২৩২: তাবুক যুদ্ধ-৫: মুনাফিকদের সংখ্যা ও উপস্থিতি!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর রচিত কুরআনের সর্বশেষ আদেশ ও নির্দেশ-যুক্ত সুরা হলো,’সূরা আত তাওবাহ’। এই সুরার ৩৮ থেকে ১২৭ নম্বর বাক্যগুলো মুহাম্মদ রচনা করেছিলেন মূলত: ‘তাবুক অভিযানের’ প্রেক্ষাপটে। মুহাম্মদের রচিত এই নব্বই-টি বাক্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় আমরা জানতে পারি: এই বাক্যগুলোর প্রায় সমস্তই মূলত: ‘তাঁরই অনুসারীদের বিরুদ্ধে’ বিষোদগার, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ হুমকি-শাসানী, ভীতি-প্রদর্শন ও প্রলোভন (বিস্তারিত: ‘সুরা তাওবাহ-শেষ নির্দেশ: এক; দুইতিন)। এই অনুসারীদের একমাত্র অপরাধ ছিল এই যে, তাঁরা মুহাম্মদের আদেশ অমান্য করে বিভিন্ন অজুহাতে তাবুক অভিযানে অংশগ্রহণে বিরত ছিলেন। মুহাম্মদ তাঁর এই অনুসারীদের ‘মুনাফিক (ভণ্ড)” নামে আখ্যায়িত করেছিলেন।

প্রশ্ন হলো, মুহাম্মদের তেইশ বছরের নবী জীবনের (৬১০- জুন, ৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) প্রায় শেষ সময়ে; তাঁর মৃত্যুর মাত্র বছর দেড়েক আগে; ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর-ডিসেম্বর মাসে (বরাবর রজব-শাবান, হিজরি ৯ সাল) এই অভিযানটির প্রাক্কালে কী এমন ঘটনা ঘটেছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে মুহাম্মদ এই বিশাল সংখ্যক বানী রচনা করেছিলেন তাঁরই অনুসারীদের (মুনাফিক) বিরুদ্ধে? তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মুহাম্মদ কী অনুমান করতে পেরেছিলেন যে তাঁর জীবনের এই প্রায় শেষ সময়ে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে মুনাফিকদের (ভণ্ড) সংখ্যা কত ও তা কত বিস্তৃত!

মুহাম্মদের রচিত ‘কুরআন’ ও আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই লিখিত পূর্ণাঙ্গ সিরাত ও হাদিস গ্রন্থের বর্ণনায় এমন কী কোন তথ্য-উপাত্ত আছে, যার মাধ্যমে মুহাম্মদের এই কর্ম-কাণ্ডের কারণ ব্যাখ্যা করা যায়? কী ঘটেছিল তখন?

মুহাম্মদ ইবনে (৭০৪-৭৬৮ সাল) ইশাকের বর্ণনা: [1] [2] [3]
(আল-তাবারীর ও আল-ওয়াকিদির বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ।)
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৩১) পর:

“মুনাফিকদের” শিবিরটি মুহাম্মদের শিবিরের চেয়ে ছোট ছিল না:

‘আল্লাহর নবী তাঁর যাত্রার প্রাক্কালে থানিয়াতুল ওয়াদার (একটি গিরিপথ যার উপর থেকে মদিনা দেখা যায়) পাশে তাঁর শিবিরটি স্থাপন করেন। আবদুল্লাহ বিন উবাই (আল-তাবারী: ‘বিন সালুল’) সেটির নিম্নাঞ্চলে ‘ধুবাব’ (থানিয়াতু’ল ওয়াদার নিম্নভাগে আল-জাবানা নামক স্থানের একটি পাহাড়) অভিমুখে আলাদাভাবে তার শিবিরটি স্থাপন করে।

কথিত আছে যে তার এই শিবিরটি তুলনায় ছোট ছিল না।

আল্লাহর নবী যখন তাঁর যাত্রা অব্যাহত রাখেন, আবদুল্লাহ বিন উবাই তাঁর কাছ থেকে পৃথক হয়ে যায় ও মুনাফিক ও সন্দেহকারীদের সাথে পিছনে অবস্থান করে। [4]

(আল-তাবারী: ‘আবদুল্লাহ ছিল বানু আউফ বিন আল-খাযরাজ গোত্রেই এক ভাই ও আবদুল্লাহ বিন নাবতাল ছিল বানু আমর বিন আউফ গোত্রের এক ভাই; আর রিফাহ বিন যায়েদ বিন আল-তাবুত ছিল বানু কেউনুকা গোত্রের এক ভাই। তারাই ছিল মুনাফিকদের মধ্যে নেতৃস্থানীয়, যারা ইসলাম ও তার অনুসারীদের ক্ষতি সাধন কামনা করছিলো। তাদের সম্বন্ধে আল্লাহ নাজিল করে: [5]

(কুরআন: ৯:৪৮) – “তারা পূর্বে থেকেই বিভেদ সৃষ্টির সুযোগ সন্ধানে ছিল এবং আপনার কার্যসমূহ উল্টা-পাল্টা করে দিচ্ছিল।”)’ — [বিস্তারিত: পর্ব-২২৯]

মুহাম্মদের সাথেই ছিল বহু মুনাফিক:

‘আসিম বিন উমর বিন কাতাদাহ হইতে < মাহমুদ বিন লাবিদ হইতে <বানু আবদুল-আশাল গোত্রের লোকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে যা বলেছে, তা হলো, সে মাহমুদকে জিজ্ঞাসা করেছিল,

“লোকেরা কি তাদের ভিতরে অবস্থানকারী মুনাফিকদের চিনতো?” [6]

সে জবাবে বলে যে লোকেরা জানতো যে তার ভাই, তার বাবা, তার চাচা ও তার পরিবারে লোকদের মধ্যে মুনাফেকি বিদ্যমান, তথাপি তারা একে অপরের-টি গোপন রাখতো।”

অতঃপর মাহমুদ বলে: আমার উপজাতির কিছু লোক আমাকে এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছে যার ভণ্ডামো ছিল কুখ্যাত। আল্লাহর নবী যেখানেই যেতেন সেখানেই সে যাত্রা করতো; যখন ‘আল-হিজরের ঘটনাটি ঘটে’ ও আল্লাহর নবী প্রার্থনা করেন যেমনটি তিনি করতেন ও অতঃপর আল্লাহ যখন এক মেঘ প্রেরণ করে যা থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হয় [তাবুক যুদ্ধের প্রাক্কালে মুহাম্মদের অলৌকিকত্ব প্রদর্শন-এ বিষয়ে আলোচনা পরবর্তীতে করা হবে।], তারা বলেছে, ‘আমরা তার কাছে এই বলতে বলতে যাই, “ধিক্ তোমাকে! এরপরে তোমার আরও কিছু কি বলার আছে?”’

সে জবাবে বলে, “এটি ছিল এক ক্ষণস্থায়ী মেঘ!” (আল-ওয়াকিদি: ‘সে ছিল আউস বিন কায়েযি; আর কিছু লোক বলে, যায়েদ বিন আল-লুসায়েত।’)

যাত্রা-কালীন সময়ে আল্লাহর নবীর উটটি দলচ্যুত হয় ও তাঁর সঙ্গীরা এটির সন্ধানে বের হয়। আল্লাহর নবীর সাথে ছিল উমারা বিন হাযম নামের এক লোক, বানু আমর বিন হাযম গোত্রের এক চাচা, যে আল-আকাবা ও বদরের সময়টিতে উপস্থিত ছিল। তার দলে ছিল যায়েদ আল-লুসায়েত আল-কেইনুকায়ি [মদিনা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ‘বানু কেইনুকা’ গোত্রের কিছু লোক মুসলমান হয়েছিল (পর্ব: ৫১)], সে ছিল এক মুনাফিক। উমারার শিবিরে অবস্থানকালীন সময়ে যখন উমারা আল্লাহর নবীর সাথে ছিল, তখন যায়েদ বলে, [7]

“মুহাম্মদ দাবী করে যে সে একজন নবী ও ঊর্ধ্বলোক (Heaven) থেকে আসা খবর সে জানাতে পারে, যেখানে সে জানে না যে তার উটটি কোথায়?”

উমারা যখন তাঁর সাথে অবস্থান করছিল, আল্লাহর নবী বলেন: ‘এক ব্যক্তি বলেছে: মুহাম্মদ যেখানে তোমাদের বলে যে সে একজন নবী ও দাবী করে যে সে ঊর্ধ্বলোকের বিষয়গুলো জানায়; অথচ সে জানে না যে কোথায় আছে তার উটটি। আল্লাহর কসম, আমি কেবল সেটাই জানি যা আল্লাহ আমাকে জানায়, আর আল্লাহ আমাকে দেখিয়েছে যে সেটি এখন কোথায় আছে। সেটি আছে এই পাথুরে নদীখাতের (ওয়াদি) অমুক-তমুক এক সংকীর্ণ উপত্যকার ভিতরে। এক গাছের সাথে তার গলার দড়িটি আটকে গেছে; অতএব যাও ও সেটিকে আমার কাছে ধরে নিয়ে এসো।” তারা যায় ও সেটি ধরে নিয়ে আসে।

উমারা তার শিবিরে ফিরে আসে ও বলে, “আল্লাহর কসম, আল্লাহর নবী এইমাত্র আমাদের এক বিস্ময়কর বিষয়ে বলেছেন যা ছিল কোন এক লোকের কিছু উক্তি, যেটি আল্লাহ তাঁকে অবহিত করিয়েছে। অতঃপর সে উক্তিগুলোর পুনরাবৃত্তি করে। তার সাথের এক ব্যক্তি যে আল্লাহর নবীর নিকট ছিল না, চিৎকার করে বলে, “কেন, তুমি আসার আগে যায়েদ এই উক্তিটি করেছিল।” উমারা যায়েদের দিকে অগ্রসর হয় ও তার ঘাড়টি চেপে ধরে বলতে থাকে, “তুই আল্লাহর বান্দা, আমার কাছে! আমার সঙ্গে এই দুর্ভাগ্য, যার কিছুই আমি জানতাম না। দুর হও, তুই আল্লাহর শত্রু, আর আমার সাথে জড়িত হবি না।” কিছু লোকের দাবী এই যে, পরবর্তীতে যায়েদ অনুতপ্ত হয়েছিল; অন্যরা বলে যে তার মৃত্যুকাল পর্যন্ত সে অমঙ্গলের আশংকা করছিল।’ [অনুরূপ বর্ণনা: আল-ওয়াকিদি; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা ৪৯৪-৪৯৫]।

অতঃপর, লোকেরা পিছিয়ে পড়া শুরু করে:

‘অতঃপর আল্লাহর নবী তাঁর যাত্রা অব্যাহত রাখেন ও লোকেরা পিছিয়ে পড়া শুরু করে। আল্লাহর নবীকে যখন জানানো হয় যে অমুক-তমুক পিছনে পড়ে আছে, তিনি বলেন, “তাকে থাকতে দাও; কারণ তার মধ্যে যদি কোন মঙ্গল থাকে তবে আল্লাহ তাকে তোমাদের সাথে যোগদান করাবে; আর যদি তা না হয় তবে আল্লাহ তোমাকে তার হাত থেকে মুক্তি দেবে।’

(আল-ওয়াকিদি: ‘মুনাফিকদের অনেক লোক তাঁর সাথে বের হয়েছিল একমাত্র লুটপাটের প্রত্যাশায় (Many people from the Hypocrites went out with him, and they did not go out except hoping for plunder) [পৃষ্ঠা ৪৯০]’) —

একদল মুনাফিকের অবজ্ঞাসূচক উক্তি:

‘একদল মুনাফিক, যাদের মধ্যে ছিল বানু আমর বিন আউফ গোত্রের ওয়াদিয়া বিন থাবিত নামের এক ভাই ও বানু সালিমা গোত্রের মিত্র আশজার [গোত্র] মুখাশশিন (তাবারী: ‘মাখশি’) বিন হুমায়ির নামের এক লোক (আল-ওয়াকিদি: ‘ও আল-জুলিয়াস বিন সুয়ায়েদ বিন আল-সামিত ও থালাবা বিন হাতিব’)। আল্লাহর নবীর তাবুক যাত্রাকালে তাঁর দিকে ইশারা করে তারা একে অপরকে বলছিল, [8]

“তোমরা কি মনে করো যে বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আর আরবদের (আল-তাবারী: ‘বানু আসফার’) মধ্যে যুদ্ধ করা সমান। আল্লাহর কসম, আপাতদৃষ্টিতে আমরা (তাবারী: ‘আমি’) দেখতে পাচ্ছি যে আগামীকাল তোমাদের-কে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হবে, যা বিশ্বাসীদের শঙ্কা ও হতাশার কারণ হবে।”

মুখাশশিন বলে,

“আমি বরং এটাই চাই যে তোমরা যা বলেছ সে বিশয়ে আমাদের সম্পর্কে একটি আয়াত নাযিল হওয়ার চেয়ে আমাদের প্রত্যেক কে একশো-টি করে চাবুক মারার দণ্ডাদেশ হয়।”

আল্লাহর নবী, যা আমি শুনেছি, আম্মার বিন ইয়াসির কে বলেন যে সে যেন ঐ লোকগুলোর সাথে যোগদান করে; এই কারণে যে তারা মিথ্যা বলেছে, আর তারা কী বলেছে তা তাদের-কে জিজ্ঞাসা করতে বলেন। ‘যদি তারা জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানায় তবে তাদের বলো যে তারা এই-সেই বলেছে।` আম্মার তাই করে যা তকে আদেশ করা হয়েছিল। [9]

অতঃপর তারা আল্লাহর নবীর কাছে এসে অজুহাত দেখায়। আল্লাহর নবী যখন তাঁর উটের উপর থেমেছিলেন তখন ওয়াদিয়া সেটির জিনের পেটি ধরে তাঁর সাথে কথা বলে, “আমরা নিছক কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম।” [কুরআন: ৯:৬৫-৬৬]।

[৯:৬৫- “আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে?”

৯:৬৬ – “ছলনা কর না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। তোমাদের মধ্যে কোন কোন লোককে যদি আমি ক্ষমা করে দেইও, তবে অবশ্য কিছু লোককে আযাবও দেব। কারণ, তারা ছিল গোনাহগার।”]

মুখাশশিন বিন হুমায়ির বলে, “হে আল্লাহর নবী, আমার নাম ও আমার পিতার নাম আমাকে বেইজ্জতি করে।”(মুখাশশীন মানে বোঝায় কঠোরতা ও অভদ্রতা, আর হুমায়ির মানে হলো এক ছোট্ট গাধা।) এই আয়াতটি-তে (৯:৬৬) যে ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হয়েছিল সে হলো মুখাশশীন ও তার নাম রাখা হয়েছিল আবদুল রহমান (আল-ওয়াকিদি: ‘অথবা আবদুল্লাহ’)।

সে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে এই বলে যে সে যেন শহীদ হিসাবে মৃত্যুবরণ ও তার মৃত্যুর স্থানটি যেন কেউ জানতে না পারে। আল-ইয়ামামার [যুদ্ধের] দিনে তাকে হত্যা করা হয় ও তার কোনও সন্ধান পাওয়া যায় নাই।’ [10] [অনুরূপ বর্ণনা: আল-ওয়াকিদি; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা ৪৯১-৪৯২]।——

লোকজন সরে পড়ে ও অংশগ্রহণে বিরত থাকে:

‘ইবনে শিহাব আল-যুহরি <ইবনে উকাইমা আল-লেইথি হইতে < ইবনে আখি আবি রুহম আল-গিফারি হইতে যা বর্ণিত, তা হলো: সে শুনেছে যে আবু রুহম কুলথুম বিন আল-হুসাইন, যে ছিল সেই অনুসারীদের একজন যারা আল্লাহর নবীর কাছে বৃক্ষটির নিচে শপথ করেছিল [পর্ব-১১৭], সে বলতো:

‘আমি যখন আল্লাহর নবীর সাথে তাবুক হামলায় অংশগ্রহণ করেছিলাম, তখন আমি তাঁর সাথে রাত্রিতে যাত্রা করি। আমরা যখন আল-আখদার নামক স্থানে আল্লাহর নবীর নিকট ছিলাম, আল্লাহ আমাদের উপর এক ঘুমে নিমজ্জিত করে ও আমার উটটি যখন আল্লাহর নবীর উটের কাছে আসে তখন আমি ঘুম থেকে জেগে উঠা শুরু করি। আমি ভীত ছিলাম এই কারণে যে যদি এটি তার খুব কাছে আসে তবে এটির পা-দানিটি (রেকাব) তাঁর পায়ে আঘাত করতে পারে। নিদ্রা আমাকে বশীভূত করার পূর্ব পর্যন্ত আমি আমার উটটি কে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া শুরু করি। অতঃপর রাত্রিকালে যখন তাঁর পা ছিল পা-দানিটির (Stirrup) মধ্যে, আমার উটটি তাঁরটির সাথে ধাক্কাধাক্কি করে ও আমি তার কণ্ঠ শুনে জেগে উঠে তাঁকে বলতে শুনি, “সতর্ক হত্ত!” আমি তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি ও তিনি আমাকে যেতে বলেন।

[১] আল্লাহর নবী আমাকে বানু গিফার গোত্রের যারা বাদ পড়েছে (dropped out) তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা শুরু করেন ও আমি তাঁকে তা বলি।

[২] অতঃপর তিনি আমাকে লম্বা বিশৃঙ্খল লাল দাড়িওয়ালা লোকদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন ও আমি তাঁকে বলি যে তারা বাদ পড়েছে।

[৩] অতঃপর তিনি ছোট কোঁকড়ানো চুলযুক্ত লোকদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন ও আমি স্বীকার করি যে তারা যে আমাদের অন্তর্ভুক্ত তা আমি জানতাম না। তিনি বলেন, “অবশ্যই হ্যাঁ, তারাই ছিল সেই লোক যারা শাবাকাতু শাদাখার (Shabakatu shadakh) উটের মালিক।” অতঃপর আমার মনে পড়ে যে তারা ছিল বানু গিফার গোত্রের অন্তর্ভুক্ত; তবে আমি তাদের স্মরণ করতে পারি না যতক্ষণে না আমার মনে পড়ে যে তারা ছিল আমাদের সহযোগী বানু আসলাম উপগোত্রের।

আমি যখন তাঁকে এটি বলি, তিনি বলেন, “কী এমন কারণ আছে যা এদের মধ্যে কেউ যে পিছনে পড়ে আছে, আমাদের সাথে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া কোন উদ্যমী ব্যক্তিকে তার উটগুলোর একটি দিয়ে সাহায্য করা থেকে বিরত রেখেছে? আমার কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো এই যে, কুরাইশদের মধ্যে মুহাজিরুন ও আনসার ও গিফার ও আসলামরা যখন পিছনে থাকে।”’ [অনুরূপ বর্ণনা: আল-ওয়াকিদি; ইংরেজি অনুবাদ পৃষ্ঠা ৪৯০।] —-

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

কুরআন ও আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি: “মুনাফিকদের ভিতর থেকে লোকেরা আল্লাহর নবীর কাছে এসে বিনা কারণে বিরত থাকার অনুমতি প্রার্থনা করে, তিনি তাদের অনুমতি দেন। যে মুনাফিকরা অনুমতি চেয়েছিল তাদের সংখ্যা ছিল প্রায় আশি জন। বেদুইনদের মধ্যে যারা অজুহাত প্রদর্শন করেছিল তারা তাঁর কাছে অজুহাত নিয়ে হাজির হয়, কিন্তু আল্লাহ তাদের অনুমতি দেয় নাই। তারা ছিল বানু গিফার (Ghifar) গোত্রের এক দল লোক; যাদের মধ্যে ছিল খুফাফ বিন ইমা বিন রাহদাহ। ‘তাদের সংখ্যা ছিল বিরাশি জন [পর্ব: ২২৯]।’—-

গত পর্বের (পর্ব: ২৩১) আলোচনায় আমরা জেনেছি, ‘কা’ব বিন মালিকের বিবৃতি:

“আমি এ বাড়ি ও অন্য বাড়িগুলোতে এমন কোন লোক দেখি নাই যারা অজুহাত ও সুস্পষ্ট ভণ্ডামির আশ্রয় নেয় নাই।” কিংবা,

“আমার আশেপাশে ভণ্ডামির জন্য অভিযুক্ত কিংবা ঐ দুর্বল লোকগুলো যাদের-কে আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছে লোকগুলো ছাড়া আর কাউকেই দেখতে পাই না।”

মুহাম্মদ অনুসারীদের অন্তরে ‘কুরআনের’ আয়াতগুলোর যে কী শক্তিশালী প্রভাব ফেলতো, তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায় ওপরে বর্ণিত বর্ণনায়; মুখাশশিন বিন হুমায়িরের এই উক্তি:

“আমি বরং এটাই চাই যে, তোমরা যা বলেছ সে বিশয়ে আমাদের সম্পর্কে একটি আয়াত নাযিল হওয়ার চেয়ে আমাদের প্রত্যেক কে একশো-টি করে চাবুক মারার দণ্ডাদেশ হয়।” (এ বিষয়ের আরও আলোচনা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে [পর্ব: ২২৯])

আল্লাহর রেফারেন্সে মুহাম্মদ ঘোষণা:
(কুরআন: ৯:৬৪) – “মুনাফেকরা এ ব্যাপারে ভয় করে যে, মুসলমানদের উপর না এমন কোন সূরা নাযিল হয়, যাতে তাদের অন্তরের গোপন বিষয় অবহিত করা হবে। সুতরাং আপনি বলে দিন, ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতে থাক; আল্লাহ তা অবশ্যই প্রকাশ করবেন যার ব্যাপারে তোমরা ভয় করছ।”

কুরআন ও আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকদের এই সকল বর্ণনায় যা সুস্পষ্ট, তা হলো:

“মুনাফিকদের সংখ্যা ছিল ‘অসংখ্য!’ আর তা ছিল ঘরে এবং বাইরে। সর্বত্রই!”

“লোকেরা জানতো যে তার ভাই, তার বাবা, তার চাচা ও তার পরিবারে লোকদের মধ্যে মুনাফেকি বিদ্যমান, তথাপি তারা একে অপরের-টি গোপন রাখতো।”

প্রতীয়মান হয় যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মুহাম্মদ নিশ্চিতই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে তাঁর অনুসারীদের মধ্যে মুনাফিকদের সংখ্যা কত বিশাল ও তা কী পরিমাণ বিস্তৃত। সে কারণেই ‘সূরা আত তাওবাহর’ দ্বিতীয় অংশে (আয়াত ৩৮-১২৭) মুনাফিকদের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর ঘোষণা, আদেশ ও নির্দেশ।

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে ইবনে ইশাকের ইংরেজি অনুবাদের অংশটি সংযুক্ত করছি; ইবনে ইশাক, আল তাবারী রেফারেন্স: বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক তথ্যসূত্র তালিকায়।]

The Narratives of Muhammad Ibn Ishaq: [1]

‘When the apostle had set out he pitched his camp by Thaniyatu’l Wada`(A pass overlooking Medina).

`Abdullah b. Ubayy (T. b. Salul) pitched his camp separately below him in the direction of Dhubab (T. a mountain in al-Jabbana below Thaniyatu’l Wada). It is alleged that it was not the smaller camp. When the apostle went on `Abdullah b. Ubayy separated from him and stayed behind with the hypocrites and doubters. (T. `Abdullah was brother of B. Auf b. al-Khazraj and Abdullah b. Nabtal was brother of B. `Amr b. `Auf; and Rifa`a b .Zayd b. al-Tabut was brother of B. Qaynuqa`. These were the principal men among the hypocrites and wished ill to Islam and its people. Concerning them God sent down: `They sought rebellion aforetime and upset things for you’). (Sura 9.48) —–

`Asim b. `Umar b. Qatadah from Mahmud b. Labid from men of B. `Abdu’l-Ashhal told me that he said to Mahmud, `Do the men know the hypocrites among them?’ He replied that a man would know that he said to Mahmud, `Do the men know the hypocrites among them? He replied that a man would know that hypocrisy existed in his brother, his father, his uncle, and his family, yet they would cover up each other.’ Then Mahmud said: Some of my tribesmen told me of a man whose hypocrisy was notorious. He used to go wherever the apostle went and when the affair at al-Hijr happened and the apostle prayed as he did and God sent a cloud which brought a heavy rain they said, `We went to him saying “Woe to you! Have you anything more to say after this?” He said, “It is a passing cloud!”

During the course of the journey the apostle’s camel strayed and his companions went in search of it. The apostle had with him a man called `Umara b. Hazm who had been at al-`Aqaba and Badr, uncle of B. `Amr b. Hazm. He had in his company Zayd al- Lusayt al-Qaynuqa’i who was a hypocrite. Zayd said while he was in `Umara’s camp and `Umara was with the apostle, `Does Muhammad allege that he is a prophet and can tell you news from heaven when he doesn’t know where his camel is?’ The apostle said while `Umara was with him: `A man has said: Now Muhammad tells you that he is a prophet and alleges that he tells you of heavenly things and yet doesn’t know where his camel is. By God, I know only what God has told me and God has shown me where it is. It is in this wadi in such-and-such a glen. A tree has caught it by its halter; so go and bring it to me.’ They went and brought it. `Umara returned to his camp and said: `By God, the apostle has just told us a wonderful thing about something someone has said which God has told him of.’ Then he repeated the words. One of his company who had not been present with the apostle exclaimed, `Why, Zayd said this before you came.’ `Umara advanced on Zayd pricking him in the neck and saying, `To me, you servants of God! I had a misfortune in my company and knew nothing of it. Get out, you enemy of God, and do not associate with me.’ Some people allege that Zayd subsequently repented; others say that he was suspected of evil until the day of his death.’

Then the apostle continued his journey and men began to drop behind. When the
apostle was told that So-and-so had dropped behind he said, `Let him be; for if there is any good in him God will join him to you; if not God has rid you of him.’ —

‘A band of hypocrites, among them Wadi’a b. Thabit, brother of B. `Amr b. Auf and a man of Ashja an ally of B. Salima called Mukhashshin b. Humayyir were pointing at (T. going with) the apostle as he was journeying to Tabuk saying one to another, `Do you think that fighting the Byzantines is like a war between Arabs: By God we (T. I) seem to see you bound with ropes tomorrow ‘so as to cause alarm and dismay to the believers. Mukhashshin said, `I would rather that every one of us were sentenced to a hundred lashes than that a verse should come down about us concerning what you have said.’

The apostle-so I have heard -told`Ammar b. Yasir to join the men, for they had uttered lies, and ask them what they said. If they refused to answer, tell them that they said so and-so. `Ammar did as he was ordered and they came to the apostle making excuses. Wadi’a said as the apostle had halted on his camel, and as he spoke he laid hold of its girth, `We were merely chatting and joking.’ (Sura 9.66) Mukhashshin b. Humayyir said, `O apostle, my name and my father’s name disgrace me.’ (Mukhashshin implies harshness, and rudeness, and Humayyir means a little donkey.) The man who was pardoned in this verse was Mukhashshin and he was named Abdul Rahman. He asked God to kill him as a martyr with none to know the place of his death. He was killed on the day of al-Yamama and no trace of him was found.’—–

‘Ibn Shihab al-Zuhri reported from Ibn Ukayma al-Laythi from Ibn Akhi Abi Ruhm al-Ghifari that he heard Abu Ruhm Kulthum b. al-Husayn, who was one of the companions who did homage to the apostle beneath the tree, say: When I made the raid on Tabuk with the apostle I journeyed the night with him. While we were at al-Akhdar near the apostle God cast a heavy sleep on us and I began to wake up when my camel had come near the apostle’s camel. I was afraid that if it came too near his foot would be hurt in the stirrup. I began to move my camel away from him until sleep overcame me on the way. Then during the night my camel jostled against his while his foot was in the stirrup and I was wakened by his voice saying, `Look out.’ I asked his pardon and he told me to carry on.

The apostle began to ask me about those who had dropped out from B. Ghifar and I told him. He asked me about the people with long straggling red beards and I told him that they had dropped out. Then he asked about the men with short curly hair and I confessed that I did not know that they were of us. `But yes,’ he said, `they are those who own camels in Shabakatu shadakh.’ Then I remembered that they were among B. Ghifar, but I did not remember them until I recalled that they were a clan of Aslam who were allies of ours. When I told him this he said, `What prevented one of these when he fell out from mounting a zealous man in the way of God on one of his camels? The most painful thing to me is that muhajirun from Quraysh and the Ansar and Ghifar and Aslam should stay behind.’ —-

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬০৪-৬০৯
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী; ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ৫০-৫১ ও ৫৩-৫৮
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[3] “কিতাব আল-মাগাজি”- আল-ওয়াকিদি, ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ৯৯৫-৯৯৬ ও ১০০০-১০১০; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail & Abdul Kader Tayob, পৃষ্ঠা ৪৮৭-৪৮৮ ও ৪৯০-৪৯৫
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[4] Ibid ইবনে ইশাক: ইবনে হিশামের নোট নম্বর ৮৬০, পৃষ্ঠা ৭৮৩: ‘তিনি মুহাম্মদ বিন মাসলামা আল-আনসারী-কে মদিনার দায়িত্বে নিয়োজিত রাখেন। আবদুল আযিয বিন মুহাম্মদ তার পিতা হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে বলেছেন যে, তাবুক যাত্রার প্রাক্কালে তিনি সিবা বিন উরফুতা-কে (আল-তাবারী: ‘বানু গিফার গোত্রের এক ভাই) মদিনার দায়িত্বে রাখেন’।

[5] কুরআনের উদ্ধৃতি ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ কর্তৃক বিতরণকৃত তরজমা থেকে নেয়া। অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। http://www.quraanshareef.org/
কুরআনের ছয়জন বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদকারীর ও চৌত্রিশ-টি ভাষায় পাশাপাশি অনুবাদ: https://quran.com/ ]

[6] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৩৭৮: ‘মাহমুদ বিন লাবিদ ছিলেন একজন আনসারী। তিনি ছিলেন তাবিউন বা “অনুসারী” ও তিনি মদীনায় আইনী মতামত দিতেন।’

[7] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৩৮০: ‘উমারা বিন হাযম – ‘দ্বিতীয় আকাবা শপথ’ প্রাক্কালে তিনি উপস্থিত ছিলেন ও ইয়ামামার যুদ্ধে [৬৩২ সাল] তিনি নিহত হোন।’

[8] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৩৯৬: আশজা – ‘ঘাতাফান গোত্রের এক উপগোত্র।’

[9] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৪০২: ‘আম্মার বিন ইয়াসির – তিনি ও তাঁর স্ত্রী ইসলামের প্রথম দিকে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন ও তাঁরা প্রচণ্ড নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তিনি তাঁর জ্ঞানার্জন, তাকওয়া ও ইসলামের প্রতি একনিষ্ঠতার জন্য সুপরিচিত। তিনি ৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ৩৭ সাল) সিফফিনের যুদ্ধে নিহত হোন। তিনি প্রথম দিকের শিয়াদের চার স্তম্ভের একটি হিসাবে বিবেচিত।’

[10] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৪০৭: ‘আল-ইয়ামামা হলো মধ্য আরবের এক জেলা, যেখানে আল-ইয়ামামার যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ ও তাদের বিপক্ষে বানু হানিফা গোত্রের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ‘ভণ্ড নবী’ মুসায়েলিমাহ। এই যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী হলেও প্রচুর ক্ষয়-ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল।’

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 2 =