২৩৫: তাবুক যুদ্ধ-৮: আবু যর আল-গিফারীর পরিণতি!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

ইসলামের ইতিহাসে আবু যর আল-গিফারী এক পরিচিত নাম। ইমাম মুসলিমের (৮১৫-৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ) বর্ণনা মতে তিনি ছিলেন নবী মুহাম্মদের এমন একজন বিশেষ অনুসারী, যিনি মুহাম্মদ (সা:) এর সঙ্গে সাক্ষাত ও তাঁর ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার দুই-তিন বছর আগে থেকেই একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন ও নামাজ আদায় করতেন। অতঃপর তিনি যখন জানতে পারেন যে মক্কায় এক লোক নিজেকে নবী দাবী করছে, তিনি তখন তাঁর ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য তার ভাই উনায়েস-কে মক্কায় প্রেরণ করেন। উনায়েস ফিরে এসে যখন তাকে সে খবরটি জানায়, তিনি নিজে মক্কায় গমন করে মুহাম্মদের সাথে দেখা করেন ও ইসলামে দীক্ষিত হোন। [1] [2]

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে আদি উৎসে ‘তাবুক অভিযান’ উপাখ্যানের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, আবু খেইথামার মতই (পর্ব: ২৩৪) আবু যর আল-গিফারী ও “বিলম্বে” তাবুক অভিযানে যোগদান করেছিলেন। তবে তার এই বিলম্বের কারণ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এ ছাড়াও এই অভিযানের প্রাক্কালে নবী মুহাম্মদ ‘আবু যর আল-গিফারীর পরিণতি’ সম্বন্ধে এমন এক ভবিষ্যতবাণী ব্যক্ত করেছিলেন, যা পরবর্তীতে সত্যে পরিণত হয়েছিল। আদি উৎসের বর্ণনায় ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:

 

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনা: [3] [4] [5]
(আল-তাবারী ও আল-ওয়াকিদির বর্ণনা, ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ।)
পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ২৩৪) পর:

‘অতঃপর নবিজী তাঁর যাত্রা অব্যাহত রাখেন ও লোকেরা পিছিয়ে পড়া শুরু করে। আল্লাহর নবীকে যখন জানানো হয় যে অমুক-তমুক পিছনে পড়ে আছে, তিনি বলেন, “তাকে থাকতে দাও; কারণ তার মধ্যে যদি কোন মঙ্গল থাকে তবে আল্লাহ তাকে তোমাদের সাথে যোগদান করাবে; আর যদি তা না হয় তবে আল্লাহ তোমাকে তার হাত থেকে মুক্তি দেবে [পর্ব: ২৩২]।’

অবশেষে রিপোর্ট পেশ করা হয় যে আবু যর পিছিয়ে পড়েছে ও তার উটটি তাকে বিলম্বিত করেছে। নবীজীও একই কথা বলেন। আবু যর তার উটের উপরে অপেক্ষা করতো, অতঃপর এটি যখন তাকে নিয়ে ধীর গতিতে চলা শুরু করে, সে তার সাজসরঞ্জাম-গুলো তার নিজের পিঠে নিয়ে নবীজীর গমনপথ অনুসরণ করে পায়ে হেঁটে রওনা দেয়। নবিজী যখন তাঁর যাত্রা বিরতির স্থানগুলোর একটিতে অপেক্ষা করছিলেন, এক লোক তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে যে কেউ একজন রাস্তায় একাই হেঁটে আসছে। নবিজী বলেন যে তিনি প্রত্যাশা করেন যে সে হলো আবু যর; অতঃপর লোকেরা মনোযোগ সহকারে তাকিয়ে দেখার পর বলে যে লোকটি হলো সেইই।

নবিজী বলেন:

“আবু যরের উপর আল্লাহর রহমত। সে চলে একা, সে মারা যাবে একা ও তাকে উঠানো হবে একাই।”

বুরাইদা বিন সুফিয়ান আল-আসলামি <মুহাম্মদ বিন কা’ব আল কুরাযি হইতে < আবদুল্লাহ বিন মাসুদ হইতে [প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে] আমাকে বলেছে যে উসমান যখন আবু যর-কে আল-রাবাধায় (মদিনার নিকটবর্তী একটি স্থান) নির্বাসিত করে ও তার শেষ সময় উপস্থিত হয়, তখন তার কাছে তার স্ত্রী ও দাস (আল-ওয়াকিদি: ‘তার পুত্র’) ব্যতীত আর কেউই উপস্থিত ছিল না। সে তাদের এই নির্দেশ দিয়েছিল যে, তারা যেন তাকে ধৌত করে কাফনে আবৃত করে ও বাতাস করে ও তাকে রাস্তার উপর শায়িত করে। অতঃপর প্রথম যে কাফেলা-টি তার পাশ দিয়ে যাবে তাদের-কে বলে যে সে কে ও তাকে সমাধিস্থ করার জন্য তারা যেন তাদের কাছে সাহায্যে চায়। যখন তার মৃত্যু হয়, তারা তাই করে। [6] [7]

কিছু লোককে সঙ্গে নিয়ে আবদুল্লাহ বিন মাসুদ যখন হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে ইরাক থেকে আসছিল তখন হঠাৎ তারা রাস্তার উপর শবের-খাটিয়াটি দেখতে পায়, উটগুলি এটির উপর পা দিয়ে তা প্রায় নিষ্পিষ্ট করতে যাচ্ছিল। দাসটি উঠে দাঁড়ায় ও বলে, “ইনিই আবু যর, নবীজীর সহচর। তোমরা তাকে সমাধিস্থ করার জন্য আমাদের সাহায্য করো।” [8]

আবদুল্লাহ বিন মাসুদ উচ্চস্বরে কান্না শুরু করে ও বলতে থাকে, “নবীজী ঠিকই বলেছিলেন। তুমি চলেছ একা, তুমি মারা গিয়েছ একা ও তোমাকে উঠানো হবে একাই।” অতঃপর সে ও তার সঙ্গীরা তাকে সরিয়ে নিয়ে যায় ও সমাধিস্থ করে। সে তাদেরকে তার গল্প ও তাবুকের রাস্তায় নবীজী যা বলেছিলেন তা শোনায়।’

আল-ওয়াকিদির অতিরিক্ত ও বিস্তারিত বর্ণনা: [5]

‘আল্লাহর নবী যখন থানিয়াতুল ওয়াদা [পর্ব:২৩২] ছেড়ে চলে যান, তখন তিনি ছিলেন পদব্রজে। যে লোকেরা তাঁর পিছনে পিছনে ছিল, তারা বলছিলো, “হে আল্লাহর নবী, অমুক-তমুক সঙ্গে আসে নাই।” তিনি বলেন, “তাকে থাকতে দাও; কারণ তোমাদের কাছে যদি সে ভাল হয় তবে আল্লাহ তাকে তোমাদের সাথে যোগদান করাবে। যদি তা না হয়, তবে আল্লাহ তোমাদের তার হাত থেকে মুক্তি দেবে।”

মুনাফিকদের অনেকে তাঁর সাথে যাত্রা করে, তারা বের হয়েছিল একমাত্র লুটের মালের প্রত্যাশায় (Many people from the Hypocrites went out with him, and they did not go out except hoping for plunder)।

আবু যর যা বলতো, তা হলো: তাবুক অভিযানে প্রাক্কালে আমি আমার উটের কারণে বিলম্ব করেছিলাম। সেটি ছিল কৃশকায় ও রোগাক্রান্ত। তাই আমি বলি, “আমি এটিকে এক দিনের জন্য খাওয়াব ও অতঃপর আল্লাহর নবীর সাথে যোগদান করবো।” আমি এটিকে একদিনের জন্য খাওয়াই ও অতঃপর যাত্রা শুরু করি। কিন্তু যখন আমি ধুল-মারওয়া নামক স্থানে এসে পৌঁছই, এটি আমাকে ব্যর্থ করে।

আমি এটিকে একদিন যাবত পর্যবেক্ষণ করি, কিন্তু তাকে নড়াচড়া করতে দেখি না। তাই আমি আমার জিনিসপত্রগুলো নিয়ে আমার পিঠে চাপাই। অতঃপর তীব্র উত্তাপের মধ্যে আমি আল্লাহর নবীর যাত্রাপথ অনুসরণ করে রওনা হই।

লোকজন কেটে পড়ে ও আমি একজন মুসলমানকেও আমাদের সাথে যোগ দিতে দেখি নাই।

আমি মধ্যাহ্নের সময় নবীজীর নিকটে এসে পৌঁছই, আমি ছিলাম তৃষ্ণার্ত। এক পর্যবেক্ষক আমাকে রাস্তায় দেখে ফেলে ও বলে, “হে আল্লাহর নবী, নিশ্চিতই এক লোক রাস্তায় একা একা হাঁটছে।” আল্লাহর নবী বলেন “এ হলো আবু যর।” লোকেরা আমার দিকে মনোযোগ সহকারে তাকিয়ে দেখার পর বলে, “হে আল্লাহর নবী, এ হলো আবু যর!” আমি আল্লাহর নবীর পাশে না আসা পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করেন, অতঃপর বলেন:

“সম্ভাষণ, আবু যর! যে চলে একা, মারা যাবে একা ও তাকে উঠানো হবে একাই।”

তিনি বলেন, “হে আবু যর, কী কারণে তোমার বিলম্ব হলো?” সে তাঁকে তার উট সম্পর্কে অবহিত করায়। অতঃপর তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই আমার লোকদের মধ্যে তোমরা হলে সবচেয়ে শক্তিশালী, যারা আমার কাছ থেকে দূরে ছিলে। আমার কাছে পৌঁছানোর জন্য যে পদক্ষেপ তুমি নিয়েছে, তার জন্য আল্লাহ তোমার পাপ মার্জনা করবে।” সে তার পিঠ থেকে জিনিসপত্র-গুলো নামিয়ে রাখে। অতঃপর সে পানি চায়, এক পাত্র পানি আনা হয় ও সে তা পান করে।

উসমানের খেলাফতের সময়, যখন উসমান তাকে আল-রাবাধা নামক স্থানে নির্বাসিত করে ও তার নির্ধারিত সময়টি উপস্থিত হয়, তখন তার সাথে তার স্ত্রী ও পুত্র ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিল না। সে তাদের-কে নির্দেশ দিয়েছিল ও বলেছিল, “যখন আমার মৃত্যু হবে, তখন তোমারা আমাকে ধৌত ও আবৃত করার পর আমাকে রাস্তার মাঝখানে শোয়ায়ে রাখবে।” ———[অবশিষ্ট বর্ণনা, মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনারই অনুরূপ।]’

– অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ – লেখক।

আবু যর আল-গিফারী ছিলেন নবী মুহাম্মদের এমন এক সাহাবী, যিনি তার নম্রতা, তপস্যা ও ধর্মীয় শিক্ষার জন্য খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তিনি ছিলেন আলী ইবনে আবু তালিব সমর্থক ও প্রাথমিক শিয়া মুসলমানদের প্রথম চার স্তম্ভের একটি হিসাবে বিবেচিত। [9]

মুহাম্মদের মৃত্যুর পর যখন ক্ষমতার রাজনীতিতে আলী ইবনে আবু তালিব সমর্থকরা পিছিয়ে পড়ে ও মুহাম্মদের বংশের (হাশেমী বংশে) লোকদের-কে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, একপ্রকার প্রহসনের মাধ্যমে ‘আবু বকর – উমর গং’ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে (বিস্তারিত: পর্ব: ১৫৪-১৫৮), আবু যর আল-গিফারী মদিনা ত্যাগ করে সিরিয়ায় গমন করেন।

পরবর্তীতে হিজরি ৩০ সালে (৬৫০-৬৫১ খ্রিস্টাব্দ) ইসলামের ইতিহাসের তৃতীয় খুলাফায়ে রাশেদীন উসমান ইবনে আফফান ও তার সহকারী সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে নিযুক্ত মুয়াবিয়া ইবনে আবু-সুফিয়ানের সাথে আবু যর আল-গিফারী প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। পরিণতিতে খলিফা উসমানের নির্দেশে মুয়াবিয়া তাকে সিরিয়া থেকে নির্বাসিত করে মদিনায় পাঠিয়ে দেন। মদিনায় আসার পর তিনি উসমানের কাছ থেকে ‘তার দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকাণ্ডর’ সমর্থনে কোন প্রকার সাহায্য বা সহানুভূতি আদায় করতে ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি নিজেই মদিনা থেকে ‘নির্বাসিত’ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অতঃপর তিনি মদিনা থেকে আল-হিজাযের যাত্রা পথে প্রায় তিন দিনের দূরত্বে অবস্থিত ‘আল-রাবাধা’ নামের এক গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে। হিজরি ৩২ সালে (৬৫২-৬৫৩ খ্রিস্টাব্দ) সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

ইসলামের ইতিহাসের আদি উৎসে বিভিন্ন উৎসের রেফারেন্সে এ বিশয়ে আল-তাবারী যে ঘটনাগুলোর বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন, তার শুরুতেই তিনি উল্লেখ করেছেন:

‘এই বছর -অর্থাৎ, হিজরি ৩০ সাল (৬৫০-৬৫১ খ্রিস্টাব্দ) – আবু যর ও মুয়াবিয়া সম্পর্কিত ও মুয়াবিয়া কর্তৃক তাকে সিরিয়া থেকে মদিনায় নির্বাসনের (ঘটনাগুলির) বিষয় লিপিবদ্ধ করা হয়। কী কারণে সে তাকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল সে সম্পর্কে অনেক কিছু লিপিবদ্ধ করা হয়েছে,

যার অধিকাংশই আমি উল্লেখ করতে ঘৃণা বোধ করি।

যারা মুয়াবিয়ার (ব্যাপারে) এই বিষয়টি উপেক্ষা করেছে তারাই এ সম্পর্কে কাহিনী (কিসসা) বর্ণনা করেছে (যা ছিল নিম্নরূপ):

(‘In this year-that is, the year 30 (650-51)-occurred (the events) that have been recorded about the affair of Abu Dharr and Mu’awiyah, and about Mu’awiyah’s exiling him from Syria to Medina. Many things have been recorded as to why he sent him into exile, most of which I am loathe to mention. As for those who excuse Mu’awiyah in this (affair), they have told a story (qissah) about it [which runs as follows]:)

আল-তাবারীর সেই বর্ণনার সংক্ষিপ্তসার (ভলুম: ১৫; পৃষ্ঠা ৬৪-৬৮): [10]

‘’আবু আল-সাওদা (Ibn al Sawda) সিরিয়ায় আসার পর আবু যরের সাথে দেখা করে ও বলে, “আবু যর, ‘জনসাধারণের অর্থ আল্লাহর সম্পত্তি’ মুয়াবিয়ার এই ঘোষণার বিষয়টি কি তোমাকে বিস্মিত করে নাই। নিশ্চয়ই সবকিছু আল্লাহরই। [এটা] এমন যে সে মুসলমানদের বাদ দিয়ে [রাজকোষ রেজিস্টার থেকে] মুসলমানদের নাম মুছে ফেলে এটিকে [নিজের জন্য] বাজেয়াপ্ত করতে চায়।” (পৃষ্ঠা ৬৪)

অতঃপর আবু যর মুয়াবিয়ার কাছে আসে ও বলে, “কেন তুমি মুসলমান জনসাধারণের অর্থ-কে (money) “আল্লাহর সম্পত্তি’ বলে ঘোষণা করেছো?”

মুয়াবিয়া জবাবে বলে,

“আবু যর, আল্লাহ যেন তোমার প্রতি সদয় হয়। আমরা কি আল্লাহর দাস নই, জনসাধারণের অর্থ হলো তার সম্পদ, এই বিশ্ব হলো তার সৃষ্টি ও জনসাধারণের কর্তৃত্ব (আল-আমর) হলো তার কর্তৃত্ব?”

আবু যর বলে, “এই শব্দগুলো ব্যবহার করো না। আমি বলি নাই যে (জনসাধারণের অর্থ) আল্লাহর নয়, কিন্তু আমি বলবো যে, তা হলো মুসলমানদের সম্পত্তি।” (পৃষ্ঠা ৬৫)

আবু যর সিরিয়ায় জাগরণ শুরু করে ও লোকদের বলে, “হে ধনীরা, দরিদ্রদের সাহায্য করো। ‘যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও’; সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে [কুরআন: ৯:৩৪-৩৫]।”

আবু যর এইরূপ বিবৃতি অব্যাহত রাখে যতক্ষণ না দরিদ্ররা উদ্দীপ্ত হতে থাকে ও তারা ধনীদের-কে এটি করতে বাধ্য করে ও যতক্ষণ না ধনীরা তাদের এই আচরণ সম্পর্কে মুয়াবিয়ার কাছে অভিযোগ করে এই বলে যে, তারা এই লোকদের প্রতিরোধের মুখোমুখি হচ্ছে।

অতঃপর উসমানের কাছে মুয়াবিয়া চিঠি লিখে জানায়, “আবু যর আমার জন্য এক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ও তার কর্মকাণ্ড এই-এই বিষয়গুলো সাথে জড়িত।”

জবাবে উসমান তাকে লিখে জানায় যে সে যেন আবু যরের সাথে সংঘর্ষে না জড়ায় ও তাকে এক গাইডের সঙ্গে মদিনায় পাঠিয়ে দেয়। আর সে যেন যথাসম্ভব নিজেকে ও তার জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখে; কারণ সে যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তবেই সে পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে।

তাই মুয়াবিয়া একজন গাইড-কে সঙ্গে দিয়ে আবু যর-কে মদিনায় প্রেরণ করে। মদিনায় পৌঁছার পর আবু যর সা’ল পর্বতের পাদ দেশে বাড়িঘর (মাজালিস) দেখার পর বলে, “মদিনা-বাসীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা, তারা এক বিধ্বংসী আক্রমণ ও ভয়াবহ যুদ্ধের সম্মুখীন (ও ক্ষতিগ্রস্ত) হবে।” [11]

মদিনায় আসার পর আবু যর যখন উসমানের সাথে দেখা করতে যায়, উসমান তাকে বলে, “আবু যর, সিরিয়ার লোকেরা কেন অভিযোগ করছে যে তুমি তাদের আঘাত দিয়েছ?” আবু যর তাকে বলে যে “আল্লাহর সম্পত্তি” বলা উচিত হয় নাই, আর এটাও উচিত হয় নাই যে ধনীরা সম্পদের পিছনে ছুটবে। (পৃষ্ঠা -৬৬)

উসমান জবাবে বলে:
“আবু যর, আমাকে অবশ্যই আমার নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে ও প্রজাদের (রাইয়াহ) যা পাওনা আছে তা নিতে হবে। আমি তাদের তপস্বী হতে বাধ্য করতে পারি না; বরং, আমি তাদের-কে আল্লাহর আদেশগুলি মেনে চলা ও মধ্যপন্থার পথ অনুসরণ করে চলার জন্য আহ্বান জানাতে চাই।”

উসমানের এই জবাবের পর আবু যর তাকে বলে, “তাহলে আমাকে এই স্থান পরিত্যাগ করার অনুমতি দাও, কারণ আমার জন্য মদিনা বসবাসের স্থান নয়।” উসমান জবাবে বলে, “তুমি কি এর পরিবর্তে এর চেয়েও খারাপ (কোন স্থানে) যেতে চাও?” আবু যর বলে, “আল্লাহর নবী আমাকে এই আদেশ করেছেন যে যখন নির্মাণাধীন এলাকাগুলো (আল বিনস) সা’ল পর্বত পর্যন্ত পৌঁছবে, তখন আমি যেন এই স্থান (মদিনা) ত্যাগ করি।” উসমান বলে, “ঠিক আছে, তিনি তোমাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন, তাই করো।”

তাই আবু যর রওনা হয় ও আল-রাবাধা নামক স্থানে এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। উসমান তার জন্য একটি ছোট উটের পাল ও দুইজন দাস (মামলুকাইন) বরাদ্দ দেয়। পরবর্তীতে আবু যর বহুবার মদিনায় আসা-যাওয়া করে।

একদা উসমানের দরবারে থাকা অবস্থায় সে কা’ব বিন আহবার (Ka’b al-Ahbar) নামের এক মুহাম্মদ অনুসারীর মাথায় আঘাত করে ও তার মাথাটি ফাটিয়ে দেয়।

কা’বের অপরাধ ছিল এই যে সে “আবু যরের ধ্যান-ধারণার সাথে” ভিন্নমত পোষণ করেছিল। এই ঘটনায় উসমান মনক্ষুন্ন হয় ও তাকে বলে,”আবু যর, আল্লাহকে ভয় করো ও তোমার হাত ও জিহ্বাকে সংযত কর। — আল্লাহর কসম, তুমি আমার কথা শুনবে, নতুবা আমি তোমার প্রতি সহিংসতা প্রদর্শন করবো।” (পৃষ্ঠা ৬৭)।

আবু যর তার নিজ ইচ্ছায় আল-রাবাধায় চলে গিয়েছিল, এই কারণে যে, সে দেখেছিল যে উসমান তার দিকে ঝুঁকছিলেন না ও পরবর্তীতে মুয়াবিয়া তার পরিবারকে সিরিয়া থেকে বিতাড়িত করেছিল। তার পরিবারের লোকেরা যখন তার সাথে যোগদানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, তখন তাদের সাথে যে বস্তাটি ছিল তা এত ভারী ছিল যে তা বহন করায় ছিল কঠিন। তা দেখার পর মুয়াবিয়া বলে,

“এই লোকের সম্পদগুলো দেখো, যে কিনা এই পৃথিবীতে আত্মত্যাগের প্রচার করে!”

আবু যরের স্ত্রী জবাবে বলে, “না, আল্লার কসম, এতে না আছে স্বর্ণ কিংবা রৌপ্য মুদ্রা, আছে কেবল তাম্র মুদ্রা, যাতে তার সরকারি বেতন (‘আতা’) শেষ হয়ে যাওয়ার পর সে যেন আমাদের প্রয়োজনে তা থেকে অল্প কিছু মুদ্রা নিতে পারে।”

আল-রাবাধায় অবস্থানকালে উসমানের নির্দেশে প্রত্যেক দিন জবাই করা উটের একটি পা (leg) সেই অঞ্চলের খলিফার প্রতিনিধিরা আবু যর আল-গিফারী ও রাফি বিন খাদিজের (Rafi’ b. Khadij) নিকট পাঠিয়ে দিতো। এই দু’জনই মদিনা থেকে চলে এসেছিল(পৃষ্ঠা ৬৮)।’ ——-

আল-তাবারীর উপরে বর্ণিত বর্ণনায় আমরা জানতে পারি, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান তার ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও স্বার্থ সিদ্ধির প্রয়োজনে আবু যর আল-গিফারী কে বলেছিলেন: “আমরা আল্লাহর দাস, জনসাধারণের অর্থ হলো তার সম্পদ, এই বিশ্ব হলো তার সৃষ্টি ও জনসাধারণের কর্তৃত্ব হলো তার কর্তৃত্ব।”

এমনতর বাক্যগুলোর উৎস হলো, স্ব-ঘোষিত আখেরি নবী মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ! তিনি অনুরূপ বাক্য বর্ষণ করেছিলেন ‘বানু কেইনুকা ইহুদি গোত্রকে মদিনা থেকে উচ্ছেদ’ করার প্রাক্কালে (পর্ব: ৫১):

“তোমাদের জানা উচিত যে এই ভূমির মালিক আল্লাহ এবং তার রসুল।–“

অন্যদিকে, আবু যর আল-গিফারী তার প্রয়োজনে ধনীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেছিলেন, মুহাম্মদের শেখানো হুমকি: “হে ধনীরা, দরিদ্রদের সাহায্য করো। ‘যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও— (কুরআন: ৯:৩৪-৩৫)!’

মুহাম্মদ তাঁর ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও স্বার্থ সিদ্ধির প্রয়োজনে ব্যবহার করেছিলেন “তাঁর আল্লাহ-কে”। আর মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর অনুসারীরা ক্ষমতা, প্রতিপত্তি ও স্বার্থ সিদ্ধির প্রয়োজনে ব্যবহার করেছিলেন ‘মুহাম্মদ-কে; তাঁরপন্থা-কে; তাঁর আল্লাহ-কে!’ আজকের মুহাম্মদ অনুসারীরাও তার ব্যতিক্রম নয়।

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] সহি মুসলিম: বই নম্বর ৩১; হাদিস নম্বর ৬০৪৬
https://quranx.com/hadith/Muslim/USC-MSA/Book-31/Hadith-6046/

[2] সহি মুসলিম: বই নম্বর ৩১; হাদিস নম্বর ৬০৪৮
https://quranx.com/hadith/Muslim/USC-MSA/Book-31/Hadith-6048/

[3] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক: পৃষ্ঠা ৬০৬
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[4] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী; ভলুউম ৯, পৃষ্ঠা ৫৫-৫৬
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21294&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[5] আল-ওয়াকিদি, ভলুম ৩; পৃষ্ঠা ১০০০-১০০১; ইংরেজি অনুবাদ: Rizwi Faizer, Amal Ismail & Abdul Kader Tayob, পৃষ্ঠা ৪৯০
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-+Rizwi+Faizer,+Amal+Ismail+and+Abdul+Kader+Tayob&hl=en&sa=X&ved=0ahUKEwjo7JHd7JLeAhUkp1kKHTmLBGcQ6AEIKzAB#v=onepage&q&f=false

[6] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৩৯০: ‘মুহাম্মদ বিন কা’ব আল কুরাযি ছিলেন বানু কুরাইজা গোত্রের। সম্ভবত: তাঁর পিতা কিংবা পিতামহ ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তিনি ৭২৬-৭২৭ সালে (হিজরি ১০৮ সাল) মৃত্যুবরণ করেন।’

[7] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৩৯১: ‘আল-রাবাধা – মদিনা থেকে আল-হিজাযের যাত্রা পথে প্রায় তিন দিনের দূরত্বে অবস্থিত একটি গ্রাম।’

[8] আবদুল্লাহ বিন মাসুদ ছিলেন ইসলামের প্রাথমিক যুগে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের একজন। তিনি কুরআনের এক প্রসিদ্ধ পাঠক ও কুরআন ব্যাখাকারী হিসাবে বিশেষভাবে পরিচিত।
[9] Ibid আল-তাবারী; নোট নম্বর ৩৮৮

[10] আল-তাবারী: ভলুউম ১৫: ‘The Crisis of the Early Caliphate’ – translated and annotated by R. Stephen Humphreys; University of Wisconsin, Madison; State University of New York Press; ISBN 0-7914-0154-5; ISBN 0-7914-0155 -3 (pbk); পৃষ্ঠা ৬৪-৬৮
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21300&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp
[11] Ibid আল-তাবারী; ভলুম ১৫; নোট নম্বর ১১১: ‘সা’ল হলো মদিনার উপকণ্ঠে নবীর মসজিদ থেকে উত্তর-পশ্চিমে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি পাহাড়।’

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

24 − 17 =