তোমার দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ হোক আমার

একটি মাছ পেটভর্তি ডিম নিয়ে শেষবারের মতো বাঁচতে চেয়েছিল। মাছটি বলেছিল, আমাকে ছেড়ে দেওয়া হোক। ডিম ফুটে আমারও বাচ্চা হবে, ছেলেমেয়ে হবে, আমি মা হব জলের খুব গভীরে, আরও গভীরে একটি শেওলার ঘরে বেড়ে উঠবে বাচ্চারা। কিন্তু তার স্বপ্নগুলো ভেঙে গেল কোনো এক জেলের জালে। তারপর তার স্বপ্নগুলো এ হাট-ও হাট, এদিক-ওদিক করতে করতে ফিশ ফ্রাই হলো কোনো এক বাবুর্চির দুহাতে। আমরা খেয়ে মজা নিয়ে যাই, আনন্দ আর উপভোগে কিন্তু পেটভর্তি ডিম নিয়ে একটি মাছের মা হওয়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।

যখন দেশে ছিলাম আমার খাটে ৩টা বালিশ থাকত, দুটো বড় একটা ছোট । ছোট বালিশটার ডানে বামে আবার চার আঙুল যায়গা থাকে। ভাল করে খেয়াল করলে বোঝা যেতো, এই বিছানার উপরে ওই বড় বালিশ দুটোর আসলে তেমন কোন অধিকার নেই, বিছানার উপরে যত অধিকার তার ৮০ ভাগ ওই ছোট বালিশটার। আর এই ছোট বালিশে ঘুমাতো একটা ছোট প্রাণী, আমার কুকুর। কি পরম নির্ভরতায় সে আমার পাশেই শুয়ে থাকতো, সে মোটেও ভাবতো না, পৃথিবীর সব চেয়ে হিংস্র প্রাণী মানুষের পাশে সে শুয়ে আছে। যে মানুষ তাকে মেরে ফেলার ক্ষমতা রাখে কিংবা আমার একটা হাত ঘুমের মধ্যে তার উপরে পড়লে সে ব্যথা পাবে! এই নির্ভরতা, এই বিশ্বাস, অসাধারণ।

উপরে এত কথা কেন লিখলাম এবার বলি,
প্রথম আলোতে দেখলাম, একটা মেয়ে তার বাসায় আত্মহত্যা করেছে ভালোবাসার জন্য । এভাবে রোজ কেউ না কেউ ভাবছে হারিয়ে যাই, জীবন থেকে পালিয়ে যাই। আমরা দুঃখ দিনের সঙ্গী হই , কষ্টগুলো ভাগ করি আর শেখাই জীবন ভালবাসতে। আজ আপনি আপনার প্রিয়জনটিকে অবহেলা করে ফোন দিলেন না । সে আজ রাতে না ঘুমিয়ে বালিশ ভেজালো ।আপনি তাকে যতই ভালোবাসুন না কেনো, তার এই কান্নায় আপনি এক ধরণের ভালো লাগা অনুভব করবেন । পরের দিনও আপনি তাই করবেন । আবার সেই অবহেলা । এবারও খোঁজ নিয়ে জানতে পারবেন এদিকে সে চোখের পানি ঝরাতে ব্যস্ত । আপনি ভাববেন, “বাহ ! সে তো আমাকে খুব ভালোবাসে ।” আপনার ভেতরে অদ্ভুত এক ধরণের অনুভূতি হবে, বেশ ভালোও লাগবে। আপনি ভাববেন, “এভাবে যতই অবহেলা করব, সে আমাকে তত বেশি বেশি ভালোবাসবে ।” আস্তে আস্তে আপনি আরো বেশি অবহেলা করা শুরু করবেন । এভাবে একদিন হঠাৎ করেই জানতে পারবেন আপনার অবহেলা সত্ত্বেও সে আজ গভীর ঘুমে মগ্ন । তার চোখে আর পানি নেই । বুকের বামপাশটা চিনচিনিয়ে উঠবে আপনার । নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করবেন, “একি, আজ সে কাঁদলো না কেনো ? সে কি আমাকে আর ভালোবাসে না ?” আপনি নিজেও জানেননা আপনার সেই অবহেলা আপনাকে তার কাছ থেকে কত দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে । আপনার অবহেলায় সে আর কখনোই কাঁদবে না । সে হাসবে ।আপনার ভালোবাসায় সে যেমন হাসবে, তেমনি আপনার অবহেলাকেও হাসিমুখে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে । অবহেলা দিয়ে কখনো ভালোবাসা অর্জন করা যায় না । যেটা করা যায়, তা হল সম্পর্কের মাঝে একটি নিখুঁত ছেদ । ভালোবাসা অর্জন করতে হয় ভালোবাসা দিয়ে ।

অবহেলা বড়ই খারাপ জিনিস । শুধু মানুষ কেনো, কেউই এটি সহ্য করতে পারে না । বাড়ির উঠানে সারাদিন পরে থেকে যে কুকুরটি আপনার পায়ে মাথা ঘেঁষানোর দিনভর অপেক্ষা করে, সেটিকে একবার অবহেলা করে দেখুন । দেখবেন, দুইদিন পর সেই কুকুরটিও নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে আপনার উঠান থেকে । শত জনমের ভালোবাসাকে নিমিষেই নিঃশেষ করতে আপনার এক মিনিটের অবহেলাই যথেষ্ট । একাকীত্বকে যে একবার ভালোবেসে ফেলে সে কখনো কাঁদে না । দিনশেষে, আপনি আপনার আগের মানুষটিকে খুঁজবেন । কিন্তু সে তখন একাকীত্বকে আলিঙ্গন করে মুখে এক চিমটি হাসির রেখা টেনে গভীর ঘুমে চিরতরে।

কথা হলে প্রেম হয়, ভালোবাসা হয়, সম্র্পক হয়। কথা ছাড়া সম্র্পক বেশ্যাভিত্তিক সম্র্পক। ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসুন। তাকে সময় দিন যতটুকু পারেন। ভালোবাসার জন্য অজস্র টাকার দরকার নেই, একটু সময় আদর-স্নেহ-মমতা দিয়ে ভালোবাসার স্বর্গের পৃথিবী বানানো যায়।

লিখাটি শেষ করছি প্রিয়তমা নিপা পারভীনের নিকট একটি চিঠি লিখে,-

প্রিয়তমা,
অনেক আগের কথা, আমার এক বন্ধ ‘র প্রিয়তমা মারা গিয়েছিলেন ১৯৯৬ সালের দিকে। আমি ওর সাথে ওর প্রিয়তমার কবরে নিয়মিত যেতাম, দুজনে মিলে কবরের আগাছা পরিষ্কার করতাম, স্মৃতির ফলকে পেতলের অক্ষরগুলো মুছে দিতাম, কবরের চারপাশে গাছ লাগিয়ে দিতাম, তারপর ফেরার সময় ও যখন কাঁদতে থাকত, আমি তখন অন্য দিকে তাকিয়ে না দেখার ভান করে থাকতাম। মনে মনে ভেবে নিতাম, না দেখার ভান করলে এই মুহূর্তটা অদৃশ্য হয়ে যাবে।

তোমাকে হারাতে হবে ভাবনা গুলো যখন মাথায় উকি দেয় তখন আমি ভান করি, অন্য দিকে তাকিয়ে থাকি, ভাবি, অন্য দিকে তাকালেই বুঝি তুমি আজীবন আমার পাশেই থাকবে। আমি আজীবন ভান করে জেতে চাই, আমি খুব চাই, তোমার আগে আমার চুল সাদা হয়ে যাক, আমি চাই আমার স্মৃতির ফলক তুমি মুছে দাও। জীবনে অনেক তো কষ্ট দিয়েছি এটাও না হয় তুমিই কর। স্বার্থপরের মত চাই, তুমি আমার চেয়ে অন্তত এক দিন বেশি বেঁচে থাকো। তোমার দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ হোক আমার।

-অনু।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 2 =