২৩৪: তাবুক যুদ্ধ-৭: আবু খেইথামার দোদুল্যমনতা!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

কুরআন ও আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় তাবুক অভিযানের প্রাক্কালে সংঘটিত ঘটনা প্রবাহের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় আমারা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুসারীদের কার্যকলাপের যে চিত্রের সন্ধান পাই, তা ছিল মূলত: চার প্রকৃতির। প্রথম প্রকৃতির অনুসারীরা ছিলেন “মুনাফিক!” যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই অভিযানে অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছিলেন (পর্ব: ২২৯), কিংবা “শুধুমাত্র” লুটের মালের (গনিমত) প্রত্যাশায় এই অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই প্রকৃতির অনুসারীদের সংখ্যা ছিল অসংখ্য ও তাঁদের ব্যাপ্তি ছিল সর্বত্র! প্রতীয়মান হয় যে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মুহাম্মদ তা নিশ্চিতরূপেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, যার সাক্ষ্য ধারণ করে আছে তাঁরই স্বরচিত জবানবন্দী কুরআনের সুরা আত তাওবাহর নব্বইটি বাক্য (পর্ব: ২৩২)। দ্বিতীয় প্রকৃতির অনুসারীরা ছিলেন “মুমিন!” যারা বেহেশত ও গনিমত লাভের প্রত্যাশায় (পর্ব: ২১৪) এই অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন, অল্প কিছু সংখ্যক তাঁদের গাফিলতির কারণে এই অভিযানে ছিলেন অনুপস্থিত।

তৃতীয় প্রকৃতির অনুসারীরা ছিলেন এমন যারা এই অভিযানে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে মুহাম্মদের সাথে মদিনা থেকে রওনা হয়েছিলেন সত্য, কিন্তু তাবুকে পৌঁছানোর পূর্বেই তারা পথিমধ্যে থেকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন; যাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল মুমিন ও মুনাফিক উভয় দলই। আর চতুর্থ প্রকৃতির অনুসারীর যে উদাহরণ-টি আমরা জানতে পারি, তা হলো, আবু খেইথামা নামের এক মুহাম্মদ অনুসারীর উপাখ্যান। আদি উৎসের বর্ণনায় ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনা: [1] [2] [3]
(আল-তাবারী ও আল-ওয়াকিদির বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ।)
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৩৩) পর:

‘আল্লাহর নবীর রওনা হওয়ার কিছুদিন পর এক গরমের দিনে আবু খেইথামা (আল-তাবারী: ‘বানু সালিম গোত্রের এক ভাই) তার পরিবারের নিকট প্রত্যাবর্তন করে। সে তার বাগানের কুঁড়েঘর-গুলোতে তার দু’জন স্ত্রীকে দেখতে পায়। তাদের প্রত্যেকেই তার [স্ত্রীলিঙ্গ] কুঁড়ে ঘরে পানি ছিটিয়ে তা শীতল করছিল ও তার জন্য খাবার প্রস্তুত করছিল। ফিরে আসার পর সে কুঠরির দরজায় দাঁড়িয়ে তার স্ত্রীদের দিকে তাকায় ও তারা তার জন্য কি করছিল তা দেখে ও বলে:

“আল্লাহর নবী এখন সূর্যের প্রখর উত্তাপ ও বায়ু প্রবাহ ও গরম আবহাওয়ায় বাইরে অবস্থান করছে; আর আবু খেইতামা আছে এক শীতল ছায়া-বিশিষ্ট স্থানে, তার জন্য খাবার আছে প্রস্তুত ও সে তার জমিতে সুন্দরী মহিলাদের সাথে করছে বিশ্রাম। এটি ঠিক নয়। আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের কারও ঘরেই প্রবেশ করবো না ও আমি অবশ্যই আল্লাহর নবীর সাথে যোগদান করবো; অতএব আমার জন্য কিছু খাবার প্রস্তুত করো।” তারা তাই করে।

সে তার উটের কাছে যায়, তার উপর উঠে বসে ও আল্লাহর নবীর সন্ধানে বের হয় যতক্ষণে না সে তাবুকে গিয়ে আল্লাহর নবীর নাগাল ধরে ফেলে। পথিমধ্যে আবু খেইথামা (আল-ওয়াকিদি: ‘ওয়াদি আল-কুরা নামক স্থানে’) উমায়ের বিন ওয়াহাব আল-জুমাহি-কে দেখতে পায়, সে আল্লাহর নবীর সন্ধানে আসছিল। তারা সৈন্যদের সাথে এসে যোগ দেয়।

তারা যখন তাবুকের নিকটে এসে পৌঁছে, উমায়ের-কে আবু খেইথামা বলে, “আমি ভুল করেছি। আল্লাহর নবীর সাথে আমি সাক্ষাত করার পূর্ব পর্যন্ত তুমি চাইলে আমার পিছনে থাকতে পারো।” সে তাই করে। আল্লাহর নবী যখন তাবুকে তাঁর যাত্রা বিরতি দিয়েছিলেন, [তখন] সে তাঁর নিকটে এসে উপস্থিত হয়। সৈন্যরা মনোযোগ আহ্বান করে এই ঘোষণা দেয় যে রাস্তায় এক আরোহীর আগমন ঘটেছে। নবিজী বলেন যে সে হয়তো আবু খেইথামা, যা ছিল সেটিই।

সে অবতরণ করে ও অতঃপর নবীজীর কাছে যায় ও তাঁকে সালাম করে। তিনি বলেন, ‘ধিক তোমাকে, আবু খেইথামা!’ অতঃপর সে নবীজী-কে ঘটনাটি অবহিত করায়। তিনি তার সাথে ভালভাবে কথা বলেন ও তাকে আশীর্বাদ করেন।‘

আল-ওয়াকিদির অতিরিক্ত ও বিস্তারিত বর্ণনা:

‘আবু খেইথামা আমাদের সাথে পিছনে থেকে গিয়েছিল। তার ইসলাম সম্পর্কে কোন সন্দেহ ছিল না ও এটি নিয়ে নিন্দাও করা হয়নি। সে ইসলামের প্রতি লক্ষ্য রেখেছিল, যা সে মনস্থ করেছিল। আবু খেইথামার নাম ছিল আবদুল্লাহ বিন খেইথামা আল-সালামি। আল্লাহর নবীর রওনা হওয়ার দশ দিন পর সে প্রত্যাবর্তন করে ও উত্তপ্ত গরমের দিনে তার দুই স্ত্রীর সন্নিকটে আসে, তারা ছিল তাদের কুঁড়ে ঘরে। —–[বাঁকি বর্ণনা ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ]। —

ওয়াদি আল-কুরা নামক স্থানে সে উমায়ের বিন ওয়াহাব আল-জুমাহির নাগাল পায়, সে নবীর উদ্দেশ্যে আসছিলো। উমায়ের ছিল তার বন্ধু, তাই তারা একত্রে যাত্রা করে যতক্ষণে না তারা তাবুকের সন্নিকটে এসে পৌঁছে।

আবু খেইথামা বলে, “হে উমায়ের! আমি পাপ করার অপরাধে অপরাধী, যেখানে তুমি তা নও। প্রথমেই আমি আল্লাহর নবীর সাথে সাক্ষাত করার পূর্ব পর্যন্ত তুমি কি অপেক্ষা করবে না।” তাই উমায়ের অপেক্ষা করে। আবু খেইথামা আল্লাহর নবীর সম্মুখে এসে উপস্থিত হয় যখন তিনি ছিলেন তাবুকে অধিষ্ঠিত।

লোকেরা বলে, “এ হলো রাস্তার এক আরোহী।”
আল্লাহর নবী বলেন, “এ কি আবু খেইথাম?”
লোকেরা বলে, “হে আল্লাহর নবী, সে হলো আবু খেইথামা!”

অতঃপর তার উটটি-কে হাঁটু গেড়ে বসানোর পর সে তাঁর নিকটে যায় ও তাঁকে সালাম করে। আল্লাহর নবী বলেন, “তুমিই অত্যন্ত যোগ্য, হে আবু খেইথামা।” অতঃপর সে আল্লাহর নবীকে ঘটনাটি অবহিত করায়। আল্লাহর নবী তাকে বলেন, “ভালো,” অতঃপর তিনি তার জন্য দোয়া করেন।’

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

আবু আল-মালিক বিন হিশামের (সংক্ষেপে, ইবনে হিশাম; মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ) মতে আবু খেইথামার নাম ছিল, ‘মালিক বিন কায়েস; আর আল-ওয়াকিদির বর্ণনা মতে তার নাম ছিল, আবদুল্লাহ বিন খেইথামা আল-সালামি। [4]

আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যা সুস্পষ্ট, তা হলো, আবু খেইথামা একজন মুমিন হওয়া সত্বেও তাবুক অভিযানে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ছিলেন “দোদুল্যমন” অবস্থায়। অতঃপর মুহাম্মদ ও তাঁর সৈন্যরা তাবুক অভিযানে রওনা হওয়ার দশ দিন পর তিনি “তাঁর প্রিয় নবীর কষ্টের বিষয়টি অনুধাবন করে” এই অভিযানে যোগদানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন।

কমপক্ষে যে “চার জন মুমিন” তাঁদের প্রস্তুতি গ্রহণে বিলম্ব হওয়ার কারণে পিছিয়ে পড়ে ও মুহাম্মদের সাথে অভিযানে রওনা হতে ব্যর্থ হোন, আবু খেইথামা ছিলেন তাদেরই একজন। অন্য তিনজন ছিলেন: কা’ব বিন মালিক বিন আবু কা’ব, মুরারা বিন আল-রাবি ও হিলাল বিন উমাইয়া, যার বিস্তারিত আলোচনা ‘মুমিনদের গাফিলতি ও অনুপস্থিতি (পর্ব: ২৩১)‘ পর্বে করা হয়েছে! আবু খেইথামা ছিলেন ভাগ্যবান, এই কারণে যে শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর দোদুল্যমনতা পরিহার করে বিলম্বে হলেও তাবুক অভিযানে অংশগ্রহণ করে “মুহাম্মদের শাস্তি” থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। এই অভিযানে অংশগ্রহণ না করার কারণে মুহাম্মদ বাঁকি তিনজন-কে কী শাস্তি দিয়েছিলেন, তা আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকরা বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এ বিশয়ের আলোচনা যথাসময়ে করা হবে।

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬০৪- ৬০৫
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[2] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী; ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ৫২
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[3] আল-ওয়াকিদি, ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ৯৯৮-৯৯৯; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail & Abdul Kader Tayob, পৃষ্ঠা ৪৮৯
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[4] Ibid মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: ইবনে হিশামের নোট নম্বর ৮৬১, পৃষ্ঠা ৭৮৩:
আবু খেইথামা – ‘তার নাম ছিল মালিক বিন কায়েস।’

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

96 − 91 =