আননভ্রম (গল্প-৬০)

বৈঠকখানার সোফায় বসে আছেন চল্লিশ বছরের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা প্রবাল, বাসায় ফিরে মাত্রই স্নান সেরেছেন, পেটে ক্ষুধা থাকলেও খাবার রুচি নেই, কাল সারারাত ঘুমোননি আর আজ দিন প্রায় শেষ হতে চলল, ক্লান্ত অথচ চোখে ঘুম নেই। মাথার ভেতরটা এখন যেন আঠার দিনের যুদ্ধ শেষের গোধূলিবেলার বিষাদময় কুরুক্ষেত্র প্রান্তর!

তোতা থপথপ করে হেঁটে এসে কাছে দাঁড়ালে ওর মুখের দিকে তাকান প্রবাল, কিছু বলেন না, তাকিয়েই থাকেন। তোতা প্রবালের হাত ধরে বলল, ‘বাবা, মা কাঁদতেছে, চলো মা’র কাছে যাই।’

তোতার বয়স দুই বছর, এখনো ভাল করে কথা শেখেনি। তোতার বাবার সঙ্গে ঝগড়া কিংবা অন্য কোনো কারণে তোতার মা কাঁদলে তোতা ওর বাবার হাত ধরে মায়ের কাছে নিয়ে যায়। প্রবাল তোতার আহ্বানে সাড়া না দিয়ে বসেই থাকেন। তোতা আবারও প্রবালের হাত ধরে টানে আর একই আহ্বান জানায়, তারপর আবারও।

প্রবাল এবার তোতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ান, তার আঙুল ধরে আগে আগে হাঁটে তোতা, মায়ের ঘরে যায়, মা বিছানায় বসে কাঁদছেন, তোতা প্রবালকে নিয়ে মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে, ‘বাবা, মা’র মাথায় হাত বুলায়ে আদর করে দাও।’

প্রবাল চুপ কর দাঁড়িয়ে থাকেন, তোতার মায়ের দিকে তাকাতে পারেন না। তোতা মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘কাঁদে না মা, কাঁদে না।’

তারপর প্রবালের হাত নিয়ে মায়ের মাথায় রেখে বলে, ‘বাবা, মা’র মাথায় হাত বুলায়ে আদর করে দাও।’

প্রবাল তোতার মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। তোতা মায়ের গালে চুমু খেয়ে প্রবালের উদ্দেশে বলে, ‘বাবা, তুমিও মাকে একতা পাপ্পি দাও।’

প্রবাল তোতার মায়ের দিকে তাকান, জলভরা চোখে তোতার মাও এক মুহূর্তের জন্য তাকান প্রবালের দিকে, তারপর তোতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আর্তনাদ করে কেঁদে ওঠেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় প্রবাল চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকেন তোতার মা।

তোতার বাবা গতকাল রোড অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছেন, দুঃসংবাদ শুনে কালরাতে রওনা করে আজ সকালেই প্রথম এই বাসায় এসেছেন প্রবাল, পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে তোতার জন্মের পর আর এই বাসায় আসা হয়নি। প্রবালের কোলে চড়েই শ্মশানে বাবার অন্তষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা পালন করেছে তোতা। তোতার সদ্য প্রয়াত বাবা শৈবাল, প্রবালের যমজ ভাই, দু-ভাইয়ের অভিন্ন আনন।

ঢাকা
জুলাই, ২০২১।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 5 = 3