

সাইমন অব ট্রেন্ট, ইতালিয়ান শিশু। শিশুটি নিঁখোজ হওয়ার জন্য ইহুদি নেতাদের দোষারোপ করা হয়। ধারণা করা হয় তার রক্ত দ্বারা ব্লাড লিবেল রিচুয়াল পালন করা হয়েছিল।

আধুনিক ইহুদি বিদ্বেষ ও প্রাচীন ইহুদি বিদ্বেষ কি একই সূত্রে গাঁথা? ইহুদি বিদ্বেষ প্রাচীন হোক বা আধুনিক তা বরাবরই হেইট ক্রাইম। ইউরোপে ইহুদিরা বাস করেছে ঘৃণা ও নিন্দার মধ্য দিয়ে। কথিত রয়েছে ইহুদিরা প্রার্থনার সময় খ্রিস্টান শিশুদের রক্ত ব্যবহার করে। এ ধরণের গুজব ইহুদিদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানরা বহুকাল লালন করেছে। প্রায় দেড় শতাধিক শিশুর নাম পাওয়া যায়, ধারণা করা হয় ইহুদিরা এদের হত্যা করেছে ধর্মীয় প্রার্থনায় শিশুর রক্ত ব্যবহারের জন্য। একে ব্লাড লিবেল রিচুয়াল বলে। একারণে হাজার হাজার ইহুদিকে মধ্যযুগে হত্যা করা হয়। জার্মানিতে ইহুদি বিদ্বেষ ছিল জাতিগত। ইহুদিরা জার্মানিতে বহিরাগত ছিল। স্থানীয়রা কখনোই তাদের আগমনকে সুনজরে দেখেনি। জার্মানরা ইহুদি বিদ্বেষকে বৈজ্ঞানিক ভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছিল। যদিও বৈজ্ঞানিক বিদ্বেষবাদ হিটলারের আবিষ্কার না। পূর্ব ইউরোপ থেকে এই ধারণার উদ্ভব হয় এবং এখন পর্যন্ত এটি বিদ্যমান। পশ্চিম ইউরোপে ইহুদি বিদ্বেষ যতটা তীব্র ছিল ততটাই তীব্র ছিল পূর্ব ইউরোপে। ৬০ লক্ষ ইহুদি হত্যা করেছে বলে হিটলার বেশি খারাপ এটা ভাবার কোন কারণ নেই। ফ্রান্সে ইহুদি সেনা অফিসার আলফ্রেড ডেফাসকে জার্মানদের পক্ষে মিথ্যা গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ১৮৯৫ থেকে ১৯০৬ পর্যন্ত ফরাসি জনগণ তীব্রভাবে বিভক্ত হয়ে যায় ইহুদি ইস্যুতে। ১৭৯০ সালের ফ্রান্সের বিপ্লবীদের ইহুদিদের দালাল ও ওল্ড জুডারি উপাধি দেওয়া হয়েছিল।

২০১৭ সালে লন্ডনের একটি দেয়ালে গ্রাফিতি ইহুদি বিদ্বেষী গ্রাফিতি পাওয়া গেছে

গোঁড়া ইহুদিদের বিরুদ্ধে ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা ইউরোপ জুড়ে সরব ছিল ইতিহাসের পুরোটা সময় জুড়ে। মধ্যযুগীয় ও আধুনিক ইহুদি বিদ্বেষ প্রভাবিত হয়েছিল প্রাচীন ইহুদি বিদ্বেষ থেকেই। প্রাচীনকালে কেউ স্বধর্ম ত্যাগ করে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করলে সামাজিকভাবে ভীষণ অবমাননার স্বীকার হতেন। রোমান ইতিহাসবিদ ট্যাসিটাস (৫৬-১২০ খ্রিস্টাব্দ) পৌত্তলিক ধর্ম ত্যাগ করে ইহুদি ধর্ম গ্রহণ করলে তাকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। ইহুদিদের সাথে শুধু পৌত্তলিকদের বিদ্বেষ ছিল না, ছিল খ্রিস্টানদের সাথেও। খ্রিস্টানরা ইহুদি সিনেগগগুলোকে ‘অত্যাচারের ঝর্ণা’ বলে অবিহিত করত। ইহুদি ধর্মের একটি অংশ থেকে সৃষ্টি হওয়া খ্রিস্ট ধর্মকে পরবর্তীতে ধীরে ধীরে ইহুদি ধর্ম থেকে পুরোপুরি আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। ওল্ড টেস্টামেন্টে যে প্রতিহিংসা পরায়ণ ঈশ্বরকে আমরা দেখতে পাই নিউ টেস্টামেন্টে সেই একই ঈশ্বরই বদলে যান প্রেম ও স্নেহের সাক্ষাৎ অবতার রূপে। নিউ টেস্টামেন্টে ইহুদিদের পাপী, দুষ্ট ও ঈশ্বরের গজবের যোগ্য হিসেবে দেখানো হয়। একই বিষয় আমরা দেখতে পাই মুসলমানদের কোরানেও। ধর্মীয় গ্রন্থের এই অবস্থানই ইহুদিদের মুহাম্মদ ও যীশু খ্রিস্টের প্রত্যাখ্যানকারী, খ্রিস্টান হত্যাকারী, মুসলিমদের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ধর্মান্ধতা ইহুদিদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের মনোভাবকে প্রভাবিত করেছিল, মুসলমানদের মনোভাবকে প্রভাবিত করেছিল। একারণেই ইহুদিরা পর্যায়ক্রমে নির্যাতনের শিকারে পরিণত করে। গবেষকদের মতে, ‘ইহুদীবাদ বিরোধিতা হ’ল এমন একটি হাতিয়ার যা প্রায় সব ইস্যুতে অত্যন্ত সফলভাবে ব্যবহার করা যায়।’ এই হাতিয়ার বহু শতাব্দী ধরে ইহুদিদের বিরুদ্ধে সফলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলাফল যে কতটা বিধ্বংসী তা প্রমাণ করে গেছেন হিটলার। এমনকি আধুনিক ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ কার্ল মার্ক্স পর্যন্ত পুঁজিবাদকে ‘জুডিয়াসিং’ বলেছিলেন। এমনকি তার একটি বই রয়েছে On the Jewish Question নামে।

গত পর্ব আমরা শেষ করেছিলাম ইহুদিদের রোমান পিরিয়ড থেকে। রোমানদের অত্যাচার শেষ হয়ে আসে যখন বাইজেন্টিন সাম্রাজ্য শুরু হয়। সেসময় রোমান সাম্রাজ্য পূর্ব ও পশ্চিম ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পশ্চিমের রোমান সাম্রাজ্য অনবরত হামলার জন্য ক্রমাগত দুর্বল হতে হতে শেষ হয়ে যায়, এবং পূর্বের রোমান সাম্রাজ্য টিকে যায় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নামে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে খ্রিস্ট ধর্ম দাপ্তরিক ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পায়। খ্রিস্টানদের সাথে ইহুদিদের সম্পর্ক আগে থেকেই মন্দ ছিল। শুরু হয় খ্রিস্টানদের দ্বারা অত্যাচারিত হওয়ার নতুন অধ্যায়। কিন্তু ৩৩০-৪০৪ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন শাসনামলে ইহুদিরা এলিয়া ক্যাপিতালাইনায় প্রার্থনার অধিকার, নাগরিক অধিকার ফেরত পায়। এলিয়া ক্যাপিতালাইনা আবার জেরুজালেম হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে সম্রাট থিয়োডোসিয়াস ইহুদিদের জন্য নতুন ডিক্রি জারি করেন। তিনি অনুধাবন করেন, যেহেতু খ্রিস্ট ধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের দাপ্তরিক ধর্মে পরিণত হয়েছে সেহেতু পৌত্তলিকরা দুর্বল হওয়ার পর খ্রিস্টধর্মের জন্য একমাত্র হুমকি হ’ল ইহুদিরা। খ্রিষ্ট ধর্মের জন্য হুমকি মানে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি। তাই তাদের সাথে এমন কিছু করা হোক যেন তারা কখনোই খ্রিষ্ট ধর্ম তথা রোমান সাম্রাজ্যের জন্য হুমকি হতে পারে। তখন ইহুদিদের সরকারী ও সামরিক সকল ধরণের কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং তাদের স্থলে খ্রিস্টানদের সম্রাটের আস্থা ভাজন হওয়ার এবং সাম্রাজ্য রক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু খাজনা আদায়ের মতো কার্যক্রমের জন্য তখনও ইহুদিরা বহাল ছিল। অবশ্য খাজনা আদায়ের ক্ষেত্রে হিসাবে কম হলে তা ইহুদিদের নিজের পকেট থেকে প্রদান করতে হতো। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের সামাজিক মর্যাদায় বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হয় সেসময়ই। ইহুদিরা তখন কোন দাস রাখতে পারত না। ইহুদি ও অ-ইহুদিদের মাঝে বিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়। ইহুদিরা অর্থ-বিত্তশালী হতে পারবে না। হিটলার ইহুদিদের দমনের জন্য যেমন ন্যুরেমবার্গ আইন প্রণয়ন করেছিলেন ঠিক তেমনই আইন প্রণয়ন করে বাইজেন্টাইনরা ইহুদিদের দমনের জন্য। প্রার্থনার জন্য ইহুদিরা সিনেগগ বানাতে পারবে না। উক্ত আইনের লঙ্ঘন করলে সেই ইহুদির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হতো, কারাবাস দেওয়া হতো, নির্বাসিত করা হতো, শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হতো। বহু ইহুদি এর বিরোধিতা করে এবং যথারীতি নিহতও হয়।

৬৩৮ খ্রিস্টাব্দের পর শুরু হয় ইসলামিক পিরিয়ড। প্রথম দিকে ইসলামিক পিরিয়ড ইহুদিদের জন্য শাপে বর ছিল। মুসলিম রাজত্বকালে ইহুদিরা হারানো মর্যাদা কিছুটা ফিরে পায়। ইহুদিদের শিল্প বাণিজ্য আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ইউরোপ থেকে আরব দেশ সমূহে যত বাণিজ্য হতো সবই ইহুদিদের মাধ্যমে হতে থাকে। ইহুদিরা ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে। সুদের ব্যবসা জমজমাট করে। মাঝামাঝি সময়ে বেশ অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে ওঠে। এরই সাথে পৃথিবীর নানান প্রান্তে থাকা ইহুদিদের একত্রিত করতে থাকে। মুসলিমরা যতদিনে জেরুজালেমে নিজেদের গোঁড়া শক্ত করতে পেরেছিলে অর্থাৎ সমস্ত বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে গিলে খেতে শুরু করে ততদিনে ইহুদিরা অনেক কিছু করে ফেলে। কিন্তু ইহুদি-মুসলিম সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে খলিফা আব্দুল মালিকের সময়কাল থেকে। তিনি জেরুজালেমের পবিত্র মন্দির ভেঙে সেখানে ডোম অব দি রক স্থাপন করেন। পাশেই তৈরি হয় আল-আকসা মসজিদ। জেরুজালেম, সিরিয়া, ইজিপ্ট, ইজরায়েল, মেসোপটেমিয়া সবই মুসলমানদের দখলে আসতে শুরু করে। দখল যত বাড়তে থাকে ইহুদিদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক তত খারাপ হতে থাকে। কিন্তু এরই মাঝে ইহুদিদের সোনালী সময় শুরু হয়ে গেছে। ইহুদিরা নিজেদের খুব অল্প সময়ের মাঝেই সংগঠিত করতে থাকে। ইহুদিরা এক স্থানে নির্যাতিত হলে অন্য স্থানে গিয়ে বসবাস শুরু করত। যেখানেই যেত সেখানে তাদের সাহায্য করার উপরে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতো। জেরুজালেম ত্যাগ করলেও ইহুদিরা স্পেনে বেশ শক্তিশালী ঘাঁটি স্থাপন করে। ১০৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ইহুদিদের সোনালী সময় শেষ হতে থাকে। ধর্ম ও সাম্রাজ্যের যে তত্ত্ব ইহুদিরা তৈরি করেছিল তারা নিজেরাই এর শিকার হতে থাকে পৌত্তলিক রোমানদের দ্বারা, একেশ্বরবাদী খ্রিস্টানদের দ্বারা ও মুসলিমদের দ্বারা। ইহুদিরা ভীষণ ধর্মভীরু জাতি। বিভিন্ন ধর্মের যে আগ্রাসন এর থেকে বাঁচার উপায় তাদের ছিল সেই ধর্ম যদি তারা গ্রহণ করত তবে। কিন্তু নিজের ধর্ম তারা ত্যাগ করেনি। ইহুদিরা যেমন তাদের ধর্মের প্রতি আসক্ত ঠিক ততটাই ধর্ম নিয়ে নিরাপত্তা হীনতায় ভোগে। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমা তাদের এমনটা বানিয়ে ফেলেছে।

১০০০ শতকে শুরু হয় ক্রুসেডর পিরিয়ডের। ক্রুসেডর পিরিয়ড হ’ল যীশু খ্রিস্টের ক্রুসিফিকেশনে যে সম্প্রদায়েরা জড়িত ছিল তাদের হত্যা করে পবিত্র ভূমি পুনরুদ্ধার করার অভিযান। মানব ইতিহাসে সংঘটিত সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান যুদ্ধ ছিল এটি। পরিচালনা করেছিল খ্রিস্টান ক্যাথলিক চার্চ। একাদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই চলেছিল। ক্রুসেডের মূল টার্গেট ছিল মুসলমানরা, এবং ইহুদিদের যেখানে যে অবস্থায় পাওয়া গেছে সে অবস্থায় তাদের উপরে গণহত্যা চালানো হয়েছিল। ধর্মের নামে এত বড় গণহত্যা, যুদ্ধ, সহিংসতা, খুনোখুনি, ঘৃণা মানুষ এর পূর্বে কখনো দেখেনি। ইহুদিরা মুসলিম ও আরবদের সাথে ক্রুসেডরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। ইউরোপ ইহুদিদের জন্য সাক্ষাৎ নরকে পরিণত হয়। তখন থেকেই ইহুদিরা ইউরোপ ছেড়ে ইজরায়েল তথা প্যালেস্টাইনে ফিরে আসতে থাকে। ইহুদিরা যখন ইজরায়েলে ফিরে আসে তখন আরব বিশ্ব শাসন করত মামলুকরা। ইহুদিরা পরে আবার ইউরোপে ফেরত যেতে থাকে ইরাক সিরিয়া মিশরের গভর্নরেরা ইহুদিদের হত্যা করতে নতুন ডিক্রি জারির পরে।

অটোমানরা এরপর আরব বিশ্বের হর্তাকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তখন পূর্ব ইউরোপ ও মুসলিমদের দেখাদেখি ইহুদিদের মাঝে একটি মুভমেন্ট শুরু হয়ে যায়। একে হাসকালাহ মুভমেন্ট বলে। ইহুদীবাদ এই মুভমেন্ট থেকে উপকৃত হয়েছিল। তখনই ইহুদি ধর্ম পুনর্গঠিত হয়েছিল, ইহুদিদের মানসিকতা ও বুদ্ধিমত্তার উন্মেষ ঘটে এই মুভমেন্টের মাধ্যমে। হাসকালাহ মুভমেন্টই পরবর্তীতে গিয়ে জাইওনিস্ট মুভমেন্টে পরিণত হয়। জাইওনিস্ট মুভমেন্টে ইহুদিরা নিজেদের অধিকার নিয়ে সরব হয়ে ওঠে। বসবাসের ভূমি দাবী করে। অটোমানদের অত্যাচারে ইহুদিরা এক পর্যায়ে প্যালেস্টাইন-ইসরায়েল ছেড়ে রাশিয়া গমন করে। কিন্তু রাশিয়াতেও ইহুদিদের বিরুদ্ধে ডিক্রি জারি করে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়।

শেষ পর্যন্ত ইহুদিরা পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ায় থিতু হয়। এখানকার মাইগ্রেশন আইন শিথিল হওয়ায় অর্ধেকের বেশি ইহুদি এই দুটি দেশে আশ্রয় নেয়। কিন্তু অষ্টাদশ শতকে পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়া রাশিয়ার সাম্রাজ্য, অস্ট্রো-হাঙ্গেরি ও প্রুশিয়ার মাঝে বিভক্ত হয়ে যায়। সে সময় ইজরায়েল শাসন করত অটোমানরা। তারা কঠিন শর্তে ইহুদীদের আবার সেখানে থাকার জায়গা দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু বেশিরভাগ ইহুদি পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়াতেই বাস করত। এই সুযোগে ইহুদিরা সেখানে নিজেদের শক্তি পুনরায় বৃদ্ধি করে, অর্থনৈতিক অবস্থা দৃঢ় করে। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ইহুদিদের মাঝে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও নিজেদের জন্য একটি দেশের দাবীর করার তাগিদ দেখা দেয়।

 

নেপোলিয়নের ফরাসি বিপ্লবের সময় ইউরোপের জনগণ প্রথমবারের মতন গণতন্ত্রের স্বাদ পায়। নেপোলিয়ন সেসময় ফ্রান্সের শাসক ছিলেন। তিনি ইহুদিদের সুযোগ দেন ফ্রান্সে এসে শান্তিতে বসবাস করার। নেপোলিয়নিক ল’ এর মাধ্যমে ইহুদিরা ফ্রান্সে সমানাধিকার পায়। ঠিক তখন থেকেই পূর্ব ইউরোপে অ্যান্টি-সেমিটিজম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। পরবর্তীতে অ্যান্টি-সেমিটিজম পশ্চিম ইউরোপে প্রবেশ করে হিটলারের নাৎসি বাহিনীকে হলোকস্টের মতো সংঘবদ্ধ অপরাধে প্রেরণা যুগিয়েছিল। পূর্ব ইউরোপের অ্যান্টি-সেমিটিজমের নিষ্ঠুর শিকার হয়েছিল বহু ইহুদি পরিবার, ইহুদি প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ, সরকারী কর্মচারী ও কর্মকর্তাগণ। একারণে তারা ফ্রান্স ত্যাগ করে আমেরিকা পারি দিতে থাকে। ইজরায়েল ও আমেরিকা ইহুদিদের বসবাসের জন্য সেফ হেভেনে পরিণত হয়।

১৮৯৭ সালে প্রথম জাইওনিস্ট কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে সেই কনফারেন্সে অঙ্গিকার করা হয় ইহুদিদের তারা স্থায়ী বাসস্থান প্রদান করবে। পূর্ব ইউরোপ ইহুদিদের পশ্চিমা সমাজের সাথে সহবস্থানের বিরোধিতা করে আসছিল সেই ফরাসি বিপ্লব থেকে। ইহুদিদের বিশ্বাস ছিল তারা এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারে যদি নিজেদের জন্য একটি ভূখণ্ড অর্জন করতে পারে। ইহুদিদের সাংস্কৃতিক পরিবেশ, ধর্মীয় আসক্তি ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের জন্য হলি ল্যান্ড জেরুজালেম ছিল তাদের জন্য উপযুক্ত স্থান এটি বিভিন্নভাবে প্রচার হতে থাকে। থিয়োডর হার্জলের এই দাবী ইহুদিদের মাঝে বেশ প্রভাব ফেলে। তখন থেকেই বহু ইহুদি পরিবার ইসরায়েলে আরবদের কাছ থেকে জায়গা জমি কিনে বসবাস শুরু করে। কনফারেন্সের পরপরই তেল আবিব প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্যালেস্টাইনে জমি ক্রয় করে বসতবাড়ি বৃদ্ধির সাথে সাথে স্কুল কলেজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন দালান, সংবাদ সংস্থা বানিয়ে আরবদের পাশাপাশি ইহুদিরা বসবাস করতে থাকে। ১৯০৪ সালে জিওনিজমের জনক হার্জলের মৃত্যুর পরে ক্যারিশমাটিক নেতৃত্বের অভাবে এই মুভমেন্টে কিছুটা ভাটা পড়লেও ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ধীরে ধীরে এই কর্মকাণ্ড চলতে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা তখন প্যালেস্টাইন স্বাধীন কোন অঞ্চল ছিল না, অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। ফলে ইহুদিরা নানানভাবে তখন থেকেই ইজরায়েল রাষ্ট্র গঠনে বাঁধার সম্মুখীন হতে থাকে।

আউশভিৎসে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ইহুদিদের একাংশ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইহুদিরা দুই পক্ষের হয়েই লড়াই করেছিল। ফলে প্যালেস্টাইনে তাদের সংখ্যা ৩৫% কমে ৮৫,০০০ থেকে ৫৫,০০০ নেমে আসে। যদিও ক্রুসেডেও ইহুদিরা মুসলিমদের পক্ষে লড়েছিল ফলে মুসলমানদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করাটা ইহুদিদের জন্য নতুন কোন বিষয় ছিল না। কিন্তু ব্রিটিশদের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি এসেছিল যুদ্ধে তাদের সমর্থন দিলে তারা ইহুদিদের একটি ভূখণ্ড প্রদান করবে। অটোমানদের পরাজয়ের পর প্যালেস্টাইন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকারি অঙ্গিকার ও বেলফোর্ড চুক্তি মোতাবেক বহু সংখ্যক ইহুদি প্যালেস্টাইনে বসবাস শুরু করে। কিন্তু সাইকস-পিকট চুক্তি মোতাবেক অটোমান সাম্রাজ্যকে ব্রিটিশ-ফ্রান্স নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করেছিল। পর্দার অন্তরালে যখন এসব ভাগ বাটোয়ারা চলছে তখন ইহুদি বসতি স্থাপন একটি আলাদা বেগ পায়। যদিও সাইকস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে প্রতিশ্রুত দেশ থেকে ইহুদিরা বঞ্চিত হয়, প্রতারিত হয়। প্যালেস্টাইন হয়ে যায় ব্রিটিশ ম্যান্ডেট। কিন্তু এতসবের পরও জমি ক্রয় করে ইহুদি বসতি স্থাপন থেমে ছিল না। তারা বসতি স্থাপন করে দেওয়াল তোলা শুরু করে যা ইহুদিরা বরাবরই করে থাকে।

 

বিশেষ করে ১৯৩৩ সালের পর নাৎসি বাহিনীর উত্থানের পর ইহুদি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য প্যালেস্টাইন হয়ে ওঠে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। ১৯৩৯ সাল নাগাদ প্যালেস্টাইনে প্রায় পাঁচ লক্ষ ইহুদি বাস করত। ফলে তখন থেকেই ইহুদি আরব সংকট ঐ অঞ্চলে তীব্র হয়ে ওঠে। তখনও ইহুদিরা ঐ অঞ্চলে সংখ্যালঘু। প্যালেস্টাইনের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩০% ছিল ইহুদি। কিন্তু ইহুদিরা প্যালেস্টাইনে নয় ইউরোপে স্বায়ত্তশাসন আশা করেছিল। অথচ ইউরোপে আগে থেকেই অ্যান্টি-সেমিটিজম এতটা তীব্র আকার ধারণ করেছিল যে ইহুদিরা নিজেদের জন্য ইউরোপে নিরাপদ কোন অঞ্চল আশা করতে পারেনি। আর ইহুদি হলোকস্ট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল ইউরোপে নিরাপদ আশ্রয় প্রার্থনা করা ইহুদিদের জন্য অলীক কল্পনা হয়ে দাঁড়ায়।

ইজরায়েল রাষ্ট্র পশ্চিম তীর ও গাজা স্ট্রিপ দখলের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেদের আধিপত্য বজায়ের চিত্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ হলি ল্যান্ডকে পার্টিশন করে দেয়। ১৯৪৯-১৯৬৭ পর্যন্ত আরব ইজরায়েল যুদ্ধে ইজরায়েল আরবদের বহু ভূমি দখল করে। বিস্তারিত আলোচনা পাবেন এই লেখায়। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় আজকের যে প্যালেস্টাইন এটি হয়ে গেছে একটি অদৃশ্য রাষ্ট্র। কেননা, পশ্চিম তীর ছিল জর্ডানের অংশ, গাজা স্ট্রিপ ছিল মিশরের অংশ। ইজরায়েল এই দুটি অংশ দখল করেছে জর্ডান ও মিশরের থেকে। স্বাধীন প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র এই দুই অংশ মিলে গঠিত। এই দুই অংশের জন্য প্যালেস্টাইনের যত সংগ্রাম যত বিপ্লব। যে রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের মধ্য দিয়ে ইসরায়েল গেছে বিগত দুই হাজার বছর ধরে, সেই রক্তক্ষয়ী অধ্যায় লিখিত হচ্ছে ইজরায়েল লিখছে নতুন করে। যা তাদের সাথে হয়েছে তা নিজেরাই করছে। ইসরায়েল পশ্চিম তীর পুরোটা দখল করতে চায় ধর্মের নামে, দেশের নামে, পবিত্র ভূমির নামে। আরবরা তা ছাড়তে চায় না ধর্মের নামে দেশের নামে, নিপীড়ন ও নির্যাতনের নামে। ইতিহাসে কাউকে ভিলেন বানায় না, কাউকে নায়ক বানায় না। নায়ক বানায় দৃষ্টিভঙ্গি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 8 = 1